12/07/2026
ভাই, এই পোস্টটা যদি এখন না পড়েন, রাতে ঘুমানোর আগে মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরবে — "ইশ, আগে জানলে..."
গত পরশু রাত ২টা। আমার ছোটবেলার বন্ধু সাকিব হাউমাউ করে কাঁদতেছে ফোনে।
"দোস্ত, আমার বোনটা আর নাই রে..."
২১ বছরের মেয়ে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে হাসিখুশি মেয়েটা। ৩ মাস ধরে খালি বলতো, "ভাইয়া, রাতে ঘুম আসে না। খাবার দেখলেই বমি আসে। শরীরটা কেমন জানি ম্যাজম্যাজ করে।"
আমরা সবাই ভাবছি, "আরে সেমিস্টার ফাইনাল, টেনশনে এমন হয়। একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।"
সাকিব ওষুধের দোকান থেকে গ্যাসের ওষুধ আর ঘুমের ট্যাবলেট এনে দিছে। মা বলছে, "নজর লাগছে, হুজুর ডাক।"
হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার রিপোর্ট দেখে আমাদের দিকে তাকায় থাকলো। তারপর বললো, "অনেক দেরি করে ফেলছেন। ওর লিভারে টিউমারটা ছড়ায় গেছে পুরাটা। লাস্ট স্টেজ।"
বিশ্বাস করেন ভাই, মেয়েটা ৩ মাস আগেও টিএসসিতে আড্ডা দিছে, ছবি তুলছে। দেখে কেউ বলবে ওর ভিতরে মৃত্যু বসে আছে?
আরেকটা ঘটনা শোনেন। আমার অফিসের বস, বয়স ৩৪। সিক্স প্যাক বডি, প্রতিদিন জিম করে। প্রোটিন শেক ছাড়া দিন চলে না। লাস্ট মাসে অফিস ট্যুরে কক্সবাজার গেলাম। সি-বিচে ফুটবল খেলতে গিয়ে হঠাৎ পেটের ডান পাশটা চেপে ধরে বসে পড়লো।
ভাবলাম মাসল পুল।
হোটেলে ফিরে দেখি চোখ হলুদ, গায়ে জ্বর ১০২।
ঢাকায় এনে আল্ট্রা করায় ডাক্তার বললো, "আপনার লিভারে ফ্যাট জমে জমে শক্ত হয়ে গেছে। অবস্থা ভালো না। সিরোসিসের দিকে যাচ্ছে।"
সিক্স প্যাকওয়ালা বসের লিভার নষ্ট! কারণ? রাতে জিম করে এসে ডেইলি রেড মিট, ফাস্টফুড, আর উইকেন্ডে বন্ধুদের সাথে "চিল" করা।
দুইটা মানুষ, দুইটা লাইফস্টাইল। কিন্তু শত্রু একটাই।
এইটার নাম — ফ্যাটি লিভার। আমাদের সময়ের নতুন সাইলেন্ট কিলার।
ভাই, লিভার নষ্ট হইলে শরীর আগে থেকে ব্যথা দেয় না কেন?
এইটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। লিভারের কোনো নার্ভ নাই। মানে ব্যথার তারই নাই ওর। আপনি ওরে দিনের পর দিন বিষ খাওয়ান, ও চুপচাপ হজম করবে।
গাড়ির ইঞ্জিনে মবিল না থাকলে যেমন শব্দ করে, লিভার সেটাও করে না।
ও ৮০% ড্যামেজ না হওয়া পর্যন্ত আপনারে কোনো সিগন্যালই দিবে না। যেদিন দিবে, সেদিন আপনি আর উঠে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় থাকবেন না।
আমাদের শরীরের ল্যাবরেটরি হইলো লিভার। আপনি যা খান, যা পান করেন — সব ফিল্টার করে ও।
কিন্তু সমস্যা হইলো, আমরা এখন ফিল্টারটারেই জ্যাম করে দিতেছি।
তাইলে এই বয়সে লিভারটা পচাইতেছি কেমনে?
