14/01/2026
#নিবদ্ধ_এক_প্রহেলিকা
#সাদিয়া
#স্পেশাল পর্ব
শেখ বাড়ির বিশাল ঘড়ির কাঁটা ঠিক তিনটেয় এসে ঠেকেছে। সময়টা দুপুরের মাঝামাঝি। সাধারণত এ সময় ডাইনিং রুম প্রায় ফাঁকাই থাকে। দুপুরের খাবার শেষে সবাই যে যার ঘরে বিশ্রামে মগ্ন হয়। তবে বাড়ির পুরুষেরা ব্যতিক্রম। তারা তখন অফিসে ব্যস্ত। ইয়াছির সকালবেলা বের হলে ফেরে সন্ধ্যার দিকে—এ তো তার পুরোনো অভ্যাস। যদিও ইশানের জন্মের পর সেই অভ্যাসে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। বিয়ের পরও রাত করে ফেরার স্বভাব ছিলো। কিন্তু এখন বাড়ি থেকে বেরোলেই কখন আবার ফিরবে—এই চিন্তায় সারাক্ষণই মগ্ন থাকে।
শুধু ইয়াছিরই নয়, আনসারি সাহেবের অবস্থাও প্রায় একই। অফিসের কাজ শেষ হতেই তিনি ছুটে আসেন বাড়িতে। একমাত্র নাতিকে পেয়ে যেন তিনি চাঁদ হাতে পেয়েছেন। শেখ বাড়ির সকলেরই ইশানের প্রতি গভীর আসক্ত। কিন্তু এত আদরে সে যে দিন দিন একটু ‘বাদর’ হয়ে উঠছে—এই বিষয়টি সবার চোখ এড়ায়নি।
ধীর গতিতে, এক পা… তারপর আরেক পা করে কেউ এগিয়ে আসছে রান্নাঘরের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে চরম সতর্কতা অবলম্বন করছে। লাল নেলপলিশে রাঙানো ফর্সা পা দু’টি চোখে পড়ার মতো আকর্ষণীয়। অথচ সেই পায়ে পরানো শব্দময় নুপুর তার নিজের কাছেই বিরক্তিকর ঠেকছে। মা জোর করেই এসব পরিয়ে দেন—তার নিজের এসব মোটেও ভালো লাগে না। এসবের আদৌ কি কোনো দরকার আছে?
এই মুহূর্তে যদি নুপুরের ঝুমঝুম শব্দে অপরাধী সতর্ক হয়ে যায়, তবে তাকে ধরবে কীভাবে? বিশাল এক মুশকিল।
তবুও সব বাঁধা এড়িয়ে নুপুরের মালিক অবশেষে পৌঁছাল রান্নাঘরে। ঘন পাপড়ির গোল গোল চোখ মেলে প্রথমেই উঁকি দিল রান্নাঘরের ভেতরে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখটা বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। অবচেতনে এক হাত উঠে এল ঠোঁট, মুখে—সে কি সত্যিই যা দেখছে, তাই?
ইশান বসে আছে রান্নাঘরের মেঝেতে। সামনে মিষ্টির এক বিশাল প্যাকেট—শুধু প্যাকেটই নয়, ভেতরটা উপচে পড়া মিষ্টিতে ভরা। আর সেই মিষ্টিগুলো একের পর এক ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে ইশানের পেটে। চিবিয়ে খাওয়ার প্রয়োজনও যেন সে বোধ করছে না। রাক্ষসের মতো গিলে চলেছে। মিষ্টিগুলোর আকার ছোট, তাই গিলতে কোনো অসুবিধেও হচ্ছে না তার।
সানায়ার কাছে এ এক বিভৎস দৃশ্য। তার ভাই এভাবে কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে মিষ্টি চালান করে দিচ্ছে পেটে। আর তারপর কিছুক্ষণ পর আবারও বায়না ধরবে মিষ্টির?
সানায়ার মাথায় বুদ্ধি এলো এক অন্যরকম। যেহেতু চোরকে আজ ধরেই ফেলেছে সবার কাছে ধরিয়ে দেওয়াও যেনো এক ন্যায্য দায়িত্ব।
সানায়া হঠাৎ গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠলো। সানায়ার চিৎকারে সবাই তরস্ত। এদিকে ইশান হঠাৎ দিশা হারিয়ে বুঝলো না কি করবে। মুখে পুড়ে থাকা মৃষ্টি গুলো গিলবে নাকি উগ্রিয়ে দেবে। কোন দিকে যাবে সে এখন। এই সানায়ার বাচ্চা তাকে সব সময় বিপদে ফেলে। এখন মা এসে দেখলে নির্ঘাৎ এক ঘা বসিয়ে দেবে। গত সাপ্তাহে দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে এনেছে। দাঁতে বেশ পুকায় খেয়েছে। মিষ্টি খাওয়া বারন। কিন্তু তার পরান তো সবসময় মিষ্টি মিষ্টি করে। তারই বা কি দোষ?
