27/05/2026
_অপূর্ণতার_পূর্ণতা_পার্ট : ১১
---
রাত ১২টা ১৭ মিনিট। জেলের মহিলা ওয়ার্ড।
বাইরে কুকুরের কান্না। ভেতরে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। শুধু দেয়ালের ফাটল দিয়ে ঢোকা ঠান্ডা বাতাস যেন ফিসফিস করে বলছে—
"আজ রাতে কেউ হারাবে সবকিছু।"
মর্জিনা কাঁপা হাতে স্টিলের গ্লাসটা নিয়ে পরীর সেলের সামনে দাঁড়ায়। আঁচলের নিচে লুকানো খালি শিশি। বিষটা সে ১০ মিনিট আগেই দুধে ঢেলে দিয়েছে।
৫ লাখ টাকা...
তার ছেলেটার কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট। ডাক্তার বলেছিল, "আর ১৫ দিন। টাকা না এলে বাঁচবে না।"
কিন্তু সামনের মেয়েটার পেট... সাড়ে ৮ মাসের ভারী পেট। একটা জীবন, যে এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি।
"নে মা, দুধটা খা। গরম দুধ। বাচ্চার জন্য ভালো। শরীরে বল পাবি।"
মর্জিনার গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের পানি আটকে রাখতে রাখতে গলা বসে গেছে।
পরী শুয়ে ছিল। খালা রাহেলা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। পরী ধীরে ধীরে উঠে বসে। মুখে ক্লান্ত, তবু মায়াবী হাসি।
"খালা, বাচ্চাটা আজ খুব নড়ছে। মনে হয় বুঝতে পারছে ওর মায়ের সময় শেষ।"
খালা রাহেলার বুক ধক করে ওঠে। বৃদ্ধা হাত দুটো কেঁপে ওঠে।
"এমন কথা কয় না মা। মুখে কুলুপ দে। আল্লাহ ভরসা। আল্লাহ থাকতে কিছু হবে না।"
মর্জিনা গ্লাস এগিয়ে দেয়। হাত এত কাঁপছে যে দুধ ছলকে পড়ছে মেঝেতে।
পরী গ্লাসটা নেয়। পেটে হাত রেখে ফিসফিস করে,
"তোর জন্য খাচ্ছি সোনা। তুই শক্ত হ। তোর মা দুর্বল হলে চলবে না। তোকে যে বড় যোদ্ধা হতে হবে।"
এক চুমুক...
দুই চুমুক...
তিন চুমুক...
অর্ধেক গ্লাস শেষ।
হঠাৎ পরীর মুখ বেঁকে যায়। গলায় আগুনের মতো জ্বালা। পেটের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালাচ্ছে, একটানে সব ছিঁড়ে ফেলছে। গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে যেতে নেয়।
খালা রাহেলার অভিজ্ঞ চোখ। ২০ বছর জেলে কাটিয়েছেন। বিষের গন্ধ, মৃত্যুর গন্ধ উনি হাড়ে হাড়ে চেন।
পরীর মুখের নীলচে আভা, চোখের মণি উল্টে যাওয়া দেখে উনার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। যেন মৃত্যু নিজে এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে।
"হারামজাদি! তুই কী খাওয়াইছিস আমার মাইয়ারে?"
বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন খালা রাহেলা। এক ঝটকায় পরীর হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নেন।
মর্জিনা আটকাতে যায়।
ধস্তাধস্তি। টানাটানিতে স্টিলের গ্লাসটা ছিটকে পড়ে সিমেন্টের মেঝেতে।
ঝনঝন করে ভেঙে যায়।
বাকি অর্ধেক বিষ মেশানো দুধ মেঝেতে গড়িয়ে যায়। সাদা দুধের সাথে মিশে থাকে মৃত্যু। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
পরী দুহাতে গলা চেপে ধরে।
"খা...লা... বাচ্চা... আমার বাচ্চা..."
মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। চোখ উল্টে যাচ্ছে। পেটের ভেতর শিশুটা পাগলের মতো লাথি মারছে। যেন মায়ের সাথে সেও চিৎকার করে বলছে—
"আমি বাঁচতে চাই মা!"
খালা রাহেলা ফেটে পড়েন।
"গার্ড! ডাক্তার! কে কই আছিস! আমার মাইয়াডারে মাইরা ফেললো রে! ও আল্লাহ, তুই দেখছোস না!"
