Nylima Ahana Rose Medlar Arts

Nylima Ahana Rose Medlar Arts Run By" Nylima Ahana Rose Medlar "
"Making the incomplete complete. Embracing creativity"

27/05/2026

_অপূর্ণতার_পূর্ণতা_পার্ট : ১১

---

রাত ১২টা ১৭ মিনিট। জেলের মহিলা ওয়ার্ড।

বাইরে কুকুরের কান্না। ভেতরে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। শুধু দেয়ালের ফাটল দিয়ে ঢোকা ঠান্ডা বাতাস যেন ফিসফিস করে বলছে—
"আজ রাতে কেউ হারাবে সবকিছু।"

মর্জিনা কাঁপা হাতে স্টিলের গ্লাসটা নিয়ে পরীর সেলের সামনে দাঁড়ায়। আঁচলের নিচে লুকানো খালি শিশি। বিষটা সে ১০ মিনিট আগেই দুধে ঢেলে দিয়েছে।

৫ লাখ টাকা...
তার ছেলেটার কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট। ডাক্তার বলেছিল, "আর ১৫ দিন। টাকা না এলে বাঁচবে না।"

কিন্তু সামনের মেয়েটার পেট... সাড়ে ৮ মাসের ভারী পেট। একটা জীবন, যে এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি।

"নে মা, দুধটা খা। গরম দুধ। বাচ্চার জন্য ভালো। শরীরে বল পাবি।"
মর্জিনার গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের পানি আটকে রাখতে রাখতে গলা বসে গেছে।

পরী শুয়ে ছিল। খালা রাহেলা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। পরী ধীরে ধীরে উঠে বসে। মুখে ক্লান্ত, তবু মায়াবী হাসি।
"খালা, বাচ্চাটা আজ খুব নড়ছে। মনে হয় বুঝতে পারছে ওর মায়ের সময় শেষ।"

খালা রাহেলার বুক ধক করে ওঠে। বৃদ্ধা হাত দুটো কেঁপে ওঠে।
"এমন কথা কয় না মা। মুখে কুলুপ দে। আল্লাহ ভরসা। আল্লাহ থাকতে কিছু হবে না।"

মর্জিনা গ্লাস এগিয়ে দেয়। হাত এত কাঁপছে যে দুধ ছলকে পড়ছে মেঝেতে।
পরী গ্লাসটা নেয়। পেটে হাত রেখে ফিসফিস করে,
"তোর জন্য খাচ্ছি সোনা। তুই শক্ত হ। তোর মা দুর্বল হলে চলবে না। তোকে যে বড় যোদ্ধা হতে হবে।"

এক চুমুক...
দুই চুমুক...
তিন চুমুক...

অর্ধেক গ্লাস শেষ।

হঠাৎ পরীর মুখ বেঁকে যায়। গলায় আগুনের মতো জ্বালা। পেটের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালাচ্ছে, একটানে সব ছিঁড়ে ফেলছে। গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে যেতে নেয়।

খালা রাহেলার অভিজ্ঞ চোখ। ২০ বছর জেলে কাটিয়েছেন। বিষের গন্ধ, মৃত্যুর গন্ধ উনি হাড়ে হাড়ে চেন।
পরীর মুখের নীলচে আভা, চোখের মণি উল্টে যাওয়া দেখে উনার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। যেন মৃত্যু নিজে এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে।

"হারামজাদি! তুই কী খাওয়াইছিস আমার মাইয়ারে?"
বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন খালা রাহেলা। এক ঝটকায় পরীর হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নেন।

মর্জিনা আটকাতে যায়।
ধস্তাধস্তি। টানাটানিতে স্টিলের গ্লাসটা ছিটকে পড়ে সিমেন্টের মেঝেতে।
ঝনঝন করে ভেঙে যায়।

বাকি অর্ধেক বিষ মেশানো দুধ মেঝেতে গড়িয়ে যায়। সাদা দুধের সাথে মিশে থাকে মৃত্যু। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

পরী দুহাতে গলা চেপে ধরে।
"খা...লা... বাচ্চা... আমার বাচ্চা..."
মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। চোখ উল্টে যাচ্ছে। পেটের ভেতর শিশুটা পাগলের মতো লাথি মারছে। যেন মায়ের সাথে সেও চিৎকার করে বলছে—
"আমি বাঁচতে চাই মা!"

খালা রাহেলা ফেটে পড়েন।
"গার্ড! ডাক্তার! কে কই আছিস! আমার মাইয়াডারে মাইরা ফেললো রে! ও আল্লাহ, তুই দেখছোস না!"

মর্জিনা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ে।
"আমি... আমি ইচ্ছা করে করি নাই... আমার পোলাডা... ও মইরা যাইবো... আমারে মাফ কইরা দে বইন..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই গলা ধরে আসে কান্নায়।

২ মিনিটে জেল হাসপাতালের লোকজন দৌড়ে আসে।
স্ট্রেচার, অক্সিজেন, স্যালাইন। পরীকে ধরাধরি করে নিয়ে যায়।
ওর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। হাত-পা খিঁচুনি দিচ্ছে। তবু দুহাত দিয়ে পেটটা আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলে বাচ্চাটা পড়ে যাবে।

খালা রাহেলা স্ট্রেচারের সাথে দৌড়াচ্ছেন। চোখে পানি, গলায় কান্না।
"ওরে বইন, চোখ খোল। তোর পোলার মুখ দেখবি না? তুই না যোদ্ধা? তুই না বলছিলি, 'আমি হারবো না'? মরিস না মা... তোর ছেলের জন্য হলেও বাঁচ!"

