30/06/2025
মতি মিয়ার ভুল
#পর্ব_০১
লেখক_শান্ত
কবিরাজ সাহেবের বলার পর থেকে মতি মিয়া আর রাতে বাহিরে থাকে না। যত কাজই থাকুক সেটা সন্ধ্যোর আগেই শেষ করে বাড়িতে চলে আসে। কারণ তার বিশ্বাস কবিরাজ সাহেব যা বলেছেন সেটা সত্য,ওটা একটা জিনই ছিল।
এই কয়েকটা গ্রামের মধ্যে একমাত্র তিনিই এই বিষয়গুলোতে ভালোভাবে সমাধাণ দিতে পারেন। যদিও কবিরাজ সাহেব আগে গাছ-গাছালি দিয়ে ঔষুধই বানিয়ে দিতেন শুধু,তবে পরবর্তিতে তিনি এই বিষয়গুলোতেও কাজ শুরু করেন। যার জন্য তার কাছেই সকলে যায় এই বিষয়গুলো নিয়ে।
দেখতে দেখতে প্রায় ১মাস চলে গেল। সবকিছু ঠিকই চলছিলো। কিন্তু খুব দরকারি একটা কাজে মতি মিয়াকে চট্রগ্রাম যেতে হলো।
সেখানে ৩দিন থেকে কাজ সেরে সে বাড়ির দিকে রওনা দিল। ফিরতে ফিরতে আজও বেশ রাত হয়ে গেছে। বাস থেকে নেমে
অনেকক্ষণ রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে থেকেও কোনো ভ্যান বা অন্য কোনো গাড়ি পাওয়া গেল না। অগত্যা হেঁটেই রওনা দিল বাড়ির দিকে মতি মিয়া। এখান থেকে তার বাড়ি বেশ কিছুটা দূরেই।সামনে একটা গোরস্থানও পড়বে পথের ধারে। প্রথমে কিছু বাড়ি-ঘর ছিল কিন্তু এখন দু পাশে শুধু ধানক্ষেত ছাড়া আর কিছুই নেই। হাঁটতে হাঁটতে সে গোরস্হান এর সামনে চলে এলো। এখানে এসেই মতি মিয়ার কেমন যেন একটা অস্থস্থিভাব হতে লাগলো।
কবরস্থানের ভেতরে তাকানোর সাহস হলো না তার। দ্রুত পায়ে কবরস্থানটা পার হয়ে চলে এলো।
এমন সময় হঠাৎ মতি মিয়ার মনে হলো কেউ তার পেছনে দাড়িয়ে আছে। ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকাতেই সে একদম অবাক হয়ে গেল,কারণ পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কবিরাজ সাহেব।
কিন্তু কবিরাজ সাহেবের একি হয়েছে! কাপুড়-চোপড়ে রক্ত লেগে আছে।
মতি মিয়ার দিকে কেমন যেন রাগিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।
মতি মিয়া অবাক চোখে একমুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে তোতলাতে তোতলাতে বললো,
"কবিরাজ সাব আ..আপনি?"
"তোকে না নিষেধ করেছি রাতের বেলা বাহিরে না থাকতে? তুই আমার কথা কেন অমান্য করেছিস? জানিস এর ফল কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে?"
মতি মিয়া এবার ভয়ার্ত আর কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
"আমারে মাফ কইরা দেন কবিরাজ সাব আমার খুব বড় ভুল হইয়া গেছে। একখান কাজে গ্যারামের বাইরে যাইতে অইছিল"
"ঠিক আছে এবারের মতো তোকে মাফ করে দিলাম। এখন যা এখান থেকে"
মতি মিয়া হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লো। তারপরে বললো,
"একখান কতা জিগাইতাম কবিরাজ সাব যদি অনুমতি দিতেন তো"
"কি কথা বল?"
"এত রাইত আপনে এহানে কি করতাছেন? আর আপনার শইলত রক্ত আইল ক্যামনে?"