ইশান চটজলদি উঠে এসে খপ করে মুখ চেপে ধরলো সানায়ার। সানায়া কেঁচোর মতো ছটফট করছে ইশানের থেকে বাচতে। ইশান মুখের শেষ টুকরো মিষ্টি গিলে সানায়ার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,"বুন্ডি চুপ চুপ। চকলেট দিব। চুপ।"
চকলেটের লোভ দেখিয়েও কোনো কাজ হলো না। বরং সানায়া উল্টো এক কামড় বসিয়ে দিল ইশানের হাতে। ইশান চট করে সানায়াকে ছেড়ে দিল। রাগে তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
পরক্ষণেই ইশানও হুট করে সানায়ার হাতে কামড়ে ধরল। সানায়া এবার বাড়ি ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল।
পরপর দু’বার সেই চিৎকারের শব্দে প্রভা দুতলার সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত রান্নাঘরে এসে পড়ল। তার সঙ্গে শাশুড়ি আজমেরীও ছুটে এলেন। বৌ-শাশুড়ি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একবার একে অপরের দিকে তাকালেন, তারপর চোখ গেল বাচ্চা দু’টির দিকে। কী কাণ্ড! দু’জনেই একে অপরকে কামড়ে ধরে আছে।
প্রভা এবার শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ইশানের পাশে দাঁড়াল। ইশান মাকে দেখে সানায়াকে ছেড়ে দৌড় দেবে দেবে ভাবতেই, মুহূর্তের মধ্যেই প্রভা তার কানে চেপে ধরল। নরম কানটা সঙ্গে সঙ্গেই লাল বর্ণ ধারণ করল।
চোখ বড় বড় করে শাসনের ভঙ্গিতে প্রভা ইশানকে জিজ্ঞেস করল,
—বোনকে কামড়ালে কেন? আজই পুলিশে ধরিয়ে দেব। কোনো মাফ নেই তোমার।
ইশান চোখভরা জল নিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ঠোঁট উল্টে সে অভিযোগের সুরে তুতলিয়ে বলল,
—মা, বুন্ডি আমাকে আগে কামড়েছে। আমি কিছুই করিনি। ইশান ভালো ছেলে।
প্রভা সানায়ার দিকে তাকাতেই সে আরও গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল—যেন প্রমাণ করতে চাইছে, ইশান মিথ্যে বলছে। ইশান মাথা নত করে ফিসফিস করে বলল,
—মা, সত্যি আমি কিছু করিনি।
সানায়া এবার কান্নার তেজ কিছুটা কমিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
—মা, ও মিষ্টি খেয়েছে। ডাক্তার না বারন করেছে মিষ্টি খেতে? ওর দাঁতে পোকা। তবুও খেয়েছে।
প্রভা মেঝের দিকে তাকাল এবার। সত্যিই—মিষ্টির অনেকটা অংশ এদিক-সেদিক ছড়িয়ে আছে মেঝের উপর। তার মানে মেয়েটা সত্যিই বলছে। সে নিঃশব্দে ভাবতে লাগলো ,এই ছেলে কার মতো হয়েছে? এত দুষ্টু!
আজমেরি ততক্ষনে নাতিকে কোলে নিয়ে দূরে দাঁড়িয়েছে। " থাক না , এক দুটো মিষ্টি খেলে দাঁতে পোঁকা হবেনা। তাইনা দাদুভাই?।
দাদির কাছে গিয়েই ইশান যেন একটু স্বস্তি পেল। এখন আর মা তাকে মারতে পারবে না। আর এই সানায়াকে… সে পরে দেখে নেবে। সুযোগ পেলে পিঠে ধুপধুপ করে দু’টো কিল বসিয়ে দেবে। এমন সব পরিকল্পনার মাঝেই হঠাৎ টের পেল—মা তাকে ধরতে আসছে আবারও।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ইশান দাদির কোল থেকে নেমে উড়ন্ত চিলের মতো ছুট লাগাল। প্রভা কি আর ছেলের সঙ্গে দৌড়ে পারে! পেছন থেকে কয়েকবার জোরে ডাকলেও ইশান শুনল না।
হঠাৎই সে কারও সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে—ইহসান কাকু এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। কী মজা! এবার তো সে পুরোপুরি ভেবে নিল, সে বেঁচে গেছে এই বিপদ হতে।
ইহসান ঠোঁট বাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ," কি চলছে?"
উষা ,ইহসানের পিছে থেকে উত্তর দিলো,"নিশ্চই ইশান বাবুর দুষ্টুমি চলছে?
প্রভা, সানায়াকে কোলে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল," দুষ্টুমি না অন্যায় করেছেন উনি। মেয়েটাকে কামড়ে শেষ করে দিয়েছে। দেখ দেখ ,হাতটা লাল হয়ে দাঁতের চিহ্ন বসে গেছে। কত জোড়েই না কামড়েছে বাদরটা। "
উষা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে বলল," আচ্ছা আপা, পুলিশকে ফোন দিচ্ছি ওরা এসে নিয়ে যাক ইশানকে। আমাদের কাছে তো একটা মেয়ে আছেই। দুষ্টু ছেলেটাকে বরং পুলিশের কাছে দিয়ে আসি। কি বলো?
- হ্যা তাই কর তো। দুষ্টু গরুর থেকে শূন্য গোয়াল ভালো।
উষার হাতে ফোন দেখে এবার যেনো ইশান কেঁদেই দিলো। মিষ্টি খাওয়ার অপরাধে পুলিশ কাকু তাকে ধরে নিয়ে যাবে? এটা অন্যায়। তার মা আর খালা মিলে তার সাথে শত্রুতা করছে?