১. "আমি তো মদ খাই না" এই ভুল ধারণা: ভাই, বাংলাদেশে এখন ৭০% ফ্যাটি লিভারের রোগী কোনোদিন অ্যালকোহল ছুঁয়েও দেখে নাই। এর নাম নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। ভিলেন কে? সয়াবিন তেলে ভাজা সিঙ্গারা, কোল্ড ড্রিংকস, প্যাকেটের জুস, মেয়োনিজ, আর রাত ১টায় ফুডপান্ডা থেকে অর্ডার করা কাচ্চি।
২. "ডায়েট করি তো" বলে মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ খাওয়া: ইউটিউব দেখে পেইন কিলার, ফেসবুকের পেজ থেকে স্লিমিং টি, ফ্যাট কাটার, লিভার ক্লিনজিং পিল। ভাই, ব্যথার ওষুধ আর ভুয়া সাপ্লিমেন্ট গুলা ডিরেক্ট লিভারে গিয়ে আঘাত করে। লিভার আপনারে বাঁচাইতে গিয়ে নিজেই মরে যায়।
৩. ভুঁড়িটারে "ভালো খাই" এর সাইনবোর্ড ভাবা: আয়নায় দাঁড়ায় ভুঁড়ি দেখে বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, স্বাস্থ্য ভালো।" ভাই, এই ভুঁড়ি মানে আপনার লিভারের চারপাশে তেলের ডিপো। এই তেলই ধীরে ধীরে লিভারের সেলগুলারে মেরে ফেলে। চিকন মানুষেরও কিন্তু ভিতরে ভুঁড়ি থাকে — টফি (TOFI) বলে এটারে। Thin Outside, Fat Inside।
শেষ সময়ে লিভার যেই ৪টা সিগন্যাল দেয়, আমরা গ্যাস্ট্রিক ভেবে উড়ায় দেই:
দুপুরে খাওয়ার পর অসহ্য ঘুম, আর সারাদিন ক্লান্তি: মনে হবে ১০ ঘণ্টা ঘুমালেও এনার্জি নাই।
পেটের ডান পাশে উপরের দিকে ভার ভার লাগা: গ্যাস্ট্রিকের মতো, কিন্তু গ্যাসের ওষুধে কমে না।
হঠাৎ করে চেহারা মলিন, চোখের নিচে কালি: আয়নায় দেখলে নিজেরেই চিনবেন না।
হাত-পা চুলকানো, বিশেষ করে রাতে: লিভার বিলিরুবিন ফিল্টার করতে না পারলে চামড়ার নিচে জমে চুলকায়।
ভয় পাওয়ার কিছু নাই ভাই। খবর ভালো।
লিভার হইলো শরীরের একমাত্র অর্গান যেটা নিজে নিজে ঠিক হইতে পারে। ১০% ভালো থাকলেও বাকি ৯০% রিকভার করার ক্ষমতা ওর আছে।
শুধু ওরে একটু সময় দেন, একটু রেস্ট দেন।
আজকে থেকে ৩টা কাজ করেন, লিভার আপনারে সালাম দিবে:
২০০ টাকার টেস্ট: বয়স ২০ পার হইলে একটা SGPT আর আল্ট্রাসনোগ্রাম করেন। এই দুইটা রিপোর্টই বলে দিবে আপনার লিভার হাসতেছে না কাঁদতেছে। একটা পিৎজার দাম, কিন্তু আপনার পুরা ফ্যামিলির কান্না থামায় দিতে পারে।
চিনিরে না বলেন: কোল্ড ড্রিংকস, প্যাকেট জুস, মিষ্টি — এইগুলা ডিরেক্ট লিভারে গিয়ে ফ্যাট হয়। পানি খান, ডাবের পানি খান, লেবুর শরবত খান চিনি ছাড়া। ৩০ দিন পর নিজেই টের পাবেন শরীর হালকা।
রাত ১১টার মধ্যে ঘুম: লিভার তার মেরামতের কাজটা করে রাত ১১টা থেকে ৩টার মধ্যে। আপনি যদি ওই সময় জেগে থেকে ফোন টিপেন বা নেটফ্লিক্স দেখেন, লিভার তার কাজ করতে পারে না। আবর্জনা জমতেই থাকে।
ভাই, আমরা ৩০ হাজার টাকার ফোন কিনলে ২ হাজার টাকার গ্লাস প্রটেক্টর লাগাই। আর আল্লাহর দেওয়া একমাত্র ল্যাবরেটরি, যেটা একবার নষ্ট হলে লাখ টাকা দিয়েও ফেরত পাওয়া যায় না — ওইটার যত্ন নিই না।
এই পোস্টটা সেভ করে রাখেন।
আর আপনার ওই বন্ধুটারে মেনশন দেন, যে সারাদিন বসে থাকে, ভুঁড়ি নিয়ে গর্ব করে, আর বলে "খাইলে মোটা হয় না"।
একটা শেয়ার হয়তো কারো বোনরে, কারো বাপরে বাঁচায় দিবে।
আমরা তো "কালকে থেকে" বলতে বলতে অনেক দেরি করে ফেলি।
আজকেই একটা SGPT টেস্ট করান ভাই। নিজের জন্য, ফ্যামিলির জন্য।
লেখা ঃ- Learn with love