---

জেল হাসপাতাল, OT-র বাইরে। রাত ২টা।

বাইরে ঠান্ডা বাতাস। ভেতরে মৃত্যুর সাথে লড়াই।

ডাক্তার বের হয়। মুখে মাস্ক, চোখে আতঙ্ক। গলার স্বর ভারী।
"বিষটা ইঁদুর মারার। খুব স্ট্রং। মায়ের লিভার-কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে। ৫০% দুধ খেয়েছে। এটাই এনাফ ওকে মেরে ফেলার জন্য।"

গার্ডের গলা শুকিয়ে যায়। "বাচ্চা?"

ডাক্তার মাথা নিচু করে।
"বাচ্চার হার্টবিট কমে যাচ্ছে। মা আর ১০ মিনিট। এখনই ইমার্জেন্সি সিজার না করলে দুজনেই যাবে। কনসেন্ট কে দেবে?"

খালা রাহেলা এক পা এগিয়ে আসেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটা হঠাৎ সোজা হয়ে যায়। চোখে আগুন।
"আমি দিমু। আমি ওর মা। কাগজ দেন।
আমার মাইয়ার পেট কাইট্টা হইলেও নাতিরে বাঁচান।
মা মরলে দুনিয়া অন্ধকার হয়, কিন্তু সন্তান মরলে দুনিয়ার মানে থাকে না।"

কলম ধরে কাঁপা হাতে সাইন করে দেন। কালি শুকানোর আগেই লাল বাতি জ্বলে ওঠে।
OT-র দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

ভেতরে চলছে জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ।
বাইরে, খালা রাহেলা মেঝেতে বসে পড়েন। দুহাত তুলে আকাশের দিকে তাকান। গলা ফেটে যায় কান্নায়।
"আল্লাহ, আমি কিছু চাই না। শুধু পরী আর বাচ্চাটারে বাঁচায়ে দে। একটারে নিলেও আরেকটারে ফিরায়ে দে।"

---

বাইরে, রোহানের ফ্ল্যাট। রাত ২টা ১৫।

রোহানের ঘুম ভেঙে যায়।
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। অজানা আতঙ্ক গলাটা চেপে ধরে। মনে হচ্ছে কেউ ওর কলিজা টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে।

সে ধড়ফড় করে উঠে বসে। ঘামে ভিজে গেছে শরীর।
"পরী..."

বারান্দায় যায়। টেবিলের উপর রাখা আদ্রিয়ানা আর পরীর ছবিটা হাতে নেয়।
ছবির পরী হাসছে। সেই হাসি, যেটা দেখলে রোহানের পৃথিবী থেমে যেত।

হঠাৎ রোহানের মনে হয় ছবির পরীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
ভুল দেখছে ভেবে চোখ মুছে আবার তাকায়।
না, ভুল না।

"পরী?" রোহান ফিসফিস করে। গলা কাঁপছে।
"তোর কিছু হয় নাই তো? প্লিজ বল না কিছু হয় নাই।"

ঠিক তখনই ফোন বাজে।
স্ক্রিনে লেখা— _"Jail Superintendent"_

রোহানের হাত থেমে যায়। ফোন ধরতে ভয় লাগে। মনে হয় ফোন ধরলেই সে শুনবে সব শেষ।

তবু কাঁপা হাতে রিসিভ করে।
"হ্যালো?"

ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা ভেসে আসে,
"মিস্টার রোহান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জেল হাসপাতালে আসুন। পরীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আমরা বাচ্চাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।"

টু টু টু...
ফোন কেটে যায়।

রোহানের হাত থেকে ছবিটা পড়ে যায়।
ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়।
ঠিক যেমন ওর দুনিয়া ভেঙে যাচ্ছে।

সে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে রাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে যায়।
"না! পরী, তুই আমাকে ছেড়ে যেতে পারিস না! শুনছিস তুই? আমি আসছি! আমি আসছি রে!"

দরজা খুলে পাগলের মতো দৌড় দেয়। পেছনে পড়ে থাকে ভাঙা ছবি, আর একটা প্রশ্ন—
ভালোবাসা কি সবসময় এত দেরি করে পৌঁছায়?

---

চলবে...

#অপূর্ণতার_পূর্ণতা

©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#বাংলাউপন্যাস #ক্রিয়েটিভলাইফ

27/05/2026

11/05/2026

_অপূর্ণতার_পূর্ণতা – পার্ট : ১০

বিয়ের ১ মাস পেরিয়েছে। রোহান-রাইমার দোতলা ফ্ল্যাট। দেয়ালে বড় করে বাঁধানো ওয়েডিং ফটো, ডাইনিং টেবিলে রোহানের পছন্দের কাচ্চি বিরিয়ানি। বাইরে থেকে যে কেউ দেখলে বলবে, "আহা, সুখের সংসার!"

কিন্তু দরজা বন্ধ হলেই এই ফ্ল্যাটটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এখানে দুটো মানুষ থাকে—রোহান আর রাইমা। শরীরে প্রাণ আছে, কিন্তু মনে নেই। শুধু নিঃশ্বাসটা পড়ে।

ভোর ৬টা। রাইমা ঘড়ির কাঁটার মতো ওঠে। রোহানের জন্য গ্রিন টি বানায়, শার্ট ইস্ত্রি করে, টিফিন বক্সে গরুর কালা ভুনা ভরে দেয়। রোহান চুপচাপ খায়, চুপচাপ বের হয়। যাওয়ার আগে একবারও বলে না, "আসি"।

রাত ১১টা। রোহান ফেরে। জামা ছাড়ে না, হাতমুখ ধোয় না। সোজা বারান্দায়। একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সাথে ওর দীর্ঘশ্বাস যেন মিশে গেছে।

