04/05/2026
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আধুনিক রূপ: পার্সেল রিসিভ না করার শরঈ পর্যালোচনা
বর্তমান যুগে অনলাইন ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের
জীবনে সহজতা এনে দিয়েছে। ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় জিনিস অর্ডার করা যায়, সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সহজ ব্যবস্থার অপব্যবহারও ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। অনেকেই পণ্য অর্ডার করে, কুরিয়ার পৌঁছার পর তা গ্রহণ না করে বাতিল করে দেয়। কেউ কেউ বিনোদন বা খামখেয়ালিপনায় বারবার এমন কাজ করে। ফলে ব্যবসায়ী, প্রকাশনী ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই আচরণ কতটুকু গ্রহণযোগ্য—তা বিশ্লেষণ করা সময়ের দাবি।
(ফাতাওয়া আলমগীরি ৩/৫৮, ৩/৬৬, রাশেদিয়া সংস্করণ, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নং 144308100029)
খিয়ারে রুইয়াত ও খিয়ারে আইব: কুরিয়ার খরচ কার?
যদি ক্রেতা পণ্য গ্রহণের পর তাতে কোনো ত্রুটি বা সমস্যা (আইব) দেখতে পায়, অথবা পণ্যটি ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর পর প্রদর্শিত বিবরণ বা প্রত্যাশিত মানের সাথে মিল না খায়, তবে ক্রেতার সম্পূর্ণ পণ্য ফেরত দেওয়ার অধিকার থাকবে।
এই ক্ষেত্রে—পণ্য ফেরত দেওয়া, আনা-নেওয়া বা পরিবহন সংক্রান্ত খরচ বা কুরিয়ার চার্জ ক্রেতাকেই বহন করতে হবে।
ফাতাওয়া শামীতে এসেছে—
«ومؤنة رد المبيع بعيب أو بخيار شرط أو رؤية على المشتري».(كتاب البيوع، باب خيار الرؤية: 7/148، رشيدية)
খিয়ারে রুইয়াত, খিয়ারে শর্ত বা খিয়ারে আইব—এসব কারণে পণ্য ফেরত দেওয়ার ব্যয় ক্রেতার উপর বর্তাবে। ফাতাওয়া শামী ৭/১৪৮, রাশেদিয়া সংস্করণ। জামিয়া ফারুকিয়া করাচী, পাকিস্তান, ফাতাওয়া নং : 170/36،38
বাইয়ে ইক্বালা প্রসঙ্গ
ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর অনেক সময়ই চুক্তি ভঙ্গ করে দিতে হয়। দেখা যায় যে জিনিসটা আমি কিনেছি এটা এখন আমার আর তেমন দরকার নেই। অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে টাকাটা বেশি দরকার। একই অবস্থা বিক্রেতারও হতে পারে। তিনি যে জিনিসটি বিক্রি করেছেন সেটা হয়তো তার অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
বিধান হলো ইজাব-কবুল বা প্রস্তাব ও গ্রহণ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর আর কোনো এক পক্ষের জন্য এককভাবে সেই চুক্তি ভঙ্গ করে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে এক্ষেত্রে উভয়ে মিলে সন্তুষ্টিক্রমে চুক্তিটি ভঙ্গ করে ফেলতে পারে। পরিভাষায় এ ধরনের কাজকে বলে ইক্বালা। ইক্বালার শাব্দিক অর্থ, তুলে নেওয়া, উঠিয়ে নেওয়া ও রহিত করা। বিক্রয়চুক্তি উঠিয়ে নেওয়া বা রহিত করে দেওয়াকে বলা হয় ইক্বালা।
হাদিসে এসেছে—বিক্রয় সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পর কোনো এক পক্ষ যদি চুক্তি ভঙ্গ করার আবেদন করে আর অপর পক্ষ তার সেই মুসলিম ভাইয়ের আবেদনে সাড়া দেয় তাহলে আল্লাহ তায়ালা সাড়াদানকারীর সব গুনাহ মাফ করে দেন। সুনানে আবু দাউদ ৩৪৬০, আল হিদায়া ৪/১০১ (মাকতাবাতুল ফাতাহ)
এক্ষেত্রে কুরিয়ার চার্জ কে বহন করবে?
