শতফুল-shotoful

শতফুল-shotoful We ensure you the premium quality products. The sole purpose is to improve the lifestyle which means saving valuable times for the people of Bangladesh.

ইন শা আল্লাহ ❤️চেষ্টা করছি নতুন মোড়কেআগের মতই সেরা গুনগত মান নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হতেআল্লাহুম্মা বারিক
14/01/2024

ইন শা আল্লাহ ❤️
চেষ্টা করছি নতুন মোড়কে
আগের মতই সেরা গুনগত মান নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হতে

আল্লাহুম্মা বারিক

ইয়া রব্বী,আমার মতো এভাবে কে আর পথ হারায়?তোমার মতো এভাবে কে আর পথ দেখায়?আমাকে তুমি ধরে রাখো—ভালোবাসায়, রহমতে, নিয়ামতে।বুক...
27/12/2023

ইয়া রব্বী,
আমার মতো এভাবে কে আর পথ হারায়?
তোমার মতো এভাবে কে আর পথ দেখায়?
আমাকে তুমি ধরে রাখো—ভালোবাসায়, রহমতে, নিয়ামতে।
বুকের মধ্যে আস্ত একটা জান্নাত নিয়ে চলার তৌফিক দাও।

আমিন 🤲

20/09/2023

আব্বু আর মেরো না, আব্বু খুব ব্যাথা পাচ্ছি আব্বু, আব্বু আমি পড়ে গেলে নিচে দাড়া করে রাখা লোহা গুলো আমার মাথা ফুটো হয়ে ঢুকে যাবে আব্বু। আব্বু তুমি যা বলবা তাই করব। আম্মু প্লীজ ফ্যানটা ছেড়ে দিও না আম্মু। আম্মু বাচাও আমাকে, ছেড়ে দাও আমাকে,,,, বলে চিৎকার করতে করতে আজ রাতেও লাফিয়ে উঠল রাসেল। ফুল স্পীডে ঘুরতে থাকা ফ্যানের নিচেও ঘেমে নেয়ে উঠেছে ওর পুরো শরীরটা। তারপরেই মুচকি একটা হাসি দিয়ে মনে মনে বলল," ধুর, আগেই বোঝা উচিৎ ছিল এটা স্বপ্ন, বাস্তবে সেদিন তো আমার মুখ পর্যন্ত বেধে নিয়েছিল তারা।"
......

দুইপা একসাথে বেধে ফ্যানের সাথে পা উপরে মাথা নিচের দিকে দেয়া উল্টো ভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় আবিষ্কার করল নিজেকে সফিক সাহেব। মুদে যাওয়া চোখদুটো আবছা আবছা করে খোলার চেষ্টা করতেই সামনে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেল সে। উলটো অবস্থায় ও স্পস্ট চিনতে পারলো সামনে বসা মানুষটাকে। বিগত এক মাসের ভেতর তিন বার দেখা হয়েছে এই মুখের মালিকের সাথে।......

সফিক রেহমান, দেশের অন্যতম নাম করা সাইকিয়াট্রিস্ট। আজব আজব সব রোগীদের উদ্ভট সব প্রশ্ন শোনাই কাজ তার। দরজা ঠেলে বেশ অদ্ভুত দর্শন একজন ঢুকল চেম্বারে৷ চশমার ওপর দিয়ে আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিল সফিক। বয়স ৩২ এর আশপাশ হবে। এলো মেলো ঝাকড়া চুলগুলো একটু পর পর দুলে উঠছে সিলিং ফ্যানের বাতাসে।

- তা কি সমস্যা আপনার। বলুন।
- স্যার, আপনি পিশাচ বানাতে পারেন?
- হ্যা পারিতো, কয় পিস লাগবে আপনার? সরি মজা করলাম, আচ্ছা আপনার সমস্যাটা বলুন এবার।
- আচ্ছা স্যার, আপনার পা বেধে উলটো করে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিলে কতক্ষন থাকতে পারবেন?
- মানে...?
- আমি আজ তাহলে উঠি, আপনি একটু ভেবে বা প্র‍্যাক্টিক্যাল চেষ্টা করে আমাকে জানাবেন। আমি আবার আসবো।... বলেই উঠে চলে গেল লোকটা। একটা ভয়ংকর শীতল অনুভুতি যেন জাপটে ধরেছে সফিককে। হঠাৎ মনে পড়ল রোগীর নামটাই জিজ্ঞেস করা হয় নি। রিসিপশনের মেয়েটাকে পেশেন্ট লিস্ট এর খাতা টা নিয়ে ডাকলেন। শেষ টিক দেয়া নামটা দেখলেন ভালো করে,
(√) "রাসেল চৌধুরী"...

পাঠ: ২

আমিনবাজারের নদীর পাড় ধরে হাঁটছে রাসেল। দুই হাতে একটা লাল ও একটা কালো রঙের দুটো বিড়ালের বাচ্চা। আর সাথে সারা গায়ে ধুলো মাখানো, ছেঁড়া একটা হাফপ্যান্ট পরা ৪-৫ বছর বয়সের একটি বাচ্চা। বাচ্চাটাকে বেশ কষ্ট করেই খুঁজে পেতে হয়েছে রাসেলের। এই বয়সী সাতার জানা বাচ্চা খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। একটু পরপর রাসেলের মুখে ফুটে ওঠা মুচকি হাসিটা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে ইসমাঈলকে পেয়ে বেশ খুশি সে। অনেকদিন পর পুরনো একটা খেলার স্বাদ নেয়ার তীব্র ইচ্ছা চকচক করছে তার চোখে মুখে। লোকজন নেই এমন একটা জায়গায় নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালো দুজন। ইসমাইলের হাতে ইটের খোয়া ভর্তি একটি ব্যাগ।

- ইটের চাক্কা দিয়া কি অইব স্যার?
- ইসমাইল, আজকে খুব মজার একটা খেলা খেলব আমরা।
বলেই বিড়ালের বাচ্চা দু'টোকে নদীর দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল রাসেল। পানিতে পড়তেই বিড়ালের বাচ্চা দুটো সাঁতরে নদীর পাড়ে আসার চেষ্টা করতে নিচ্ছিল। সাথে সাথে রাসেল একটা বড় ইটের টুকরো নিয়ে মারলো লাল ছানাটির মাথার উপর। সাথে সাথে মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল ফিনকি দিয়ে। ছানাটি ডুবতে নিয়েও আবার যেন বাঁচার শেষ ইচ্ছাটুকু নিয়ে, আবার মাথা জাগালো পানির উপর। সাথে সাথে রাসেলের হাতের আরো একটি ইটের টুকরো সাঁই করে ছুটে এলো ওর মুখ বরাবর।

এদিকে ইসমাইল ও যেন বেশ মজা পাচ্ছে। সেও ইটের টুকরো হাতে নিয়ে সমানে মেরে চলছে, কালো ছানাটির গায়ে,,, আর রাসেল উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে ইসমাইলের দিকে।

সেদিন রাতে পুলিশ ইসমাইলের লাশ আমিনবাজারের নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করে। ওর লাশের সারা মাথায় ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন, যেন শক্ত কোন কিছুর আঘাতে জায়গায় জায়গায় খুলি ভেঙে ফুটো হয়ে গিয়েছে ওর। .....