একদিন রাইমা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল। রোহান হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল এমনভাবে যে রাইমা তাল সামলাতে না পেরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। কপাল কেটে রক্ত ঝরছে। রোহান সেদিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলেছিল, "তোর কষ্ট দেখলেও আমার কিছু মনে হয় না, রাইমা। কারণ তুই আমার কেউ না। তুই শুধু একটা মাধ্যম। পরীকে কষ্ট দেওয়ার মাধ্যম। আমি তোকে আপন ভাবতে পারি না।"

রাইমা সেদিন সারারাত বাথরুমের মেঝেতে বসে কেঁদেছিল। শাওয়ার ছেড়ে দিয়েছিল যাতে কান্নার শব্দ রোহানের কানে না যায়।

"জোর করে পাওয়া মানুষটা কখনো আপন হয় না। সে হয় সাজানো শোকেসের পুতুল—দেখতে সুন্দর, ছুঁতে মানা।"
"অবহেলা হলো ধীর বিষ। প্রতিদিন একটু একটু করে খেলে মানুষ মরে না, জীবন্ত লাশ হয়ে যায়।"

রোহান প্রতিদিন অফিস শেষে জেলে যায়। উদ্দেশ্য একটাই—পরীকে কঠিন কথায় আঘাত করা। "জেলের খাবার কেমন লাগে? আমার স্ত্রী আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তোর মতো অভিনয় করে না।" "তোর সন্তানটা তো জেলেই বড় হবে।" — রোহান জানে, পরীর গর্ভের এই ৮ মাসের সন্তান তারই। কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে সে নিজের রক্তকেও অস্বীকার করতে চায়।

বলে আসে, আর রাতে ফিরে নিজের বুকের ভেতর দাউদাউ আগুন নিয়ে ছটফট করে। ঘুমের ওষুধ দুটো করে খায়, তাও ঘুম আসে না। চোখ বন্ধ করলেই ভাসে—পরীর সাথে কাটানো সুন্দর সময়গুলো, পরীর হাতে বানানো চা, পরীর গায়ের সেই চেনা গন্ধ।

একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই নিজে আঘাত করেছিল। "আমি কী মানুষ? আমি কি পশু হয়ে গেছি? অন্তঃসত্ত্বা একটা মেয়েকে আমি এভাবে কথা শোনাই?" পরক্ষণেই আদ্রিয়ানার কবরের মাটি মনে পড়ে। আদ্রিয়ানার শেষ কথা—"ভাইয়া, আমাকে বাঁচা..."। রোহান চোখ বন্ধ করে। আবার কঠিন হয়। আবার প্রতিশোধ। আমার বোনের সাথে যারা অন্যায় করেছে, তারা শাস্তি পাবে না?

"প্রতিশোধ হলো সেই নেশা, যা খেয়ে মানুষ ভাবে সে জিতে গেছে। নেশা কাটলে দেখে সে নিজেই হেরে বসে আছে।"
"ঘৃণা করতে করতে মানুষ কখন যে নিজেকেই ঘৃণা করা শুরু করে, সে নিজেও টের পায় না।"

রোহান এখন আয়নাও দেখে না। কারণ আয়নায় একজন অপরাধীকে দেখতে পায়—যে তার নিজের ভালোবাসাকে শেষ করে দিয়েছে।

রাইমা এখন দিশেহারা। রোহানের একটু ভালোবাসা, একটু মনোযোগ পাওয়ার জন্য সে সব করতে রাজি। গভীর রাতে রাইয়ানকে ফোন দেয়। "ভাইয়া, ও আমাকে মানুষই মনে করে না। আমাকে গুরুত্ব দেয় না। বলে আমি নাকি শুধু পুতুল। ওর অবহেলা আমি আর সহ্য করবো না। ওকে আমার করতেই হবে, যেভাবেই হোক।"

ওপাশে রাইয়ান ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সুযোগ এসেছে। এখন শুধু কাজে লাগানোর পালা। "শোন বোন, তোর এই কষ্টের একটাই সমাধান। পরীকে এই দুনিয়া থেকে সরাতে হবে। যতদিন ও বেঁচে আছে, ততদিন রোহানের মনে ও থাকবে। জেলের ভেতর ওকে শেষ করে দিতে হবে। সন্তানসহ।"

রাইমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। "সন্তান... সন্তানসহ?" এক মুহূর্তের জন্য পরীর ফোলা পেটটা চোখে ভাসে। পরক্ষণেই রোহানের অবহেলার কথা মনে পড়ে। "হ্যাঁ। না হলে রোহান সারাজীবন ওই সন্তানের টানে ছুটবে। তুই কি অন্যের সন্তানকে মানুষ করতে পারবি? পারবি না। তাই দুজনকেই সরাতে হবে।"

জেদ, না পাওয়ার যন্ত্রণা, আর রোহানের অবহেলা—এই তিনটা মিলে রাইমার ভেতরের কোমল মেয়েটাকে শেষ করে দিয়েছে। এখন সেখানে শুধুই প্রতিহিংসা। রাইমার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। পরীর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে। কিন্তু রোহানকে না পাওয়ার যন্ত্রণা সব মায়া মুছে দেয়। "বলো কী করতে হবে।" রাইমার গলা বরফের মতো ঠান্ডা।

রাইয়ানের প্ল্যান: জেলের মহিলা ওয়ার্ডের সুইপার মর্জিনাকে ৫ লাখ টাকা দিবে। মর্জিনা পরীর রাতের দুধে বিষ মেশাবে। ৮ মাসের গর্ভবতী শরীর, একটু বিষেই সব শেষ। সকালে সবাই ভাববে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। গর্ভাবস্থার জটিলতা।

"লোভ আর জেদ যখন এক হয়, তখন বিবেক পালিয়ে যায়।"
"অন্যের ক্ষতি যারা চায়, তারা ভুলে যায়—উপরওয়ালা সব দেখেন। প্রতিটি কাজের হিসাব হয়।"

