20/04/2025
অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ঘটনার সত্যতা দেরিতে স্পষ্ট হয়, তাই প্রাথমিকভাবে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। তবে সারাদিন বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি ছেলেটার মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত ঘটনা কী ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা বলছি।
কয়েক বছর আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার সময় নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে ট্রেনে উঠেছিলাম। সেখানে সাধারণত সিট পাওয়ার জন্য খুব হুড়োহুড়ি হয়। যাত্রীরা একসাথে ট্রেনে ওঠার সময় নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঢুকে পড়ে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে আমি একদিন দেখলাম, ট্রেনের দরজার দিকে অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি হচ্ছে। পরে দেখি, একটা মেয়ে একজন ছেলেকে নিজে থেকেই থাপ্পড় মারছে।
মেয়েটি ট্রেনের ভেতরে ঢুকে বলতে শুরু করল, ছেলেটি তাকে বাজেভাবে স্পর্শ করেছে, তাই সে তাকে মারেছে। এ ধরনের ঘটনার পর সাধারণত যারা অপরাধী, তারা ওই ভিকটিমের কাছাকাছি থাকতেই চায় না—এটা আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কিন্তু এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো, থাপ্পড় খাওয়ার পরেও ছেলেটা সেই একই বগিতে উঠে মেয়েটার কাছাকাছি একটা সিটে গিয়ে বসল। ছেলেটার চেহারাটা এতটা ইনোসেন্ট ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল না সে কোনো খারাপ কাজ করতে পারে। অবশ্য আমি ভুলও হতে পারি—কারণ অপরাধীদের মানসিকতা একেক রকম হয়। কিন্তু “gut feeling” বলে একটা জিনিস তো আছে, তাই না?
ঝামেলাটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হঠাৎ মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড এসে ছেলেটাকে মারধর শুরু করল। তবুও ছেলেটি কোনো প্রতিবাদ করল না। আমি শুধু বলেছিলাম যে ট্রেনে ওঠার সময় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেক সময় ঘটে যায়। বলার পেছনে কারণ ছিল—আমরা মেয়েরা সাধারণত খুব সহজেই বুঝতে পারি কে আমাদের ভালোভাবে ছুঁয়েছে আর কে খারাপ নিয়তে। আমরা সেটা বেশ স্পষ্টভাবে অনুভব করি। এরপর দেখি, সম্ভবত স্টেশনের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এসে ছেলেটাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে গেলেন। পরে তার কী হয়েছে জানি না, কারণ ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে। এরপর মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড তাকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিল।
আরেকটা ঘটনা দেখলাম এই ঈদের পরদিন। আমরা সন্ধ্যাবেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। জায়গাটা ঠিকঠাকভাবে আলো না থাকায় আলো-আঁধারির মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়। সেখানে যে একটা পুকুর আছে, পুকুরপাড়ে অনেকেই বসে ছিল। হঠাৎ একটা মহিলা চিৎকার করে উঠল—সে বলল, তার বাচ্চাকে একজন লোক জোর করে জড়িয়ে ধরে বলেছে, “তোমাকে আমার অনেক ভালো লাগে।” আশপাশে থাকা দুইজন তরুণ তখনই লোকটিকে মারতে শুরু করল এবং আরও দু’জন লোকটিকে ধাওয়া দিল।
এখানেও আমার প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই ধরনের অপরাধ যারা করে তারা কি সত্যিই এতটা সাহসী হয় যে জনসমাগমের মধ্যেও তারা বিকৃত রুচির পরিচয় দিতে পারে? যদি না তারা পেশাদার অপরাধী হয়। এই বিষয়ে আমি জানি না। যদি কেউ জেনে থাকেন, জানালে ভালো হয়—এই ধরনের অপরাধীরা কি জনসমাগম বা নির্জনতা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না?
কিন্তু এই যে সাধারণ একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি জনরোষের শিকার হয় বা কাউকে প্রাণ দিতে হয়—এটা কি আদৌ সমাজে কোনো ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করে?
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেউ আপনার গায়ে ধাক্কা দিতে পারে—এটা হতে পারে অনিচ্ছাকৃত। আবার, কেউ আপনার শিশুকে আদর করতে গিয়ে কাছে টেনেছে, কিন্তু আপনার মনে হলো তার নিয়ত ভালো না।
আমি বলছি না যে আপনি কোনো অপরিচিত লোকের হাতে আপনার বাচ্চাকে তুলে দিন। আপনি অবশ্যই সতর্ক থাকবেন। কিন্তু যখন আপনি নিজে আপনার বাচ্চার সঙ্গে আছেন, তখন আপনাকেই বুদ্ধিমানের মতো আচরণ করতে হবে।
আমরা যেন কোনো ঘটনায় আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়ে একজন নির্দোষ মানুষের জীবন কেড়ে না নিই। বিচার যেন হয় প্রমাণের ভিত্তিতে, মবের রাগের ভিত্তিতে নয়। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন বিচারবুদ্ধি, সংযম, এবং মানবিকতা।