09/07/2026
🚲 একটি ভুল, একটি শিক্ষা, আর এক অচেনা জাপানির মানবতা ❤️🇯🇵🚲
গত ৫ জুন আমি পার্ট-টাইম জবের উদ্দেশ্যে সাইকেল নিয়ে ওসাকার শিনসাইবাশি এলাকায় যাই। স্টেশনের পাশের সব সাইকেল পার্কিং ঘুরেও কোথাও খালি জায়গা পেলাম না। পাশের একটি মার্কেটের নিচে অনেকগুলো সাইকেল রাখা দেখে ভাবলাম, নিশ্চয়ই এখানে সাইকেল রাখা যাবে। তাই আমিও সেখানে সাইকেল রেখে কাজে চলে গেলাম।
কাজের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলো—যদি সাইকেলটি তুলে নিয়ে যায়! কিন্তু তখন তো কাজ ফেলে বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই শিফট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে সাইকেল আনতে গেলাম।
গিয়ে দেখি, আমি ঠিক কোথায় সাইকেল রেখেছিলাম সেটাই ভুলে গেছি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জায়গাটি খুঁজে পেলেও সাইকেলটি আর সেখানে নেই। আশপাশে কোনো নোটিশও চোখে পড়ল না। পরে পায়ের নিচে বৃষ্টিতে ভেজা, মানুষের পায়ে মাড়ানো একটি অস্পষ্ট কাগজ দেখতে পেলাম। কষ্ট করে সেটি অনুবাদ করে বুঝলাম—আমার সাইকেলটি কর্তৃপক্ষ নিয়ে গেছে এবং কোথায় রাখা হয়েছে তার একটি ঠিকানা দেওয়া আছে।
এরপর শুরু হলো আরেক ঝামেলা। অনেককে জিজ্ঞেস করে স্টেশনে গেলাম এবং টিকিট কেটে রওনা দিলাম। প্রথম স্টেশনের একজন গার্ড আমাকে একটি ট্রেনে উঠতে বললেন এবং জানালেন, একটি নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে ট্রেন পরিবর্তন করতে হবে।
কিন্তু সেই স্টেশনে নেমে দেখি, সেখানে ট্রেন পরিবর্তনের কোনো সুযোগই নেই। আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। ঠিক তখনই একজন জাপানি ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। তিনি কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম যে আমার সাইকেল নিয়ে গেছে এবং এই ঠিকানায় যেতে হবে।
তিনি আমার কথা শুনে বললেন, আমি ভুল স্টেশনে চলে এসেছি। এরপর তিনি বললেন, "আমার সঙ্গে আসুন।"
এরপর যা ঘটল, তা আমি কখনো ভুলতে পারব না।
তিনি আমাকে সঠিক স্টেশনে নিয়ে গেলেন। স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়ে আমার হয়ে পুরো বিষয়টি জাপানিতে বুঝিয়ে বললেন। আমি ভুল তথ্যের কারণে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ফেলেছিলাম, সেটাও তিনি বুঝিয়ে দেন। স্টেশন মাস্টার আমার টিকিট রেখে কিছু টাকা ফেরত দিলেন।
এরপরও তিনি থেমে থাকেননি। বিশাল পাতাল রেল স্টেশনে নিজে টাকা খরচ করে প্রবেশ করলেন, আমার জন্য নতুন টিকিট কাটলেন এবং এতগুলো লাইনের মধ্যে কোন ট্রেনে উঠলে আমি সাইকেলের কাছে পৌঁছাতে পারব, সেটি পর্যন্ত আমাকে দেখিয়ে দিলেন। ট্রেন ছাড়ার একেবারে শেষ মুহূর্তে আমাকে ট্রেনে তুলে দিলেন।
আমি ট্রেনে উঠতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তাই তাঁকে ঠিকমতো "ধন্যবাদ" বলারও সুযোগ পাইনি। দূর থেকে শুধু কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। আজও সেই অচেনা মানুষটির কথা মনে পড়ে। মানুষের প্রতি মানুষের এমন আন্তরিকতা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে।
অবশেষে যেখানে সাইকেল রাখা হয়েছিল সেখানে পৌঁছে দেখি, সাইকেল নেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। তারা জানাল, পরদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে আসতে হবে। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ট্রাকে করে একের পর এক অবৈধভাবে রাখা সাইকেল এনে জমা করা হচ্ছে।
সেদিন ক্লান্ত শরীরে স্টেশন থেকে বাসা পর্যন্ত অনেকটা পথ হেঁটে ফিরতে হয়েছিল।
পরের দিন ক্লাস শেষে আবার সেখানে গেলাম। প্রথমে আমাকে আমার সাইকেলটি শনাক্ত করতে বলা হলো। তারপর তারা সাইকেল এনে দিল এবং ৩,৫০০ ইয়েন জরিমানা দিতে হলো।
এতেই শেষ নয়। সাইকেল না থাকায় ট্রেনে যাতায়াতের জন্য আরও প্রায় ১,৫০০ ইয়েন খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে আমার প্রায় ৫,০০০–৬,০০০ ইয়েন অতিরিক্ত খরচ হয়েছে, সঙ্গে ছিল মানসিক চাপ এবং অযথা সময়ের অপচয়।
📌 তাই সবার প্রতি আমার অনুরোধ—
জাপানে কখনোই নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের বাইরে সাইকেল রাখবেন না। অন্যরা রেখেছে দেখে একই ভুল করবেন না। কয়েক মিনিটের সুবিধার জন্য পরে বড় অঙ্কের জরিমানা, সময়ের অপচয় এবং অনেক কষ্টের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
আর সেই অচেনা জাপানি ভদ্রলোকের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনার মতো মানুষদের জন্যই পৃথিবী এখনো সুন্দর। ❤️🇯🇵