পরদিন রোহান আবার জেলে যায়। পরীর চোখের নিচে কালি, গাল ভেঙে গেছে, কিন্তু মাথা উঁচু। ৮ মাসের গর্ভাবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে। সেলের ভেতর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। দূরে একটা শিশু কাঁদছে। এই কষ্টের জায়গায় ৮ মাস ধরে সে একটা নতুন প্রাণকে আগলে রেখেছে।

জেলের ভেতর সেলমেট খালা রাহেলা পরীর পেটে হাত বুলিয়ে দেন। "তুই চিন্তা করিস না মা। আমি ২০ বছর এই জেলে। কে ভালো, কে খারাপ—আমার চোখ এড়ায় না। দরকার পড়লে এই বুড়ি জান দিয়ে দেবে। তোর পোলা যোদ্ধা হবে রে, দেখিস।"

রোহান কঠিন কথা বলে, "মরার জন্য তৈরি? শুনলাম পেটের বাচ্চাটার নড়াচড়া কমে গেছে। ভালোই হয়েছে। অন্যায়কারীর বংশ শেষ হওয়াই ভালো।"

পরী এই প্রথম হাসে। সে হাসি দেখে রোহানের বুক কেঁপে ওঠে। এ হাসিতে কান্না নেই, ভয় নেই। আছে শুধু আত্মবিশ্বাস। পরী পেটে হাত রাখে। ভেতরের শিশুটা জোরে নড়ে ওঠে, যেন সেও বাবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। পরী ব্যথা উপেক্ষা করে এক পা এক পা করে রোহানের দিকে এগিয়ে আসে। গার্ডও ভয় পেয়ে দু-পা পিছিয়ে যায়।

"শোন রোহান, তুই আমাকে শেষ করতে পারবি, আমার সন্তানকে শেষ করতে পারবি, কিন্তু আমার সত্যকে শেষ করতে পারবি না। তুই দিনরাত আমাকে দোষ দিস, কারণ তুই নিজেকে বোঝাস যে আমি অপরাধী। কারণ তুই যদি এক মুহূর্তের জন্য ভাবিস আমি নির্দোষ, তাহলে তুই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি না। তোর এই প্রতিশোধ, এই বিয়ে, এই সবকিছু—আমার জন্য না। সব তোর নিজের জন্য। তুই নিজের অপরাধবোধ থেকে পালাচ্ছিস।"

রোহানের গলা শুকিয়ে যায়। হাত মুঠো হয়ে যায়।

পরী আরও বলে, "আর তোর রাইমা? ও তোকে ভালোবাসে না। ও ভালোবাসে তোকে পাওয়ার জেদকে। যেদিন তুই পুরোপুরি ভেঙে পড়বি, সেদিন ও তোকে ফেলে চলে যাবে। মনে রাখিস—"

"জোর করে বাঁধা গিঁট, সময় হলেই খুলে যায়। আর খোলার সময় নিজেরও ক্ষতি হয়।"
"যে অন্যের ঘর ভেঙে নিজের ঘর সাজায়, তার ঘরে কখনো শান্তি আসে না। আসে শুধু অশান্তি।"
"তুই আমাকে ঘৃণা করিস না, রোহান। তুই নিজেকে ঘৃণা করিস। কারণ তুই জানিস, তুই আমার সাথে অন্যায় করছিস।"

কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে রোহানের বুকে। সে আর দাঁড়াতে পারে না। টলতে টলতে বের হয়ে যায়। গাড়িতে উঠে স্টিয়ারিং-এ মাথা রেখে কেঁদে ওঠে। "আমি কী করলাম..."

সে রাতেই রাইয়ান মর্জিনাকে টাকা দেয়। সাথে একটা ছোট শিশি। "কাল রাতে। দুধের সাথে। কেউ যেন টের না পায়। কাজ হলে আরও ৫ লাখ।"

রাইমা বাসায় বসে অপেক্ষা করে। বারবার ঘড়ি দেখে। কাল সকালেই খবর আসবে—পরী নেই। তারপর রোহান শুধু তার।

"অন্যায় করার আগে মানুষ ভাবে সে জিতে যাচ্ছে। অন্যায় হয়ে যাওয়ার পর বোঝে সে নিজের কাছেই হেরে গেছে।"

আর রোহান? সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। নিচে ব্যস্ত শহর, উপরে কালো আকাশ। তার হাতে সিগারেট না, আজ তার হাতে আদ্রিয়ানা আর পরীর সাথে তোলা পুরোনো একটা ছবি। ছবিটা বুকে চেপে ধরে সে প্রথমবারের মতো শব্দ করে কেঁদে ওঠে। "আমি কী করলাম পরী... আমাদের বাচ্চাটাকে ক্ষমা করে দে..."

কিন্তু ততক্ষণে কি দেরি হয়ে গেছে? জেলের ভেতর মর্জিনা বিষের শিশিটা আঁচলে লুকিয়ে পরীর সেলের দিকে পা বাড়াচ্ছে।

"নিয়তি যখন হিসাব মেলাতে বসে, তখন এক মুহূর্তের দেরিও সারা জীবনের আফসোস হয়ে যায়।"
"ভালোবাসা আর ঘৃণার মাঝখানে যে সেতুটা থাকে, সেটার নাম বিশ্বাস। একবার ভাঙলে, দুটোই ডুবে যায়।"

_চলবে..._

#অপূর্ণতার_পূর্ণতা
©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#বাংলাউপন্যাস