মতি মিয়ার প্রশ্ন শুনে কবিরাজ সাহেব যেন বেজায় ক্ষেপে গেলেন। ওর দিকে রাগিচোখে তাকালেন। মতি মিয়া কবিরাজ সাহেবের এমন চেহারা দেখে একদম ভয় পেয়ে গেল। সে আর একমুহূর্ত সেখানে না দাড়িয়ে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো।
আর একটু হেঁটে আসবার পরেই দেখে কয়েকজন লোক দল বেঁধে এদিকেই আসছে। এত রাতে একসাথে এত লোকজনকে দেখে মতি মিয়া বেশ অবাকই হলো। কারণ এখানে রাতে খুব একটা জরুরী প্রয়োজন ব্যতিত লোকজন বাহিরে থাকে না।
লোকগুলো কাছে আসতেই মতি মিয়া তাদের উদ্দেশ্যে বললো,
"মিয়ারা কোনহানে যাইতাছো এত রাইত দল বাইন্দা?"
তাদের ভেতর থেকে একজন বললো,
"কেন তুমি জানো না? পাশের গ্রামের কবিরাজ চাচায় খুন অইছে"
মতি মিয়া লোকটির কথা শুনে যেন একটা বড়সর রকমের শক খেলেন। এটা কিভাবে হতে পারে!
কবিরাজ সাব তো ঔখানে...!মতি মিয়া সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলেন সেখানেই। তিনি যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে কবিরাজ সাহেবকে কেউ খুন করে দিয়েছে। এটা কিভাবে হতে পারে?
মতি মিয়ার ভুল
#পর্ব_০১
লেখক_শান্ত
চলবে.............
(গল্পটা হরর হবে ধীরে ধীরে)
মতি মিয়ার ভুল
#পর্ব_২_ও_৩
লেখক_শান্ত
কবিরাজ সাহেবকে খুব নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। তার মাথাটা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল মাটিতে।
আর তার পাশেই পড়েছিল কবিরাজ সাহেবের নিথর দেহটা।
মতি মিয়া বাড়িতে ফিরেই দরজা আটকে দেয়। আতংকগ্রস্থ অবস্থায় বিছানাতে বসে পড়ে। মতি মিয়ার স্ত্রী তার পাশে বসে বলে,
"কি হইছে তোমার? তোমারে অমন দেখাইতাছে কেন?"
মতি মিয়া কিছু বলছে না। সে বসে থেকেই একনাগারে ঘেমে চলেছে। তাকে বাতাস করতে করতে আবারও তার স্ত্রী বললো,
"আমারে কও কি হইছে তোমার?"
মতি মিয়া এবার গামছা দিয়ে গলা মুছতে মুছতে আমতা আমতা করে বলে,
"কোই না কিছু না,তুমি কালগাই পোলারে নিয়া বাপের বাড়ি চইলা যাইবা"
মতি মিয়ার কথা শুনে তার স্ত্রী বাতাস করা বন্ধ করে বললো,
"এক সপ্তাহ আগেইতো আইলাম আবার যামু ক্যান?"
"তোমারে যেইটা কইছি সেইটাই করো,এইহানে তোমগো থাহাডা ঠিক হইবো না বিপদ অইতে পারে"
"কেন কিসের বিপদ?"
"তোমারে অত কিছু বুজানো যাইবো না তুমি কাল বাপের বাড়িত যাইবা"
পরদিন সকালেতেই মতি মিয়ার স্ত্রী তার ছেলে সাহেদকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি চলে যায়।
এদিকে মতি মিয়া একা একা ঘরে বসে ভাবতে থাকে কাল রাতের সেই কথাগুলো।
কবিরাজ সাহেবরে কেউ খুন করছে আগেই তাহলে উনি কবরস্থান থেকে এসে তার সাথে কথা বললো কিভাবে?
আর কে খুন করলো কবিরাজ সাহেবকে? আর কেনই বা খুন করলো?
কবিরাজ সাহেব অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ ছিলেন।
কখনো কারো উপকার ছাড়া ক্ষতি করতে শোনা যায়নি,এমন লোককে এমন নিষ্ঠুরভাবে কে খুন করলো?