যদি বিক্রেতা ও ক্রেতা পরস্পরের মধ্যে বাইয়ে ইক্বালা অনুযায়ী পণ্য ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পণ্য ফেরতের খরচ বিক্রেতার উপরই বর্তাবে। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রে ক্রেতাকে কোনো পরিবহন বা কুরিয়ার চার্জ বহন করতে হবে না।
ফাতাওয়া শামীতে এসেছে:
وفيها مؤنة الرد على البائع مطلقاً) لأنه عاد إلى ملكه فمؤنة رده عليه . قال القاضي بديع الدين سواء تقايلا بحضرة المبيع أو بغيبته اهـ منح. وهذا معنى قوله : مطلقاً
অর্থাৎ বাইয়ে ইক্বালার কারণে পণ্য ফেরত দেওয়ার ব্যয় বিক্রেতার উপর বর্তাবে। ফাতাওয়া শামী ৭/৩৪৫।
বর্তমানে অনলাইন শপগুলোর সাথে যা ঘটছে
বর্তমানে অনেকেই পণ্য অর্ডার করে, কুরিয়ার পৌঁছার পর তা গ্রহণ না করে বাতিল করে দেয়। পণ্য রিসিভ করে না। কেউ কেউ বিনোদন বা খামখেয়ালিপনায় বারবার এমন কাজ করে।
খিয়ারে রুইয়াত, খিয়ারে আইব বা বাইয়ে ইক্বালার ভিত্তিতে এসব করলেও তো একটা কথা ছিল। যদিও প্রথম দুই প্রকারের ক্ষেত্রে ক্রেতাকেই কুরিয়ার চার্জ বহন করতে হবে।
অনেক গ্রাহকের এসব অনৈতিক কাজের ফলে ব্যবসায়ী, প্রকাশনী ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে গ্রাহকরা কুরিয়ার চার্জ বহন করবে তো দূরের কথা, ফোন করে মাফ চাওয়ারও প্রয়োজন অনুভব করে না। এটি শরঈ ও সামাজিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই মারাত্মক পর্যায়ের গোনাহের শামিল। এছাড়া এটি বান্দার হকের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট।
ক. প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার রক্ষার গুরুত্ব
ইসলামে প্রতিশ্রুতি (وعد) ও চুক্তি (عقد) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَوۡفُوۡا بِالۡعُقُوۡدِ
“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।” (সূরা মায়িদা: ১)
অন্যত্র বলা হয়েছে—“তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরা ইসরাঈল: ৩৪)
অতএব, কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করা একজন মুমিনের শোভা পায় না।
খ. অনলাইন শপে অর্ডার দেওয়া মূলত একটি প্রকারের ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) বা অনেক ক্ষেত্রে বিক্রয় চুক্তির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে যখন বিক্রেতা ক্রেতার অর্ডারের ভিত্তিতে পণ্য প্রস্তুত করে, প্যাকেজিং করে এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠায়—তখন তা কার্যত একটি লেনদেনের দিকে অগ্রসর হয়।
ইসলামী আইন শাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালার গ্রন্থে বলা হয়েছে—
“المعروف عرفاً كالمشروط شرطاً”
অর্থাৎ, প্রচলিত রীতিই শর্ত হিসেবে গণ্য। আল কাওয়ায়িদুল ফিকহিয়্যাহ ৭/৭, মুহাম্মাদ হাসান আব্দুল গাফফার।
বর্তমানে প্রচলিত রীতি হলো—অর্ডার দিলে তা গ্রহণ করার দায় থাকে, যদি না পূর্বেই বাতিল করা হয়। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে পার্সেল না নেওয়া এই প্রচলিত শর্তের লঙ্ঘন।
গ. নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও যাবে না
উবাদা ইবনুস সামিত রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে,
“لا ضرر ولا ضرار”
‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও যাবে না।’ সুনানে ইবনে মাজা ২৩৪০, বায়হাকী ১১৯৯৯, দারাকুতনী ২৩৪৫।
পার্সেল রিসিভ না করার ফলে—
▪️বিক্রেতার কুরিয়ার খরচ নষ্ট হয়।
▪️অনেক ক্ষেত্রে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা নষ্ট হয়।
▪️ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়।
অতএব, এটি সরাসরি অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার শামিল, যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
ঘ. আমানতদারিতা ও মুসলিম চরিত্র
একজন মুসলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—আমানতদারিতা ও দায়িত্বশীলতা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি... যখন সে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ভঙ্গ করে।” (সহীহ বুখারী ৩৩)
অতএব, অর্ডার দিয়ে তা গ্রহণ না করা—বিশেষত ইচ্ছাকৃতভাবে—মুনাফিকসুলভ আচরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সারকথা হচ্ছে—
উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায়—অপ্রয়োজনে বা খামখেয়ালিপনায় অর্ডার করা নিন্দনীয়। অর্ডার দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য গ্রহণ না করা গুনাহের কাজ। কুরিয়ার চার্জ না দিয়ে বান্দার হক লঙ্ঘন করা শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর অপরাধ, যা পরকালে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। যদিও দুনিয়াতে পরিশোধ না করেন।
আবূ হুরাইরা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত, একদা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিঃস্ব ব্যক্তি সেই, যে কিয়ামতে নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে কিন্তু অন্যের উপর অন্যায় করেছে—গালি দিয়েছে, মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, মাল আত্মসাৎ করেছে বা ক্ষতি করেছে, খুন করেছে। সে তখন প্রতিশোধ স্বরূপ নিজের নেকী সেই সকল ব্যক্তিদেরকে দান করবে।
যখন তার নেকী শেষ হয়ে যাবে অথচ প্রতিশোধ শেষ হবে না, তখন অবশিষ্ট গুনাহ তার ঘাড়ে চাপানো হবে এবং সর্বশেষে তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে।”
(মুসলিম ৬৭৪৪, আহমাদ ৮০২৯, তিরমিযী ২৪১৮, ইবনে হিব্বান ৪৪১১, বাইহাকী ১১৮৩৮, সিলসিলাহ সহীহাহ ৮৪৭)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়—কেবল নিজস্ব নেকী ও ইবাদত যথেষ্ট নয়, বান্দার হক রক্ষা করাও সমান জরুরি।
অতএব, আমাদের মনে রাখতে হবে—
ইসলাম শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং লেনদেনেও সততা অপরিহার্য।অনলাইন কেনাবেচাতেও তাকওয়া ও জবাবদিহিতা রয়েছে। ছোট একটি “অর্ডার”ও কিয়ামতের দিন প্রশ্নের কারণ হতে পারে।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায়
না। অনেক ক্ষেত্রে কুরিয়ার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাইডারদের অসৌজন্যমূলক আচরণ সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে। কখনো রাইডারের রূঢ় ব্যবহার, অসহযোগিতা বা সময়ানুবর্তিতার অভাব ক্রেতাকে এমনভাবে বিরক্ত করে যে, সে পার্সেল গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এর ফলে নির্দোষ ব্যবসায়ী বা প্রকাশককে আর্থিক ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয়। তাই ব্যবসায়ী ও প্রকাশকদের উচিত এই বিষয়েও সতর্ক থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাওফিক দান করুন। আমীন।
= কপি পোস্ট =