10/05/2026

_অপূর্ণতার_পূর্ণতা_পার্ট : ০৯

পরীকে সবাই ছেড়ে দিলেও তিনজন মানুষ ছাড়েনি— তার বাবা, মা আর বোন জয়নব। মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছেন, কিন্তু প্রতিদিন মেয়ের জন্য তাহাজ্জুদে হাউমাউ করে কাঁদেন। "আল্লাহ, আমার নির্দোষ মেয়েটারে তুমি দেখো।"

জয়নব প্রতিদিন কোর্টে যায়, উকিলের সাথে দেখা করে, সত্যিটা বের করার জন্য রাতদিন এক করে ফেলেছে। জেলের ভেতর সেলমেট খালা রাহেলা পরীর পেটে হাত বুলিয়ে দেন যখন বাচ্চাটা লাথি মারে। "তোর পোলা যোদ্ধা হবে রে, দেখিস। জেলের দেয়াল গুনেই বড় হইতেছে।"

প্রতিদিন দেখা করার সময় জয়নব পরীর গাল ধরে বলে—
"আপু, তুই ভাঙিস না। মেঘ যত কালোই হোক, সূর্য তাকে চিরে বের হবেই। তোর সত্যই তোর সবচেয়ে বড় ঢাল।"

পরী জয়নবের কোলে মাথা রেখে কাঁদে। পেটের ভেতর বাচ্চাটা জোরে নড়ে ওঠে। "আমার বাচ্চাটা যদি জেলেই জন্ম নেয় জয়নব?"

জয়নব পরীর পেটে হাত রেখে বলে, "তোর বাচ্চা জন্ম নেবে বীরের মতো। কারণ তার মা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। মনে রাখিস আপু—

"পাহাড় যতই উঁচু হোক, পথ তার বুক চিরেই তৈরি হয়।"
"যে সয়, সে রয়। আর যে সত্যের পথে থাকে, শেষ হাসিটা তারই হয়।"
"দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ হয় ভাঙে, নয়তো দেয়াল ভাঙে। তুই দেয়াল ভাঙবি আপু।"

পরীর বাবা প্রতিবার দেখা করে শুধু একটা কথাই বলেন, "মা রে, আমরা মধ্যবিত্ত হতে পারি, কিন্তু অসম্মান নিয়ে বাঁচি না। তুই নির্দোষ—এই বিশ্বাসটাই আমার শক্তি।"
"বাবার বিশ্বাস হলো সেই ছাতা, যা দুর্যোগের দিনেও মাথার উপর ভরসা হয়ে থাকে।"
"মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা না, আত্মসম্মান।"

সময় সময়ের গতিতে ছুটতে থাকে...

এই ছয় মাসে রোহান পাথর হয়ে গেছে। কোর্ট-কাচারি, উকিলের দৌড়ঝাঁপ, রাতজাগা। কিন্তু সব প্রমাণ, সব সাক্ষী পরীর বিরুদ্ধে। বোনের লাশ, স্ত্রীর জেল—দুই দিকের যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।

এদিকে রাইয়ান প্রতিদিন রোহানের কানে বিষ ঢালে। কিন্তু এই বিষের আসল উৎস রাইমা।

রাইমা ছোটবেলা থেকে রোহানকে ভালোবাসে। রোহানের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, রোহানের জন্য কবিতা লেখা—সব করেছে। কিন্তু রোহানের চোখে শুধু পরী। পরী আসার পর রোহান যেন রাইমাকে দেখতেই পায় না।

সেই ক্ষোভ, সেই না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে রাইমা ঠিক করে— "রোহান যদি আমার না হয়, কারো হতে দেব না। পরীকে সরাতেই হবে।"

আলাদা স্কুলে সবার সামনে পরীকে প্রপোজ করেছিল রাইয়ান। পরী স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, "তোমার মতো লম্পটের সাথে আমার যায় না রাইয়ান। আয়নায় নিজের চেহারা দেখো।" সেই অপমান রাইয়ান ভোলেনি।

রাইমা যখন পরীকে ধ্বংস করার প্ল্যান নিয়ে আসে রাইয়ানের কাছে, রাইয়ান তা লুফে নেয়। এক ঢিলে দুই পাখি মারা—রাইমা পাবে রোহানকে, আর রাইয়ান নেবে অপমানের প্রতিশোধ। দুজনে মিলে সাজায় আদ্রিয়ানা মার্ডারের নিখুঁত নাটক। প্রমাণ, সাক্ষী, টাইমিং—সব।

ছয় মাসের মাথায় রোহান ভেঙে পড়ে। ভালোবাসার এই বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। রাতে ঘুমাতে পারে না। চোখ বন্ধ করলেই পরীর হাসি ভাসে।

রাইয়ান তখনই সুযোগ নেয়। প্রতিদিন কানের কাছে বলে, "অভিনয় রে পাগলা, সব অভিনয়। যে মেয়ে তোর বোনকে মারতে পারে, সে তোর সন্তানের মা হওয়ার যোগ্য না। সমাজে মুখ দেখাবি কীভাবে? তোর বাচ্চাটাকে সবাই কী বলবে?"

