20/09/2024
আত্মশুদ্ধির পথে যাত্রা... ১
হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াতেই মিশ্র অনুভূতি ঘিরে ধরলো নাবিহাকে। জীবনে অসংখ্যবার এই হাসপাতালে এসেছে সে, কখনো পাপার সাথে, কখনো আদিব্বার সাথে, কখনো বড়মামার সাথে, কখনো মার সাথে। হাসপাতালটাকে নাবিহার দ্বিতীয় ঘর বললেও ভুল হবে না। এখানে তার একটা ব্যক্তিগত ঘর আছে। খেলা করে, পড়াশোনা করে, ঘুমিয়ে যেখানে কেটেছে নাবিহার জীবনের অনেকটা সময়। তবে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছে পাপার জন্য অপেক্ষা করাতে। ছোটবেলায় তাকে ফাঁকি দিয়ে ডিউটিতে আসাটা পাপার জন্য বিশাল এক পরীক্ষা ছিলো। অধিকাংশ সময়ই পাপা সেই পরীক্ষাতে অনুত্তীর্ণ হতেন এবং তাকে কাঁধে চড়িয়ে হসপিটালে নিয়ে আসতেন। অতীত স্মৃতির স্মরণে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠার পাশাপাশি চোখে আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠলো নাবিহার। চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দু'জন মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করবো। যারা তার অস্তিত্বে আসার মূল কারণ। কিন্তু কোথাও পাপা মাকে দেখতে পেলো না নাবিহা। আজকের এই স্পেশাল দিনে তার পাশে পাপা, মা ও আদিব্বা থাকবেন না এমনটা নাবিহা কল্পনাও করতে পারছে না। আদিব্বা অবশ্য তার সাথেই ছিলো এতক্ষণ। বাড়ি থেকে আদিব্বার সাথেই এসেছে। তাকে হসপিটালের সামনে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্ক করতে গিয়েছেন আদিব্বা। কিন্তু পাপা, মা কোথায়? ভাবার পাশাপাশি নজর ঘুরিয়ে চারপাশে দেখছিলো নাবিহা। পেছন থেকে হাতের মাঝে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে খানিকটা চমকে উঠলেও মূহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে পেছন ঘুরে হাসি মুখে সালাম দিলো।
সালামের জবাব দেয়ার পাশাপাশি হাসির জবাব দিয়ে মিহির বলল, চমকে দেয়ার জন্য দুঃখিত। আমাকে আশা করছিলে না নিশ্চয়ই!
নাবিহা ভ্রু কুঁচকে বলল, এমনটা বলছো কেন?
মিহির হেসে বলল, মজা করে বলেছিলাম। কিন্তু দুর্বল জায়গায় স্পর্শ করলে কথা যতই মজার হোক মানুষ আনন্দ পাওয়ার চাইতে বিরক্ত অধিক হয়, এটা খেয়াল ছিলো না।
হাসি ফুটে উঠলো নাবিহার মুখে। বিয়ের পর থেকে মিহিরের একটাই এজেন্ডা, নাবিহার জীবনের সবচেয়ে স্পেশাল মানুষ হতে চায়। মিহির দাবী করে জীবনের যে কোন আনন্দে, যে কোন বেদনায় নাবিহা সর্বপ্রথম তাকে স্মরণ করবে। কিন্তু কারো জীবনের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়াটা কি এতই সহজ? অর্ডার অব রেসপন্সিবিলিটি অনুযায়ী হয়তো মিহিরের হক সবার প্রথমে। কিন্তু অর্ডার অব রিলেশনশিপে পাপা, মার আগে তো অন্য কারো হওয়ার কোন সুযোগই নেই। থাকলেও সেই হিসাব নাবিহার ঠিক বোধগম্য হয়না। নাবিহার জীবনের আনন্দ বেদনার কাব্যের প্রথম ধ্বনি তাই পা মা আ ভা অর্থাৎ পাপা, মা, আদিব্বা ও ভাই। আর সেই ধ্বনি পরিবর্তন করার মিশন হাতে নিয়েছে মিহির। নাবিহার জীবনের সবার চেয়ে প্রিয়, সর্বাপেক্ষা আপনজন হয়ে নাকি দেখাবেই। নাবিহাও দেখতে আগ্রহী মিহিরের উড়ে এসে জুড়ে বসার ক্ষমতা। পাপা, মা, আদিব্বা ও তার ভাইদের স্থান নেয়া এতটাও সহজ নয় যতটা মিস্টার মিহির ভাবছে। মেঘে মেঘে আকাশ করেছে ধূসর বর্ণ ধারণ, দেখা যাক কবে তুলতে পারে মিহির হৃদয়ে ভালোবাসার তুমুল বর্ষণ।
মিহিরের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে নাবিহা বলল, মা কখনোই মেডিকেলে পড়তে চায়নি। মা সবসময় স্বপ্ন দেখতো ছোট ছোট বাচ্চাদের টিচার হবার। এরপর মার স্বপ্ন কিভাবে বদলে গিয়েছিলে জানো? পাপার সাথে পত্রমিতালির অধ্যায়ে পাপা মার সাথে হাসপাতালের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন। সেসব পড়তে পড়তে মার মনেও জেগে উঠেছিলো মানুষের সেবা করার আকাঙ্ক্ষা। মার ভীষণ শখ ছিলো পাপার আন্ডারে ইন্টার্নশিপ করার। কিন্তু পাপা মার বিচ্ছেদের কারণে সবকিছু অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলো। হোয়াইট এপ্রোন আর গলার স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে পাপার সাথে কদমে কদম মিলিয়ে চলতে চেয়েছিলো মা। পাপার হাত ধরে পথ চলা সম্ভব হবে না বিধায় মা এই স্বপ্নটাকেই মন থেকে মুছে ফেলেছিলো। আমি যেদিন মার এই স্বপ্নের কথা জেনেছিলাম যেদিন স্বপ্নটাকে তুলে নিয়েছিলাম সযতনে নিজের করে। আলহামদুলিল্লাহ আজকে মার হয়ে আমার সেই স্বপ্নপূরণের দিন এসে গিয়েছে। পাপার আন্ডারে ইন্টার্নশিপ করবো, পাপাকে অ্যাসিস্ট করবো ভাবতেই সুখানন্দে ভরে উঠছে মন। আমি আমার এই সুখানন্দ মার সাথে শেয়ার করতে চাই। আমি তো ভেবেছিলাম হাসপাতালে ঢুকেই মাকে দেখতে পাবো। কিন্তু কোথায় গেলো আমার মা?
