01/03/2023
জামদানীর ইতিকথা (পর্ব ০২)
জামদানির জন্মকথা
জানেন কি, জামদানির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে? সেসময় বঙ্গ ও পৌণ্ড্র এলাকায় যে সূক্ষ্ম বস্ত্রের প্রচলন ছিল তা অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়। এছাড়া প্রাচীন বাংলায় যে বরাবরই সূক্ষ্ম বস্ত্রের চল ছিল তা অবশ্য নানা জনের নানা লেখা থেকে জানাই যায়। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতাও বাংলাদেশের সূক্ষ্ম সুতির কাপড়ের প্রশংসা করেন। তার পরে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে ইংরেজ পর্যটক র্যালফ ফিচ ও ঐতিহাসিক আবুল ফজলও বাংলার মসলিনের সূক্ষ্মতার প্রশংসা করেছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে উৎকৃষ্ট সূক্ষ্ম মসলিনের দাম ছিল প্রায় তখনকার হিসেবে প্রায় ৪০০ টাকার কাছাকাছি। এই ৪০০ টাকা যে তখনকার হিসেবে বেশ অনেকটাই টাকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না!
পরবর্তীকালে মসলিনে সূক্ষ্ম নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা শুরু হয়। ঢাকা জেলাতেই এই শিল্প চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, তিতাবাড়ি, বাজিতপুর তো মসলিনের জন্য বিখ্যাত ছিল। ঢাকার জামদানি শিল্প তখন এতই বিখ্যাত ছিল যে বিদেশী বণিকরাও রীতিমতো এই শিল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন। দেশে-বিদেশে জামদানির চাহিদাও তখন ছিল মারাত্মক! অষ্টাদশ শতকের এক ইংরেজ দলিল থেকে জানা যায় সেসময় মসলিন সংগ্রহ করার জন্য দারোগা-ই-মলমল নামক রাজকর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন। যার কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি শাড়ির উৎপাদনের দিকে কড়া নজর রাখা। জেনে অবাক হবেন যে শুধুমাত্র ঢাকা থেকেই তখন প্রায় এক লক্ষ টাকার খাস মসলিন মুঘল রাজদরবারে পাঠানো হত। যেমন ১৭৪৭ সালের এক হিসেব থেকে পাই দিল্লির মুঘল বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগত শেঠের জন্য ওই বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার জামদানি পাঠানো হয়েছিল!
তবে জামদানি শিল্পের রমরমা হ্রাস পেতে শুরু করে ইংরেজরা আসার পর। শুরু হয় তাঁতিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন। ফলে জামদানি শিল্প আস্তে আস্তে পতনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মার খেতে থাকে ব্যবসা ও চাহিদা, সাথে সাথে তার মানও! একদা বাংলা বিখ্যাত জামদানীর তখন শেষের শুরু। এরপর ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব হয়। তারপরের ইতিহাস তো কমবেশি আমাদের সবারই জানা। যন্ত্রে তৈরি সস্তা বিদেশী সুতোর সাথে পাল্লা দিতে না পেরে দেশী সুতোর রমরমা কমতে থাকে। ফলে কমতে থাকে জামদানির রমরমাও।
বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে...