11/02/2026
জুলাই সনদের মোট প্রস্তাব ৮৪টি৷ এটাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে আছে ১-৪৭ নং প্রস্তাব৷ গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এই প্রথম ভাগের উপরে৷ অর্থাৎ হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হলে এগুলো বাস্তবায়ন হবে। এই ৪৭টি প্রস্তাবের সার আমি সহজ ভাষায় ১৭টি পয়েন্টে তুলে ধরব।
১. প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা৷ প্রচলিত অন্যান্য ভাষার স্বীকৃতি প্রদান। জাতি হিসেবে বাঙালি না, বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত হবো আমরা।
২. সংবিধানের মূলনীতি আগে যে চারটা ছিল: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ৷ এখন যে চারটা থাকবে: সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
৩. জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট৷ নিম্নকক্ষের এমপিরা আগের কায়দায় নির্বাচিত হবেন৷ উচ্চকক্ষের আসন সংখ্যা হবে ১০০৷ উচ্চকক্ষের প্রার্থীরা PR পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। পিআর জিনিসটা খুবই সিম্পল। একটি রাজনৈতিক দল দেশের মোট ভোটের কত শতাংশ পেলো তার উপর নির্ভর করে উচ্চকক্ষে সিট পাবে। ধরে নিই, কোনো দল দেশের মোট ভোটের ৩৫% পেয়ে নিম্নকক্ষে ১৫১টি আসন পেলো৷ তারা সরকার গঠন করতে পারবে কিন্তু উচ্চকক্ষে ৩৫টা সিট পাবে ১০০টার মধ্যে। সোজা কথায়, যত পার্সেন্ট ভোট, ততটা উচ্চকক্ষের সিট। জিতে গেলে সব পাওয়া, আর ভালো সংখ্যক ভোট পেয়ে হেরে গেলে সব হারানো— এই চলমান নীতির অবসান হবে৷
৪. মন চাইলেই সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে প্রথমে৷ সেইখানে পাশ হইলে উচ্চকক্ষে যাবে৷ উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানে অর্ধেকের চেয়ে বেশি ভোট লাগবে৷ তবে ভাইটাল কিছু সংশোধন করতে হইলে গণভোট লাগবে৷
৫. রাজনৈতিক দলের হেডপারসন প্রধানমন্ত্রী হইতে পারবেন না। উলটো করে বললে ভালো বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী হইলে আর দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না। দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। মানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অবসান হবে।
৬. প্রধানমন্ত্রী চাইলেই জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবে না; মন্ত্রীসভার মিটিং লাগবে; সেই মিটিংয়ে বিরোধী দলের নেতা বা উপনেতার উপস্থিত থাকা লাগবে৷ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে মানুষ মাইরা ফ্যালা যাবে না।
৭. সংসদের মধ্যে নানারকম ভোট-ফোট হয়। ওইখানে আগে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া যাইতো না। ফলে অনেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে চাইলেও অবস্থান নিতে পারতেন না এমপিরা৷ এখন দেওয়া যাবে। অর্থবিল আর আস্থা ভোট ছাড়া যেকোনো কেইসে নিজের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যাবে।
৮. সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হবে। নিম্নকক্ষের ৩০০ এমপির মধ্যে অন্তত ১০০ জন হবেন নারী। এই লক্ষ্য ক্রমান্বয়ে পূরণ করা হবে৷ কোটা পূরণ না বরং প্রকৃতপক্ষে নারীর ক্ষমতায়ন হবে।
৯. আগে তো একটাই কক্ষ ছিল সংসদের৷ তাই ওই এক কক্ষের সাংসদরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতেন। এখন যেহেতু দুই কক্ষ হবে, দুই কক্ষের লোক মিলায়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
১০. আগে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া মাত্র দুইজনকে নিয়োগ দিতে পারতেন: প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি। এখন আরও ৬টা জায়গায় উনি এই পাওয়ার পাবেন৷ ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে৷ প্রধানমন্ত্রী যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না৷
১১. রাষ্ট্রপতির অভিশংসনও অতো সহজে করা যাবে না। প্রথমে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে৷ তারপর উচ্চকক্ষেরও দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে৷ ফলে, রাষ্ট্রপতি আর পুতুল হিসেবে থাকবে না।
১২. রাষ্ট্রপতি আগের মতো আসামীকে মাফ-টাফ করে দিতে পারবেন। তবে ভিক্টিমের পরিবারের সম্মতি লাগবে তাতে।
১৩. নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্ডারে৷ তবে রাষ্ট্রপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবেন না। ফলে উনি একটা রিয়েলিটি চেক খাবেন৷ প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে পদ্ধতি মেনে, কমিটি করে, মোটামুটি সব পক্ষের অংশগ্রহণে।
১৪. ডেপুটি স্পিকার হবে বিরোধী দল থেকে৷ সংসদীয় বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতেও থাকবেন বিরোধী দলের লোক। অর্থাৎ ক্ষমতায় আরও একটু ভারসাম্য।
১৫. বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন৷ প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাবেন আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি। আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবে৷ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ হবে নিয়োগ কমিশনের মাধ্যমে। সুপ্রিম কোর্ট শুধু ঢাকায় থাকবে না, বিভাগেও স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে৷ মানুষের দৌড়াদৌড়ি একটু কমবে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির ব্যাপারটা দেখবে সুপ্রিম কোর্ট৷
১৬. নির্বাচন কমিশন, ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুদকে নিয়োগ হবে নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে৷ সেই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। অর্থাৎ আরও বেশি ভারসাম্য৷
১৭. স্থানীয় সরকার হবে স্বায়ত্তশাসিত। আমলারা হবে জনপ্রতিনিধিদের অধীন।
গণভোট সম্পর্কিত কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের ভিডিও বা পোস্ট আমি দেখিনি, পাছে প্রভাবিত হই। মানে, এই মতামত-বোঝাপড়া নিতান্তই মৌলিক বলা যায়৷ যদি আপনার মনে হয় আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিস করে গেছি, ভুল বা শয়তানি করেছি, তাহলে আমাকে দেখিয়ে দেবার অনুরোধ৷
আওয়ামী লীগ এবং অ-আওয়ামী লীগ অংশের যারা প্রচার করছেন যে এর সাথে এলজিটিভি ইস্যু বা ফরিদপুরের বিভাগ হওয়া ইত্যাদি সম্পর্কিত তারা ভুলও করছেন না, কন্সপিরেসি থিওরিও দিচ্ছেন না; তারা ডাহা মিথ্যা কথা বলছেন। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই, নিজে জুলাই সনদ পড়ে দেখতে পারেন৷
এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কোনোটার সাথেই আমার কঠোর দ্বিমত নেই। বরং কিছু কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি মনে করি, যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতার ভারসাম্য, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি৷ তবে লুপহোল আছে। ইভেন যদি ফুলপ্রুফও হতো তাও কথা থাকতো: রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
অনেকে বলছেন, হ্যাঁ ভোট না দেওয়াটা হচ্ছে শহিদের রক্তের সাথে বেঈমানি। আমি ওভাবে বলব না। বেঈমানি অনেক কঠিন শব্দ। বরং এভাবে বলা যায়, হাজারের উপরে মানুষ শহিদ হয়েছেন, শুধু কিছুটা পরিবর্তনের আশায়। দেড় বছরে আমরা জাতি হিসেবে শুধু সেই পরিবর্তনের একটা ড্রাফট করতে পেরেছি। সেই ড্রাফট কাজে লাগানোর সুযোগ আমাদের সামনে উপস্থিত। চাবি আমাদের হাতে।
এজন্যই আমি এবং আমরা শুরু থেকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছি; বলছি যে, ভোট যাকে খুশি দেন, গণভোটে হ্যাঁ ভোট অবশ্যই দিয়েন। আপনার পছন্দের রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে যাতে তারা উলটো আপনার উপর অত্যাচার করতে না পারে এইজন্য হলেও গণভোটে হ্যাঁ দিন।
অন্তর্বর্তী সরকার হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা করতে পারবে না— এরকম 'নিরপেক্ষ' অবস্থান আমি ধারণ করি না। তবে এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা যে, স্বাধীনতার এতো বছর পরে এসেও জনগণের টাকায় একটা খুবই অভিয়াস জিনিসের ব্যাপারে প্রচারণা চালানো লাগছে।
আমার যেরকম সংস্কার প্রস্তাবের সবগুলোই এককথায় মোটামুটি পছন্দ হয়েছে, আপনাদের সবার না-ও হতে পারে৷ সেক্ষেত্রে আপনারা কী করবেন? কস্ট-বেনিফিট হিসাব করবেন। ৪৭টা প্রস্তাবের কতগুলো আপনার পছন্দ, কতগুলো অপছন্দ, সেই পছন্দ-অপছন্দের মাত্রাটা কেমন৷ ধরে নিই, আপনার ৭টা প্রস্তাব পছন্দ হয়নি, বাকি ৪০টা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনি হ্যাঁ ভোট দেবেন৷ আবার দেখা গেল সেই ৭টা প্রস্তাবের সাথে আপনি এমনভাবে দ্বিমত যে সেটা বাকি ৪০টা পজিটিভ পয়েন্টকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে৷ তখন না ভোট দেবেন৷ তবে আপনি যদি সত্যিই প্রি-ডিটারমাইন্ড কোনো পজিশনে স্ট্রিক্ট না থাকেন, এরকমটা হবার কথা না, সমস্ত লুপহোল সমেতই৷
আমি মনে করি, ভোট ঠিকঠাক হলে হ্যাঁ ভোট জিতবে৷ তবে যদি ফেয়ার ইলেকশনে না ভোট জেতে তবে তা-ই সই। এটাই গণতন্ত্র।
গণভোটে হ্যাঁ জিতলে বাংলাদেশ রাতারাতি স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে না। তবে মিনিমাম একটা মানবিক এবং সিভিলাইজড রাষ্ট্র গঠনের প্রথম পদক্ষেপটা আমরা নিতে পারবো৷
- Copied Post