12/01/2024
গল্প: তিন লাইনের জন্য
কেউ কাউকে খুন করলে শাস্তি পেতে হয়। এটাই নিয়ম। আমিও এই নিয়মের ভিতরেই। কিছুক্ষণ হলো আমার সৎ ভাই নিলয়কে আমি খুন করেছি। এবং পুলিশকে ফোন দিয়ে তা স্বীকারও করেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো পুলিশ চলে আসবে আমার বলা ঠিকানায়। আর আমার ভাইকে খুন করার অপরাধে হয়তো খুব তাড়াতাড়িই আমার ফাঁসির ব্যবস্থা করা হবে।
এই তো আমার সামনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নিলয়ের নিথর দেহটা পড়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে নিলয়ের গলায় আমি ছুরি চালিয়েছি।তাই এখনও তার গলা থেকে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। একটু আগেও নিলয়ের শরীরটা থর থর করে কাঁপছিলো। এখন একদম শান্ত হয়ে গেছে। অবশ্য নিলয়কে মারার আগে, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই তিন লাইন বলেছি। যে তিন লাইন কথার জন্যই আজ নিলয়ের মরতে হয়েছে। সেই তিন লাইন বলে শেষ করার আগেই নিলয় আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। আর এখন মৃত্যুর পরেও নিলয় চোখগুলো বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার এভাবে তাকিয়ে মানেটা কারণ হচ্ছে...
" মুখ ফুসকে বলা মাত্র তিনটা কথার জন্য তাকে মরতে হচ্ছে! এবং আমিও এই তিনটা কথার জন্যই তার প্রান কেড়ে নিচ্ছি!"
যদিও নিলয়কে মারার যথেষ্ট কারণ ছিলো তবুও তাকে মারার কোনো ইচ্ছা আমার ছিলো না। কিন্তু সেদিন নিয়ল আমাকে তিন লাইনে একটা কথা বলেছিলো। সেই কথা শুনে আমি বুঝতে পেরেছি নিলয় মানুষের মত দেখতে অমানুষ হয়ে গিয়েছে। তাই তার বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তার সাথে যারা মিশবে তাদের নামও চলে যাবে অমানুষের খাতায়।
হ্যাঁ, শুরু থেকে আমি সবটা আপনাদের বলবো। তবে সেই তিন লাইনটা ছাড়া, যে তিন লাইনের জন্য আমি নিলয়কে খুন করেছি। সে তিন লাইনের কথা শুধু আমি আর নিলয় জানতে পারি। অন্য কেউ নয়। এখন একদম শুরু থেকে সবটা বলছি। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন। না হয় নিলয়কে খুন করার কারণটা বুঝতে পারবেন না।...
-" আমার জন্মের সাত বছর পর একটা সড়ক দুর্ঘটনায় আমার মা মারা যায়। মা মারা যাওয়ার পর সেই সাত বছর বয়সেই আমি খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে হয়েছে যে 'সন্তানের জন্য মা খুব বড় নিয়ামত'। কারণ মা মারা যাওয়ার পর বাবা কিছুদিন আমাকে সময় দেয়। তারপরও আস্তে আস্তে বদলে যায়। বাবা খুব রাত করে বাড়ি আসে। এবং আবার সকাল হতেই চলে যায়। আমার খাওয়া দাওয়া কোনো খোঁজ নিতো না। খাওয়ার জন্য কিছু আনতোও না।
যখন খুদা সহ্য না করতে পেরে কান্না করতাম। তখন পাশের বাসার এক আন্টি এসে কিছু খাইয়ে যেতো। কিন্তু একজন ঠিক কয়দিন খাওয়াবে! তাই পাশের বাসার আঙ্কেল-আন্টি মিলে বাবা কে বিয়ে করতে বলেলেন, এবং বাবাও তাই করে।
নতুন একটা মা পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে পেয়ে মা খুশি হতে পারছিলো না। বিয়ে করে আসার তিনদিন পরেই তিনি কারণে-অকারণে আমাকে বকাঝকা শুরু করেন। বাবা বুঝতেন কিন্তু মাকে কিছু বলতেন না। মা আমাকে অকারণে বকাঝকা করলেও আমার কোনো অভিযোগ ছিলো না।কারণ সৎ মা হলেও তিনি তো মা।
বিয়ের এক বছর পরই আমার একটা ভাই হয়। বাবা আদর করে তার নাম রাখে "নিলয়"। ভাইকে পেয়ে আমরা সবাই খুশি। সবার আদরে থেকে নিলয় বড় হতে থাকে। আর নিলয়ের জন্মের পর মা যেন আমাকে আর সহ্যই করতে পারে না। আমার ছায়া দেখলেও তিনি রেগে যান। আমি যেন ওনার চোখের কাঁটা হয়ে যাই।
নিলয় যত বড় হচ্ছিলো ততই সে তার মায়ের মত করতে শুরু করেছিলো। নিলয়ের দোষ আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাকে মার খাওয়াতো। এভাবেই আমার দিন যাচ্ছিলো। কিন্তু আমার তাদের উপর কোনো অভিযোগ নেই। কারণ হয়তো কোনো দিন দুজনেই শুধরে যাবে। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে নিলয়ের অত্যাচার আরো বেড়ে গেলো। নিলয় প্রতিদিন ইচ্ছা করে কিছু না কিছু ভেঙে আমার উপর দোষ চাপিয়ে দিতো।
এই তো কিছুদিন আগেও নিলয় ঘরের এলএডি টিভিটা ভেঙে আমার উপর দোষ চাপিয়ে দিলো। আর মা সেটা বুঝতে পেরেও সেই আমাকেই মারলো। সবকিছুই আমি সহ্য করে নিচ্ছিলাম। কারণ এখন তো আমি যথেষ্ট বুঝি। আর এটাও খুব ভালো করে বুঝেছি যে 'সবার ভাগ্যে সুখ-শান্তি লিখা থাকে না। আমিও সেই ভাগ্য নিয়েই জন্মেছি।'
কিন্তু আমার উপর এমন অত্যাচার করেও তাদের মন ভরলো না। কথায় কথায় আমার মৃত মাকে গালি না দিলে যেন তাদের মনই ভরে না। আমার উপর অত্যাচার সহ্য করে নিলেও আমার মৃত মাকে গালি দেওয়াটা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তাদের এই আচরণ আর সহ্য করতে না পেরে বাবাকে বললাম। কিন্তু বাবা এই বিষয়ে কোনো প্রতিবাদই করলেন না।
এই তো সেদিন। নিলয়ের কাপড় ধুয়ে দিতে দেরি হওয়ায় নিলয় আমাকে খুব জোরে একটা লাথি মারে। কিন্তু লাথি মেরে নিজের পায়ে ব্যথা পায়। কিন্তু মাকে গিয়ে বলে আমি নিলয়কে লাথি মেরেছি। আমার কোনো কথা না শুনে মা ঝাড়ু নিয়ে আমাকে খুব মারলেন। আমাকে মেরে তিনি শান্ত হতে পারলো না। গ্যাসের চুলা থেকে ফুটন্ত পানি এনে আমার হাতে ঢেলে দিলো। আর মা চলে যাওয়ার পর নিলয় একটা বিচ্ছিরি হাসি দিয়া আমার কাছে এসে বললো...
-" কি রে, কেমন লাগছে মার খেয়ে?জানিস, তোকে মার খাইয়ে আমি খুব মজা পাই। কারণ, তোর প্রতিবাদ করার কেউ নেই। আর যাদের প্রতিবাদ করার কেউ নেই তাদের উপরই অত্যাচার করতে হয়। তাদের উপর অত্যাচার করে মনের শান্তি আনতে হয়। হয়তো তুই তোর মায়ের অপকর্মের ফল। তাই তোর জীবনের এমন দশা"
এতোদিনে আমি আজ বুঝলাম যে ' আমার মা নেই বলেই এতোটা অসহায়।' এতোদিন সব অত্যাচার সহ্য করে নিলেও আজ নিলয়ের শেষ কথা গুলোতে খুব কষ্ট পেয়েছি। কারণ কোনো মানুষ কখনো এমন কথা বলতে পারে না। এমন কথা বলে তো অমানুষরা। আর মা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আমার মৃত মাকে নিয়ে এমন কথা বলার অধিকার নিলয়কে কে দিলো? তাই সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি নিলয়কে খুন করবো। যদিও বা এটা আমার জন্য খুব কষ্টের তবুও আমি এই কাজটা করবো। কারণ, সুন্দর পৃথিবীটা শুধু মানুষের জন্য। অমানুষের জন্য নয়। একটা অমানুষ পৃথিবীতে থাকলে আরো দশটা জন্ম নিবে। তাই সে'দিন থেকেই আমি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম৷
আজ সেই সুযোগ আমি পেয়েছি। আজকে মা একটু কাজে বের হয়েছে। যদিও আমি জানি মা কোথায় এবং কি কারণে যাচ্ছে। মা কোথাও গিয়ে কিছু করুক, সেটা বলার অধিকার আমার নেই। কারণ, আমি তো অমানুষ হইনি। মা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি পা টিপে টিপে নিলয়ের রুমে গিয়ে দেখি নিলয় উপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে। তাই আমি খুব সাবধানতার সাথে তার হাত পা বেঁধে ফেলি। নিলয়ের যখন ঘুম ভাঙলো তখন আমার বাঁধার কাজ শেষ। আমি নিলয়ের হাত পা বেঁধেছি বুঝতে পেরে সে আমাকে বাজে ভাষায় গালি দিতে শুরু করে। গালির মাঝে হঠাৎ করেই নিলয় সেদিনের সেই তিন লাইনের এক লাইন কথা আবার বলে। তখনই আমি আর দেরি করি নি। তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে সেই তিন লাইনের কথা বলে বললাম...
-" এই তিনটা কথার জন্যই আজ তোকে মরতে হবে নিলয়।"
কথাটা শুনেই নিলয় চোখগুলো বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি হাতে ফল কাটার ছুড়িটা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলে নিলয় বুঝতে পারে আমি তার সাথে মজা করি নি।সে সত্যিই মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাড়িয়ে আছে। আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে নিলয়ের চোখে মুখে ভয়ের চাপ ফুটে উঠে। আমি নিজের চোখটা বন্ধ করে, নিলয়ের গলায় ধারালো ছুরিটা চালিয়ে দেই। সাথে সাথে তার গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। আর তার গলা থেকে অদ্ভুত গড়-গড় শব্দ বের হতে থাকে।
নিলয়ের শরীর থেকে রুহ টা বের হতে চাইছে। কিন্তু তার শরীর রুহ ছাড়তে চাইছে না। তার বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু সেই সুযোগ আর নেই। নিলয়ের এমন অবস্থা দেখে আমার বিন্দু পরিমাণ কষ্ট হয় নি। কারণ সে মানুষের মত দেখতে অমানুষ। অবশ্য তার বলা সেই তিন লাইনের কথা সব মানুষকেই অমানুষ বানায়।"
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি আপনাদের সবটা বললাম। হয়তো অনেকেই বলবেন আমি ঠিক কাজ করেছি। আমিও জানি আমি ঠিক কাজ করেছি। পুলিশ বোধ হয় আমার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে আমাকে নিয়ে যাবো। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই আদালতে আমার ফাঁসির রায় হয়ে যাবে। কিন্তু আমার এই গল্পটা থেকে যাবে।
আপনারা হয়তো গল্পে সেই তিনটা লাইনের কথা খুঁজবেন। যে তিন লাইনের জন্য নিলয়কে মরতে হলো, আমাকেও নিয়লকে মারতে হলো। আসলে সেই "তিনটা লাইনের" কথা গল্পে আমি উল্লেখ করি নি। কারণ আমি চাই না সে তিন লাইন কথা অন্য কেউ জানুক৷ হয়তো এই তিন লাইনের কথা শুনে আপনার মনের অজান্তে আপনিও অমানুষ হবেন। তবে সে তিন লাইনের মতই তিন লাইন গল্প আছে। আর এই তিন লাইন পরে একবার ভাববেন, 'এই তিন লাইনের কথা কি কোনো মানুষের মুখে মানায়?'
বাহিরে থেকে একটা গাড়ির শব্দ পাচ্ছি। হয়তো পুলিশ চলে এসেছে। আমি পালাবো না, আমি ধরা দিবো। আর পুলিশের কাছে অনুরোধ করবো যেন আমার এই তিন লাইনের জন্য গল্পটা ছাপানো হয়। হয়তো কেউ মৃত্যু ভয়ে অমানুষ থেকে মানুষ হবে।
__________সমাপ্ত
লেখা: রাফিকুল ইসলাম তাজ
[ বি:দ্র: ভুলক্রুটি ক্ষমা করবেন। গল্পের সেই তিন লাইনের রহস্য রেখে দিয়েছি। আর সে তিন লাইনের মতই তিন লাইন তুলে ধরেছি। আমার মনে হয় এই তিন লাইনের কথাগুলো অমানুষরাই বলে। আর সে জন্যই গল্পটা লেখলাম]