হাতে একটা বক্স নিয়ে শফিক রেহমানের রিসিপশনিস্ট মেয়েটা চেম্বারে ঢুকলো।
- স্যার এই বক্সটা একজন আপনার জন্য দিয়ে গেল।
মেয়েটি বেরিয়ে যাবার পর সাবধানে বক্সটা খুললেন শফিক। বক্সটা খুলতেই ভয়ঙ্কর রকম ঠান্ডা শিরশিরে একটা অনুভূতি যেন নেমে তার শিরদাঁড়া বেয়ে। বক্সের ভেতর ভেজা চুপচুপে দুটো বিড়াল ছানার লাশ। একটা লাল, একটা কালো।

পাঠ: ৩

বেশ কিছুদিন রাসেলের কোন খবর শফিক সাহেবের কাছে আর আসেনি। প্রায় ভুলতেই বসেছিল তার কথা। এক বিকেলে চেম্বারে ঢুকে দরজা লাগাতে লাগাতে খেয়াল করলেন চেম্বারে ভেতরে রোগীর চেয়ারে এলোমেলো চুলের কেউ একজন উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছে। মুখটা না দেখলেও শফিক সাহেবের চিনে নিতে ভুল হলো না রাসেলকে,

- আরে আপনি, বসুন বসুন আপনার সাথে জরুরী কথা আছে। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি আগে। - বলেই ওয়াশ রুমের দিকে পা বাড়ালেন।

ওয়াসরুম এর দরজা খুলতেই বিকট এক চিৎকার দিয়ে পেছনদিকে পড়ে গেল শফিক। তার সামনে পড়ে আছে রিসিপশনিস্ট মেয়েটার মাথাহীন রক্তাক্ত দেহ। গলার ওপর কাটা জায়গাটা থেকে তখনও ফিনকি দিয়ে ছিটকে ছিটকে রক্ত বেড়িয়ে আসছে, আর কেঁপে কেঁপে উঠছে পুরো শরীরটা। তার পাশেই পড়ে আছে দ্বিখণ্ডিত মাথাটা। ওটার চোখে চোখ পড়তেই, শফিকের দিকে চেয়ে যেন শেষ পলকটা ফেলল চোখের পাতা দুটো।

শফিকের চিৎকার শুনে পেছন থেকে একজন দৌড়ে এসে শফীকে জাপটে ধরলো। শফিক সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে রিসিপশনিস্ট মেয়েটা কে দেখতে পেয়ে ভড়কে গেল ভীষণ রকম।
- তু...তুমি এখানে! তাহলে বাথরুমে কার লাশ!?
- স্যার, কী বলছেন এসব, কার লাশ, কোথায় লাশ!?

শফিক সাহেব আবার বাথরুমের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে তাকালেন, কিন্তু সেখানে কোনো লাশ দেখতে পেলেন না।

- রুমে যে লোকটা বসে ছিল সে কোথায়?
- স্যার আপনি মাত্র চেম্বারে ঢুকলেন। আপনি ঢোকার আগে চেম্বারে কোন রোগীকে ঢুকতে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ওয়াশ রুমের দরজাটা লাগিয়ে বেসিনের সামনে গিয়ে দাড়ালেন সফিক। দু'হাতের আঁজলা ভরে এক ঝাপটা পানি ছিটিয়ে দিলেন তার ঘর্মাক্ত মুখ বরাবর।
....

রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। বনানীর বিলাসবহুল হোটেল সিগাল এর সামনে এই বৃষ্টির মধ্যেও অনেক মানুষজনের ভীড়। হোটেলের সামনে দাঁড়ানো পুলিশের গাড়ি গুলোর সাইরেন বেজেই চলেছে অনবরত। হোটেলের ১৪ তলার একটি রুমের বাথরুম থেকে একটি মেয়ের মাথাহীন লাশ উদ্ধার কর্ম চলছে। মেয়েটির ব্যাগ থেকে পাওয়া আইডি কার্ড ও কনডমের প্যাকেট থেকে শারমিন নামের মেয়েটির প্রাথমিক পরিচয় ও পেশা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করতে পেরেছে পুলিশ। তবে ঘাতকের ব্যাপারে এখনো কিছুই জানা যায়নি। এমনকি পাওয়া যায়নি মেয়েটির মাথাটিও। ....

শহুরে কোলাহল এড়াতেই, ব্যয়বহুল এলাকাতেও বিশাল জায়গা নিয়ে বাড়ি করেছেন সফিক সাহেব। বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে অসংখ্য রকম নানা বিধ গাছ লাগানো। এলাকার বাউন্ডারি বিশাল জায়গা জুড়ে হলেও মাঝা মাঝির দিকে অবস্থিত তার ডুপ্লেক্স বাড়িটা কিন্তু খুব এক টা বড়সড় নয়। বাড়ির দরজার দশ কদম সামনেই লেটার বক্স টা। তার পাশেই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও ঠায় দাঁড়িয়ে ভিজে চলছে রাসেলের এলোমেলো চুল গুলো। তার ডান হাতে ধরা শারমিনের মাথাটা একটা গিফট বক্স এর মধ্যে র‍্যাপ করে ড্রপ করে দিল সফিকের লেটার বক্সে। হাতের ৭ ইঞ্চি চাকুটায় লেগে থাকা রক্তগুলো মাথার চুলে মুছতে মুছতে একটা লাইন গুনগুন করতে করতে হারিয়ে গেল অন্ধকারে..

"এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি নেই বলে
সময় আমার কাটেনা।
চাঁদ কেনো আলো দেয় না,
পাখি কেন........"

পাঠ: ৪

পরপর দুটো রোগীকে ফিরিয়ে দিলেন আজ সফিক সাহেব। একের পর এক বিষয়গুলো অস্থির করে তুলেছিল তাকে। সবকিছুর জন্য রাসেলকে দোষী ভাবতে চাচ্ছিলেন মনে মনে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় সেটাই পারছিলেন না। কে এই রাসেল, হ্যা মানসিক বিকারগ্রস্থ এটা নিশ্চিত, কিন্তু তার কাছে কি চায়! রাসেলের নামটা অভিশাপের মত তার কানে এসে বাজছিল বারবার। চোখ বন্ধ করে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনে চোখ না খুলেই বলে উঠলেন,

- আমি তো আসতে নিষেধ করলাম এখন কাউকে। - বলতে বলতেই চোখ খুলে রাসেলকে দেখতে পেয়ে চুপ হয়ে গেলেন শফিক। দরজাটা বন্ধ করে বেশ নির্লিপ্ত ভাবেই হেটে এসে বসল সফিকের সামনে।

- আজ আপনার সাথে একটা মজার খেলা খেলবো। আমার সব থেকে প্রিয় খেলাটা।
- আমার সাথে মজার খেলা খেলবেন!? আমিই কেন। আমার সাথেই কেন?
- স্যার আপনি পিশাচ বানাতে পারেন?
- না, এই সব নুইসেন্স জিনিস আমি বানাই না। আপনি পারেন পিশাচ বানাতে?
- জ্বি স্যার, পারি। তবে হয়তো আমার তৈরি পিশাচ আপনার দেখা হবে না।
- আচ্ছা স্যার, আপনার পা বেঁধে উল্টো করে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিলে কতক্ষন থাকতে পারবেন?
- এক সেকেন্ড ও পারার দরকার নেই আমার। পা বেধে উল্টো করে ঝুলে থাকতে হবে কেন শুনি!? আপনি পারবেন?
- জ্বী স্যার, পারব। আজ প্র‍্যাক্টিক্যাল দেখাবো আপনাকে। চলেন স্যার অনেক কাজ, এখনি না গেলে দেরি হয়ে যাবে।

হটাৎ সফিকের মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠলো। অন্ধকার হয়ে আসলো সামনের সব কিছু
....

আমিন বাজারে নদীর পারে ৭ থেকে ১০-১২ বছর বয়সী ৫-৬ টা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে৷ সবার এক হাতে একটা বিড়ালের বাচ্চা আর অন্য হাত ভর্তি ভাঙ্গা ইটের বড় বড় খোয়া। সবাই ওদের খুব প্রিয় একটা খেলা খেলতে এসেছে। যদিও খেলাটা একদম নতুন শেখা। ওদের এক নতুন বন্ধুর কাছ থেকে। সে আবার প্রতিদিন ওদের সাথে এই সময়ে এই খেলাটা খেলে। কিন্তু আজতো অনেক দেরি হয়ে গেল এখনো আসলো না! তারপর ১-২-৩ বলে সবাই যার যার হাতের ছানা গুলো ছুড়ে দিল নদীর দিকে....

পাঠ: ৫ (শেষ)

খাটের ঠিক মাঝ বরাবর দুইপা একসাথে বেধে ফ্যানের সাথে পা উপরে মাথা নিচের দিকে দেয়া অবস্তায় উল্টো ভাবে ঝুলছে সফিক সাহেব। তার মাথার ঠিক নিচেই খাটের মসারি টাঙ্গানোর স্ট্যান্ডের উপর দাড়া হয়ে থাকা লোহার পেরেক চারটা সেট করা। কোন ভাবে পড়ে গেলেই পেরেক গুলো সরাসরি মাথায় গেথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত একদম। মুদে যাওয়া চোখদুটো আবছা আবছা করে খোলার চেষ্টা করতেই সামনে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেল সে। উলটো অবস্থায় ও স্পস্ট চিনতে পারলো তার ঠিক সামনেই, ঠিক তার মতো করেই আরেকটা খাটের উপর সিলিং ফ্যান এর সাথেই বাধা পা দিয়ে উলটো হয়ে ঝুলে থাকা মানুষটাকে। বিগত এক মাসের ভেতর তিন বার দেখা হয়েছে এই মুখের মালিকের সাথে।

- স্যার, একটা মানুষের সবথেকে আপন কে হয়?
- অবশ্যই তার বাবা মা।
- হা হা হা, জানেন স্যার আমার যখন সাড়ে তিন বছর বয়স তখন আমি রাতে জোড়ে কাদতাম বলে আমার মুখ আর হাত-পা বেধে সারা রাত খাটের নিচে ফেলে রেখেছিল আব্বু আম্মু।
- কি বলছেন এসব!
- জানেন, আমি যখন মাত্র ১ম শ্রেনীতে পড়ি তখন ২য় পার্বিক পরিক্ষায় আমার রেজাল্ট খারাপ আসে...
- তারপর?
- আমার আব্বু আমাকে ঠিক এভাবে ঝুলিয়ে দেয় ফ্যানের সাথে। আমার মাথার ঠিক নিচে দাড়া হয়ে ছিল স্ট্যান্ড এ তীক্ষ্ণ পেরেক চারটা। রক্তের চাপে আমার ছোট্ট মাথাটা প্রচন্ড ভারী হয়ে আসছিল, কিন্তু আতংকে আমি সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। আমি যাতে চিৎকার পর্যন্ত করতে না পারি, সেজন্য মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে মুখ পর্যন্ত বেধে দেয় আমার। বলতে নিয়ে বলতে পারছিলাম না যে দম আটকে আসছিল আমার। তারপর পর আব্বু ক্যাসেট প্লেয়ার এর তারটা চার ভাজ করে আমাকে পেটাতে শুরু করে ঝুলিয়েই। উলটো হয়ে ঝুলে অসহায় ভাবে আম্মুর দিকে তাকিয়ে আব্বুর দেয়া তারের বাড়ি খেতে থাকি আমি।
- আম্মুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তারপরও আম্মু আপনাকে বাঁচালো না!?
- হা...হা....হা, (উল্টো অবস্থাতেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো রাসেল), আমি আম্মুর দিকে কেন তাকিয়ে ছিলাম জানেন?
- কেন?
- সেদিন আম্মু দাঁড়িয়েছিল ফ্যানের সুইচ এর কাছে, বলেছিল যদি আমি বেশি নড়াচড়া করি তাহলে সে ফ্যানের সুইচটা ছেড়ে দেব। আমি তাই, মার খেতে খেতে ও আম্মুর হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম সে ফ্যানের সুইচটা না ছেড়ে দেয়...
- Oh My God,,! কী বলছেন এসব, কারো বাবা মা কারো সাথে এমন কেন করবে!
- আমি জানিনা, আর সেদিনের পর তাদের ব্যাপারে জানার সুযোগও আমার আর তেমন হয়নি। তবু ওইদিন থেকে ব্যথা আর ভয়ের সাথে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক হয়ে যায়। খুব ভালো লাগে আতঙ্কের অনুভূতিগুলো। কেমন যেন একটা নেশার মতন অনুভব হয়। তবে আঘাত করার থেকে আঘাত পেতে আমার বেশি মজা লাগে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এই উল্টো অবস্থায় নিচে পড়ে গেলে যদি পেরেকগুলো মাথায় ঢুকে যায় তখন কেমন লাগবে। আজকে সেটাই অনুভব করতে আপনাকে নিয়ে এখানে এসেছি।

শফিক খেয়াল করল ওরা দুজনই যে দড়ি দুটো দিয়ে দুই ফ্যানের সাথে ঝুলছে সেটার দড়ি দুটো রাসেলের হাতে ধরা।

- আপনি একদম পাগলামি করবেননা, কি বলছেন এসব? শক্ত করে ধরে রাখুন দড়িটা। ওটা ফসকে গেলে আমরা দুজনই মারা পড়বো। আপনার অতীত আমার পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব না, তবে আপনার ভবিষ্যৎ টা যাতে সুন্দর হয় সেটার চেষ্টা অন্তত আমরা করতে পারি।
- আর কিছু পরিবর্তন করতে হবে না স্যার, আজকের এই দৃশ্যই আপনারা আমার জীবনের শেষ অধ্যায়।

বলেই হাতে দরি দুটো ছেড়ে দিলো রাসেল৷ জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত যেন খুব স্লো হয়ে গেল শফিকের কাছে। মাথা ভেদ করে ঘি*লুতে চারটে করে পেরেক গেথে যেতেই মুহুর্তের মধ্যে নিথর হয়ে গেল দুটি দেহ। একটা নিষ্পাপ মুচকি হাসি তখনো ফুটে আছে রাসেল এর মুখে...
.....

বেশ কয়েকদিন যাবৎ অদ্ভুত কিছু খু*নের রিপোর্ট আসছে পুলিশের কাছে। প্রথমে এক পথশিশুর রহস্যময় মৃত্যু, তারপর এক যৌনকর্মীর মাথা কে*টে নিশংস ভাবে হ*ত্যা, আর সবশেষে দেশের সবথেকে নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের রহস্যময় খু*ন। অনেকে অবশ্য এটাকে আত্মহ*ত্যা বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি পুলিশের কাছেও যে রুমে শফিক খু*ন হয় সে রুমে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতির আলামত পাওয়া যায়নি। কিন্তু এমন অদ্ভুত পদ্ধতিতে কেউ কেন আত্মহত্যা করবে! খাটের সামনে ঠিক শফিক যেখানে মারা যায় সেই বরাবর একটি বড় আয়না রাখা। সেটার ই বা রহস্য কি! সব কিছু নিয়ে বেশ চিন্তিত রমনা থানার ওসি মিজান সাহেব। শফিক সাহেবের ব্যাপারে আরেকটু ভালোভাবে জানার জন্য তার বাবা মায়ের ঠিকানা নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন তিনি।....

তিনবার কলিংবেল বাজার পর দরজা খুললেন রেহমান সাহেব। খুলে দেখতে পেলেন পুলিশের পোশাকে রমনা থানার ওসি মিজান দাঁড়ানো।

- আপনাদের ছেলে শফিক রেহমানের মৃত্যুতে আমরা সবাই গভীরভাবে শোকাহত, স্যারের খুন ও খুনির ব্যাপারে জানার জন্য আপনাদের সাথে কিছু জরুরী কথা ছিল।
- আসুন আসুন, ভেতরে আসুন।
- আপনার স্ত্রী বাসায় আছেন?

ঠিক এই সময়ে বেডরুম থেকে কোলে একটা বিড়ালছানা নিয়ে আদর করতে করতে বেরিয়ে এলেন মিসেস রেহমান। তাকে দেখেই রেহমান সাহেব বললেন,
- কোথায় যাচ্ছো?
- একটু সুইমিং পুলের দিকে,,, যাবে তুমি?
- যাবো, তবে তার আগে ওসি সাহেব এসেছে, সফিকের ব্যাপারে কথা বলতে, এসো আমাদের সাথে ড্রইং রুমে।

মিসেস রেহমান সোফায় বসে কোলের বিড়াল ছানাটিকে একনাগাড়ে আদর করে চলছে, আর ওসি মিজান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকেই। নজরটা বিড়ালের দিকে রেখেই রেহমান সাহেবকে মিজান বলল

- অনেকেই কিন্তু বলছেন শফিক সাহেব আত্মহত্যা করেছেন। যদিও আমরা এখনি সেটাকে বিশ্বাস করে নিচ্ছিনা। তবে..
- তবে কি ওসি সাহেব..?
- আচ্ছা আপনাদের পরিবারে বা বংশে কি কারো মধ্যে কি আত্মহত্যার প্রবনতা দেখা গিয়েছিল কখনো?

