01/05/2026
দুনিয়ার মজদুর এক হও!
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)
কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি
অস্থায়ী কার্যালয়: ২৩/২ তোপখানা রোড (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১৬২১০০৩৪, ০১৮৭৪৫৫৪৭৩১
সূত্র: ----------------- তারিখ: ০১/০৫/২০২৬ খ্রি.
মে দিবসের ঘোষণা
মহান মে দিবসে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ স্কপের ঘোষণা, মহান মে দিবসের চেতনায় শোষণ, বৈষম্য ও আত্মসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী করুন!
কাজের অধিকার, চাকুরীর নিশ্চয়তা, ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবস, জাতীয় ন্যূনতম মজুরী ৩০ হাজার টাকা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবেই।
সংগ্রামী শ্রমিক কর্মচারী ভাই ও বোনেরা,
১৪০তম মহান মে দিবসের সংগ্রামী শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। (১৮৮৬ সাল থেকে ২০২৬ সালে মে দিবস হয় ১৪১ তম; আর মে দিবসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করলে ১৪০ তম হয়)। আপনারা জানেন, শ্রমিক শ্রেণীর রক্তঝরা সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মহিমায় মহিমান্বিত সংগ্রামের প্রতীক হচ্ছে ১লা মে "মহান মে দিবস"। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে রক্তঝরা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই শ্রমিক শ্রেণীকে অধিকার আদায় করে নিতে হয়। শ্রমিক শ্রেণীর ছোট বড়, বিচ্ছিন্ন, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন যূথবদ্ধ ও সংগঠিত রূপের আন্দোলনের সূচনা ঘটে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে সমাবেশের মাধ্যমে। সেই সমাবেশে বুর্জোয়া শ্রেণীর সরকারের পুলিশ ও গুণ্ডা বাহিনীর নির্মম দমন পীড়নের প্রতিবাদে ১ মে শ্রমিক ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট চলাকালে পুলিশ ও বুর্জোয়াশ্রেণীর দালালদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন ৬ জন শ্রমিক এবং শত শত শ্রমিক আহত হন। এর প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেটের সামনে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ সভা চলাকালীন সময়ে পুলিশের পৈশাচিক গুলিবর্ষণে নিহত হন ৭ জন শ্রমিক এবং হতাহত হন অনেকে। ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের এই ঐতিহাসিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবার কারণে পুলিশ গ্রেফতার করে অগাস্ট স্পাইজ, সীমফেল্ডেন, মাইকেল, জর্জ এঞ্জেল, এডলফ ফিশার, লুই নিগ এবং অস্কার নিবে- এই ৭ জন শ্রমিক নেতাকে। বুর্জোয়াশ্রেণী ও তাদের ধারকবাহক সরকার ফাঁসির আদেশ দেয় শ্রমিকশ্রেণীর নির্ভীক, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বীর নেতা অগাস্ট স্পাইজ, পারসন, ফিশার, জর্জ এঞ্জেলকে। এই সব বীর শ্রমিক নেতারা সেদিন সৃষ্টি করেন-আত্মত্যাগ ও বিপ্লবী দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিষ্ঠিত হয় ৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন ও ৮ ঘণ্টা বিশ্রামের সময়সীমা। ১৮৮৯ সালে ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্যারিস কংগ্রেসে প্রতিবছর ১ মে আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৮৯০ সালের নিউইয়র্কে প্রথম মে দিবসের সমাবেশের প্রস্তাবে লেখা হয়, "৮ ঘণ্টা কাজের দিনের দাবী পূরণের সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব, কিন্তু কখনো ভুলবো না, আমাদের শেষ লক্ষ্য হল (পুঁজিবাদী) মজুরী ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন"। তারপর থেকেই ৮ ঘণ্টা কাজ, ন্যায্য মজুরী আর সমাজবদলের সংগ্রাম একসাথেই চলছে।
সংগ্রামী বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের ৭ কোটি ৬০ লক্ষ শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মে দিবসের ১৪০ বছর পরও ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের অধিকার থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত করা হয়। তাদের শ্রম ঘণ্টা, ন্যূনতম মজুরী, কাজের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা কোনটাই নেই। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কম দিয়ে মজুরী দিয়ে ওভারটাইম করতে বাধ্য করে মালিকরা মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলেন। বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বাঁচার মতো মজুরী নির্ধারণের কথা উঠলেই শিল্প সংকট, বাজার সংকট, আর যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাত দাড় করিয়ে মজুরী কম দেওয়া হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বব্যাপী পুঁজির আধিপত্য আর সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের জন্য যুদ্ধ লাগানো হচ্ছে। আত্মসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের দায় বহন করতে হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণিকে। ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত সামগ্রিক গুরুত্বে প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীরা স্ব পক্ষে বাংলাদেশকে যুদ্ধে জড়িত করার ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত...চলছে। ফলে এবারের মে দিবসে শ্রমিক শ্রেণিকে শোষণ-লুটপাট, নির্যাতন, কর্মহীনতা, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে জীবিকা রক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি জীবন রক্ষায় আত্মসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার শপথ নিতে হবে। শ্রমআইনে পাঁচ বছর পর মজুরী নির্ধারণ করার কথা থাকলেও ওষুধি সেক্টরের মধ্যে অনেক সেক্টরেই পাঁচ বছরের মধ্যে মজুরী নির্ধারণ করা হয় না, সম্প্রতি শ্রম আইন সংশোধন করে তিন বছর অন্তর মজুরী পুনঃনির্ধারণের আইন করা হয়েছে। পাঁচ/তিন বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর কত শতাংশ বাড়ে এবং শ্রমিকের মজুরী কত বাড়ানো হয় তা হিসেব করলে দেখা যায় শ্রমিকের প্রকৃত মজুরী বাড়ে না বরং কমে যায়। ফলে শ্রমিকদের জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম মজুরীও কার্যত শ্রমিকরা পায় না, আবার কাগজে কলমে মজুরি ঘোষণা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিক ও সরকার তা কার্যকর করে না। সেক্টর এবং মালিকানা নির্বিশেষে সকল শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি জাতীয় ন্যূনতম মজুরী আইন করে নির্ধারণ করার বিষয়টিও সকল সরকারই উপেক্ষা করে চলেছে। শ্রমিকদের সংগঠন গড়ার স্বাধীনতাকেও আইনের মারপ্যাঁচে নানাভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। এমন কি শ্রম অধ্যাদেশ-২০২৩ এ যেখানে যে কোন সেক্টরে ৫ টি ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, সেখানে নতুন সরকার শ্রমআইন সংশোধন করে তিনটির বেশি ইউনিয়ন করা নিষিদ্ধ করে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আরও সংকুচিত করেছে। এছাড়াও শ্রমআইনের ২৩ ও ২৬ ধারাসহ শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী ধারাসমূহ বাতিল না করে মালিকদের শোষণ-নিপীড়ন চালানোর সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সর্বোচ্চ উপায় হিসাবে ধর্মঘট করার অধিকারও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা আইনের খড়গের নিচে আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। ইপিজেড, ইসিজেডসহ নতুন গড়ে ওঠা শিল্প কারখানায় আইনি বাধা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠছে না। ফলে শ্রমিকরা সংখ্যায় বাড়লেও ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা এবং শক্তি কোনটাই বাড়ছে না বরং শ্রমিকদের উপর নিপীড়ন, হয়রানি ক্রমাগত বাড়ছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি জীবনদান, নির্যাতন সহ্য করলেও শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয় নি। বরং শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, বৈষম্য আরও বেড়েছে। গত এক বছরে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু শ্রমিকদের জীবিকার অসহায়ত্ব সকলের সামনে দৃশ্যমান করে তুলেছে। এতদসত্ত্বেও মালিক ও সরকার শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করেনি। যার কারণে হাজার হাজার শ্রমিককে কর্মক্ষেত্রে অগ্নিদগ্ধ হয়ে, ভবন ধ্বসে ও মালিকের মুনাফার নির্মম শিকার অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই সামগ্রিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের শ্রমিক কর্মচারীদের সংগ্রামের সংস্থা শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সামনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব হলো প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সকল শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে দাবি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলা। তাই সকল শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের প্রতি মহান মে দিবসের আহ্বান, আসুন ঐক্যবদ্ধ হই এবং আওয়াজ তুলি-
১। ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবস বাস্তবায়ন কর। আউট সোর্সিং বন্ধ কর।
২। আইন করে জাতীয় ন্যূনতম মজুরী ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা কর এবং সেক্টরভিত্তিক মজুরী নির্ধারণ কর।
৩। প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং মালিকানা নির্বিশেষে ইপিজেড, ইসিজেডসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে।
৪। সকল শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুতে আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ, আহতের চিকিৎসা পুনর্বাসন এবং সকল ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বিমা ইআইএস চালু কর।
৫। ট্রেড ইউনিয়নকে দুর্বল করার ধারাসহ শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী সকল ধারা বাতিল করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রবর্তন কর।
৬। শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত কর।
৭। শ্রমিকদের রেশন, পেনশন ও আবাসনের দাবি সহ স্কপের ৯ দফা মেনে নাও।
ধন্যবাদসহ-
(স্বাক্ষর)
(এ.এস.এম. ফয়েজ হোসেন)
যুগ্ম সমন্বয়ক
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)
মোবাইল: ০১৭১৬-২১০০৩৪