মর্জিনা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ে।
"আমি... আমি ইচ্ছা করে করি নাই... আমার পোলাডা... ও মইরা যাইবো... আমারে মাফ কইরা দে বইন..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই গলা ধরে আসে কান্নায়।
২ মিনিটে জেল হাসপাতালের লোকজন দৌড়ে আসে।
স্ট্রেচার, অক্সিজেন, স্যালাইন। পরীকে ধরাধরি করে নিয়ে যায়।
ওর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। হাত-পা খিঁচুনি দিচ্ছে। তবু দুহাত দিয়ে পেটটা আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলে বাচ্চাটা পড়ে যাবে।
খালা রাহেলা স্ট্রেচারের সাথে দৌড়াচ্ছেন। চোখে পানি, গলায় কান্না।
"ওরে বইন, চোখ খোল। তোর পোলার মুখ দেখবি না? তুই না যোদ্ধা? তুই না বলছিলি, 'আমি হারবো না'? মরিস না মা... তোর ছেলের জন্য হলেও বাঁচ!"
---
জেল হাসপাতাল, OT-র বাইরে। রাত ২টা।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস। ভেতরে মৃত্যুর সাথে লড়াই।
ডাক্তার বের হয়। মুখে মাস্ক, চোখে আতঙ্ক। গলার স্বর ভারী।
"বিষটা ইঁদুর মারার। খুব স্ট্রং। মায়ের লিভার-কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে। ৫০% দুধ খেয়েছে। এটাই এনাফ ওকে মেরে ফেলার জন্য।"
গার্ডের গলা শুকিয়ে যায়। "বাচ্চা?"
ডাক্তার মাথা নিচু করে।
"বাচ্চার হার্টবিট কমে যাচ্ছে। মা আর ১০ মিনিট। এখনই ইমার্জেন্সি সিজার না করলে দুজনেই যাবে। কনসেন্ট কে দেবে?"
খালা রাহেলা এক পা এগিয়ে আসেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটা হঠাৎ সোজা হয়ে যায়। চোখে আগুন।
"আমি দিমু। আমি ওর মা। কাগজ দেন।
আমার মাইয়ার পেট কাইট্টা হইলেও নাতিরে বাঁচান।
মা মরলে দুনিয়া অন্ধকার হয়, কিন্তু সন্তান মরলে দুনিয়ার মানে থাকে না।"
কলম ধরে কাঁপা হাতে সাইন করে দেন। কালি শুকানোর আগেই লাল বাতি জ্বলে ওঠে।
OT-র দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
ভেতরে চলছে জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ।
বাইরে, খালা রাহেলা মেঝেতে বসে পড়েন। দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকান। গলা ফেটে যায় কান্নায়।
"আল্লাহ, আমি কিছু চাই না। শুধু পরী আর বাচ্চাটারে বাঁচায়ে দে। একটারে নিলেও আরেকটারে ফিরায়ে দে।"
---
বাইরে, রোহানের ফ্ল্যাট। রাত ২টা ১৫।
রোহানের ঘুম ভেঙে যায়।
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। অজানা আতঙ্ক গলাটা চেপে ধরে। মনে হচ্ছে কেউ ওর কলিজা টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে।
সে ধড়ফড় করে উঠে বসে। ঘামে ভিজে গেছে শরীর।
"পরী..."
বারান্দায় যায়। টেবিলের উপর রাখা আদ্রিয়ানা আর পরীর ছবিটা হাতে নেয়।
ছবির পরী হাসছে। সেই হাসি, যেটা দেখলে রোহানের পৃথিবী থেমে যেত।
হঠাৎ রোহানের মনে হয় ছবির পরীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
ভুল দেখছে ভেবে চোখ মুছে আবার তাকায়।
না, ভুল না।
"পরী?" রোহান ফিসফিস করে। গলা কাঁপছে।
"তোর কিছু হয় নাই তো? প্লিজ বল না কিছু হয় নাই।"
ঠিক তখনই ফোন বাজে।
স্ক্রিনে লেখা— _"Jail Superintendent"_
রোহানের হাত থেমে যায়। ফোন ধরতে ভয় লাগে। মনে হয় ফোন ধরলেই সে শুনবে সব শেষ।
তবু কাঁপা হাতে রিসিভ করে।
"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা ভেসে আসে,
"মিস্টার রোহান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জেল হাসপাতালে আসুন। পরীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আমরা বাচ্চাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।"
টু টু টু...
ফোন কেটে যায়।
রোহানের হাত থেকে ছবিটা পড়ে যায়।
ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়।
ঠিক যেমন ওর দুনিয়া ভেঙে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে রাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে যায়।
"না! পরী, তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না! শুনছিস তুই? আমি আসছি! আমি আসছি রে!"
দরজা খুলে পাগলের মতো দৌড় দেয়। পেছনে পড়ে থাকে ভাঙা ছবি, আর একটা প্রশ্ন—
ভালোবাসা কি সবসময় এত দেরি করে পৌঁছায়?
---
চলবে...
#অপূর্ণতার_পূর্ণতা
©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#বাংলাউপন্যাস #ক্রিয়েটিভলাইফ