এই কথা শোনার পর মিসেস রেহমান ও রেহমান সাহেব পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। একটা চিন্তার রেখা দেখা গেল দুজনের কপালেই। তার পর রেহমান সাহেব একটু আমতা আমতা করে বললেন,
- ও আমাদের সন্তান হলেও ও ঠিক আমাদের বংশের নয়।
- সেটা কেমন?
- ওর যখন চার-সাড়ে চার বছর বয়স তখন ওকে আমরা কুড়িয়ে পাই। দীর্ঘদিন যাবৎ যখন আমাদের সন্তান হচ্ছিল না তখন হঠাৎ রাস্তায় ওকে পেয়ে আমরাও বিবেকের সব বাঁধা ভুলে যাই।
- সে কখনো তার বাবা মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেনি আপনাদের?
- নাহ, ও বরং আগের কোন কথা তুলতেই চাইতো না। আর আমরাও আসলে চাইতাম না সেসব মনে করতে।
- আচ্ছা, এটা বুঝতে পারছি ওনার নামের শেষাংশ রেহমান তো আপনার নাম থেকেই নেয়া। সফিক নামটাই কি ওনার আসল বাবা মায়ের দেয়া নাম?
- না না, এই নাম নতুন করে আমাদের দেয়া ওর বাকি সব কিছুর মতই।
- ওহ আচ্ছা, ওনার আগের আসল নামটা কি ছিল, বলতে পারবেন?

মিসেস রহমানের মুখের দিকে চাইলেন রেহমান সাহেব,
- কি চৌধুরী যেন নামটা, আমার স্পষ্ট মনে নেই। এই তোমার মনে আছে?

দেয়ালে টাঙানো ছবিতে বাবা-মায়ের মাঝে বসা শফিকের এলোমেলো ঝাকড়া চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে, বাম চোখ দিয়ে অশ্রুর একটি ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল মিসেস রেহমানের,

- ওর নাম ছিল রাসেল, রাসেল চৌধুরী...

(সমাপ্ত)

©আরিফ ইসলাম*

18/09/2023

"হতাশ হয়ো না। উঠো! সিজদাহ করো এবং কাঁদো!"
--সূরা ইউসুফ : ৮৬
"আল্লাহ কষ্টের পর সুখ দিবেন।"
--সূরা ত্বলাক : ৭
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।"
--সূরা ইনশিরাহ : ৬
"আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতাগুলো আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।"
--সূরা ইউসুফ : ৮৬
"জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।"
--সূরা বাক্বারা : ২১৪
"একমাত্র কাফির ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।"
--সূরা ইউসুফ : ৮৭
"আল্লাহ কোনো ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের চাইতে বেশী, এমন বোঝা চাপিয়ে দেন না।"
--সূরা বাক্বারা : ২৮৬
"এবং অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।"
--সূরা বাক্বারা : ১৫৫
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা সবর ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।"
--সূরা বাক্বারা : ১৫৩
"হে আল্লাহ, আমি তো কখনো আপনাকে ডেকে ব্যর্থ হইনি।"
--সূরা মারইয়াম : ৪
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন--
"মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটা অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর এটা কেবল মুমিনের জন্যই নির্ধারিত, অন্য কারো জন্য নয়। মুমিনের কাছে সুখের কিছু এলে শুকরিয়া আদায় করে। এটা তার জন্য মঙ্গলময় হয়। অনুরূপভাবে যখন কোনো দুঃখ তাকে স্পর্শ করে, তখন সে ধৈর্যধারন করে। আর এটাও তার জন্য মঙ্গলময় হয়...।"
--সহীহ মুসলিম : ২৯৯৯
অতএব, কোনো হতাশা আমার জন্য নয়। 'আলহামদুলিল্লাহি আ'লা কুল্লি হাল।' (আমি সকল অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করি।)

ওনার অব শতফুল-shotoful 🌿

06/08/2023

আব্বা পাঁচ বছর পর সৌদিআরব থেকে বাড়িতে এসেছে সাথে নতুন বিদেশি মাকে নিয়ে।বাড়িতে ঢুকেই আব্বা হাক-ডাক ছেড়ে দাদীকে বলল,মা দেখো তোমার লাইগা পরীর মতোন বউ আনছি।

আব্বা মিথ্যা বলেনাই,এমন সুন্দর মেয়ে মানুষ আমি আমার ছোট্ট জীবনে দেখিনাই,ধবধবা সুন্দর মানুষ।
আম্মা, আব্বাকে দেখে এতোটাই অবাক হলো যে আম্মার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেলো,বাড়ির উঠোনে আম্মা ধপাস করে বসে পড়লো,আমরা দুই বোন দৌড়ায়া আম্মার কাছে গিয়ে বসতেই আম্মা আমাদের জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কানতে লাগলো।
আব্বার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই, নতুন বউ নিয়া ঘরে গেলো।
আব্বার আসার খুশিতে আম্মা সকাল থেকেই অনেক রকম রান্না বান্না করছিলো,আমরা দুই বোন সাজুগুজু করে ঘুরাঘুরি করছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম কখন আব্বা আসবে?কি কি আনবে আমাদের জন্য ভেবেই খুশিতে আত্নহারা হয়ে যাচ্ছিলাম,আব্বার দেশে আসার সাথে আমাদের সাজগোজ করা আর ভালো জামা কাপড় পড়ার কি সম্বন্ধ কে জানে?আম্মা নিজেও নতুন একটা শাড়ি পড়েছিলো।কিন্তু আব্বা বাড়িতে আসার পর আমাদের সব আনন্দ উচ্ছাস এক মুহূর্তেই মিইয়ে গেলো।আমি ওতোটাও ছোট না যে আব্বার আরেকটা বিয়ে কে সহজ ভাবে দেখতে পারবো।ক্লাস ফাইভ পড়া আমার ছোটবোনটাও কেমন চুপসে গেছে আম্মার চোখের পানি দেখে।
আমরা একান্নবর্তী পরিবারে থাকি,বাড়িতে দাদী,মেঝো চাচা-চাচী,ছোট চাচা-চাচি আর একজন ফুপি,আর ২ জন চাচাতো ভাই সহ বড়সর পরিবার।
মেঝো চাচা কৃষি কাজ করেন,ছোট চাচা ব্যবসা করেন আর আব্বা তো প্রবাসি,সংসারে সিংহভাগ টাকা আব্বা ই দেয়,সেই সুবাদে আমরা সবার মধ্যমনি হয়েই থাকতাম।

বাড়িতে আমরা তিনজন বাদে সবার মনেই খুশি আনন্দ নতুন বিদেশি আত্নীয় পেয়ে,গ্রামের লোকজন বউ দেখতে আমাদের বাড়িতে সকাল বিকাল আসতে লাগলো ।আব্বা খুব খুশি খুশি মনে একবার আরবি একবার বাংলায় ট্রান্সলেট করে করে সবার সাথে কথা বলায় দিচ্ছে। এর মাঝে অবশ্য আমাদের দুই বোনকে ডেকেও কথা বলায় দিছে,আম্মা কষ্ট পাবে দেখে আমি বেশী কথা বলিনাই তবে পারুলের ইচ্ছা ছিলো আরেকটু কথা বলার।আম্মা নতুন শাড়ি পাল্টে পুরোনো শাড়ি পড়লো,এমনকি সারাদিন না খেয়ে ঘরের এক কোনে পড়ে রইলো,কেউ শান্তনা দিতেও আসলোনা,মাঝে অবশ্য গ্রামের কয়েকজন বয়স্ক মহিলা এসে ঘরের দরজায় দারিয়ে হা হুতাশ করলো,কেউ কেউ বলল কপাল পুড়লো তোর মুখপুরি,কপাল পুড়লো।
কপাল যে পুড়লো সেটা তো আম্মা নিজেই জানে তাদের এসে এসে বলে যাওয়ার কারন বুঝলাম না।মাগরিবের আগ সময় দাদী এসে মাকে বলল,জামাই বিয়া করছে মরে তো আর নাই,এতো শোক পালন করা লাগবো না,নাতনি গুলারে খাওন দেও,নিজেও খাও।
আম্মা কিচ্ছু বললনা,মাটিতে পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসে রইলো।
আম্মার উত্তর না পেয়ে দাদী আমার দিকে তাকিয়ে বলল,শিউলি তোর মাইজ্জা চাচিরে ক,তোগোরে ভাত দিতে,দুপুরে খাস নাই তোরা।
আমি মাথা নেড়ে হ্যা সূচক সম্মতি জানালাম।

রাতে খাসি জবাই হলো,বিরাট আয়োজন,খাসি নাকি আস্ত পুরিয়ে খাওয়া হবে,বিদেশি বউ নাকি তেল মশলার খাবার খেতে পারেনা,তাই এরাবিয়ান স্টাইলে রান্না হবে,বাবুর্চি আব্বা নিজেই।আমরা যতোটাই কষ্ট পাচ্ছিলাম ঠিক ততটাই আনন্দ করছিলো আমার চাচাতো ভাই বোনেরা,ওরা নেহায়েত ই ছোট।
তবে সবচেয়ে কষ্টকর ছিলো আমার দুই চাচি ই হেসে হেসে ভাঙাচুরা ভাষায় নতুন মা এর সাথে গল্প করছিলো,তারা একটিবারের জন্য আম্মার কাছে আসেনাই খোজ নিতে।ছাগল পোড়ানো দেখতে আরো বাচ্চা কাচ্চা জরো হলো,কেমন উৎসব মুখোর পরিবেশ।
আব্বা সুরে সুরে গলা ছেড়ে গান ধরলো"মি'লন হবে কত দিনে,আমার মনের মানুষ এলো সনে,আমার মনের মানুষ এলো সনে…."