আমিও তো এমন একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। মিহিরের কথা শুনে নাবিহা বলল, কি স্বপ্ন?
মিহির বলল, আনন্দবাড়ির আকাশে সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র দম্পতি হওয়ার স্বপ্ন। যাদের ভালোবাসা জোছনার শিশির রূপে ঝরবে পরবর্তী প্রজন্মদের উপরে। তাদেরকে জানাবে, সখী ভালোবাসা কারে কয়।
কিসের মধ্যে কি, পান্তা ভাতে ঘি, বলে মিহিরের কথাতে উড়িয়ে দিয়ে নাবিহা হাঁটতে শুরু করলো পাপা, মার সন্ধানে। অর্ধাঙ্গিনীর গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মিহিরের বুকের ভেতর থেকে।
হাসপাতাল এরিয়াতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বিসর্জন দণ্ডনীয় অপরাধের মধ্যে সামিল হলেও হতে পারে। মন্তব্য শুনে ঘুরে তাকালো মিহির। নূহা হেসে বললেন, সুপ্রভাত জামাই বাবাজ্বি। আপনার অবস্থা দেখে মনেহচ্ছে আপনার বঁধুয়া আজকেও আপনাকে ছেড়ে প্যা প্যা করতে করতে তার পাপার কাছে ছুট লাগিয়েছে।
মিহির চেহারাতে করুণ ভাব ফুটিয়ে বলল, আজকে অবশ্য মার স্বপ্নের স্মরণে ম্যা ম্যা বেশি করছে।
হেসে ফেললো নূহা। মিহিরও হাসতে হাসতে বলল, ফুমা, তুমি কিন্তু বলেছিলে বৌকে বশ করতে সাহায্য করবে আমাকে। বলে দাও না কি করবো আমি। কি করলে আমার বৌ পা মা আ ভা সুর ভুলে শুধু মিহির মিহির করবে?
নূহা হেসে বলল, তোমার নাম মিহির আমরা কেন রেখেছিলাম? যাতে সূর্যের মতো আলো বিকিরণ করতে পারো। নামের হক আদায়ে সচেষ্ট হও। বৌয়ের জীবনের সূর্যরশ্নি হয়ে যাও। তোমার সংস্পর্শে জীবন হবে আলোকিত, তোমার ছহবতে মুছে যাবে মনের ক্ষত। শোনাবে আশায় গান, জুড়াবে অতৃপ্ত প্রাণ। খুলে অন্তর রাজ্যের দোর, হয়ে যাও সুহাসিনী ভোর।
মিহির হেসে বলল, ইনশাআল্লাহ হয়ে যাবো। কদমে কদমে তোমার দিক নির্দেশনা লাগবে ফুমা। এখন চলো তোমাকে উপহার স্বরূপ হাজির করবো আমার বৌয়ের সম্মুখে। খুশি হয়ে যাবে তোমাকে দেখে। অস্থির হয়ে আছে তোমার জন্য।
সেজন্যই পালিয়ে বেড়াচ্ছি তোমার বৌয়ের নজর থেকে। আমাকে দেখলেই নাবিহার মনের অস্থির অবস্থাতে পানি পড়ে যাবে। সেই পানি বেরিয়ে আসবে দুচোখ ছাপিয়ে অশ্রু রূপে। এত সুন্দর একটা দিনে কন্যার চোখে অশ্রু দেখতে চাইনা। স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ভরপুর উপভোগ করতে দেখতে চাই ওর পাপার সাথে। সেজন্য আমার দূরে থাকাটা এখন সময়ের দাবী। নূহা হাসি মুখে কথাগুলো বললেও মিহিরের বুকের ভেতরে চিনচিন করে উঠলো। হাত বাড়িয়ে ফুমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, তাহলে আমিও আজকে পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দে শরীক না হয়ে, দূর থেকে দাঁড়িয়ে আপনজনদের আনন্দিত দেখে আনন্দিত হওয়ার চেষ্টা করবো। আমিও আজকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে দেখি দূর থেকে প্রিয় প্রিয় মানুষদের সুখানন্দে ভাসতে দেখার প্রশান্তিকে। নাস্তা করেছো ফুমা?
উহু।
মিহির হেসে বলল, তাহলে চলো তোমাকে নাস্তা করাবো। পাঁচ মিনিটের মতো পথ হেঁটে গেলেই একটা টার্কিশ ক্যাফেটেরিয়া পাওয়া যাবে। গত সপ্তাহেই উদ্বোধন হয়েছে। এখনো ট্রাই করা হয়নি ওদের নাস্তা। যাবে?
নূহা হেসে বলল, হু, চলো।
দু'জন তখন ক্যাফেটেরিয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলো।