23/01/2026
'শারমিন একাডেমি'তে নির্যাতিত শিশুটির বাবা-মায়ের সাক্ষাৎকারটি দেখলাম। ফাইনালি শিশু সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পবিত্র কুমার বড়ুয়া। আপডেট: পবিত্র কুমার গ্রেফতার হয়েছেন।
গতকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিলো -
শুধুমাত্র শিক্ষক-শিক্ষিকা মৌখিকভাবে ক্ষমা চেয়েই হয়তো পার পেয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। শুধুমাত্র ক্ষমা চেয়ে মাফ পাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আর নেই। ভুল আর ক্রাইম এক না। ভুল ক্ষমা করা যায়। ক্রাইম নয়।
শিশুটি বাসায় ফিরলে তাকে ট্রমাটাইজ অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। প্রচুর কান্নাকাটি। কানে ব্যথা। শিশুটি ঘুমাতে পারে না। ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ বন্ধ করলেই ঘুরে ফিরে অফিস রুমের নির্যাতনের ঘটনা ওর চোখে ভেসে উঠে।
নানাকে অভিযোগ করে বলে, 'বাবা ভালো না। মা ভালো না। আমাকে আবার স্কুলে দিবে। স্কুলে দিলে ম্যাম মারে। প্যানিক হয়ে এসব বলতে থাকে। উনারা ডাক্তার দেখানোর পর কানে ব্যথা কমানোর মেডিসিন দিয়েছেন।
শিশুটিকে নির্যাতনের সময় তাকে বাবা মাকে জানাতে নিষেধ করেছিলো। কিন্তু সে বারবার বলেছে, বাবাকে বলে দিবো। নানাকে বলে দিবো।
শিশুটি কাউকে বললে 'গলায় পাড়া দিয়ে ছিঁড়ে ফেলার হুমকিও দিয়েছে।' বলে শিশুটি বাবা মাকে জানায়।
এরপর উনারা ব্যাপারটা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্কুল কর্তৃপক্ষ- শিশুটি এবনরমাল, জ্বীনে ধরা, মানসিকভাবে অসুস্থ প্রমাণের চেষ্টা করেন।
অথচ শিশুটি মৌখিক পরীক্ষা দিয়েই এই মাসেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো। একটি শিশুর জীবনের প্রথম স্কুল। শারীরিকভাবে নির্যাতন। থানা পুলিশ। কী ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা।
কত বড় ক্রিমিনাল মাইন্ডের হলে নিজেদের দোষ ঢাকতে শিশুটিকে পাগল বানানোর চেষ্টা করে কেউ?
সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার পর তো ঠিকই প্রমাণিত হয় শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে গতকাল সেই ফুটেজ ভাইরাল হলে আমরা সবাই টের পাই।
ভিডিও ভাইরালের পর থেকে শিশুটির বাবা মাকে মামলা না করার জন্য নানান ধরণের হুমকি ধামকি প্রদান করে অভিযুক্তরা।
অপরাধ করার পর ক্ষমা না চেয়ে - হুমকি ধামকি দিলে কী আর ঐ ঘটনা মৌখিক ক্ষমায় সীমাবদ্ধ থাকে? দৃষ্টান্ত শাস্তি না দিয়েই?
২৫ বছর আগে -
অধ্যক্ষ শারমিন তখন ছিলেন গৃহবধূ। নিজের ৭ ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে শিক্ষার আলো ছড়াতে নয়া পল্টনে শারমিন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। এমনই টিভি নিউজে ২৫ বছর পূর্তিতে বলা হয়েছিলো। উনার মেধা এবং চেষ্টার কারণে অবশ্যই উনাকে সফল বলা যায়। কিন্তু সিসিটিভির সাথে টিভি নিউজ মিলে না। উনাকে বরং অত্যন্ত আনপ্রফেশনাল লাগলো।
কমেন্ট থেকে জানতে পারলাম - উনার প্রথম স্বামী ২০২০ সালে মারা গিয়েছেন। পূর্বের স্বামীসহ স্কুল চালাতেন। আবার সিসি ফুটেজের শিশুকে আঘাত করা ঐ ব্যক্তি নাকি উনার দ্বিতীয় স্বামী, স্বামীর নাম নাকি পবিত্র কুমার বড়ুয়া।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে - ম্যাডামের চেয়েও উনার স্বামী অত্যন্ত ডেস্পারেট হয়েই শিশুটিকে যত নোংরাভাবে নির্যাতন করা যায়। উনি করেছেন।
একজন শিক্ষিকার ২৫ বছরের সব প্রচেষ্টা একটি ঘটনায় ধূলিসাৎ হয়ে গেলো শুধুমাত্র উনার এবং রঞ্জন বড়ুয়ার অমানবিক আচরণ, নোংরামির জন্য।
শুধু অমানবিক আচরণ করেও থামেনি। শিশুটির বাবা মাকে পর্যন্ত হুমকি ধামকি দিয়েছেন মামলা না করার জন্য। শিশুটির পরিবারের নিরাপত্তা ও দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তি প্রয়োজন।
গত পোস্টে গুটি কয়েকজন মানুষ এই শিশুটির উপর হওয়া নির্যাতনটিকে উচিত কাজ হয়েছে বলে কমেন্ট করেছেন। তাদের মতে শিশুটি বেয়াদব। তাই মেরে শাসনের প্রয়োজন রয়েছে।
এসব কমেন্ট করা অধিকাংশের কোন বেবি নেই। আর যাদের বেবি রয়েছে কিন্তু তাদের বেবি এরকম সিচুয়েশনে পড়েনি বলে এরকম শারীরিক নির্যাতনকে সাপোর্ট করে যাচ্ছে। নিজেদের শিশু হলে এমন বলতে পারতো না।
আমাদের দেশে ADHD কী কতজন বাবা মা জানে? শিক্ষক তো দূরের কথা। ADHD শিশুরা জেদি, চঞ্চল, তেমনিই মেধাবী হয়। সেটা কীসের জন্য হয়? কেন হয়! কীভাবে এদেরকে হ্যান্ডেল করতে হয়। এই সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই কম।
আমরা শুধু শিখেছি বেয়াদব, ত্যাঁদড় ট্যাগ দিয়ে শিশুকে মারধোর করা জাস্টিফাই করতে।
অথচ শুধু ADHD কেন! নরমাল বেবিদেরকেও মারধোর করে কখনও ভদ্র করা যায় না। এসব মারধোর ওদের ছোট্ট মনে আজীবনের জন্য ট্রমা হিসেবে কাজ করে। সুষ্ঠু বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, যতক্ষণ না শিশুটিকে মারধোর করা হয়েছে। ততক্ষণ সে চুপ ছিলো। থুতু দেয়নি। যেখানে বড়রাই আঘাত করলে ডিফেন্সিভ মোডে চলে যায়। সেখানে একটি অবুঝ শিশু ডিফেন্সিভ মোডে কেন যাবে না?
আবারও বলি -
একটি ছোট্ট শিশু যত জেদি, ত্যাঁদড়, বেয়াদব হোক না কেন! ক্লাসের অন্যান্য শিশুকে উত্যক্ত/বিরক্ত, ক্লাসরুমের পরিবেশ নষ্ট করুক না কেন! শিক্ষকের কাজ তাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে কথা বলা। যদি শিশুটি তাও না শুনে। তাদের যদি নিজেদেরকে ব্যর্থ মনে হয়, কোনভাবে সামলানো সম্ভব মনে না হয়।
তাহলে শিশুটিকে টিসি দিয়ে বের করে দিবে। কিন্তু সামলাতে পারছেনা দেখে, মেজাজ হারিয়ে কোনভাবেই শিক্ষক দ্বারা শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শাস্তি দেওয়া জায়েজ হয়ে যায় না। এটা ক্রিমিনাল অফেন্স।
সেই অফেন্স করে বসেছেন শারমীন একাডেমির কর্ণধার অধ্যক্ষ শারমিন ও উনার স্বামী।
উক্ত স্কুল আজকে বন্ধ ছিলো এবং পরবর্তীতে নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে বলেছে কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত অমানবিক এই শিক্ষক দম্পতীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কামনা করছি।