গানটা সুখের নাকি দুঃখের বুঝা গেলো না,তবে আব্বার গানের গলা চমৎকার, চাদের আলোয়ে আব্বা খুব যত্ন করে খাসি পোড়াচ্ছে আর গানের সুর তুলছে।
আব্বার গান শুনে আম্মা হাউমাউ করে কানতে লাগলো।পারুল আম্মার পাশ ঘেষে বলল,আম্মা গানটা কি খারাপ তুমি কান্দো কেন?
আম্মার হেচকি উঠে গেলো কানতে কানতে,আমাকে চিল্লায়া বললো তোর আব্বারে বল গান থামাইতে,আমার কানে বিষ লাগতেছে।

আমি উঠার আগেই,পারুল দৌড়ায়া গিয়া বলল,আব্বা গান থামান আম্মার কানে বিষ লাগে।
আব্বা পারুলের দিকে তাকায়া আবার ছাগলের গায়ে তেল লাগানোয় মনোযোগ দিলো
এরপর আরেকটা গান ধরলো,"তুই যদি আমার হইতিরে,ও বন্ধুরে আমি হইতাম তোর,…..কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর ও বন্ধুরে তুই যদি আমার হইতিরে…"

আব্বার গান শুনে, চাচিরা হাসতে হাসতে বলল,আপনার ই তো হইছে আবার কিয়ের এতো আফসোস?
আব্বা আরো জোরে গান গাইতে লাগলো,গানের তালে তালে বাচ্চারা নাচতেছে।
রাতে আমরা কেউ খেতে গেলাম না,পারুলের পোড়া মাংস খাওয়ার খুব শখ,আম্মাকে কয়েকবার জিগেস করছে যাবে কিনা,শেষবার আম্মা একটা জোরেসোরে থাপ্পর মারার পর এখন চুপ করে বসে আছে।
এদিকে খুদায় আমাদের জীবন যায় যায় অবস্থা কিন্তু আম্মারে ছাড়া খাইতেও পারতেছিনা।
সবার খাওয়া শেষে ছোট চাচি তিনজনের খাবার নিয়ে আসলো,পোড়া মাংস আর রুটি,পারুলের চোখমুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠলো।
আম্মা গলা খাকিয়ে বলল খাওন লাগবো না আমগো,লইয়া যাও,আমরা তিনজন না খাইয়া মরমু,তোমরা সুখ করো।
আম্মার কথা শুনে পারুলের উজ্জল মুখটা একদম মিয়িয়ে গেলো।
যেই ছোট চাচি কোনোদিন আম্মার মুখের উপর কোনো কথা বলেনাই,আজকে সে টিপ্পনি কেটে বলল,নিজের দোষে জামাই হারাইছেন,আপনি না খাইয়া মরেন, না করছে কে?
মাইয়াগুলানরে মারবেন কেন?হেগো কি দোষ!!
আম্মা আকাশ থেকে পড়লো ছোট চাচির কথায়,নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারছিলো না,আম্মা রাগে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলো।চাচি যাওয়ার পর,আম্মা হঠাত করেই কেমন স্বাভাবিক আচরন করার চেষ্টা করলো,হয়তো মেয়েদের সামনে অপমানজনক কথাটা সহ্য করতে পারছেন না,সবকিছু আড়াল করতেই এই অভিনয়।
আম্মা নিজ হাতে আমাদের দুই বোনকে খাইয়ে দিলেন,কিন্তু আম্মা খেলেন না।সারারাত বাড়ির বারান্দায় বসে কাটালেন,ঘুমের মাঝেও আম্মার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না আমার কানে এসেছে।

সাতদিন পর,আব্বা উঠানে মিটিং বসালেন।মিটিং এর প্রধান উদ্দেশ্য আম্মার বিচার করা,
আম্মার বিরুদ্ধে আব্বার অভিযোগ হলো,আব্বা আসার পর,আম্মা নিজ থেকে তার সাথে কথা বলতে যায় নাই,মেয়েদেরকেও নাকি শলাপরামর্শ দিয়া দূরে রাখতেছে,আব্বা আর নতুন বউ এর যত্নের দায়িত্ব আম্মার কিন্তু আম্মা সেটা অবহেলা করছে।
আব্বা দাদীকে উদ্দেশ্য করে বলল,মা তুমি কও হের কি বিচার হওন দরকার,তালাক না?
আম্মা আতকে উঠলো আব্বার মুখে তালাকের কথা শুনে।আব্বাকে চাচা-চাচীরা সায় দিলো,এমনকি
দাদী কিছুখন চুপ করে থেকে বলল,বড় বউ অবশ্যই অন্যায় করছে, কিন্তু এটার লাইগা তালাক দেওন যায় না,
এর মাঝে মেঝো চাচা বলে উঠলো,হ্যায় যদি জামাইরে না মানে তাইলে এই সংসারে থাইকা কি লাভ,তালাক ই হওন উচিত!

দাদী আব্বার দিকে তাকাইয়া বলল,জহির তুই আর কয়দিন থাকবি?
আব্বা বলল,ভাবছিলাম ২ মাস থাকমু,কিন্তু তোমার বিদেশী বউ এর কষ্ট হইতাছে এখানে,তাই ২০/২২ দিন আছি আর।
দাদী বলল,জমিলার শাস্তি হইলো আগামি ২০/২২ দিন তোর লগে তিনবেলা বইসা ভাত খাইবো,তোরে ভাত বাইড়া খাওয়াইবো,দাদীর শাস্তির ফয়সালা শুনে সবাই খুব বিরক্ত হলো,এমনকি আম্মাও।
ছোট চাচি বলল,আম্মা এইটা কেমন শাস্তি দিলেন,এটা করেনাই দেইখাই তো বিচার বসলো,এটা কেমন বিচার বুঝলাম না।
দাদী ছোট চাচিকে থামিয়ে দিয়ে বলল,সতীন লইয়া একলগে বইয়া ভাত খাওন ওতো সোজা না ছোট বউ,যা বুঝনা তা লইয়া কথা না কওন ভালা।

এরমাঝে খবর পেয়ে ফুপু শশুর বাড়ি থেকে আসলো,যদিও ফুপু বেশীরভাগ সময় এ বাড়িতেই থাকে,তবু এবার বেশ কিছুদিনের জন্য গিয়েছিল।আমার খুব আশা ছিলো ফুপু আম্মার দুঃখটা বুঝবে কারন ফুপু আমাদের খুব আদর করে,কিন্তু প্রথম ধাক্কা খেলাম যখন ফুপু বাড়িতে এসেই তার মেয়েকে বললো তোর নতুন মামিরে সালাম কর,মামারেও।তার চোখে মুখে উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে আছে,তার খুব ভাগ্যবতি মনে হচ্ছে নিজেকে ভাইয়ের এমন সুন্দর বউ বিয়ে করতে পারায়।
আমি আর পারুল কিছুটা দূর থেকে পুরোটা দেখছিলাম,ফুপু একবার মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দেখে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিলো।ফুপুর এমন আচরন আমার মনটা ভেঙে দিলো।
ফুপু আসার পর থেকে আম্মার উপর আরো মানসিক চাপ শুরু হলো সারাখন ই আব্বার এই লাগবে ঐ লাগবে,সবকিছুর খবরদারি ফুপু হাতের চলে এলো।
আমরা এই সংসারে উচ্ছিষ্ট হয়ে গেলাম।আমি অবশ্য ফুপুর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছি,ফুপুকে ইনিয়ে বিনিয়ে কয়েকবার বাবাকে বলতে শুনেছি যেনো ফুপাকে বিদেশ নিয়ে যায়।

আমার আম্মাকে দেখলে আমার খুব অবাক লাগে,আব্বার প্রতি অগাধ ভালোবাসা মাকে কেমন অবুঝ বানিয়ে রেখেছে,এই যে আব্বা এতো বড় একটা অন্যায় করলো তবু আম্মার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমে নাই, সবাই আম্মার উপরের রাগ টা দেখেছে,কিন্তু আমি ভিতরটা দেখতে পাই,মাঝ রাতে আম্মা প্রায় জায়নামাজ বসে কাদে আর বিরবির করে করে বলে,আল্লাহ আমার ভিতর আপনি রাগ দুঃখ দিছেন তাই আমি কান্দি,কিন্তু এই কান্দনের পানি যেনো মানুষটার অভিশাপ না হয়,তারে আপনি ভালো রাইখেন,সুখে রাইখেন।
আমি চুপচাপ ঘুমের ভানকরে শুয়ে থাকি,আর ভাবি ইশ আব্বা যদি একবার এই কথা গুলো শুনতো তাইলে কি আম্মারে ভালো না বাইসা পারতো!

