12/08/2026
𝐏𝐚𝐫𝐭:-𝟐𝟎
এলেসা রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করল। মেরুন গাউনটা খুলে একটা আরামদায়ক কালো শার্ট আর ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে নিল। চুলগুলো খুলে দিল। নীল মুকুট আর নেকলেস টেবিলের উপর রাখল। তারপর সোফায় বসে একটা মোটা বই হাতে নিল। বইয়ের নাম গুপ্ত রাজ্য। ভ্যালুরিয়ার সকল রহস্য, লুকানো ইতিহাস, প্রাচীন শপথ আর হারিয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোর কথা লেখা আছে এতে। পৃষ্ঠাগুলো হলুদাভ, অক্ষরগুলো সূক্ষ্ম। এলেসা এক পাতা এক পাতা করে উল্টাতে লাগল। তার অলিভ গ্রিন চোখ মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। বাইরের রাতের নীরবতা রুমের ভিতরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। শুধু পাতা ওল্টানোর শব্দ আর দূর থেকে কোনো পাখির ডাক মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল।
সময় যেন থেমে গিয়েছিল। দেখতে দেখতে রাত একটা বেজে গেল। ভ্যালুরিয়ায় তাদের ঘুমের কোনো প্রয়োজন নেই। শরীর ক্লান্ত হয় না, চোখ ভারী হয় না। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক বছর কাটানোর কারণে অভ্যাস হয়ে গেছে রাতে শান্ত হয়ে বসার। এলেসা বইয়ের মধ্যে ডুবে ছিল। প্রাচীন এক রাজবংশের পতনের কাহিনি পড়ছিল, যখন হঠাৎ তার মোবাইলটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে দেখা গেল — আননোন নাম্বার। এলেসা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভ্যালুরিয়ার যেকোনো রাজ্যই পৃথিবীর চেয়ে অনেক আধুনিক। এখানকার নেটওয়ার্ক, ডিভাইস, সবকিছুই উন্নত। তবুও আননোন নাম্বার দেখে তার মনে সন্দেহ জাগল। সে কল পিক করল না। মোবাইলটা সোফায় রেখে আবার বইয়ে মন দিল। কিন্তু ফোনটা বারবার বাজতে লাগল। একবার, দুবার, তিনবার… বিরক্তি বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে মোবাইল তুলে কল পিক করল।
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক রাগান্বিত কণ্ঠ।
“কই ছিলি তুই এতক্ষণ? কতগুলো কল দিয়েছি, চোখে পড়ে না?”
এলেসা চমকে গেল। কণ্ঠস্বরটা চিনতে তার এক সেকেন্ডও লাগল না। রিটস। সে মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে বলল, “এ্যহহেহহহে… এই রিটসের জন্য নতুন সিম নিয়েছিলাম, ও এইটারও নাম্বার খুঁজে বের করেছে। আল্লাহ, আমাকে উঠায়ে নাও তোমার কাছে।”
সে গলায় যতটা সম্ভব শান্ত সুর এনে বলল, “কেন? কী হয়েছে? এতবার কল দেওয়ার কারণ কী?”
রিটসের কণ্ঠ এবার একটু নরম হলো। “পিছনের বাগানে আয়।”
এলেসা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? কী জন্য এখন আমি পিছনের বাগানে যাবো?”
হঠাৎ ওপাশ থেকে মিহিদের কণ্ঠ ভেসে এল। চেনা, জোরে, আর একটু রাগান্বিত।
“শালি, তুই তাড়াতাড়ি পিছনের বাগানে আয়! ঘুরতে যাবো থরি শিকার করতে যাবো। তাড়াতাড়ি আয়। নয়তো আমি যদি তোর কাছে যাই, তাহলে বেদম মার খাবি তুই। বলে দিলাম।”
এলেসা হেসে ফেলল। মিহিদের এই সুর শুনলেই তার রাগ উবে যায়। সে বলল, “দোস্ত, তুই ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন? আসতেছি, একটু ওয়েট কর।” বলেই কল কেটে দিল।
মোবাইলটা সোফায় রেখে সে উঠে দাঁড়াল। বইটা বন্ধ করে টেবিলে রাখল। জুতো পরল। চুলগুলো হালকা করে বেঁধে নিল। রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে পিছনের দিকে গেল। প্রাসাদের ভিতরটা এখন নীরব। দাসীরাও কেউ নেই। শুধু মাঝে মাঝে দেওয়ালের টর্চের আলো কাঁপছে।
পিছনের দরজা খুলে সে বাগানে বেরোল। রাতের বাতাস ঠান্ডা আর সতেজ। ফুলের গন্ধ মিশে আছে। দূরে নদীর শব্দ ভেসে আসছে। চাঁদের আলোয় বাগানটা রূপকথার মতো লাগছে। এলেসা একটু দূরে গিয়ে দেখল — মিহিদ আর রিটস দাঁড়িয়ে আছে। মিহিদ হাতে একটা ছোট ব্যাগ নিয়েছে, রিটস চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে।
মিহিদ তাকে দেখে হাসল। “আরে শেষমেশ এলি তো! আর একটু দেরি করলে আমি নিজে গিয়ে তোকে টেনে আনতাম।”
এলেসা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এত তাড়া কেন? রাত একটা বাজে। কোথায় যাবি?”
মিহিদ চোখ টিপে বলল, “শিকার করতে যাবো। অনেকদিন হয়নি। তোরও দরকার। পৃথিবীতে এতদিন বসে থেকে হাড় জমে গেছে নিশ্চয়ই।”
রিটস কিছু বলল না। শুধু এলেসার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কালো চোখে আগের সেই নরম ছায়া এখনো আছে। এলেসা তার দিকে তাকাল, আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। সন্ধায় রিটসের বলা কথাগুলো এখনো তার কানে বাজছে। কিন্তু এখন সে সেসব নিয়ে ভাবতে চায় না।
তিনজনে একসাথে বাগানের গভীরে হেঁটে চলল। গাছের ছায়া আর চাঁদের আলো একে অপরের সাথে মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। এলেসার মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর আবার নিজের জগতের রাতের বাতাস নিচ্ছে সে। তার পায়ের নিচে ঘাস নরম। দূরে কোনো প্রাণীর ডাক শোনা যাচ্ছে।
মিহিদ সামনে সামনে হাঁটছিলো। রিটস পিছন থেকে হালকা গলায় বলল, “সাবধান থেকো। এখানকার জঙ্গল পৃথিবীর মতো নয়।”
এলেসা পিছনে তাকিয়ে বলল, “জানি। তুমি চুপচাপ হাঁটো।”
তিনজনে গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলল। রাতের অন্ধকারে তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ছিল। এলেসার বুকে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল — শিকারের উত্তেজনা, আর রিটসের উপস্থিতির অদ্ভুত টান। সে জানে না আজ রাতটা কেমন কাটবে।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলে পৌঁছে গেল। প্রাসাদের পিছনের এই জঙ্গলটা ঘন, অন্ধকার আর রহস্যময়। গাছের ডালপালা একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে, মাটি নরম আর স্যাঁতসেঁতে। চাঁদের আলো মাঝে মাঝে পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিলিক দিচ্ছে। মিহিদ এলেসাকে একটা তির-ধনুক দিয়ে দিল। ধনুকটা হালকা কিন্তু শক্তিশালী, তিরগুলো ধারালো আর জাদুময় আভাযুক্ত।
“লক্ষ্য চার থেকে ছয়টা হরিণ,” মিহিদ নিচু গলায় বলল। “বেশি নয়। শুধু প্রয়োজনমতো।”
তিনজনে জঙ্গলের গভীরে এগোতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা হরিণের পদশব্দ শোনা গেল। প্রাণীটা তাদের গন্ধ পেয়ে খুব জোরে পালাতে শুরু করল। মিহিদ আর রিটস এক নজরে একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর তিনজনেই ডানা মেলে আকাশের দিকে উঠে গেল। গাছের উপর দিয়ে উড়তে উড়তে হরিণটাকে খুঁজতে লাগল।
এলেসা উপর থেকে একটা হরিণ দেখতে পেল। সে দ্রুত তির ছুড়ল। তিরটা সঠিক জায়গাতেই বিঁধল। হরিণটা নিচে পড়ে গেল। মিহিদ উপরে থেকে চিৎকার করে বলল, “তুই ওই হরিণটার কাছে যা। আমরা ওইদিক থেকে অন্য হরিণগুলো ধরে আনছি।”
এলেসা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে দ্রুত উড়ে জঙ্গলের ভিতরে নেমে গেল। উড়তে উড়তে হরিণের কাছে যাওয়ার সময় তার ডানা একটা মোটা গাছের ডালের সাথে লেগে গেল। তীব্র ব্যথায় সে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
“আহ…” সে উঠে বসতে গিয়েই থমকে গেল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত প্রাণী। অর্ধেক ঘোড়া, অর্ধেক মানুষ। শরীরের নিচের অংশ ঘোড়ার মতো, উপরের অংশ মানুষের। চোখ দুটো লালচে, চুলগুলো এলোমেলো আর কালো। সে এলেসার দিকে তাকিয়ে আছে।
এলেসা উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল। গলায় শক্ত সুর এনে বলল, “কী চাও? কে তুমি?”
মানুষরূপী ঘোড়াটি গম্ভীর গলায় বলল, “আমি লুসিফ। এই জঙ্গল আমার রাজ্য।এই জঙ্গলে পশু শিকার করা বারণ।”
এলেসা এমন কথা শুনে হেসে ফেলল। তার হাসিটা স্পষ্ট বিদ্রূপময়। লুসিফ ওকে এভাবে হাসতে দেখে আরও ক্ষেপে গেল।
“তোমার সাহস তো কম না,” লুসিফ রেগে বলল। “এই জঙ্গলের রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তার কথার উপর হাসছো?”
কথা শেষ হতে না হতেই লুসিফ এলেসার দিকে আক্রমণ করতে গেল। কিন্তু এলেসা এক ঝটকায় তার পিছনে চলে গেল। সে হাসতে হাসতে বলল, “আমি ভ্যাম্পায়ার কুইন। আমাকে আঘাত করা এত সহজ না, লুসিফ। আর এই জঙ্গল আমার রাজ্যের, নাকি তোমার মতো একটা ঘোড়ার?”
বলেই এলেসা তার দিকে তির ছুড়ে মারল। লুসিফ দ্রুত সরে গেল। তিরটা গাছের গুঁড়িতে বিঁধল। লুসিফ তখন তার কোমর থেকে একটা ম্যাজিক হান্টিং বেল্ট বের করল। বেল্টটার মাথায় নীল রশি জ্বলছে, বিদ্যুতের মতো লাফাচ্ছে। সে সেটা এলেসার দিকে ছুড়তে শুরু করল।
এলেসা এক সেকেন্ডের মধ্যে একটা গাছের উপর উঠে বসল। তার এক হাতে নিজের হান্টিং বেল্ট এনে ফেলল। দুজনের বেল্ট বাতাসে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। নীল আলো আর বিদ্যুতের ঝলক জঙ্গলের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ল।
লুসিফ রেগে গর্জন করে বলল, “তুমি কে? এই জঙ্গলে এসে আমার আদেশ অমান্য করছো?”
এলেসা গাছের ডালে বসে হাসল। “আমি মাহি এলেসা ইভলব। মেলিসা রাজ্যের রাজকন্যা। আর এই জঙ্গল আমার পরিবারের অধীনে। তুমি কে যে আমাকে আমার শিকার আটকাচ্ছো?”
লুসিফের চোখ আরও লাল হয়ে গেল। সে বেল্টটা আরও জোরে ছুড়ল। এলেসা দ্রুত সরে গিয়ে নিচে নেমে এল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমে এল। জঙ্গলের পাতাগুলো তাদের লড়াইয়ের বাতাসে কেঁপে উঠল।
লুসিফ হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, “ইভলব…? তুই সেই মেলিসা রাজ্যের পবিত্র্য রক্তের মেয়ে?”
এলেসা তির এঁকে ধরে বলল, “হ্যাঁ। এখন বলো, তুমি এখানে কী করছো এই জঙ্গল এ শুধু নরমাল পশু থাকার অধিকার আছে নাকি কোনো আমাদের মতো অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক প্রানী?”
দুজনের চোখে চোখ পড়ল। জঙ্গলের রাত যেন আরও গভীর হয়ে গেল। লুসিফের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। যে এগিয়ে আসতে আসতে বললো...
To be continued...
ᥫ᭡𝐓𝐭: 𝚗𝚊𝚍𝚒𝚢𝚊.𝚚𝚞𝚎𝚗𝚗𝟶𔓕
𐙚𝐅𝐛: তানহা ইসলাম কনাᥫ᭡