ঘুমের ওষুধ আর একাকিত্বে ডুবে থাকা রোহানের মাথা কাজ করে না।
"একাকিত্ব হলো সেই ফাঁকা মাঠ, যেখানে শত্রুরা সবচেয়ে সহজে ফসল ফলায়।"

বেশ কিছুদিন কেটে যায়। হঠাৎ একদিন রাইয়ান রোহানের কাছে রাইমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। "রাইমা তোকে ছোটবেলা থেকে ভালোবাসে। সব জেনেও ও তোর পাশে থাকতে চায়। ওর মতো মেয়ে পাবি না।"

বিধ্বস্ত রোহান ভাবে, পরীকে কষ্ট দিলেই হয়তো নিজের যন্ত্রণা কমবে। হয়তো বোনের আত্মা শান্তি পাবে। সে রাজি হয়ে যায়।

বিয়ের কার্ডটা সে নিজে জেলে গিয়ে পরীর হাতে দেয়। "কাল আমার বিয়ে। এইটা হলো তোর জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার আমার কাছ থেকে। এখন বুঝবি, প্রিয় মানুষ হারানোর যন্ত্রণা কী।"

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা পরী কার্ডটা বুকে চেপে ধরে। পেটের ভেতর বাচ্চাটা লাথি মারে, যেন মাকে বলে "কাঁদিস না মা"। চোখে জল নেই। শুধু ঠোঁট কেঁপে বলে—
"তুমি আজ আমাকে মারলে না রোহান, তুমি আমাদের ভালোবাসাটাকে খুন করলে। আর জানো? ছোটবেলার ভালোবাসা দিয়ে সংসার হয় না রোহান, বিশ্বাস দিয়ে হয়। যেটা তুমি আমাকে করোনি।"

আর মনে রেখো— "প্রতিশোধে শান্তি মেলে না, মেলে শুধু আরেকটা শূন্যতা।"
"যে হাতে ঘর পোড়ায়, সে হাতেই একদিন ছাই লাগে।"
"কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না, হারিয়ে দিতে হয়। আজ থেকে তুমি আমার জন্য মৃত।"

রোহান সেখান থেকে চলে যায়।

পরদিন রেজিস্ট্রি হয় রোহান আর রাইমার। কবুল বলার সময় রাইমার চোখ চকচক করে—অবশেষে রোহানকে পেল। রোহানের গলা কাঁপে।

রাইয়ান দূরে দাঁড়িয়ে বিজয়ের হাসি হাসে। তার ছক পুরোপুরি সফল। সে শুধু আদ্রিয়ানাকে সরায়নি, একটা ভালোবাসা, একটি অনাগত শিশুর ভবিষ্যৎ, একটা পরিবারের সবকিছু শেষ করেছে। আর রাইমাকে দিয়েছে তার ছোটবেলার স্বপ্ন। এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে রাইয়ান।

কারণ সে বিশ্বাস করে—
"সবচেয়ে নিখুঁত ধ্বংস হলো সেটাই, যেখানে শত্রু নিজের হাতেই নিজের কলিজা ছিঁড়ে ফেলে।"

আর রোহান? সে জিতে গিয়েও হেরে গেল। কারণ সে বোঝেনি— "চোখে দেখা প্রমাণও সাজানো হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের বিশ্বাস কখনো মিথ্যা হয় না।"
"যে সম্পর্ককে সন্দেহের বীজ দিয়ে পুঁতবে, সেখানে ফুল নয়, কাঁটাই জন্মাবে।"
"তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত সারা জীবনের আফসোস হয়ে ফেরে।"

জেলের ছোট্ট জানালা দিয়ে আকাশ দেখে পরী। হঠাৎ খালা রাহেলা ফিসফিস করে, "শুনছস পরী? নতুন দারোগা আইছে। হে নাকি পুরান কেস নতুন কইরা খুলতেছে। আদ্রিয়ানা মার্ডার কেসের ফাইলও চাইছে... আর শুনলাম, ঘটনার দিন নাকি একটা CNG-এর ড্রাইভার সব দেখছে। পলাতক ছিল এতদিন।"

পরীর চোখ চকচক করে ওঠে। পেটে হাত রেখে সে বিড়বিড় করে— "রাত যত গভীর হয়, ভোর তত কাছে আসে। মিথ্যা ভালোবাসা আর সাজানো প্রতিশোধের দেয়াল একদিন ভাঙবেই, সত্যের একটা আঘাতেই। আমি বাঁচব, আমার বাচ্চার জন্য বাঁচব।"

*চলবে...*
#অপূর্ণতার_পূর্ণতা

©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#বাংলাউপন্যাস

10/05/2026

Yep😌...

09/05/2026

...

09/05/2026

_অপূর্ণতার_পূর্ণতা_পার্ট:০৮

সময় কখনো কখনো এমন নিষ্ঠুর খেলা খেলে, যেখানে সত্যকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় মিথ্যার কাঠগড়ায়। আদ্রিয়ানাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কেটে গেছে তিনটি দিন। তিনটি নির্ঘুম রাত। এই তিনটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত রোহানের পরিবারের জন্য একেকটা বছর মনে হচ্ছিল। এবং পরিবারের সবার মধ্যে তখন শুধুই আতঙ্ক আর প্রার্থনা ছিল।

এদিকে পরীর মন ছটফট করছে। রোহানকে সারপ্রাইজ দেওয়ার কথা ছিল অথচ পুরো পরিবার এখন ডুবে আছে দুশ্চিন্তায়। পরী নিজেও পাগলের মতো ছুটেছে থানা-পুলিশ, হাসপাতাল, আত্মীয়ের বাড়ি। তার শরীরে আরেকটা প্রাণ বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। কারণ সে জানত—

"সম্পর্ক শুধু রক্তের হয় না, কিছু সম্পর্ক দায়িত্ব দিয়ে তৈরি হয়।"

চতুর্থ দিনের সকালে রোহানের ফোনে একটা ভয়েস মেসেজ আসে। কাঁপা কাঁপা গলায় আদ্রিয়ানার কণ্ঠ—"ভাইয়া বাঁচাও... ভাবি... ভাবি আমাকে..." লাইনটা কেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই একটা লোকেশন—শহরের বাইরের সেই পরিত্যক্ত পেইন্ট ফ্যাক্টরি।

রোহান দিশেহারা হয়ে ছুটে যায়। পরী যেতে চাইলে তাকে ধমকে থামায়, "তোমার যেতে হবে না। আমার বোনের কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করব না।"