অনেকদিন পর বাড়িতে দেশী রাতা মোরগ রান্না হচ্ছে, যদিও উদ্দেশ্য আব্বার কিন্তু সবার জন্যই রান্না হচ্ছে, আব্বার উৎসাহের শেষ নেই,আমি আর আম্মা কাটা বাছা করছিলাম,আব্বা বারবার উকি মারছিলো রান্না ঘরে,কতদূর হলো রান্না তার তদারকি করতে,এরমাঝে আব্বাকে দেখে আম্মা আমাকে বললো তোর বাপরে জিগা মুরগিতে কি ঝাল দিমু নাকি হের বিদেশি বউ খাইতে পারবোনা, আমি বলার আগেই আব্বা বললো,পোড়া রসুন,আর পোড়া শুকনা মরিচ,সাথে লাল মরিচ বাইটা কড়া ঝাল দিয়া নতুন আলু দিয়া রানবা,মুরগি আমি খামু,হের না খাইলেও চলবো,আর লগে লাউপাতা দিয়া চেপাশুটকির বড়া বানাইয়ো,বিদেশী বিলাইরা এগুলার স্বাদ বুঝেনা,এগুলার সিদ্ধ খাইলেই চলে।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল তোর নতুন মার জন্য একটা ফারমের মুরগি হলুদ লবন দিয়া বিলাইয়ের খাওন এর মতো সিদ্ধ কইরা দিবি আর কিছু লাগবো না।
আমি খুব বিরক্ত হয়ে বললাম, আব্বা আমার কোনো নতুন পুরান মা নাই,আমার মা একটাই!!
আমার কথায় আব্বা মনে কিছুটা আঘাত পেয়েছেন, কিছু না বলে মাথা নিচু করে হেটে চলে গেলো।
আব্বা যাওয়ার সাথে সাথে আম্মা রেগেমেগে বললো বাপের লগে বেয়াদবি করলি কেন,আমি এগুলা শিখাইছি তোগোরে??
আমি আম্মার কথায় আকাশ সমান বিষ্সয় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম।কি অদ্ভুত নারীর প্রেম!!
হঠাৎ পারুল এসে বলল আম্মা মুরগি হইছে? কলিজাটা আমারে দিবা,খাইতে মন চায়?

আম্মা একটা ছোট বাটিতে কলিজাগুলো উঠিয়ে দিয়ে বললো তোর আব্বার কাছে নিয়া যা,সে খাওয়ার সময় তোরে একটু দিবো,তোর বাপ আর তুই তো সবসময় কলিজা ভাগাভাগি করে খাইতি,এখন বাপরে ছাড়া খাবি?যা নিয়া যা।পারুল দৌড়ে কলিজার বাটিটা নিয়ে আব্বার কাছে গেলো,আর কিছুখন পর মুখ মলিন করে ফিরলো।
আম্মা পারুলের মুখ দেখে বললো কিরে মুখকালা কেন?
পারুলের চোখমুখ লাল হয়ে আসছে,মনে হয় কান্না করে দিবে,কাপাকাপা গলায় বললো,একটা কলিজা আব্বা খাইছে,আরেকটা পানি দিয়া ধুইয়া নতুন মারে খাওয়াইছে,কথাটা বলেই পারুল ভেউ ভেউ করে কান্না করে দিলো।
আম্মা দৌড়ে এসে পারুলকে জরিয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বললো আমারে মাফ কইরা দে শোনা,আমি তোরে আবার কলিজা রান্না কইরা খাওয়ামু।
আম্মার চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে, এই পানি হয়তো পারুলের জন্য আর না হয় আব্বার সন্তানের প্রতি অবহেলার জন্য।
আম্মার আর পারুলের দেখাদেখি আমার চোখেও পানি চলে আসলো,আব্বা কি সত্যিই আমাদের আর ভালোবাসেনা?

আব্বা পাক্কা ২০ দিন পর সৌদি চলে গেলো নতুন মাকে নিয়ে।আম্মার অনিচ্ছা সত্বেও আমরা এই কয়দিন একসাথে খাবার খেয়েছি।আম্মার ভেতরের দুঃখটা যেনো আরো গাঢ়ো হলো,হয়তো আব্বাকে চোখের দেখা দেখেও মার শান্তি হয়!
আব্বা যাওয়ার পর থেকে বাড়ির সবার আচরন আরো বেশী বদলে গেলো,যেই আমরা ছিলাম মধ্যমনি সেই আমরাই কেমন সবার তুচ্ছতাচ্ছিল্যের স্বীকার হতে থাকলাম,চাচীরা আগে আম্মাকে সমীহ করতো,এখন কথায় কথায় ছোট করে,আমারা কেমন একঘরে হয়ে যেতে থাকলাম,দাদী ও একদম চুপচাপ হয়ে গেলো,আর তাছাড়া আব্বা আমাদের হাতে কোনো টাকা পয়সা ও দিয়ে যায় নি।আম্মা সারাদিন চোখের পানি ফেলে,নামাজের সেজদায় পড়ে পড়ে কাদে,সামনে আমার এস এস সি পরিক্ষা, কিন্তু পড়াশোনায় ও মন দিতে পারছিনা।

দুঃখের থেকেও যে ভয়ঙ্কর দুঃখ মানুষের জীবনে আসতে পারে সেটা টের পেলাম মাসখানেক পড়ে,হঠাত সৌদি থেকে ফোন এলো আব্বা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে,খবরটা শুনার পর থেকে দাদী বিলাপ করছে,আমরাও দুইবোন ও খুব কানালাম,শত হলেও বাপ তো,খালি আম্মা সারাদিন বোবার মতো বারান্দায় বসে রইলো।
সন্ধ্যায় দাদি এসে আম্মাকে কয়েকদফা কথা শুনালো,আম্মা অভিশাপ দিয়েছে কিনা দাদী বারবার জানতে চাইলো,আম্মা একদম নিরসভাবে বসে রইলো,যেনো একটা পাথর বসে আছে এর কোনো প্রান নেই।দাদী তাও জানতে চেয়েছে,কিন্তু চাচী ফুপিরা সরাসরি মাকে দোষারপ করতে লাগলো।
দুইদিন পর আম্মাকে হাসপাতালে নিতে হলো,না খেয়ে মরার মতো দশা,আম্মা হাসপাতাল থেকে আসার পর দাদী বাদে বাড়ির সবাই আম্মার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো,এমনকি আমাদের সাথেও,আর রান্না ঘরের দায়িত্ব চাচিরা বুঝে নিলো,আম্মা রান্না ঘরে যায়,কেউ কিছু বলেনা,কাজ ও করতে দেয়না,আম্মা বারবার গিয়ে ফিরে আসে,কি এক অসহায় দৃশ্য!
প্রথম কিছুদিন সবার খাওয়া শেষে আমরা গিয়ে খেতাম,কিন্তু এরপর থেকে যেয়ে দেখতাম কোনো খাবার নেই,আম্মার আবার ভাত বসাতেন,ডাল ডিম দিয়ে আমাদের খেতে দিতেন।কিন্তু এটাও তাদোর সহ্য হলো না,একদিন ছোট চাচা বাড়ির উঠোনে দাড়িয়ে চেচাতে চেচাতে বললেন নবাবেরা কার টাকায় বাড়িতে খায়দায় ফূর্তি করে?কার হুকুমে চাল ডাল নেয়?

আমি নিজের কানে কথা গুলো শুনে বিশ্বাস ই করতে পারছিলাম না,আমার প্রিয় মানুষ,আমার প্রিয় ছোট কাকা এগুলো কি বলছে?বাবার চেয়ে যেই মানুষকে আমি বেশী ভালোবাসতাম সেই ছোটচাচা খাওয়ার খোটা দিচ্ছে!
চাচার কথা শুনে দাদী ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বললো কি হয়েছে?কারে বলিস এসব কথা?
চাচা রাগে গজগজ করতে করতে বললো,বুঝেন না?
এই বাড়িতে আমরা কাউরে বসায়া বসায়া খাওয়াতে পারমুনা।আমাগো সংসার আছে,বাচ্চার ভবিষ্যত আছে।

দাদী নরম গলায় বললো আর ভাতিজিগোরে ফালায় দিবি?
চাচা কিছু বললো না!চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।

এরমাঝে বাকিরাও উঠোনে এসে জরো হইছে,বড় চাচা বললো রফিক ঠিকি বলছে,আমাদের ইনকাম তো বেশী না,আগে ভাই ই খরচ দিতো এখন তো নিজেগই চলেনা,হেরা হেগো নানুর বাড়িত যাক তাইলেই তো হয়!
এরপর দাদী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,আমিও কামাই করিনা,আমার জামাই ও মইরা গেছে, বড় বউ যদি ভাত না পায়,তাইলে তো আমার ভাত ও বন্ধ হয়ে যাইবো,আমারে যদি মা বইলা মানস,তাইলে ওগোরে তোরা দেখে রাখবি।
আর বড় বউ বিনিময়ে বাড়ির সব কাজ কইরা দিবো,ছোট বউ,মেঝো বউ তোমরা দাসী বান্দি পাইলা খুশি তো?

সবাই দাদীর রায় মেনে নিলো,দাদী আসোলে ভালো করলো নাকি খারাপ করলো ঠিক বুঝা গেলো না,কিন্তু অনেকদিন পর আম্মাকে কানতে দেখলাম,খুব কাদলো সারাদিন।
এরপরের দিনগুলো হলো আমাদের তিন মা মেয়ের দাসী বাদির দিন,শুধু আম্মা না,পারুলকেও কাজের হুকুম দেয়া হতো,দিনরাত গাধার খাটুনি যাকে বলে,চাচীরা পায়ের উপর পা তুলে খেতো,ছোট চাচা অবশ্য মাঝে মাঝে চাচীকে বলতো,আমার এসএসসি তাই আমাকে যেনো বেশী কাজ না দেয়!তবে এটা আমার কাছে করুনা বলেই মনে হতো,ভালোবাসা না।কষ্ট করে আমার এসএসসি দেওয়া হলেও কলেজে ভর্তি হতে পারবোনা বুঝে গেলাম।
চরম দুর্দশায় আমাদের দিন কাটতে লাগলো।

প্রায় বছরখানেক পার হয়ে গেলো,দুই বোনের ই পড়াশোনা বন্ধ, চাচারা আমার জন্য প্রায়ই বিয়ের প্রস্তাব আনে,আম্মা ফিরিয়ে দেয়,তা নিয়েও আম্মাকে গালিগালাজ শুনতে হয় দিনরাত।একদিন মাঝরাতে আম্মা আমাদের ডেকে তুললেন,চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম কি হয়েছে মা?
মা চোখমুখ শুকনো করে বললো তোর দাদী তোদেরকে ডাকছে চল,আমরা টলতে টলতে দাদীর ঘরে গেলাম,দাদীর শরীরটা বেশকয়েকদিন যাবত খারাপ,সারাখন ই কান্নাকাটি করে মরে যাবে ভেবে,আমাদের দেখে দাদী কোনোরকম উঠে বসলেন,বালিশের নিচ থেকে একটা পোটলা বের করে আম্মার হাতে দিয়ে বললেন আমার উপর কষ্ট রাইখোনা বউ,আমি যদি তোমারে কাজের লোক না বানাইতাম তাইলে ওরা তোমাগোরে থাকতে দিতো না,আমার পোলাগরে আমি চিনি।এইখানে কিছু গয়না আছে,একসেট তোমার বিয়ার গয়না,যা আমি খুইলা নিছিলাম তোমার বিয়ার রাইতে,তোমার বাপ যৌতুক দেয় নাই দেইখা,আর আছে একজোরা কানের জিনিস আর গলার জিনিস,এগুলা শিউলি আর পারুলের লাইগা,আসোলে ওগো বাপ আমার জন্য জিনিস আনছিলো শেষবার,তোমাগোরে পরে দিবো কইছিলো,কিন্তু পোলাটাই তো মইরা গেলো,তাই এগুলা ওগোর হক।
ভাবছিলাম এইসব গয়না আমার মাইয়ারে দিয়া যামু,কিন্তু আসোল কথা কি বউ জানো?
খারাপ চিন্তা নিয়া সারাজীবন পার করা গেলেও মরনকালে খারাপ চিন্তাগুলান মরার আগেই মাইরা ফালায়!কুচিন্তা লইয়া মরনযাত্রা করন যায় না।তুমি আজপর্যন্ত কোনোদিন গয়নাগুলান চাও নাই,এমিটেশান পইরা ঘুরছো,বেড়াইতে গেছো তাও কোনোদিন কওনাই আমার গয়নাগুলান দেও,তোমারে কেমনে ঠকাই কও তো,এগুলা তোমার কাবিনের গয়না!
আম্মা কাদোকাদো গলায় বললো মা,আমি আপনারে চিকিৎসা করামু,আপনি মরবেন না!!ডরাইয়েন না,আল্লাহ ভরসা!

দাদি কিছুখন অন্যমনষ্ক থেকে বললো,সম্পত্তি পাইবা কিনা জানিনা,যেহেতু তোমার কোনো পোলা নাই,কিন্তু এই গয়নাগুলান তোমার হক,এগুলা দিয়া তুমি আমার নাতিনগরে পরাবা শহরে যাইয়া,শিউলির মাথা ভালা,ওরে তুমি ডাক্তার বানাইবা,আর আমারে মাফ কইরা দিবা,তোমারে সতীন লইয়া ভাত খাইতে কইছিলাম কেন জানো?আমি জানতাম আমার পোলা আর ফিরবোনা,মইরা যাইবো এইটা ভাবিনাই,তবে ভাবছিলাম আর দেশে আইবো না।তাই ভাবছি শেষ দিনগুলান হের লগে থাকো,আমগো মাইয়ারা কিসে সুখ পাই জানো?জামাইরে পেট ভইরা ভাত খাইতে দেখলে আমগো আউশ মিটে।
আম্মা দাদিকে থামিয়ে দিয়ে বললো আমারে আপনি এতো স্নেহ করলেন মা!আমি আপনার উপ্রে কেমনে রাগ রাখবো বলেন!!জীবনে প্রথম বার আমি আম্মা আর দাদীকে জরাজরি করে কাদতে দেখলাম।যেনো মা মেয়ে একে অপরকে পরম মমতায় জরিয়ে রেখেছে।
সত্যি সত্যি তার দুদিন পর দাদী মারা গেলেন।দাদীর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশী কাদলেন আম্মা।
আমাদের মাথার উপর একটা অদৃশ্য ছায়া ছিলো তা টের পেলাম দাদীর মৃত্যুর পর।এর পর আমরা আর ঐ বাড়িতে টিকতে পারলাম না,সম্পত্তির ভাগ চেয়ে আরো কাল হলো,রীতিমতো আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিলো,গ্রামের লোকজনকে টাকা পয়সা দিয়ে হাত করে। একবুক কষ্ট আর অসহায়ত্ব নিয়ে আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম,মামার বাড়িতে দিন দশেক এর বেশী থাকলাম না,ঢাকায় চলে গেলাম।
তবে ঢাকায় আসার পর আমাদের দিন ফিরলো,আম্মা গার্মেন্টসে জব নিলো,পারুল স্কুলে আর আমি কলেজে ভর্তি হলাম,
এরপর স্বপ্নের মতো আমি সরকারি মেডিকেলেও চান্স পেলাম কলেজ শেষ করে,আমার ভাঙাচুরা এলোমেলো জীবন জোড়া লাগতে শুরু করলো।একান্ত নিজের মানুষগুলোকে নিয়ে আমার সুখের জীবনের সূচনা হলো।

প্রায় ছয় বছর পর,আম্মার এক্সিডেন্ট হলো, একটা পা ভেঙে গেছে,জবটা চলে গেলো,আমার টিউশনির টাকায় সংসার চলেনা ঠিকমতো,আম্মার চিকিত্সার টাকা জোগাতে পারছিনা,আবার সামনে ফাইনাল পরিক্ষা! জীবনের কঠিন সময় আবার না চাইতেই ধরা দিলো,তবুও জীবন যাচ্ছে চলে।
একদিন হঠাত সন্ধ্যে বেলায় দরজায় একজন মধ্যবয়স্ক লোক নক করলো,পারুল না চিনতে পারলেও আমি চিনলাম,ছোট চাচা।
উষ্কখুষ্ক চেহারা দেখে চেনার উপায় নেই,আমি খুব বিরক্ত নিয়ে বললাম কি চাই কেনো এসেছেন?
চাচা খুব করুন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,কত বড় হয়ে গেছিসরে শিউলি!

