11/08/2026
সুন্দর জীবন বোধ ‼️‼️‼️
আমার জীবনের একটা গল্প শোনাই। খুব সহজ সাধারণ একটা ঘটনা- কিন্তু আমার জীবনে এই ঘটনাটার প্রভাব অনেক। জসিমের সিনেমা দেখা এক ভ্যানচালক আমাকে শিখিয়েছিলেন জীবনটাকে অন্যভাবে দেখতে!
২০০৫ এর শেষদিকের কথা। বুয়েটে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। থাকি ড. এম এ রশীদ হলে। হলে কিছু অসাধারণ বন্ধু পেয়েছি। সবাই দেশের জন্য কিছু না কিছু করতে চায়। তখন উত্তরবঙ্গে চলছে মঙ্গা পরিস্থিতি। সেখানে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্যে জর্জরিত মানুষ। আমরা ঠিক করলাম ত্রাণ বিতরণ করতে যাব। সবাই মিলে খুব অল্প সময়ের ভেতরে বেশ ভালো একটা অঙ্কের টাকা তুলে ফেললাম। সেই টাকা দিয়ে কম্বল কিনলাম। আর কিনলাম কিছু রিক্সা-ভ্যান। বন্ধুরা মিলে ত্রাণ বিতরণ করতে গেলাম গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। উজান বুড়াইল- ভাটি বুড়াইলের চরে।
কত যে স্মৃতিময় ঘটনা ঘটলো সেখানে! বালুর চরে ত্রাণের ভ্যান ঠেলে নিয়ে যাওয়া, কুয়াশার ভেতরে তিস্তার বুকে নৌকায় ভাসা, ঢেউয়ের তালে খোলা গলায় গান, বিরান চরের ভেতরে পথ হারিয়ে ফেলা, তীব্র শীতে বাসের ছাদে ওঠার সাধ মিটে যাওয়া- প্রতিটা স্মৃতিই অনবদ্য!
কিন্তু এতসব স্মৃতির ভেতরে একটা স্মৃতি আলাদা করে রয়ে গেছে আমার ভেতরে, অনুভূতি হয়ে। সহজ সুন্দর একটা স্মৃতি। ঠিক ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা হয়তো সাথে থাকা বন্ধুরাই ভালো বলতে পারবে। আমার মনে আছে নির্যাসটুকু।
একদিন দুর্গম চরে ত্রাণ বিতরণ শেষে আমরা ফিরে আসছি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে, চারিদিক মোটামুটি জনশূন্য। শেষ পথটুকু একটা রিক্সা-ভ্যানে চড়ে ফিরতে হবে। কিন্তু ফেরার জন্য কোনো ভ্যান পাচ্ছি না। কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম- একটা টঙের দোকানের সামনে একটা খালি ভ্যান দাঁড়ানো। কাছে গিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম- “ভ্যানটা কার?” তিনি ইশারায় ভেতরের দিকে দেখিয়ে দিলেন।
দেখি দোকানের ভেতরে একটু ফাঁকা জায়গা, সেখানে একটা টিভি চলছে। টিভিতে জসিমের সিনেমা। ভ্যানচালক বসে খুব মন দিয়ে সিনেমা দেখছেন। আমরা ওনাকে বললাম, “আমাদের নিয়ে যান- শীতের রাত, ভাড়া একটু বাড়িয়ে দেব”। উনি রাজি হলেন না। আমরা দ্বিগুণ ভাড়া দিতে চাইলাম। তারপর তিনগুণ…
উনি একটা সরল হাসি দিয়ে জানালেন – আজ আর কোথাও যাবেন না।
সারাদিনে তিনি যতটুকু উপার্জন করতে চেয়েছেন, সেটা হয়েছে। এখন তিনি সিনেমা দেখবেন। জসিমের সিনেমা। যত অভাব, যত দারিদ্র্যই থাকুক, এই সহজ সুখের চেয়ে আর কিছুই এখন তার কাছে দামী না। আজকের মতো তিনি তৃপ্ত, জীবনের সাথে বোঝাপড়া আজকের মতো শেষ। তিনগুণ ভাড়ার লোভ তাকে আর টলাতে পারবে না!
বন্ধুদের কেউ কেউ বিরক্ত হলো, কেউ হতাশ। আমি হলাম মুগ্ধ- সেই মুগ্ধতা এখনও গেল না। কী অদ্ভুত, কী অসাধারণ! যে অঞ্চলে অর্থাভাবে মানুষ দুইবেলা খেতে পায় না - সেখানেই একজন মানুষ কী অবলীলায় উপার্জনের সীমারেখা টেনে দিলেন, একটা নির্দোষ সুখের জন্য!
এই গল্প এক বড়ভাইকে শোনানোর পর উনি বলেছিলেন- “এসবের জন্যেই এরা জীবনে উন্নতি করতে পারে না”। কথাটা হয়তো আসলেই সত্যি! তবে ওই বড়ভাইয়ের চোখে আমি দেখেছিলাম অস্থিরতা, অতৃপ্তি। আর ওই রিক্সাচালকের চোখে দেখেছিলাম তৃপ্তি, প্রশান্তি।
জীবনে ছোটার দরকার আছে, এটা আমি মানি। আমিও তো কম ছুটিনি। কিন্তু ওই যে ভ্যানচালক- তিনি আমার ভেতরে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এখন আমি জানি, ছোটার যতটা দরকার- থামারও দরকার ততটাই- কিংবা তার থেকেও বেশি।
একটা গাড়ির শুধু ইঞ্জিন শক্তিশালী হলেই হয় না, ব্রেকও শক্তিশালী হতে হয়। জীবনটাও তো অমনই।
অনেকে ছুটে চলার ভেতরেই আনন্দ পায়, সেই আনন্দকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু এই অস্থির সময়ে আমার বারবার মনে হয়- এই যে একটু থেমে জীবনকে উপভোগ করা- এটারও খুব দরকার।
কখনও ছুটতে ছুটতে খুব ক্লান্ত লাগলে আমি সেই ভ্যানচালকের কথা ভাবি। তখন মনটা শান্ত হয়। আর প্রতিবারই ভ্যানচালকের সাথে মনের ভেতর আসেন জীবনানন্দ বাবু, তাঁর ‘ঊনিশশো চৌত্রিশের’ কবিতা নিয়ে-
“আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না”
--------------
চমক হাসান
ADILA - আদিলা তে সবাইকে ওয়েলকাম.... 🥰🥰
কোঠা বাড়ি শপিং সেন্টার, নিচতলা, শপ নং ১৩৬।