ফ্যাক্টরির ভেতরটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে। একটা ঘরের দরজা হালকা খোলা। ভেতরে ঢুকতেই রোহানের পৃথিবী থমকে যায়। মেঝেতে পড়ে আছে আদ্রিয়ানা। নিথর, নিস্তব্ধ। গলায় ওড়না পেঁচানো, হাতে ধস্তাধস্তির দাগ। পাশে পড়ে আছে পরীর গলার সেই চেনটা, যেটা রোহান প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে দিয়েছিল। চেনের লকেটে লেগে আছে টাটকা রক্ত।

ঠিক তখনই পুলিশের সাইরেন বেজে ওঠে। রোহান আগেই খবর দিয়ে রেখেছিল । পুলিশের সঙ্গে ঢুকে সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি। যার নাম রাইয়ান। নিজেকে রোহানের 'বাল্যবন্ধু' বলে পরিচয় দেয় সে। তার চোখে-মুখে নাটকীয় শোক।

"আমি খবর পেয়ে ছুটে এসেছি রোহান। বিশ্বাস কর, আমি দূর থেকে দেখেছি... ভাবি আর আদ্রিয়ানার মধ্যে কি নিয়ে যেন তুমুল ঝগড়া হচ্ছিলো।' তারপর হঠাৎ ভাবী আদ্রিয়ানা কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় আর গলায় উড়না পেঁচিয়ে ধরে... আমি ঢোকার আগেই..." রাইয়ান কান্নায় ভেঙে পড়ে।

পুলিশ পুরো ঘর সার্চ করে। একটা ভাঙা সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক উদ্ধার হয়। টেকনিক্যালি 'নষ্ট' হলেও শেষ ২০ সেকেন্ডের ফুটেজ রিকভার করা যায়—ঘোলা ভিডিওতে পরীর মতো শাড়ি পরা একজনকে দেখা যায়, আদ্রিয়ানাকে ধাক্কা দিচ্ছে। মুখ স্পষ্ট না, কিন্তু শাড়িটা পরীর। যেটা সে ৫মাস আগে ঢাকা থেকে পরীর জন্য কিনে এনে দিয়েছিল আর পরী ওই শাড়িটা পরেছিল।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দেয় ফরেনসিক রিপোর্ট। আদ্রিয়ানার নখের ভেতর পরীর চামড়া, আর গলার লকেটে পরীর আঙুলের ছাপ। রাইয়ান আগেই কৌশলে পরীর ব্যবহার করা চিরুনি থেকে চুল, আর কফির মগ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে রেখেছিল। 'পারফেক্ট ক্রাইম' সাজাতে এক বছর ধরে সে পরীর রুটিন, পছন্দ, অভ্যাস মুখস্থ করেছে।

বাড়িতে যখন পুলিশ পরীকে অ্যারেস্ট করতে আসে, তখন পুরো বাড়ির সদস্যরা ভেঙে পড়েছে। রোহান বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে গেছে।

"তুমি? তুমি আমার বোনকে..." রোহানের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।
"রোহান, আমার কথা শোনো। আমি গত তিন দিন বাড়ি থেকে বেরই হইনি। তোমার বাবা-মা জানে, জয়নব ও জানে।" পরীর চোখে জল।

ঠিক তখনই রোহানের মা এগিয়ে আসেন। "আমি সাক্ষী দেব। বউমা সেদিন সারাদিন আমার সাথেই ছিল।"
কিন্তু রাইয়ান তখনই পকেট থেকে একটা ফোন বের করে। "আন্টি, তাহলে এই কল রেকর্ডটা কী? পরী সেদিন দুপুরে আদ্রিয়ানাকে ফোন করে ফ্যাক্টরিতে ডেকেছিল।" স্পিকারে বাজে এডিট করা কণ্ঠস্বর—হুবহু পরীর গলা। AI দিয়ে বানানো।

পুরো দুনিয়া দুলে ওঠে রোহানের এবং বাকি সবার। প্রমাণ, ভিডিও, ফরেনসিক, কল রেকর্ড—সব পরীর বিরুদ্ধে।

"সন্দেহ হলো সেই বিষ, যা ঢালার জন্য কোনো পাত্র লাগে না, মনটাই যথেষ্ট।"

পরীকে যখন হাতকড়া পরানো হয়, সে শুধু রোহানের চোখে চোখ রাখে। "ভালোবাসা যদি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে না পারে, তবে সেটা ভালোবাসা না রোহান, সেটা শুধুই চুক্তি আর মোহ।"

পরী কে সেদিনই পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।
...............................................................

#অপূর্ণতার_পূর্ণতা
©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#বাংলাউপন্যাস

02/05/2026

_অপূর্ণতার_পূর্ণতা_ পার্ট:০৭

এভাবেই চলতে থাকে তাদের তিনজনের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক। সময় গড়ায়, বছর পেরোয়। ধীরে ধীরে পরী ও রোহান উপলব্ধি করে—

"ভালোবাসা মানে শুধু পাশে থাকা নয়, একে অপরের স্বপ্নে বেঁচে থাকা।"

তাই একদিন সাহস করে তারা নিজেদের ভালোবাসার কথা পরিবারকে জানায়। দুই পরিবারের সম্মতি আর আশীর্বাদে তাদের বিয়ে ঠিক হয়।

শানাইয়ের মিষ্টি সুরে, প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয়, হাজারো মানুষের দোয়ায় জমকালো আয়োজনে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেদিন রোহান পরীর হাত ধরে ফিসফিসিয়ে বলেছিল—

"তোমার হাসিতেই আমার ভোর, তোমার চোখেই আমার গোধূলি।"

কেটে যায় চারটি বছর...