আম্মা হুইল চেয়ারে করেই এগিয়ে এসে চাচাকে দেখে বললেন,রফিক কেমন আছো?আসো ভিতরে আইসা বসো।

আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,যা খাওয়ার ব্যবস্থা কর,মেহমান আসছে।
আমি একরাশ বিরক্তি নিয়ে রান্না করলাম,এই বেইমান লোকটা কেনো এসেছে কে জানে?আর আম্মার দরদ দেখতেও আমার বিরক্ত লাগতেছে।
চাচা প্রথমে খেতে না চাইলেও আম্মার জোরাজুরিতে খেতে বসলেন,আমার রান্নার প্রশংসাও করলেন খানিকটা তবে আমি একদম ই পাত্তা দিলাম না। খেতে খেতে চাচা জানালেন তার একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে পুরোপুরি,আরেকটা আধোমরা,অনেক কষ্টে আমাদের ঠিকানা জোগাড় করে এসেছেন ক্ষমা চাইতে,কারন তিনি বুঝতে পেরেছেন তিনি অন্যায় করেছেন আমাদের উপর।
এতোখন রাগ লাগলেও চাচার অসুখ শুনে মনটা কিছুটা খারাপ হয়ে গেলো,এককালে আমার চোখের মনি ছিলো কিনা এই ছোট চাচা।
কথা বলতে বলতে রাত হয়ে গেলো,আম্মা ছোট চাচাকে থেকে যেতে বললেন,তিনি সহজে রাজি ও হয়ে গেলেন।
কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে ছোট চাচা আম্মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,ভাবি গত ছয়মাস যাবত একটা স্বপ্ন দেখি মাঝেমধ্যে,ভয়ে কলিজা শুকায় যায়।বারবার এক স্বপ্ন,আর সহ্য করতে পারতেছিনা।

আম্মা অবাক হয়ে বলল,কি দেখো?

চাচা কিছুটা ঢোক গিলে বললো,দেখি আমার মা সুন্দর সাদা বিছনায় ঘুমায়া আছে,আমি আম্মার ঘরে গিয়া দেখি আম্মার বিছানার পাশে একটা পাউরুটি পইরা আছে,আমার রুটি দেইখা খাইতে মন চায়,আর আমি খাইয়া ফেলি,এরপর আম্মা ঘুম থেকে উঠে যায়,আমারে দেইখা বলে তুই আমার ভাগের রুটি কেন খাইলি,আমি তোরে জাহান্নামে পাঠামু,মায়ের অভিশাপ বৃথা যাইবো না,এই কথা গুলো আম্মা প্রতিবার তিনবার করে বলে,আমি আম্মার পা ধরে মাফ চাইতে গেলে দেখি আম্মা নাই"

স্বপ্নটা বলেই চাচা কেমন থরথর করে কাপতে লাগলো,তারপর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললো আমি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানি ভাবি,তাই আমি আপনার ভাগের রুটি ফিরায়া দিতে আসছি।বলেই কাকা ব্যাগ থেকে টাকার থলে বের করে বললো,দশলাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা,আমি করায় গন্ডায় হিসাব করে আনছি ভাবি,আমারে মাফ করে দেন দয়া করে,আমি আর এই ভার বহন করতে পারতেছিনা,মেঝে ভাইয়ের খবর আমি জানিনা,তার কাছে আমি আমার ভাগ বেচে দিছিলাম,আমি আমার ভাগ থেকে আপনার অংশের টাকা বুঝায়া দিলাম,আমারে আর অভিশাপ দিয়েন না।

আমরা সবাই জেনো সবচেয়ে আচ্শর্যজনক ঘটনার সাক্ষী হলাম।আম্মা নিরস গলায় বললো রফিক আমি আমার জীবদ্দশায় কাউরে কোনোদিন অভিশাপ দেইনাই ভাই,অন্যরে দিলে নিজের গায়ে লাগে এটা বিশ্বাস করি,আমার শাশুড়ী আসোলে আমারে ভালোবাসতো তো,তাই গতমাস ছয়মাস ধরে আমি বিছনায় পড়া,তাই হয়তো তুমি এ স্বপ্ন দেখছো,আমার বিপদের দিন তোমারে আল্লাহ পাঠাইছে।

চাচা মাথা নিচু করে বসে রইলো,তেমন কিছু আর বললোনা।

সেদিন রাতটা কেমন উত্তেজনায় কাটলো,এমন বিপদে এই টাকা গুলো আমাদের লাইফ সেভিংস এলিমেন্ট!
ফজর পরেই চাচা রেডি হয়ে গেলেন,আমরাও সকালেই উঠে পরলাম,ছোট চাচা দরজায় দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ছোটচাচার উপর তোর অনেক অভিমান নারে মা?মাফ করে দিস,তবে তোর ছোট চাচা তোকে এখন সত্যিই ভালোবাসে সবাইকে গর্ব করে বলে আমার ভাতিজি ডাক্তারি পরে!চাচা চোখের পানি সাবধানে আড়াল করে বিদায় নিয়ে চলে গেলো,আমি দৌড়ে বারান্দায় আসলাম,চাচার চলে যাওয়াটুকু দেখছি,ভেতরাটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, আমি জানি আমার প্রিয় ছোট কাকার সাথে এটাই আমার শেষ দেখা,দাদীর বলা সেই কথাটা মনে পড়ছে,মরনকালে কেউ কুচিন্তা নিয়ে মরতে চায়না!
আমার ভিষন কান্না পাচ্ছে,কার জন্য?
দাদীর জন্য? যে কিনা মরে গিয়েও আমাদের পরম মমতায় আগলে রেখেছে, নাকি বাবার জন্য যে আমার ছোটবেলার সুপারহিরো ছিলো? নাকি আমার সবচেয়ে প্রিয় ছোটকাকার জন্য যে কিনা আমার ছোটবেলাটা রঙিন করেছিলো,আব্বার চেয়ে বেশী সুখের সৃতি আমার এই মানুষটার সাথে জরিয়ে আছে।
আম্মার কোরআন শরীফ পরার আওয়াজ কানে আসছে,,মানুষ মরে গেলে যেমন শোনায় তেলয়াতগুলো তেমন শোনাচ্ছে,আম্মার যখন মনখারাপ থাকে তখন আম্মা বেশী বেশী কোরআন পড়ে,আচ্ছা আজকে আম্মার মন খারাপ কেনো?তাহলে কি সত্যি ই ছোট চাচা মারা যাচ্ছেন?আমার এখনো মনে আছে,আব্বার মারা যাওয়ার তিনদিন আগে,দাদী মারা যাওয়ার আগে আম্মা ঠিক এমন কাপাকাপা গলায় কোরআনা পড়েছিলো,অসহ্য যন্ত্রণায় আমার ভেতরটা ছিড়ে যাচ্ছে, ভোরের কাকের ডাকাডাকি গুলো কেমন আর্তনাদের মতো লাগছে,আমি ছোট চাচার চলার পথের দিকে তাকিয়ে আছি,মহাকালের শেষযাত্রায় আমার প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া দেখছি…..

©উম্মে শারমিন নিহা*

Address

Badda
Dhaka
1212

Telephone

+8801687136959

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when শতফুল-shotoful posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to শতফুল-shotoful:

Shortcuts

Share