10/12/2024
কি নাম তোমার?
আমার নাম মোহাম্মদ হাসান।
তোমার একটা ছবি তুলি?
আমনে কি ইউটিউবার?
না, আমি খুব সামান্য একজন মানুষ, চাকরি করি।
তাইলে আমার ছবি তুলবেন কিল্লেগ্গা?
তোমাকে আমার পছন্দ হইছে।
এই পরথম কেউ কইলো আমারে তার পছন্দ অইছে!
সবাই আমারে অপছন্দ করে, বকা দেয় আর মারে।
খালি আমার মায় আমারে আদর করতো, ভালো পাইতো।
আর কেউ আমারে পছন্দ করে না।
তুলবো ছবি?
তোলেন, কমলাপুর যাইবেন? আপনার অফিস কি ওই দিকে?
আমার অফিস মতিঝিল।
তাইলে আমার কাছে আইসা বসেন।
এহন একটা লোকাল টেরেন আইবো,
ঐটার পরে ভালো টেরেন আইবো, ঐটাতে যাইয়েন।
একটু আমার লগে গল্প করেন।
এটা কি বানাইতাছো?
পাহাড় বানাইতাছি। মাঝে মাঝে হয়, আর বেশিরবাগ টাইমে বাইঙ্গা যায়, জীবনের লাহান!
(একটু অবাক হলাম, রেললাইনে বসা ছিন্নমূল একটা কিশোরের কাছে জীবন নিয়ে এমন ফিলোসফি আশা করিনি)!!
লোকাল ট্রেনেই কমলাপুর যাবো ভেবেছিলাম। তার কথাটা শুনে আগ্রহ নিয়েই তার পাশে বসলাম। লোকাল চলে গেলো। আন্তনগর ট্রেনের অপেক্ষা।
তবে ট্রেনের চাইতে ছেলেটার কিছু কথা শুনতেই আমার আগ্রহ বেশি হচ্ছিলো।
মানুষের জীবনে আবার পাহাড় হয় নাকি?
অয়না? এই যে মায়ে আদর দিয়া বালোবাসার পাহাড় বানায়া দিছিলো।
এক বছর আগে মায়ে মইরা গেছে। বাপে আবার বিয়া করছে। সৎ মায়ে আমারে বাসা থেইক্কা বাইর কইরা দিছে। আমার জীবনের পাহাড় বাইঙ্গা দিলো।
(চোখের কোন নিজের অজান্তেই পানি চলে এসেছিলো, নিজেকে সামলালাম)
এখানে কোথায় থাকো?
আশকোনা টোকাইগো লিগ্গা একটা আশ্রয়কেন্দ্র আছে, ঐহানে থাহি।
ঠিকমতন খেতে দেয়?
হ, খাইতে দেয় আবার রাইতে পড়তে বহায়।
তুমি পড়ো?
হ, খালি আমিই পড়ি, আরডি কেউ পড়ে না। সব কয়ডায় ডান্ডি খায়।
তুমি খাও না?
না। আমি এডি কিছু খাই না। কিডনি মিডনি জইল্লা জাইবোগা।
(চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চোখটা খুব স্বচ্ছ আর মায়ায় ভরা। সাধারণত যারা নেশা করে তাদের চোখ হয় ঘোলাটে আর থাকে ঘুমঘুম ভাব। পায়ের কাছে পোড়া দাগ দেখে জিজ্ঞেস করলাম)
পাও পুড়ছে কেমনে?
জাউরা গুলি আমি ডান্ডি খাইনা দেইখ্যা রাইতের বেলায় গুমের মইদ্দে আমার পায়ে কেরাসিন ঢাইল্লা আগুন ধরায়া দিছিলো। আমারে চুরি করতে কয়। আমি তো চুরি করতাম না। সকাল বেলা জীবনের পাহাড় বানাই, তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত বোতল টোকাই। সকালে আর রাইতে হেরা (পুনর্বাসন কেন্দ্র) খাইতে দেয়। চুরি করমু কিল্লেইগ্গা?
আপ্নে কিয়ে চাকরি করেন?
ব্যাংকে চাকরি করি।
ব্যাংকে চাকরি লইতে কি পাশ অয়ন লাগে?
বিএ পাশ।
আইচ্ছা।
তুমি ব্যাংকে চাকরি করতে চাও?
একটা বালা চাকরি ওইলেই অয়।
চাকরি কইরা পরে কি করবা?
বাড়িত যামু, যাইয়া বাপেরে কমু, আমারে বাড়ি থেইক্কা খেদায়া দিয়া তোমার জীবনের পাহাড় বাইঙ্গা গেছেগা। তয় আমার জীবনের পাহাড় কিন্তু বাঙ্গে নাই। দেহো, আমি পাহাড় অইয়া আইছি।
ট্রেন চইলা আইছে, আপ্নে অফিসে যাইতেননা?
ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ট্রেনে উঠলাম। তার কাছে কোনো মোবাইল নেই তাই যোগাযোগের জন্য কোনো নাম্বার নিয়ে আসতে পারিনি। আসার আগে কিছু টাকা হাতে দিয়ে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মনে হলো এই ছেলে আমার কাছ থেকে টাকা নেবে না। জীবনের পাহাড় বানাচ্ছে যে ছোট্ট ছেলেটা, সে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তার পাহাড় ভাঙবে না।