23/11/2025
ইতিহাস
মিয়ানমারের (পূর্বে বার্মা) পোশাকের ইতিহাস সেখানকার বহু-জাতিগত বৈচিত্র্য, জলবায়ু এবং প্রাচীন রাজকীয় ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত।
১. জাতীয় পোশাক: লুঙ্গি (Longyi)
মিয়ানমারের পোশাকের সবচেয়ে প্রধান এবং জনপ্রিয় অংশ হলো লুঙ্গি। এটি একটি নলাকার আকৃতির কাপড়, যা কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পরা হয়। এটি শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাকই নয়, বরং সেখানকার দৈনন্দিন জীবনেও পুরুষ-মহিলা সবার কাছেই এটি অত্যন্ত আরামদায়ক ও সহজলভ্য পরিধেয়।
পুরুষদের লুঙ্গি: পাসো (Paso)
গঠন: এটি সাধারণত প্রায় ২ মিটার লম্বা এবং ৮০ সেন্টিমিটার চওড়া এক টুকরো কাপড়, যা সেলাই করে নলাকার বা টিউব আকৃতি দেওয়া হয়।
পরার ধরণ: পুরুষরা সামনে একটি বড় গিঁট (নট) বা ভাঁজ করে কোমরে গুঁজে পাসো পরেন।
নকশা: পাসো সাধারণত চেকার্ড (চৌক-চৌক), স্ট্রাইপ (ডোরাকাটা) অথবা একরঙা হয়। সাধারণত গাঢ় রং যেমন কালো, বাদামী, গাঢ় নীল রঙের প্রচলন বেশি।
মহিলাদের লুঙ্গি: থামাইন (Htamein)
গঠন: থামাইনও লুঙ্গির মতোই নলাকার, তবে এটি পুরুষদের পাসোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল ও বৈচিত্র্যময় নকশার হয়।
বিশেষত্ব: থামাইনের কোমরের অংশে প্রায় ৫ ইঞ্চি চওড়া একটি কালো কাপড়ের স্ট্রিপ সেলাই করা থাকে, যাকে আ-থেট সিন (Ahtet hsin) বলা হয়। এই স্ট্রিপটি থামাইনকে কোমরে শক্তভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
পরার ধরণ: মহিলারা পুরো কাপড় একদিকে টেনে কোমরের একপাশে ভাঁজ করে গুঁজে এটি পরেন।
২. পোশাকের উপরের অংশ (টপস)
লুঙ্গির সাথে মিয়ানমারের মানুষ বিভিন্ন ধরনের টপস বা ব্লাউজ পরেন:
এইংগি (Eingyi): এটি হলো মহিলাদের কোমর পর্যন্ত লম্বা ব্লাউজ। এর দুটি প্রধান শৈলী রয়েছে:
ইনজি-ইনবোন (Yinbon): পাশে বোতামযুক্ত।
ইনজি-ইনজি (Yinzi): সামনে বোতামযুক্ত।
এটি সাধারণত পাতলা সুতির বা সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি হয়।
তাইকপন এইংগি (Taikpon Eingyi): এটি হলো পুরুষদের পরিধানের ঐতিহ্যবাহী জ্যাকেট। এটি কলারযুক্ত শার্টের উপর পরা হয় এবং সাধারণত আনুষ্ঠানিক বা ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। এটি ঔপনিবেশিক আমলে জনপ্রিয় হয়েছিল।
থাইংমাথেইন (Htaingmathein): এটি হলো এক ধরণের ফিটিং জ্যাকেট যা মহিলারা বিয়ে বা ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মতো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে পরেন। এর বিশেষত্ব হলো এটি এমনভাবে তৈরি যে বসলে জ্যাকেটটি কুঁচকে যায় না ("does not gather while sitting")। এটি কনবাউং রাজবংশের সময় অভিজাত মহিলাদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল।
৩. ঐতিহ্যবাহী বুনন ও নকশা
মিয়ানমারের কাপড়ে বিশেষত লুঙ্গি ও থামাইনে আচেইক (Acheik) বা লুনতায়া আচেইক (Luntaya Acheik) নামে একটি নকশা দেখা যায়।
লুনতায়া (Luntaya): বার্মিজ ভাষায় এর অর্থ হলো "একশ শাটল" (hundred shuttles)।
নকশা: এতে ঢেউ-এর মতো জটিল নকশা এবং অনুভূমিক ডোরাকাটা স্ট্রাইপের সাথে জালের মতো ডিজাইন থাকে। এটি মিয়ানমারের একটি আদিবাসী বস্ত্র প্যাটার্ন, যা প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে। ঐতিহ্যগতভাবে হাতে বোনা এই আচেইক কাপড়ের দাম অনেক বেশি এবং এটি বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরা হয়।
৪. অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ
গাউংবাউং (Gaungbaung): এটি হলো পুরুষদের মাথায় পরার ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি বা হেডড্রেস।
পাদুকা: পুরুষ ও মহিলা উভয়ই সাধারণত দুই ফিতের স্যান্ডেল বা ফ্লিপ-ফ্লপ পরে থাকেন।
৫. ইতিহাস ও বিবর্তন
প্রাচীন যুগ: প্রাচীনকালে, বিশেষ করে কনবাউং রাজবংশের (১৭৫২-১৮৮৫) সময়, পাসো (পুরুষদের) এবং থামাইন (মহিলাদের) ছিল আরো দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক পোশাক। রাজকীয় ও অভিজাত শ্রেণীর মানুষের পোশাক সোনা, রূপা এবং রত্নপাথর দিয়ে অত্যন্ত কারুকার্যময় হতো।
ঔপনিবেশিক সময়: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় অভিবাসীদের আগমনের ফলে ভারতীয় 'লুঙ্গি'র স্টাইলটি মিয়ানমারে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়কালে, ভারতীয় লুঙ্গি এবং পূর্বের রাজকীয় পাসো/থামাইনের মিশ্রণে আধুনিক নলাকার 'লুঙ্গি'র উদ্ভব ঘটে, যা আজকের দিনে জাতীয় পোশাক হিসেবে পরিচিত।
আধুনিক যুগ: অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় মিয়ানমারে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার আজও অনেক বেশি। লুঙ্গি সেখানকার সংস্কৃতি ও পরিচয়ের এক অপরিহার্য অংশ।
এই হলো মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস !