12/08/2026
আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদ আজ আমাদের ঘরদোর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে শিশুদের কোমল হাতের মুঠোয়। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কাছে খেতে বসা মানেই চোখের সামনে রঙিন কোনো পর্দার হাতছানি—হাতে মোবাইল তুলে না দিলে যেন তাদের গ্রাসটি মুখে রোচে না। প্রশ্ন জাগে, কেন এমন অদ্ভুত ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ছে আজকের শিশুরা? এই আসক্তি দূর করার জাদুকরী উপায়ই বা কী? কেবল বাচ্চার হাত থেকে জোর করে স্ক্রিন কেড়ে নিলে কি সমস্যার সমাধান মেলে? যারা নিত্যদিন সন্তান সামলান, কেবল তারাই জানেন এই অদৃশ্য লড়াইয়ের তীব্রতা ও কাঠিন্য।
বয়সের তারতম্য রয়েছে, রয়েছে পারিবারিক আবহাওয়ার ভিন্নতা। কারো মা ঘর সামলান পরম মমতায়, আবার কারো মা কর্মব্যস্ততায় দিন কাটান বাইরের দুনিয়ায়। কিন্তু সব ঘরের দৃশ্যপটেই আজ একটি অদ্ভুত মিল—খাবারের থালার সামনে বসা মাত্রই চাই মোবাইল। মায়েদের মুখে একটাই কথা, স্ক্রিন সামনে না ধরলে সন্তান মুখে খাবার তো তুলতেই চায় না, উল্টো খাবার গালে পুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। শেষমেশ নিরুপায় হয়ে মায়েরাও হার মানেন এবং সন্তানের হাতে তুলে দেন প্রযুক্তির রঙিন নেশা।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ঘরে ঘরে এই চিত্র আজ এক চিরন্তন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। গান, কার্টুন কিংবা কোনো রিল চালু থাকলেই কেবল তারা আহার সম্পন্ন করে, আর বিনোদনের এই আলো নিভে গেলেই শুরু হয় কান্নাকাটি, চিৎকার ও জেদের আস্ফালন। এই দৃশ্য দেখে আজ গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদগণ।
সমস্যার মূল শিকড় কোথায়?
শিশুর খাবার খেতে না চাওয়ার পেছনে থাকতে পারে শারীরবৃত্তীয় নানা কারণ—হতে পারে তার পেটে আদৌ খিদে নেই, কিংবা সে কিছুটা অসুস্থ, কিংবা মা-যে খাবারটি সামনে এনেছেন তার স্বাদ বা গন্ধ তার পছন্দ নয়। অনেক সময় মায়েরা সন্তানের বয়স ও চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ খাবার থালায় তুলে দেন এবং জোর করে তা খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। শিশু সেই জোরাজুরির প্রতিবাদ জানায় খাবার দীর্ঘক্ষণ মুখে জমিয়ে রেখে, না চিবিয়ে।
তাছাড়া, ব্যস্ত মায়েরাও অনেক সময় সহজ পথ বেছে নেন। সন্তানের সাথে গল্প করে, ছড়া শুনিয়ে বা বুঝিয়ে খাবার খাওয়াতে গেলে যে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, শহুরে যান্ত্রিক জীবনে তার বড় অভাব। তাড়াহুড়োর সকালে মোবাইলে কোনো কার্টুন বা পছন্দের গান ছেড়ে দিলে যে কাজ দুই ঘণ্টায় শেষ হওয়ার কথা, তা নিমিষেই আধ ঘণ্টায় মিটে যায়।
কিন্তু এর পরিণাম অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্থূলত্বের সমস্যা আজ চরম আকার ধারণ করেছে এবং ভারতও এর বাইরে নয়। মোবাইলে মগ্ন থেকে যখন একটি শিশু খাবার খায়, তখন তার মস্তিষ্ক খাবারের স্বাদ, ঘ্রাণ বা পরিমাণের প্রতি পুরোপুরি অচেতন থাকে। সে কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে—তার কোনো হিসেব তার মগজে থাকে না। অভিভাবকেরাও খাসির মতো বাচ্চা খেয়ে নিচ্ছে ভেবে খাইয়েই যান, আর তা থেকেই ডেকে আনেন স্থূলতার মতো মারাত্মক শারীরিক ব্যাধি। বিশিষ্ট মনোবিদদের মতে, সচেতনভাবে খেলেই কেবল শিশু বুঝতে পারে তার পেট ভরেছে কি না। অতিরিক্ত হলে সে নিজেই হাত সরিয়ে নেবে। অভিভাবকরা সেই প্রাকৃতিক ইশারাকে অবহেলা করলেই বিপত্তি ঘোরে।
বাস্তবসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সমাধানের পথ
"খাওয়ার সময় মোবাইল দেওয়া যাবে না, স্ক্রিন টাইম বেঁধে দিতে হবে"—এই তত্ত্বকথাগুলো আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাস্তবে মায়ের পক্ষে তা মানা অনেক সময় অসম্ভব ঠেকে। এই জটিলতা থেকে উত্তরণের জন্য মনো-সমাজকর্মীরা কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পথ বাতলেছেন:
স্বল্প আহারে সম্মতি: শিশু যদি কোনো বেলায় খুব কমও খায়, তবে সেই ক্ষিদেটুকু বা অনিচ্ছা মেনে নেওয়া ভালো। জোর করে খাইয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অন্যায্য জেদে প্রশ্রয় না দেওয়া: শিশুর প্রতিটি বায়নায় মদত দিলে তা ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। চিকিৎসকদের মতে, প্রকৃত খিদে পেলে শিশু নিজ থেকেই খাবার চাইবে। তার শরীরকে সংকেত দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং বুঝতে হবে সে কেন খেতে চাইছে না।
খাবারে বৈচিত্র্য ও রঙের জাদুকরী ছোঁয়া: শিশুরা স্বভাবতই রংচঙে ও সুন্দর জিনিসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। তাই অমলেট হোক বা সাধারণ ভাত-রুটি—রান্নায় একটু সৃজনশীলতা আনুন। ডিমের পোচকে গাজর ও আঙুরের টুকরো দিয়ে চোখ-নাক বানিয়ে প্লেট সাজাতে পারেন। পালংশাক বা ধনেপাতার সবুজ রস দিয়ে ছোট ছোট সুদৃশ্য রঙিন রুটি তৈরি করতে পারেন। খাবারের স্বাদ এবং রূপ শিশুর মনে আগ্রহ জাগাবে।
রান্নাঘরে খুদে সহায়ক: রান্না করার সময় আপনার ছোট্ট সোনামণিকেও পাশে ডেকে নিন। কী রান্না হচ্ছে, কীভাবে মশলা মিশছে—তা তাকে দেখালে সে কৌতূহলী হয়ে উঠবে। নিজ হাতে তৈরি বা পরিচিত খাবারের প্রতি তার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
গল্প ও রূপকথার সবজি: মাটির নিচের নানা সবজি বা বইয়ের পাতার রঙিন ছবি দেখিয়ে তাদের পুষ্টিগুণ সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিন। এরপর সেই সবজি দিয়ে রান্না করে দিলে শিশু আনন্দের সাথেই তা গ্রহণ করবে।
পারিবারিক ভোজনরসিকতা: এক কোণায় একলা শিশুকে মোবাইল দিয়ে খাইয়ে দেওয়ার চেয়ে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস করুন। খাবারের প্রশংসা করুন, একে অপরের সাথে গল্প করুন। বড়দের উৎসাহ দেখে শিশুও তখন খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তির রঙিন পর্দা দিয়ে শিশুর শৈশবের স্বাভাবিক ক্ষুধাকে দমিয়ে না রেখে, তাকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনুন। খাবার টেবিল হোক ভালোবাসার আদান-প্রদান ও গল্পগুজবের এক সুন্দর প্রাঙ্গণ, যেখানে স্ক্রিনের আলো নয়, বরং পারিবারিক উষ্ণতাই শিশুর মন ও দেহকে পুষ্ট করে তুলবে।