এই চার বছরে তাদের তিনজনের সম্পর্কে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দায়িত্ব বেড়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—রোহান ও পরীর ভালোবাসা। বরং দিন দিন তা আরও গভীর হয়েছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে—

"সংসার মানে শুধু দুটি মানুষ নয়, দুটি মনের একসাথে পথচলা।"

হঠাৎ এক সকাল বদলে দেয় সবকিছু। পরী জানতে পারে, সে গর্ভবতী। পরী মা হবে, আর রোহান বাবা হবে—এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই আনন্দে পরীর চোখ ভিজে ওঠে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে এক অপার্থিব অনুভূতিতে। মনে মনে বলে ওঠে—
"তুমি আসার আগেই তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি, আমার ছোট্ট পৃথিবী।"

সঙ্গে সঙ্গে পরী পরিবারের সদস্যদের খবরটা জানায়। সুসংবাদ শুনে সবাই আনন্দে আত্মহারা। মা-বাবার চোখে জল, শশুড়-শাশুড়ির মুখে তৃপ্তির হাসি। জয়নব ও লিমা তারা দুজনেও খুশি।সবার একটাই প্রতীক্ষা—তাদের পরিবারে এবার একটা নতুন সদস্য যোগ হবে। ছোট ছোট পায়ে হেঁটে, আধো বোলে 'মা' ডেকে, খেলা করে পুরো বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখবে সে...

তবে এই খবরটা পরী এখনও রোহানকে জানাতে পারেনি। কারণ রোহান ব্যবসার কাজে ঢাকায় গিয়েছে বেশ কিছুদিনের জন্য। ফোনে বললে চমকটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই পরী ঠিক করেছে, রোহান ফিরলে নিজের হাতে কফির মগে ছোট্ট একটা চিরকুট গুঁজে দিয়ে বলবে—
"অভিনন্দন স্বামী-জান, আমাদের গল্পে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।" " তুমি বাবা হতে যাচ্ছো,আর আমি মা।"

পরিবারের সবাইকেও রোহানকে জানাতে নিষেধ করেছে, আর পরীর এই মিষ্টি পরিকল্পনায় সবাই সায় দিয়েছে।

এভাবেই পরী আর রোহানের ভালোবাসার সংসারটা স্বপ্নের মতো চলছিল। তাদের ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর পরিবারের সহযোগিতায় জীবনটা ভরে উঠেছিল প্রশান্তিতে। কারণ তারা জানে—

"যে ঘরে ভালোবাসা থাকে, সে ঘরে অভাব থাকলেও সুখের অভাব হয় না।"

কিন্তু সেই স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক কালো ছায়া।

আলো যত তীব্র হয়, ছায়াও তত গাঢ় হয়। তাদের গভীর ভালোবাসা দেখে এক ব্যক্তির মনে হিংসার বিষ জমতে থাকে। আর পরী গর্ভবতী হওয়ার সংবাদ শুনে সেই হিংসার আগুন দ্বিগুণ হয়ে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। পরীর এই সুখের সংসারকে ধ্বংস করার জন্য সেই ব্যক্তি এক জঘন্য পরিকল্পনা আঁটে...

সেই জঘন্য পরিকল্পনার প্রথম শিকার হয় রোহানের ছোট বোন, আদ্রিয়ানা লিমা। আদ্রিয়ানা একটা সাদাসিধে, কোমল মনের মেয়ে। সে বিশ্বাস করে—

"পৃথিবীর সব মানুষই ভালো, শুধু পরিস্থিতি মানুষকে খারাপ বানায়।"

এই সরলতাকেই কাজে লাগায় সেই হিংসুক ব্যক্তি। আদ্রিয়ানাকে ফাঁদে ফেলার জন্য ফোন করে নিজেকে রোহানের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেয়।

"হ্যালো আদ্রিয়ানা, আমি রোহান ভাইয়ের বন্ধু বলছি। ভাইয়ের একটা ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ, তুমি তাড়াতাড়ি সিটি হাসপাতালে চলে এসো"—কণ্ঠে গভীর উদ্বেগ মিশিয়ে বলে সেই ব্যক্তি।

ভাইয়ের বিপদের কথা শুনে আদ্রিয়ানার পৃথিবী থমকে যায়। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে থাকে। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে রোহান নেই। রিসেপশনেও কোনো তথ্য নেই। তখনই তার বুক কেঁপে ওঠে, সে বুঝতে পারে—এটা একটা ফাঁদ।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে...

হাসপাতালের গেট থেকে বের হতেই একটা কালো মাইক্রোবাস থামে, আর সেই ব্যক্তি আদ্রিয়ানাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় অন্ধকারের দিকে।

*চলবে...*

#অপূর্ণতার_পূর্ণতা
©[Nylima Ahana Rose Medlar][2026]
©[Nylima Ahana Rose Medlar Arts][2026]
#নতুন #লেখিকা #সাপোর্ট #ক্রিয়েটিভলাইফ #বাংলাউপন্যাস

28/04/2026

পৃষ্ঠা ৬!

হুম, তারপর......

ভালোবাসা আর ঘৃনা আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। প্রেমিক প্রেমিকার সামনে সেই মুদ্রা ঘুরতে থাকে, যাদের প্রেম যত গভীর তাদের মুদ্রার ঘূর্ণন তত বেশি। একসময় মুদ্রা থেমে যায়, কখনো ভালোবাসার লেখার পিঠ পরে থাকে তো আবার কখনো ঘৃনা। তাই প্রেমে মুদ্রাকে সবসময় ঘূরতে দিতে হয়।ঘূর্ণন কখনো থামতে দেওয়া যাবে না।

#হাইলাইট #ক্রিয়েটিভলাইফ

27/04/2026

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Nylima Ahana Rose Medlar Arts posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share