মতি মিয়া আর কিছু যেন ভাবতে পারছে না।
সারাটা দিন তার এসব ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল। মতি মিয়া যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন অন্য কোনো এক জগতে।
সন্ধ্যো হতেই ঘরের দরজা,জানালা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় এসে বসলেন।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হতে লাগলো। চারিদিক আজ একদমই শুনশান নিরব। গ্রামে রাত হতেই সব নিরব হয়ে যায় তবে কেন জানি আজকে একটা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকও শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না।
মনে হচ্ছে যেন কোনো এক মৃতপুরীতে বসে রয়েছে মতি মিয়া একলা। আর তার পাশে শুয়ে রয়েছে শত শত মৃতদেহ,যার একটা কবিরাজ সাহেবের।
কথাগুলো ভাবছে এমন সময় হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। এই সময় এত রাতে কে এলো? মতি মিয়া আওয়াজ করে বললেন,
"কেডা কেডায় দরজায়?"
বাহির থেকে আওয়াজ এলো,
"আমি আবুল এইদিক দিয়াই যাইতাছিলাম তাই ভাবলাম একখান বিড়ি লইয়া যাই তোমার থাইকা"
মতি মিয়া উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। বাহিরে আবুলই দাড়িয়ে আছে। মতি মিয়া আবুলকে বললেন,
"বাইরে কেন ভিতরে আইসা বসো"
"না না এহন আর বসমু না একখান বিড়ি থাকলে দাও"
"দারাও আনতাছি"
মতি মিয়া আবার ঘরে চলে এলো। বিড়ির প্যাকেটটা কোথায় রেখেছে সেটা খুজে পাচ্ছে না। আগে অনেক খেত সাহেদ হওয়ার পর থেকে এসব খাওয়া ছেড়ে দিছে।
যদিও একবারে ছাড়তে পারেনি মাঝে মধ্যে দু একটা খায়।
মতি মিয়া বিড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে দরজার সামনে এসে দেখে আবুল নেই।
এতক্ষণতো এখানেই দাড়িয়ে ছিল হঠাৎ বিড়ি না নিয়েই কোই গেল!
মনে মনে কথাগুলো বললো মতি মিয়া। আবুল চলে গেছে ভেবে দরজা আটকাতে গিয়েই হঠাৎ মতি মিয়া চোখ গেল নিচের দিকে।
"আরে এইডা কি?রক্তের লাহান লাগতাছে!"
নিজে নিজেই কথাটা বলেই নিচু হয়ে দেখতেই মতি মিয়া একদম চঁমকে উঠে,কারণ সেখানে পড়ে আছে কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত। মতি মিয়া দরজা খুলে বাহিরে আসে। বাহিরেও রক্তের ছাপ দেখা যাচ্ছে অথচ আবুল কোথাও নেই। এতটুকুন সময়ের মধ্যে হঠাৎ এখানে কি হয়েছে এমন?
#পর্ব_০৩
রক্তের ফোঁটা অনুশরণ করে মতি মিয়া সেদিকেই যেতে লাগলো।
হারিকেনের মৃদু আলোতে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে রক্তের ফোঁটাগুলো। কিন্তু মনেতো হচ্ছে এটা সামনের বাঁশঝাড়টার দিকে গিয়েছে।
মতি মিয়া ধীরে ধীরে বাঁশঝাড়টার দিকেই যেতে লাগলো।
তার কেমন যেন একটা অস্থস্থিভাব হচ্ছে এখানে এসে।
বাঁশঝাড়টার কাছে আসতেই মতি মিয়া একদম হতভম্ব হয়ে যায়। সে যেন নিজের চোখকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ তার সামনে পড়ে রয়েছে একটা মহিলার লাশ।
কিন্তু লাশটা উল্টোভাবে পড়ে থাকার কারণে মতি মিয়া এখনো লাশটার চেহারাটা দেখতে পায়নি।
ভয়ে ভয়ে লাশটার কাছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে লাশটাকে ধরে চিৎ করে শোয়াতেই, মতি মিয়া একদম আঁতকে উঠে।
কারণ তার সামনে পড়ে আছে আবুলের স্ত্রী সখিনার লাশ। গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। রক্তে মেখে যাচ্ছে চারিপাশ।
"খুন খুন"
বলে চিৎকার করতে থাকে মতি মিয়া।
তার চিৎকারের আওয়াজ শুনে আশেপাশের লোকজন বেড়িয়ে আসে। তারাও এসে লাশটা দেখে একটা বড়সর রকমের শক খায়।
এদিকে মতি মিয়া চিৎকার করে একনাগারে বলে যেতে থাকে,
"আবুল খুন করছে,আবুল খুন করছে হের বৌরে।"
লোকজন লাশ দেখে যতটা না চঁমকে উঠেছে তার থেকেও বেশি চঁমকে উঠেছে মতি মিয়ার মুখে এই কথাটা শুনে।
মতি মিয়াকে কেউ থামাতে পারছে না, একনাগারে এই কথাটাই বলে চলেছে।
গ্রামের দু-তিনজন এসে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অন্য একটা জায়গায় বসায়।
তারপরে তাদের ভেতরে থেকে মজিদ মতি মিয়ার পাশে বসে বলে,
"আবুল হের বৌরে মারছে মানে কি মতি?"
মতি মিয়ার ভয়ে চোখগুলো যেন বের হয়ে আসতে চাইছে।
একনাগারে তার শরীর ঘেমেই চলেছে। হাত দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মতি মিয়া বলে,
"পা...পানি আমারে একটু পা...পানি দেও"
একজন দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে।
মতি মিয়া এক ঢোকে গ্লাসের সমস্ত পানি খেয়ে নেয়। তারপরে বলতে শুরু করে,
"একটু আগে আবুল আমার বাইত্তে আইছিলো বিড়ি নেওনের লাইগা"
"তারপরে?"
"আমি বিড়ি নিয়া আইসা দেহি হেয় নাই,দরজা লাগাইতে গিয়া নিচে তাকাইয়া দেখি রক্ত পইরা রইছে। অহন আমি বুঝবার পারতাছি আবুল হের বউরে খুন কইরা আমার বাইত্তে আইছিলো"
ওখানকার সবাই মতি মিয়ার কথা শুনে একে অন্যর দিকে তাকাচ্ছে।
মজিদ আবারও বললো,
"মতি তুমি কি এইডা সত্য বলতাছো?"
"আমি মিথ্যা ক্যান কইতে যামু? বিশ্বাস করো আমারে মতি নিজেই হের বৌরে মারছে"
লোকজন সব বলাবলি করতে লাগলো, এমন লাশ দেখে মতি মিয়ার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে এজন্য এসব বলছে।
মতি মিয়া এবার চিৎকার করে উঠে বললো,
"তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করতাছো না কেন? আবুলই হের বৌরে মারছে"
মজিদ এবার বললো,
"মতি তুমি কইতাছো আবুল তোমার বাইত্তে আহে একটু আগে হের বৌরে খুন কইরা তাই তো?"
মতি মিয়া হ্যাসূচক মাথা নাড়লো
মজিদ আবারও বললো,
"আবুল তোমার বাইত্তে একটু আগে আইতে পারে ক্যামনে? আবুল গত বছর না গলায় দড়ি দিয়া মরলো"
মজিদের কথা শুনে মতি মিয়া একদম স্তব্ধ হয়ে গেল যেন। আরে হ্যা তাইতো আবুলতো গতবছর মারা গেছে গলায় দিয়ে দিয়ে।
এটা কিভাবে হতে পারে? একটু আগে যে এসেছিলো সেটা তাহলে কে ছিলো? আর হাসেমের বৌকে এত নিষ্ঠুরভাবে খুন করলো কেন?
চলবে.........
মতি মিয়ার ভুল
লেখক_শান্ত
#পর্ব_৪_৫_শেষ_পার্ট
পর পর দুটো খুন হয়েছে এই শান্তিপূর্ণ গ্রামটাতে। বিষয়টা মোটেও সহজ কিছু নয়।
মতি মিয়া সেই রাতের ঘটনার পর থেকেই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। কারো সঙ্গে ভালো মতো একদমই কথা বলছে না। সে শুধু ভেবে চলেছে কি হচ্ছে এইগ্রামে এসব? কে করছে? কেনই বা করছে?
গ্রামের লোকজনের ভেতরেও চরম একটা আতংক বিরাজ করছে, দুই দুটো খুন হবার পর থেকেই।
তারা এখন রাতে বাহিরে বের হবারও সাহস পাচ্ছে না। সন্ধ্যোর আগেই সকল কাজকর্ম শেষ করে বাড়িতে চলে আসছে। আর রাত নামতেই গ্রামটা যেন হয়ে যাচ্ছে একটা মৃতপুরী।
আজকে আবহাওয়াটা খুব একটা ভালো না। থেকে থেকেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সেই সাথে মেঘের গর্জন।
রাত নামতেই পরিবেশটা যেন আরো ভয়ঙ্কর রুপ নিলো।
মতি মিয়া একটা চাদর গায়ে দিয়ে বিছানাতে চুপচাপ শুয়ে রয়েছে। ওদিকে মেঘের গর্জন ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
ঘরে হারিকেনের মৃদু আলো জ্বলছে, সেই আলোতেই হঠাৎ মতি মিয়ার মনে হলো একটা ছায়া তার শরীরের উপর দিয়ে চলে গেল।
বিছানাতে এক প্রকার লাফিয়ে উঠে বসলো সে। ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। মনের ভুল ভেবে আবারও বিছানাতে শুয়ে পড়লো।
ওদিকে বাহিরে এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পরে হঠাৎ দরজাতে ঠক ঠক করার শব্দ হলো।
মতি মিয়া আবারও বিছানাতে উঠে বসলেন। জোরে করে বললেন,
"কেডা কেডায় দরজায়?"
বাহির থেকে কারো সাঁড়াশব্দ এলো না। মতি মিয়া বিছানা থেকে নেমে হারিকেনটা হাতে নিয়ে ঘরের বাহিরে এলেন। তারপরে দরজার এপার থেকেই বললেন,
"কেডায় বাইরে? কতা কউ না ক্যান?"
কোনো উত্তর নেই। মতি মিয়া ধীরে ধীরে দরজা খুলে দিলেন। কিন্তু বাহিরে কেউ নেই। মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে শুধু।
হঠাৎ তার চোখ গেল সামনের রাস্তাটার দিকে। আবছাভাবে দেখতে পেল সাদা কাপড় গায়ে কেউ একজন হেঁটে চলেছে সামনে।
এত রাতে এইভাবে বৃষ্টিতে ভিজে কে যেতে পারে? মতি মিয়া একটা হাক দিলেন,
"ক্যাডা যায়!"
কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর আসলো না। মতি মিয়া তাড়াতাড়ি ছাতা মাথায় হারিকেন হাতে বেড়িয়ে পড়লেন লোকটার পিছনে। একদিকে মাটির রাস্তা তার উপরে বৃষ্টির পানিতে পেঁছল হয়ে গেছে হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে মতি মিয়ার।
কিন্তু অবাক করার বিষয় সামনের লোকটি বেশ দ্রুত গতিতেই হেঁটে চলেছে। বেশ কিছুটা পথ চলে আসার পরে মতি মিয়া দেখে লোকটি আর নেই।
এক মুহূর্তের ভেতরে হঠাৎ কোথায় চলে গেল লোকটি? আর কেই বা এই লোক?
কথাগুলো ভাবছে মতি মিয়া এমন সময় তার মনে হলো কেউ যেন খুব দ্রুত বেগে তার পেছন দিয়ে চলেগেল। সে পেছনে ঘুরে তাকালো কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। বাড়িতে ফিরে যাওয়া উচিত নাকি ওই লোকটাকে খোঁজা!
এদিকে বৃষ্টি ক্রমশ বেড়েই চলেছে। হঠাৎই মতি মিয়ার মনে পড়লো কবিরাজ সাহেবের কথা তিনিতো তাকে বাহিরে থাকতে নিষেধ করেছিলেন রাতে।
যত তাড়াতাড়ি পারা যায় বাড়িতে ফিরতে হবে। মতি মিয়া আবার বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাড়ির সামনে আসতেই সে একটা বড়সর রকমের শক খায় কারণ সেই সাদা কাপুড় পড়া লোকটা এখানে দাড়িয়ে।
তবে উল্টোদিক হয়ে দাড়িয়ে থাকার কারণে তার চেহারা ঠিক দেখা যাচ্ছে না। মতি মিয়া তাকে উদ্দেশ্যে করে এবার বললো,
"ক্যাডায় আপনে? আর এত্ত রাইত এইহানে কি?"
লোকটা এবার ধীরে ধীরে তার মুখ মতি মিয়ার দিকে ঘুরাতে লাগলো।
হারিকেনের আবছা আলোতে লোকটির মুখ দেখেই মতি মিয়া একদম আঁতকে উঠলো, কি ভয়ানক চেহারা! মুখটা ঠিক চেনাই যাচ্ছে না।
এক পা দু পা করে এগিয়ে আসতে লাগলো মতি মিয়ার দিকে। একে অসুস্থ শরীর তার উপরে এসব মতি মিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না সেখানেই জ্ঞান হারালেন।
জ্ঞান ফিরতে নিজেকে আবিষ্কার করেন তার ঘরে।
মতি মিয়ার পাশেই বসে আছে একটি বৃদ্ধ লোক। মাথায় টুপি, পড়নে জোব্বা, মুখ ভর্তি হয়ে আছে সাদা দাড়িতে।
লোকটিকে দেখে মতি মিয়া বেশ অবাক হয়ে গেল, কে এই লোক? আর তার ঘরেই বা কি করছে?
#পর্ব_৫_ও_শেষ_পার্ট
"ক্যাডা...ক্যাডায় আফনে?"
মতি মিয়ার কথা শুনে লোকটি তার দিকে তাকালো। আস্তে করে বললো,
"তোমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলাম আমি"
"কিন্তু আফনে ক্যাডা?"
"আমি তোমাদের কবিরাজ সাহেবের খুব ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু"
কবিরাজ সাহেবের নাম শুনেই মতি মিয়া উঠে বসতে চাইলো। কিন্তু মাথাটা এখনো ব্যাথা তাই আর উঠতে পারলো না।
লোকটি আবারও বললো,
"আমি এসেছি তোমাদেরকে সাহায্য করতে"
"কিসের সাহায্য?"
'এই যে তোমরা আজকে যে ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছো সেটা থেকে।"
"আফনে ক্যামনে সাহায্য করবেন আমগোরে? আফনে কি জানেন এইসব ক্যাডায় করতাছে?"
লোকটা হ্যাসূচক মাথা নাড়লো। তারপরে বললো,
"সেজন্যই আমি এসেছি এখানে তোমাদেরকে সাহায্য করতে আর ওকে..."
"কি হইলো থামলেন ক্যান?"
"ওকে শেষ করতে"
"কারে শ্যষ করতে?"
"সব তোমাকে বলবো, তবে এখন নয়। তুমি বিশ্রাম নাও আমি একটু আসছি"
কথাটি বলেই লোকটি উঠে চলে গেল। মতি মিয়া শুধু সেদিকেই তাকিয়ে রইলো, কিছু বললো না।
সন্ধ্যো নামতে আর খুব একটা দেড়ি নেই। মতি মিয়া ঘরে বসে আছে এমন সময় লোকটি ঘরে ঢুকলো।
মতি মিয়ার সামনে এসে বসে বললো,
"আমাদেরকে আজকে রাতেই ওকে শেষ করতে হবে। নয়তো ও আরো কাউকে খুন করে ফেলবে"
"কিন্তু সেইডা ক্যাডা?"
লোকটি এক মুহূর্ত একটু থামলেন। তারপরে বলতে লাগলেন,
"আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। এই গ্রামে একটা শয়তান জিনের আবির্ভাব হয়েছিলো। তুমি তখন খুব ছোট ছিলে। সেই জিন মানুষের ক্ষতি করে আনন্দ পেত। তার যত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠে সকলে। সবশেষে কবিরাজই তাকে অনেক কষ্টে এই গ্রাম ছাড়া করে। এতদিন পর ও আবার ফিরে আসতে পেরেছে এই গ্রামে তোমার একটা ভুলের কারণে"
"আমার ভুলের কারণে?"
"হ্যাঁ, তোমার সেইদিনের ঔ ভুলে যাবার কারণে। সেদিন যদি তুমি ওকে নিজের ছেলে মনে করে না নিয়ে আসতে তবে ও এখানে আসতে পারতো না"
"কিন্তু ও কবিরাজ সাহেবকে খুন করলো ক্যান?"
"প্রতিশোধ! ওর সেই হিংসার আগুণ আবারও জ্বলে উঠেছে, আর ওকে যদি এখনই থামানো না যায় তবে ও আরো অনেক কিছু করবে"
"একটা ব্যাপার বুঝলাম না"
"কি ব্যাপার?"
"জিনটা আমার কোনো ক্ষতি করে নাই ক্যান?"
"ক্ষতি করতে পারে নি তোমার এজন্য"
মতি মিয়ার গলাতে ইঁশারা করে আবারও বললেন,
"এই তাবিজটা তোমার আব্বায় এনে দিছিলো তোমাকে, এটার জন্যই ও তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি"
"ওরে শেষ করনের কোনো উপায় কি নাই?"
"আছে একটা উপায়?"
"কি সেই উপায়?"
জুব্বার পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করে মতি মিয়ার সামনে ধরে বললেন,
"এই শিশিতে আছে মস্ত্রপুত পবিত্র পানি। এটার এক ফোঁটা যদি ওর উপর ছিঁটিয়ে দেওয়া যায় তবেই ও শেষ হবে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ কিছু না। খুব কঠিন কারণ ও এখন অনেক শক্তিশালী আর যে কারো রুপ নিয়ে ও ধোঁকা দিতে পারে"
"কিন্তু আফনে এতকিছু জানলেন ক্যামনে?
লোকটি জুব্বার পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে বললো,
"কবিরাজ ওর মৃত্যুর কয়দিন আগে আমাকে সব লিখে জানিয়েছিলো। কারণ ও বুঝতে পেরেছিলো ওকে বাঁচতে দিবে না এই জিনটা। আর আমিও কবিরাজের মতো এসব বিষয় নিয়েই কাজ করি এজন্য আমার সাহায্য চায়"
মতি মিয়া শিশিটা হাতে নিয়ে ট্যামরে গুজে রাখে।
তারপরে উঠে দাড়িয়ে বলে,
'ওরে আমি শ্যষ করমু। আর একটা গ্রামবাসিরেও খুন হইতে দিমু না"
"কাজটা কিন্তু মোটেও সহজ না, এতে তোমার নিজের জীবন বিপন্ন হতে পারে"
"হইলে হোক তাও আমি লড়মু"
রাত গভীর হতে লাগলো। মতি মিয়ার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। ও নিজের গলার তাবিজটা খুলে রেখে দিলো। এটা দেখে কবিরাজ সাহেবের বন্ধু বললো,
"ওটা খুলছো কেন?"
"এইডা পইরা রইলে ও আমার লগে লড়তে আইবো না। ভয় দেখায়াই শুধু মারতে চাইবো আমারে তাই খুইলা রাখলাম"
তাদের কথোপকথনের মধ্যেই হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হলো। মতি মিয়া গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে সফিক দাড়িয়ে বাহিরে।
"কি হইছে সফিক তোমারে ওই রকম দেখাইতাছে ক্যান?"
সফিক হাঁফাতে হাঁফাতে বললো,
"মতি ভাই তাড়াতাড়ি চলেন সাহেদের যেন কি অইছে?"
"কি হইছে! কি হইছে আমার সাহেদের?"