ইশানের বেগতিক কান্না দেখে সানায়ার মুখে হাসি ফুটলো। একদম ঠিক হয়েছে।
আজমেরি সামনে এগিয়ে এসে বলল ," হচ্ছেটা কি? আমার নাতিকে কেউ বিরক্ত করবে না বলে দিচ্ছি। তাহলে সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দিব।"
এদিকে ইহসান কোলে উঠিয়েছে ইশানকে। ইশান দাদিকে কান্নারত অবস্থায় শিশুসুলভ কন্ঠে হুংকার দিয়ে বলছে," দাদু মা পঁচা। উষা পঁচা। বের করি দাও সবাইকে। বাবা আসলে বলি দিব। সবাইকে মেরে দেবে। বুন্ডি তোমাকেও মেরে দেবে বাবা। "
সানায়া , ইশানের কথা শুনে হাসি মুখটা আবার মিলিয়ে গেলো। টুপ টুপ করে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে। পরে আবারও ধরলো তার কান্না। এ মেয়ে মানতে পারেনা বাবা তাকে মারবে। বাবা ইশানকে মারবে।
-বাবা তোমাকে মারবে।
-না তোমাকে মারবে।
-তোমাকে তোমাকে। পুলিশ কাকুর কাছে দিয়ে আসবে।
এভাবে চলতে থাকে দুজনের মাঝে। দুজনই কান্না করছে আর অপরজনকে বলছে ," বাবা তোমাকে মারবে।" এদের কান্ড দেখে প্রভা তো টেবিলে বসে পড়লো মাথায় হাত দিয়ে। আর সবাই হতবিহ্বল।
---------
আকাশের উজ্জল চাঁদে মাঝে মাঝে মেঘেরা এসে ভীড় জমাচ্ছে। কিন্তু তা ক্ষনিকের জন্যই। স্থায়িত্ব মিলছেনা মেঘেদের। কারন তারা ভাসমান। তারা আপন সুখে আকাশের বিশাল বুকে ভাসছে। আর মেঘ সরে যেতেই চাঁদ তার ক্ষীণ আলোই পূনরায় আলোকিত করছে অন্ধকার ধরনী।
প্রভা এক বার দুইবার করে সানায়ার মাথা থেকে পিঠ অব্দি আলতো স্নেহের পরশ ছুঁয়ে দিচ্ছে। সানায়া প্রগভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। মায়ের হাতের নরম আন্দোলন তাকে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে রেখেছে।
বিপরীত দিকে ইয়াছির বসে আছে কক্ষের বামদিকে রাখা সোফায়। পিঠ হেলানো চোখ বন্ধ। প্রশস্থ বুকে লেপ্টে আছে ইশান। সে ও জেগে নেই। হাতের বুড়ো আঙ্গুল মুখে ঢুকিয়ে বাপের কোলে ঘুমিয়ে আছে। সে কি তার সুখতর ঘুম।
এভাবে আরও মিনিট পাঁচেক পর ইয়াছির উঠে এসে বিছানায় শুয়ে দিল ইশান কে। ইশান আর সানায়া এখন পাশাপাশি। দুজনেই ঘুমন্ত। জেগে থাকলে এভাবে পাশাপাশি সুয়ে কখনই শান্ত থাকতনা। একজন অপরজনকে মেরে খামছে একাকার করে ফেলতো।
সানায়া ,ইশানের মাস সাতেক বড়। বেশি বড় ছোট না হলেও প্রভা ছেলেকে শিখিয়েছে সানায়াকে আপা বলতে। কিন্তু না। উনি আপা বলবেন না। উনি ডাকবেন বুন্ডি। একবার ভূল ক্রমে কেউ একজন বুন্ডি শব্দটা ব্যবহার করেছিলো। তারপর থেকেই সানায়া হয়ে গেলো ইশানের বুন্ডি। ইশান বয়সের তুলনায় অতি চতুর। মাত্র তিন বছর বয়সে উনি অনেক কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে নিজের মাঝে।
প্রভা ছেলের কপালে চুমু একে দিয়ে ইয়াছিরের দিকে তাকালো। লোকটা তাকিয়ে আছে তার দিকেই। প্রভা ইতস্ততা নিয়েই বলল , "সবসময় বলি এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না।
-আমার চোখ দিয়ে সব কিছু দেখার অধিকার আছে। তা দুনিয়া হোক ,প্রকৃতি অথবা আমার বউ। এটা একান্তই আমার বিষয়।
-আচ্ছা সেসব ছাড়ুন। কফি খাবেন?
-ছাদে আছি, নিয়ে এসো।
কথাটা বলেই ইয়াছির ফোনটা নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো। আর প্রভাও বসলো না সেখানে। শাড়ি ঠিক করতে করতে চললো নিচতলার রান্নাঘরে।
----------
কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়াছির কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসছে। তাই সে পেছনে ফিরল। হ্যাঁ—প্রভা, তার বউ। সে তাদের দু’জনের জন্য দু’কাপ কফি নিয়ে এসেছে। ইয়াছির প্রভার হাত থেকে নিজের কফির মগটা নিয়ে ছাদের দোলনাটায় বসে পড়ল।
এটা নিতুর দোলনা। বাবা আনসারী শেখ খুব শখ করে মেয়ের জন্য দোলনাখানা বানিয়ে দিয়েছিলেন।
নিতু বিকেলের সময় ছাদের ছোট টবে লাগানো গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলত দোলনাটায় বসে। এক পা নিচে ঝুলিয়ে, আরেক পা তুলে ঠিক উপরে রাখত। তখন নিজেকে সে সত্যিই এক রাজকন্যা মনে করত।
কিন্তু সেসব এখন অতীত। নিতু নেই। এখন এই দোলনার মালিক সানায়া। সানায়াও মায়ের মতোই বিকেলে ছাদে আসে। ঠিক এক পা ঝুলিয়ে, সেই ভঙ্গিতেই বসে—যেভাবে একসময় নিতু বসে থাকত।
আজমেরি শেখ তা দেখে খুব কাঁদেন। সানায়া নানুর কান্না দেখে কিছুই বুঝতে পারে না। কেন কাঁদছে তার নানুমণি।
প্রভা নিজেও ইয়াছিরের পাশে এসে বসে। তারপর ইয়াছিরের কাঁধে মাথা রেখে শান্তির এক দীর্ঘ নিশ্বাস টানে।
—সময় কত অদ্ভুত, না ইয়াছির সাহেব?
—হুম।
—আব্বা ছোটবেলায় বলতেন, সময় আর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আম্মাই তাকে এমন কঠিন বাক্যটা শিখিয়েছিলেন।
ইয়াছির সামান্য হাসল। প্রভাকে এখন আগের তুলনায় একটু বেশি চঞ্চল মনে হয়। এর কারণ কি শুধু সময়ের পরিবর্তন, নাকি ভেতরে ভেতরে অন্য কিছু?
নিতুর মৃত্যুর পর থেকে ইয়াছির অনেক শান্ত হয়ে গেছে। আগের মতো এখন আর কথা বলে না, হাসেও না। জীবনের সব রং যেন তার ছোট্ট নিতুর সঙ্গেই হাঁরিয়ে গেছে। সে হাসবে কীভাবে?
তাই ইয়াছিরকে যতটা সম্ভব অতীতের স্মৃতি থেকে সরিয়ে আনতে প্রভা চেষ্টা করে। অযথা অনেক ধরনের প্রশ্ন করে। কথা বলে। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব? এই ক্ষত যে ভীষণ গভীর।
ইয়াছির ,প্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। প্রভা তাতে চোখ বন্ধ করে আছে। খুব শান্তি মিলে এই মানুষটার কাছে। তার ভালোবাসা তার আবেগ তার অনুভূতি সব কিছু মিশে আছে ইয়াছিরের মাঝে।
ইয়াছির কফির মগে চুমুক দেয়। ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে গরম কফি।
—তুমি খাবো না? ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে যে!
—না, মন চাইছে না আর।
—ঘুম পাচ্ছে তোমার?
প্রভা চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দেয়, —হ্যাঁ, একটু।
—তাহলে চলো, রুমে যাই।
—না, এখানেই ভালো লাগছে। আমাকে এভাবে কিছুক্ষণ থাকতে দিন।
ইয়াছির সোজা হয়ে বসে থাকে, আর প্রভা আধো-আধো ঘুমে তলিয়ে যেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর প্রভা সত্যিই নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ইয়াছির প্রভার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকে অনেকসময় যাবৎ। বয়সই বা কত হয়েছে মেয়েটার? চব্বিশ—হয়তো। তবু এখনো প্রভার ঘুমন্ত মুখ দেখলে প্রথম দিনের মতোই ভালো লাগা কাজ করে তার ভেতরে। কত নিষ্পাপ, কতই না স্নিগ্ধ।
অনেক সময় ধরে তাকিয়ে আছে ইয়াছির। হঠাৎ মনের ভূলে মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে আসে একটি বাক্য ,"ভালোবাসি তোমায়।"
-আর আমিও।
প্রভার উত্তর দেওয়ায় কিছুটা চমকে উঠলো ইয়াছির। সে কি তাহলে ঘুময় নি? ঘুমের ভান ধরে ছিলো?
-জেগে আছো?
-কিছুটা।
ইয়াছির আরও শক্ত করে নিজের মাঝে আটকে ধরলো প্রভাকে।
--------------
আজ নভেম্বর ১১
সজিব বরাবরের মতোই ড্রাইভিং সিটে বসে নিজের দক্ষতায় পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে শান্তভাবে বসে আছে ইয়াছির। সজিব মাঝে মাঝে কিছু জিজ্ঞেস করছিল, আর ইয়াছির সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছিল।
একসময় ইয়াছিরের গাড়ি থামল পাহাড়ের কিনারায়। রাত অনেক হয়ে গেছে। ইয়াছির গাড়ি থেকে নামতেই এক বৃদ্ধ লোক সামনে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধকে দেখামাত্রই ইয়াছির তাকে জড়িয়ে ধরল। বৃদ্ধ হেসে ইয়াছিরের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর ইয়াছির মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল,
—কেমন আছেন, সর্দার?
সর্দার এক গাল হেসে বললেন,
—তোমার কথা খুব মনে পড়ে। বছরের এই একটা দিনই তুমি এখানে আসো। কেন রে, এই বুড়োটাকে কি আর বাকি দিনগুলোতে মনে পড়ে না?
ইয়াছির নরম স্বরে বলল,
—আপনি ছাড়া আমার আর কে আছে? আপনার জন্যই তো বেঁচে আছি।
সর্দার মাথা নেড়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,
—আমি কিছুই করিনি। সবই মহান সৃষ্টিকর্তার হুকুমে হয়েছে।
কথা বলতে বলতে ইয়াছির আর সর্দার সামনে এগোচ্ছিল। হঠাৎ ইয়াছির ডাকল,
—সজিব। গাড়ি থেকে...
পাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। ইয়াছির আবার ডাকল, তবু সজিব সাড়া দিল না। কী হয়েছে দেখতে পেছনে ঘুরে তাকাতেই বুঝল—সজিব এখানে নেই। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সে তার সেই পুরোনো অভ্যাসমতো এদিক-ওদিক লাফাচ্ছে। সমস্যা একটাই, এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক নেই। ওপাশ থেকে বউ ঠিকমতো কথা শুনতে পাচ্ছে না।
সজিবের এই বউ-পাগলামি দেখে ইয়াছিরের খুব হাসি পায় বরাবরই। মনে মনে সে ভাবল—আসল পুরুষ তো বউ-পাগলই হয়।
সজিব দূর থেকে চিৎকার করে জানাল,
—আসছি ভাই, অপেক্ষা করেন। নেটওয়ার্কের সমস্যা।
এখন সজিব আগের মতো বড় ভাইয়ের সামনে আর “বউ-বউ” করে না। কিন্তু তার সেই পাগলামি দেখলেই যে কেউ বুঝে যাবে। বউয়ের প্রতি ভালোবাসাটা অটুট। থাকুক তাদের ভালোবাসা আজীবন।
এরপর সর্দার ইয়াছিরকে একমুঠো খেয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানালেন। ইয়াছির তাতে অসম্মতি জানাল না। সর্দারের ভাত যে তার পেটে আগেও পড়েছে। ইয়াছিরের সম্মতি পেয়ে সর্দার কক্ষের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলেন সব ব্যবস্থা করতে।
ইয়াছির বসে পড়ল পাথরের এক বিশাল টুকরোর ওপর। যেখানে প্রভা প্রায়ই এসে বসত এখানে। সে দূরে তাকিয়ে রইল। মাথার ভেতর কত কী যে ঘুরছে!
""হঠাৎ ইয়াছিরের ভারী দেহ খানিকটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল পানির মধ্যে। মধ্যরাতে বিকট শব্দ হলো, কিন্তু কেউ কিছুই টের পেল না। সবাই তখন শান্তির ঘুমে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর কি এসবের দিকে নজর দেওয়ার সময় আছে? নেই।
সার্থক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—যেখানে শরীরটা পড়েছিল, মুহূর্তের মধ্যেই সেই জায়গাটুকু রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। অন্ধকার নিশীথে সেই রক্তের রঙ মেহেরের চোখেও ভীষণ ভয়ংকর লাগলো।
তবে নদীতে তখন বিশাল স্রোত। ইয়াছিরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বহুদূর। প্রায় মৃত মানুষটির নিস্তেজ দেহ ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছিল অচেনা কোনো গন্তব্যের দিকে—নাম-ঠিকানাহীন এক অজানা পথে। কোথাও কোনো বাঁধা পাচ্ছিল না। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও যেন বন্ধের উপক্রম। গুলি লেগেছিল ঠিক পিঠের এক কোণায়। অদক্ষ মানুষ দক্ষ ভাবে গুলি চালাতে পারবেনা অবশ্যই। মেহেরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। মেহের ঠিক নিশানা করে ইয়াছিরের উপর গুলি চালাতে পারেনি। ব্যর্থ হয়েছে সে।
হঠাৎ ইয়াছিরের জ্ঞান ফিরতে লাগলো আপনা আপনি। মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত। তিনি যাকে বাঁচিয়ে রাখবে তাকে মারার সাধ্য কারও নেই। ইয়াছির হালকা সজাগ হতেই বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাটুকু করল। জীবনটা এখানে থেমে গেলে চলবে না। তাকে বাঁচতে হবে—বাঁচাতেই হবে। তার চন্দ্রকে বাঁচাতে হবে, তার পরিবারকে। এক বেঈমানকে তার প্রাপ্য শাস্তিটুকু দিতেও তাকে বেঁচে থাকতে হবে।
সে সর্বশক্তি দিয়ে সাঁতরে কূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু স্রোত এতটাই প্রবল যে কিছুতেই পারছিল না। বারবারই ব্যর্থ হচ্ছিলো এমন প্রতিকূল পরিবেশের কাছে। তার শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে আছে, বাম হাতটা ঠিকমতো নড়াতে পারছে না। তাই ঠিক ঠাক ভাবে সাঁতরাতেও পারছেনা। তবুও তার চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই।
ঠিক তখন কিছু দূরে মাছবোঝাই একটি ছোট ট্রলার পানির ওপর ভেসে চলছিল। তাদের গন্তব্য কাপ্তাই লেক। ট্রলারের একজন হঠাৎ পানির মধ্যে অদ্ভুত কিছু লক্ষ করল। সঙ্গে সঙ্গে সে আরও কয়েকজন সঙ্গীকে ডেকে আনলো। তারা সাদা আলো ফেলল পানির উপর। সেখানে কোনো রকমে ভেসে থাকা ইয়াছিরকে দেখে সবাই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষন। তারা আশা করেনি এমন কিছু।
এত গভীর, ক্ষরস্রোতা নদীর মাঝখানে একজন মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করছিল নিজেকে ভাসিয়ে রাখার। ট্রলারের কেউ আর অপেক্ষা করল না। দুজন জেলে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ঝাঁপ দিল ইয়াছিরকে বাঁচাতে।তারপর কোনো রকমে ধরে ইয়াছিরকে টেনে তুলে আনা হলো ট্রলারের ওপর।
ইয়াছির তখন ট্রলারের লোহার মেঝেতে শুয়ে আছে। পিঠের পেছন দিক থেকে এখনো টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সবাই দিশাহারা এসব দেখে। এমন অবস্থায় কী করবে—কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
হাসপাতালে নেবে? যদি পুলিশের ঝামেলা হয়? তার উপর কাল সকালের মধ্যেই ট্রলারকে কাপ্তাই পৌঁছাতে হবে। কেউই নিজেদের ঝামেলা বাড়াতে চাইছিল না।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাড়ালো পাহাড়ি সর্দার। সবাই সম্মান করে বলল,
—ঝামেলা হয়েছে, সর্দার। এই চ্যাংড়াটা পানিতে ভেসে যাচ্ছিল। পিঠে গুলিও লেগেছে। আমাদের দুই মাঝি ওকে তুলে এনেছে। এখন কী করব?
সর্দার কিছু বললেন না সব কিছু শুনে। বসে ইয়াছিরের চোখ পরীক্ষা করলেন। তারপর একজনের সাহায্যে তাকে উল্টে দিলেন। পরনের শার্ট খুলে গুলির জায়গাটা ভালো করে দেখতে লাগলেন। কালচে, ভেজা, থকথকে রক্ত লেগে আছে ক্ষতস্থানে। সর্দার সেখানে হাত রাখতেই ইয়াছিরের শরীর ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠল। জ্ঞান এখনো পুরোপুরি যায়নি তার।
সর্দার হুকুম দিলেন, ইয়াছিরকে ভেতরের একটি কক্ষে নিয়ে যেতে। সবাই তাই করল। এরপর দ্রুত নিজের থলে থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করলেন। তিনি জানতেন—এগুলো দিয়ে ইয়াছিরকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব নয়। তবু পরিষ্কার একটি গামছা দিয়ে ক্ষতস্থান শক্ত করে বেঁধে দিলেন। সঙ্গে কয়েক ধরনের গাছগাছালি দিয়ে তৈরি ওষুধ লাগালেন, আর কিছুটা খাইয়েও দিলেন।
তবু সত্য যে—দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে ইয়াছিরকে।এভাবে বেশিক্ষণ রাখা যাবে না। সর্দার নিজেও এখানে আর বেশি কিছু করতে পারছেন না, তার ওপর রাত অনেক হয়ে গেছে। সর্দার সবাইকে অনুরোধ করলো কাছের কোনো হাসপাতালে ছেলেটাকে নিয়ে যেতে। কিন্তু এসব ঝামেলায় কেউ এগিয়ে আসতে চাইলোনা। পুলিশের ঝামেলা অনেক বড় ঝামেলা। একবার ফেঁসে গেলে ভূগান্তির শেষ নেই। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে সর্দার বসে রইলো ইয়াছিরের পাশে। আর যতটুকু সম্ভব চালিয়ে নিতে থাকলো তার প্রাথমিক চিকিৎসা।
ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে নৌপথে ট্রলার ঢুকল চট্টগ্রামে। সর্দার কোনো রকমে ইয়াছিরকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছাল নিজের জায়গায়। সেখানেই শুরু হলো ইয়াছিরের চিকিৎসা। পাহাড়ি মানুষজন নানান কৌশলে ইয়াছিরকে সুস্থ করে তুলতে লাগল।
ইয়াছিরের পুরোপুরি সুস্থ হতে লেগে গেল বিশ দিন। এই সময়টায় সে ছিল পরিবারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন—কোনো খোঁজ নেই, কোনো খবর নেই। দিন-রাত সে তার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করল, যেন তার পরিবার আর তার চন্দ্রের কোনো ক্ষতি না হয়। সে উঠে দাঁড়াতে পারত না, ঠিকভাবে বসতেও পারত না। এই অবস্থায় কীভাবে সে পরিবারের কাছে ছুটে যাবে?
