09/07/2026
শ্রাবণের আকাশটা সকাল থেকেই ভারী হয়ে ছিল। মেঘের ঘনঘটায় দুপুরবেলাতেই মনে হচ্ছিল যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জানালার পাশে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল অনিক। যান্ত্রিক শহরের চেনা কোলাহল আজ অনেকটাই শান্ত। পিচঢালা রাস্তাটা বৃষ্টির অপেক্ষায় যেন চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে।
হঠাৎ করেই একঝলক ঠান্ডা বাতাস ঘরের পর্দাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। আর তার পরপরই শুরু হলো রিনিঝিনি শব্দ। প্রথমে দু-এক ফোঁটা, তারপর চারপাশ ধুয়ে-মুছে নামল মুষলধারে বৃষ্টি।
জানালার কাচ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। অনিক জানালাটা সামান্য খুলে দিল। সাথে সাথেই মাটির সেই সোঁদা গন্ধটা তার নাকে এসে ধাক্কা দিল—যে গন্ধটা নিমেষেই মনকে কোনো এক অজানা নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বৃষ্টির শব্দে শহরের চেনা আওয়াজগুলো ঢাকা পড়ে গেছে। রাস্তায় দু-একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলছে। পথচারীরা ছাতা মাথায় দিয়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। কেউ কেউ আবার ছাতা থাকার পরেও জেনেশুনে ভিজছে, যেন এই বৃষ্টির জল তাদের মনের সব ক্লান্তি আর বিষাদ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
অনিকের মনে পড়ে গেল ছোটবেলার দিনগুলোর কথা। তখন বৃষ্টি মানেই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার আনন্দ, খাতার পাতা ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানিয়ে জমা জলে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। আর খিচুড়ি-ডিম ভাজার সেই চেনা সুবাস, যা রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই নিষ্পাপ আনন্দগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা, ট্রাফিক জ্যাম আর অফিসে যাওয়ার ঝক্কি। কিন্তু আজকের এই ছুটির দিনের বৃষ্টিটা অনিককে আবার সেই ফেলে আসা দিনগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনে অনিকের ভাবনায় ছেদ পড়ল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার পুরনো বন্ধু আবিরের নাম। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে চেনা গলায় আবির বলে উঠল, "কী রে অনিক, বাইরে যা বৃষ্টি হচ্ছে! মনে আছে কলেজ লাইফে এইরকম দিনে আমরা ক্লাস বাঙ্ক করে নদীর পাড়ে চলে যেতাম?"
অনিক হেসে ফেলল। স্মৃতিগুলো কত জীবন্ত! দুজনে মিলে প্রায় আধঘণ্টা ধরে পুরনো দিনের আড্ডা দিল। বৃষ্টি যেন আজ শুধু আকাশ থেকেই ঝরছে না, স্মৃতির দুয়ারগুলোকেও একে একে খুলে দিচ্ছে।
বিকেলের দিকে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমল, কিন্তু রেশ রয়ে গেল। গাছের পাতাগুলো ধুয়ে একেবারে গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠতেই জমা জলে তার প্রতিফলন এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করল।
অনিক