প্রশ্নটা করেই মতি মিয়া দিকবিদিকশূন্য হয়ে ছুটতে লাগলেন। আর তার সামনে সামনে যেতে লাগলো সফিক। বেশ অনেকটা পথ আসার পরে হঠাৎই সফিক থেমে গেল রাস্তার মাঝে। মতি মিয়াও দাড়িয়ে পড়লো। তারপরে জিজ্ঞাসা করলো,
"কি অইলো দাড়াইয়া পরলা ক্যান তারাতারি চলো?"
সফিক কিছু বললো না। এক মুহূর্ত সেভাবেই দাড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে মতি মিয়ার দিকে ঘুরে দাড়ালো।
হারিকেনের আবছা আলোতেও মতি মিয়া দেখতে পেল সফিকের ঠোঁটের কোণে এক টুঁকরো শয়তানি হাসি ফুঁটে উঠেছে। ধীরে ধীরে সেই হাসিটা বাড়তে লাগলো। হাসি থামিয়ে সফিক বললো,
"আমার হাত থেকে এর আগে তুই বারবার বেঁচে গিয়েছিস কিন্তু আজকে কিভাবে বাঁচবি?"
মতি মিয়ার বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে এটাই সেই শয়তান জিনটা। আজও তাকে ধোঁকা দিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে। মতি মিয়া বললো,
"তুই তাইলে সেই শয়তান জিন যে কবিরাজ সাব রে মারছে? আজগা তোর শেষ দিন"
মতি মিয়ার কথা শুনে ও আবারও অট্রোহাসিতে ফেঁটে পড়লো। তারপরে বললো,
"সে বার তোর বাবা কবিরাজের সাহায্য নিয়ে আমাকে এই গ্রাম থেকে বিতারিত করেছিলো, আজ তোকে মেরে সেই রাগের প্রতিশোধ আমি নেবো"
কথাটা বলেই হঠাৎ ও মতি মিয়ার গলা চেপে ধরলো। মতি মিয়া প্রাণপনে চেষ্টা করছে ছাড়াবার কিন্তু পেরে উঠছে না। মতি মিয়াকে এক ঝটকায় কিছুটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল জিনটা। মতি মিয়ার গলা প্রচন্ড ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে রক্ত বের হচ্ছে মুখ থেকে।এরই মাঝে ও আবারও এগিয়ে আসতে থাকলো মতি মিয়ার দিকে। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ কেউ একজন ওর পেছন থেকে সজোড়ে আঘাত করলো। পেছনে তাকিয়ে দেখে কবিরাজ সাহেবের সেই বন্ধু লাঠি হাতে দাড়িয়ে। জিনটার রাগ যেন আরো বেড়ে গেল, ও এবার কবিরাজের বন্ধুর গলা চেপে ধরলো।
মতি মিয়া অনেক কষ্টে উঠে এসে বাঁধা দেবার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। হঠাৎই ওর মনে পড়লো সেই শিশিটার কথা। দ্রুত শিশিটা বের করে ছিপিটা খুললো। ওদিকে জিনটা কবিরাজ সাহেবের বন্ধুকে মারতে ব্যস্ত, এই সুযোগে মতি মিয়া শিশির তরলটা ছুড়ে দিল জিনটার উপরে।
তরলটা শরীরে পড়তেই হঠাৎ জিনটার শরীর জ্বলে যেতে লাগলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জিনটা অদৃশ্য হয়ে গেল। মতি মিয়া দৌড়ে আসলেন কবিরাজ সাহেবের বন্ধুর কাছে। তাকে ধরে বললেন,
"কিছু হয় নাই তো আফনের?"
"আমি ঠিক আছি বাবা। তুমি এই শয়তান জিনটাকে তাড়াতে পেরেছো। তোমার জন্যই আজ বেঁচে গেল অনেক নিরীহ গ্রামবাসির জীবন।"
(সমাপ্ত)
(সমাপ্ত বললেই সব কিছুর শেষ হয়ে যায় না। যেখানে সমাপ্ত লিখা হয় সেখান থেকেই আরেকটা নতুন গল্পের সূচনা হয়। কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন কারণ আপনাদের পজিটিভ মন্তব্য নতুন কিছু লিখতে সাহায্য করে। কোনো ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো)