28/11/2025
গত জুমুয়াহবারে একটা মাঝারি মানের ভূমিকম্প হলো দেশে। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প ছোটখাটো কোনো ভূমিকম্প নয়। তবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অসীম দয়া আর রহমত যে, ভূমিকম্পটার স্থায়ীত্ব বেশিক্ষণ দীর্ঘ হয়নি; যার ফলে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি থেকে গোটা দেশ রক্ষা পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
সেই ভূমিকম্পটার পরে আরও বেশ কয়েকটা ছোট ছোট মাত্রার ভূমিকম্প হলো। গতকালও ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। বড় বা মাঝারি মানের ভূমিকম্পের পর সাধারণত আফটার শক হিশেবে এই ছোট ছোট মাত্রার ভূমিকম্পগুলো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু এটাও সমানভাবে সত্য যে—এই ধরণের আফটার শকগুলো অনেকসময় বড় ধরণের ডিজাস্টারের পুর্বাভাস হিশেবেও আসতে পারে।
আমরা যেহেতু ভবিষ্যত জানি না এবং ভবিষ্যত দেখতেও পারি না, আমরা সমস্তটাই সোপর্দ করব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে। নিশ্চয় তিনিই উত্তম রক্ষাকর্তা।
গত জুমুয়াহবারের ভূমিকম্প এবং এতগুলো আফটার শকের ঘটনা—এগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন এঙ্গেল থেকে দেখা এবং বিশ্বাস করা যায়। যিনি অবিশ্বাসী বা ম্যাটেরিয়ালিস্টিক চিন্তার মানুষ, তিনি এগুলোকে স্রেফ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া হিশেবে দেখবেন। যিনি বিশ্বাসী, তিনি এসবকে দেখবেন রবের সতর্কবার্তা হিশেবে।
আমরা যেহেতু বিশ্বাসী মানুষ, ভূমিকম্পকে আমরা কেবলমাত্র প্রকৃতির ক্রিয়াচক্র মনে করে গাফেল থাকলে কিন্তু চলবে না।
ভূমিকম্পটা থেকে আমরা কেবলমাত্র ‘কিয়ামতের আলামত’ নামক ব্যাখ্যা আর চিন্তাটাই গ্রহণ করেছি। এর বাইরে আর কোনোকিছু কি আমরা চিন্তা করেছি?
আচ্ছা, কিয়ামত মানে কী?
পৃথিবী ধ্বংসের একমাত্র এবং সর্বশেষ মহা আয়োজন, যে আয়োজন ঘটাবেন বিশ্বজাহানের অধিপতি মহামহিম রব।
কিয়ামত ঘটলে কী হবে?
উক্ত সময়ে যারা যারা জীবিত থাকবে, তারা একটা বিভৎস দৃশ্য অবলোকন করবে এবং সেদিন জীবিত সকলে মৃত্যুবরণ করবে।
তাহলে অর্থ দাঁড়ায়—কিয়ামত আসলে মৃত্যুরই একটা বড় আয়োজন।
কিয়ামত যদি মৃত্যুরই আয়োজন হবে, তাহলে প্রত্যেকটা মৃত্যুর ঘটনাই তো উক্ত মৃত ব্যক্তির জন্য কিয়ামত হয়ে উঠার কথা, তাই না?
গত জুমুয়াহবারের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটা যদি কোনোভাবে ১ মিনিট দীর্ঘ হতো, দেশটা পরিণত হতো একটা মৃত্যুপুরীতে। লাখে লাখে মানুষ মৃত্যুবরণ করত কেবল ঢাকা শহরেই।
যদি এমনটা ঘটতো, সেই ঘটনায় যে লাখ লাখ মানুষ মারা যেত, তাদের কাছে কী আসে যায় প্রকৃত কিয়ামত আরও ৫০০ বছর পরে সংঘটিত হলো নাকি ৫০০ কোটি বছর পরে। কারণ, তাদের জন্য কিয়ামত তো চলে এসেছে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় জুমুয়াহর দিন। কিয়ামতের মাধ্যমে মৃত্যুর যে বিভীষিকা তারা অবলোকন করত, সেটা তো তারা দেখেই ফেলেছে।
অর্থাৎ, ভূমিকম্পটা কিয়ামতের আলামত হোক বা না হোক, বিশ্বাসী মানুষের জন্য এই ঘটনা একটা মূল্যবান শিক্ষা হতে পারে। কারণ, এই ঘটনায় মারা যেতে পারতাম আমি, আপনি, আমরা। যদি তা হতো, সেটাই তো আমাদের জন্য ‘কিয়ামত’ হতো।
তাহলে, এবার চলুন আমরা একটু চিন্তা করি—ব্যক্তিগত পর্যায়ের যে কিয়ামত (ভূমিকম্পের ফলে মৃত্যুর মিছিল) আমাদের কান ঘেঁষে চলে গেল, সেই ঘটনার পর আমাদের জীবনে কতোটা পরিবর্তন এসেছে? আমাদের চিন্তায় কতোটা দাগ ফেলেছে সেদিনের সেই ঘটনা?
আমাদের ফেইসবুকের নিউজফিডের চেহারা বদলেছে কী? আমাদের সার্চহিস্ট্রিতে এসেছে কি কোনো পরিবর্তন? এখনও কি ফযরবেলা আমরা অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুমাই? এখনও কি মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার, মানুষকে ঠকানো আর হক নষ্ট করার মাঝে আমি খুঁজে পাচ্ছি জীবনের সফলতা? কুরআনের সাথে আমার সম্পর্কটা বেড়েছে? আমলের দিকে ঝুঁকতে পেরেছে আমার অন্তর? সালাতের জন্য আমার মন কি সর্বদাই তড়পায়?
এই ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প যদি এই পরিবর্তনগুলো আমাদের জীবনে আনতে সহায়ক না হতে পারে, তাহলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও আমাদের কোনোদিন বদলাতে পারবে না।
আদতে, কিয়ামত তো আমাদের ব্যক্তিক পর্যায়ে যেকোনো দিন, যেকোনো সময়েই নেমে আসতে পারে। মৃত্যুর ক্ষণটাই তো আমার আপনার জন্য সবচেয়ে বড় কিয়ামত। যে কিয়ামত একটা মশার কামড়েও নেমে আসতে পারে (ডেঙ্গু জ্বরে অসংখ্য মানুষ প্রতিবছর মারা যাচ্ছে দেশে), সেই কিয়ামতের মুখোমুখি হতে আমরা কতোখানি প্রস্তুত?