এর মধ্যেই একদিন ইয়াছির মাধুবির থেকে কোথায় কোথায় জানতে পেল—সে এখানে আসার দু-তিন দিনের মধ্যেই এক মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে। খবরটা শুনে ইয়াছির একটুও বিভ্রান্ত হলো না। কারণ বিভ্রান্ত হওয়ার মতো কিছুই ছিল না। কিন্তু মাধুবি যখন বলল মেয়েটি গর্ভবতী, আর অসহায় অবস্থায় সর্দার তাকে পেয়েছিলেন—তখন ইয়াছিরের মন কেমন করে উঠল।
মেয়েটিকে দেখার জন্য তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জন্ম নিল। সে জানে না মেয়েটি কে, তবুও একবার দেখে নিতে ইচ্ছে করছিল। কী যেন একটা ভাবনায় সে বারবার ব্যাকুল হয়ে উঠছিল।
কিছুদিন পর ইয়াছির প্রথমবারের মতো সেই বিশেষ কক্ষ থেকে বের হলো যেখানে চলছিলো তার চিকিৎসা। এত দিন ধরে সে একবারও দিনের আলো সচক্ষে দেখেনি। এখন সে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে, তবে হাটার শক্তি এখনও পুরোপুরি নেই তার।
সন্ধ্যা কিংবা রাতের প্রহরে ইয়াছির বসে থাকতো সেই উঁচু ঘরটার এক কোণে। এখানে বসলে পাহাড়ের সুন্দর্য খুব ভালো করে পরিলক্ষিত করা যায়। কিন্তু প্রায় সে লক্ষ্য করত—একটি মেয়ে পাহাড়ের অনেকটা কিনারায়, একটি বিশাল পাথরের টুকরোর উপর বসে থাকে। মেয়েটি রাতের আকাশে তাকিয়ে থাকে, ঠিক যেন তার চন্দ্রের মতো। ইয়াছিরের কাছে অদ্ভুত লাগে। বারবার মনে হয়, “এ কি তার চন্দ্র?” কিন্তু তার চন্দ্র এখানে কিভাবে আসবে? তার বাবা, আনসারী শেখ, অবশ্যই নিজের ছেলের বউ আর বংশধরকে রক্ষা করবেন—এই বিশ্বাসই ছিল ইয়াছিরের।
এভাবে দিন এগোতে লাগল। ইয়াছির নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ করার চেষ্টা করল, আর পাশাপাশি একবার সেই মেয়েটিকে দেখতে চাইল। কিন্তু মেয়েটি বড় লম্বা ঘোমটা টেনে রাখে, শরীরে চাদর পেচিয়ে বসে থাকে—এ কারণে পেছন থেকে তাকে চিনতে পারাও কঠিন হয়ে যায়।
হঠাৎ এক রাতে পাহাড়িদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হলো কিছু একটা নিয়ে। চারপাশে সকলের আহাজারি।ইয়াছির প্রথমে বুঝতে পারল না কি নিয়ে এই বিশৃঙ্খলা। মাধুবি প্রায়শই ইয়াছিরের কক্ষে আসতো; তার যা প্রয়োজন, যা দরকার—সব কিছু সে নিজ হাতে করতো।
সেই সময় মাধুবি দৌড়ে এসে সব খুলে বলল ইয়াছিরকে। শহরের এক লোক এসেছে। সেই মেয়েকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যেতে চাইছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিপুল ঝামেলা। পাহাড়িদের মাঝে অনেকে আটকাতে গিয়ে প্রাণ হাড়িয়েছে। পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলছে তাদের।
ইয়াছির সব শুনে মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করল। মাধুবি অনায়াসে উত্তর দিল—
—চন্দ্রপ্রভা।
ইয়াছির নামটা শুনে হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। নিজ জায়গায় বসে থাকতে পারল না আর। ইতিমধ্যে সে বুঝে গেছে সেখানে কি ঘটছে, আর তার চন্দ্রের সঙ্গে কি হয়ে গেছে এ কদিন। এত কাছাকাছি থেকেও দুজনকে আলাদা করেছে নিয়তি—এ ভাবনায় ইয়াছিরের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো আরও।
--
সব ভাবনার মাঝেই সর্দার এসে ইয়াছিরের কাঁধে হাত রাখলেন। ইয়াছির চমকে উঠল। এতক্ষণ পুরোনো সবকিছু মনে পড়তেই তার চোখে পানি আটকে ধরল কেনো যেনো। তারপরের ঘটনা সে আর মনে করতে চায়না। হ্যাঁ—এখানেই সেই বেঈমানকে নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছিলো নিতু। যাকে সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছে, সে-ই নিজের প্রতিশোধ নিয়েছে।
নিতুর সিদ্ধান্তটা ছিল অদ্ভুত, তবু দৃঢ়। জীবনে সে কেবল একজন মানুষকেই ভালোবেসেছে। একজনকেই স্বামী হিসেবে মেনেছে। একজন পুরুষের সঙ্গেই সংসার করেছে। অথচ সেই মানুষটিই তাকে ঠকিয়েছে, তার পরিবারকে নিঃস্ব করেছে। তার শাস্তি পাওয়া উচিতই ছিল।
কিন্তু নিতু জানত—এ ধরনের লোকদের আইনের আওতায় আনলেও বিশেষ লাভ নেই। কিছুদিন পর তারা আবার বেরিয়ে আসবে, আবার শুরু হবে তাদের নোংরা পরিকল্পনা। দেশ আর তার পরিবারের জন্য এই লোকটা ছিল এক চলমান হুমকি। তাই নিতু কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। যেহেতু এই লোকটাই তার ভাইকে হত্যা করেছে, সে নিজ হাতে তাকে শেষ করবে। সে তার স্বামী হতে পারে, কিন্তু তার ভাইয়ের খুনি—এই অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই।
কিন্তু নিতুর মন বরাবরই কোমল। কঠোর হয়েও হতে পারেনা। সার্থক হিংস্র, মৃত্যুই তার প্রাপ্র। কিন্তু নিতু একা লোকটাকে যেতে দেবে না। ভালোবাসা আর ঘৃণার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক অদ্ভুত খোঁজ, তাকে বাধ্য করছে সাথী হতে।
এই জীবন, এই নিঃসঙ্গতা, সার্থককে ছাড়া নিতুর জন্য অসম্ভব।
হয়তো পরিবার আবারও বিয়ের চাপ দেবে। হয়তো একদিন তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করবে, আবার সংসার শুরু হবে। কিন্তু নিতু চায় না। এই জীবনে আর কোনো সংসার। তার স্বামীর স্পর্শ ছাড়া, অন্য কোনো পুরুষের কাছে তার হৃদয় আর শরীরকে সমর্পণ করার কথা সে ভাবতেও পারে না।
এই কারণে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সে তার সাথী হবে। তারা দুজন, একে অপরের সাথে চলে যাবে এমন এক জায়গায়, যেখানে পৃথিবীর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।, কোনো বিচার নেই, কোনো অতীত নেই। শুধু থাকবে তারা—নিতু আর সার্থক। সেখানে সার্থক যত হিংস্র হোক, তার আবেগের ধ্বংসপ্রবণ শক্তি আর কোনো প্রভাব রাখতে পারবে না।
সেখানেই হবে তাদের সংসার—যা কেবলই তাদের। পৃথিবীর নোংরা নিয়ম, ন্যায়, বিধি—সব দূরে চলে যাবে। সেখানে হবে শুধু চাওয়া, থাকা, ভালোবাসা। হ্যাঁ, হবে। হতে হবে।
------------
সর্দারের কুঠি থেকে বেড়িয়ে সজীব আবারও গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে পাহারের আঁকা বাকা রাস্তায়। ঢাকায় ফিরছে না। যাচ্ছে অন্য কোথাও।
ইয়াছির সিগারেট টানতে টানতে ফোন করলো প্রভাকে। প্রভা অপাশ থেকে কল রিসিভ করে সালাম দিলো।
ইয়াছির সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
" পৌছেছো?"
-হ্যা বেশ খানিক আগেই এলাম। আপনি কোথায়?
-একটা কাজ শেষেই ফিরবো। ভোরের আগেই সিরাজগঞ্জ পৌছাবো। আমার বাজান কি করে?
-উনি ঘুমিয়ে পরেছে।
-আর সানায়া পাখি?
-উনি নানা জানের কোলে উঠে বসে চাঁদ দেখছে। ভীষন খুশি মেয়েটা।
-আর তুমি?
-আমি কি?
-তুমি খুশি না?
-ভীষন। কত দিন পর এলাম বাপের ভিটায়। আরও ভালো লাগবে যদি আপনি দ্রুতই চলে আসেন।
-অপেক্ষা করো আসছি। এসে তোমাকে খুশি করে দিচ্ছি।
-ফোন রাখছি।
-কেনো? লজ্জা পাচ্ছো?
ওপাশ থেকে প্রভা ফোন কেটে দিল। ইয়াছির বাঁকা হেসে ফোনটা পকেটে গুজে সজিবকে জিজ্ঞেস করলো ," কত সময় লাগবে রে সজিব্যা?"
সজিব চোখ সামনে রেখেই উত্তর দিলো "চলে আসছি ভাই।"
-আব্বে হালা একটা কথা ক তো, আমি যে তোরে পেচাইয়া বাইন্দা রাখছিলাম গোডাউনে ,তুই ছুটলি কেমতে?
-ভাই আমি এক কৌশল রপ্ত করছি। মনে করেন বহুত সাধনার ফল। এই আপনি আমারে যেহানেই বাইন্দা রাহেননা কেন দেখবেন আমি ওনথিকাই ছুইডা আমু।
-লেওরা তোরতো দেহি মেলা পাওয়ার। এই পাওয়ার কোন জ্যোতিষির থিকা রপ্ত করছো?
-জ্যোতিষ বিজ্ঞান ইহসান মির্জার তরফ থিকা।
-ওরে তার মানে ইহসান ছুটায়ছে। দুইডারেই বাইন্দা রাখুম গোডাউনে। তারপর দেখমু কোন কৌশল রপ্ত কইরা বাইর হইবার পারও।
এমন খুনশুটি পূর্ন কথা বলতে বলতে ইয়াছিরের গাড়ি থেমে গেলো। তারা চলে এসেছে তার কাং্খিত যায়গায়।
ইয়াছির ,চট্টগ্রামে সার্থকের পুরনো সেই বাগান বাড়িতে এসেছে।
একদম ধীরে ধীরে, দুই কদম পা বাড়িয়ে ইয়াছির পৌঁছালো একটি কক্ষে। সেখানে থাকা লোকেরা এসে চাবি দিয়ে তালা খুলে দিল কক্ষটার। ইয়াছির অন্ধকারে ঘরে প্রবেশ করল। এটি সেই ঘর—যেখানে সার্থক প্রভাকে এনে রেখেছিল।
ইয়াছির রুমের লাইট জ্বালাতেই মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গেই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিল। লাইটের আলো সহ্য হচ্ছিল না তার; চোখ ধাধিয়ে উঠছিলো।
ইয়াছির আস্তে করে একটি চেয়ার টেনে বসল মেয়েটির পাশে। মেয়েটি নিচের মেঝেতে বসে আছে। পড়নের কাপড় ময়লা, চুল অগোছালো। দেখে মনে হচ্ছিল—কত দিনই বা গোসল করেনি।
মেয়েটি হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল,
—আলো নেভাও। আমার চোখে লাগছে।
ইয়াছির ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক চিলতে হাসি খেললো। মেয়েটি তাকাল তার দিকে—চোখ দুটো ফ্যাকাসে, ক্লান্ত, যেন আলো নয়, জীবনের ভারেই ঝাপসা হয়ে আছে।
তারপর কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে মিনতি করল,
—ছেড়ে দাও, ইয়াছির। আমাকে আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে দাও।
ইয়াছির ঠান্ডা গলায় বলল,
—আমি তো কখনোই তোমার জীবন নষ্ট করতে চাইনি। সেই প্রথম থেকেই বরং তুমি আমার জীবনটা ধ্বংস করে এসেছ।
—আমি যা করেছি, তার ভুলের মাশুল তিনটা বছর ধরে দিয়ে যাচ্ছি। আর কত? আমাকে মেরে ফেলো, না হয় আমাকে আমার পরিবারের কাছে যেতে দাও। আমার ভাইয়ের কাছে ফিরতে দাও…
—তোমার ভাই জানেই না তুমি বেঁচে আছো, —ইয়াছির কণ্ঠে তিরস্কারের ধার মেহেরের প্রতি।
—তাকে অকারণে জানিয়ে লাভ কী, মেহের? তাদের কাছে তুমি মৃতই থাকো। আবার কেন তাদের জীবনে ঝামেলা বাড়াতে যাবে?
মেয়েটি কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল,
—না… আমি এভাবে বেঁচে থাকতে চাই না। প্লিজ, আমাকে এভাবে বাঁচিয়ে রেখো না। এই বদ্ধ ঘরে আমি দম নিতে পারছি না। আমাকে মেরে ফেলো। আমি মরতে চাই।
ইয়াছির চোখ সরু করল। কণ্ঠে উঠে এল কঠোরতা,
—এবার আর সেই ভুল করব না, শালি। দেখব ছেলে বিয়ে করাতে গিয়ে তুমি আবার কোথা থেকে এসে হাজির হও—“আমি ফিরে এসেছি, ইয়াছির।” তখন ছেলের শাশুড়ির সামনে আমার মান-সম্মান থাকবে?
মেয়েটি ভাঙা গলায় বলল,
—তুমি আমার প্রতি আর এতটা কঠোর হয়ো না… একসময় তো ভালোবাসতে। বলো না—ভালোবাসতে না?
ইয়াছির হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিল, ঘৃণায় ঠোঁট কেঁপে উঠছে সেসব ভাবতে গিয়ে,
—ছ্যাহ… এসব মনে করলেও ঘেন্না লাগে। চুপ করো।
ঘরটায় আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা—যেখানে শুধু শোনা যায় ভাঙা নিঃশ্বাস আর অদৃশ্য যন্ত্রণার শব্দ। আলো জ্বলছে। তার মাঝেই কথা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইয়াছির। এখানে আর সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। বউকে কথা দিয়েছে—জলদি ফিরবে। তাই সে বড় বড় পা ফেলে ধাপে ধাপে বেরিয়ে গেল সেই রুম থেকে।
আর পেছন থেকে ভেসে এলো মেহেরের আত্নচিৎকার ছড়িয়ে পড়ল ঘরজুড়ে। সে চিৎকার করছে, আর সেই ধ্বনি যেন ইয়াছিরের ধীরস্থির পদক্ষেপকেও কিছুটা থমকে দিয়েছে। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছে দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি, এবং সময়—এগুলোর কাছে কোনো আবেগ আর থেমে থাকতে পারবে না।
ইয়াছিরের প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা, জন্ম নিয়েছিল এক ভ্রান্ত মানুষের প্রতি—যে মানুষটি কখনো সত্যিই তাকে ভালোবাসেনি। মেহের প্রতিদিন একটি না একটি পুরুষের সঙ্গে মিশত, তার আত্মা ছিল পুরুষদের প্রতি দুর্বল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না সে। ইয়াছিরকে চেয়েছে, আবার অন্য পুরুষদেরও।
তাদের সম্পর্কের মাঝেই মেহের সার্থকের সঙ্গেও বেশ কয়েকবার এক বিছানায় কাটিয়েছে। ধীরে ধীরে দুই বছর কেটে গেলে ইয়াছির বুঝতে শুরু করল—মেহের অন্য পুরুষদের প্রতি আসক্ত।
ইয়াছির সেই বেঈমানী মেনে নিতে পারল না। বরাবরই সে এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাকে অপছন্দ করত। তার অনুভূতি নিয়ে খেলেছে মেহের। তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে, অন্য কারও সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা—এই সবই ইয়াছিরের কাছে অমার্জনীয়।
সম্পর্কের শুরুতেই মেহের ইয়াছিরকে বাধ্য করেছিল তাকে ভালোবাসতে। কিন্তু এই একই মেহের, অন্যদের নিয়ে স্বপ্ন বুনেছে, অন্যের কাছে নিজেদের ভঙ্গুর আবেগ সমর্পণ করেছে।
ইয়াছিরের হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি হাসি—সবই বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। কেবলই প্রশ্ন—কেন? কেন এমন এক ভ্রান্ত ভালোবাসা তাকে এভাবে ঘৃণায়, ব্যথায় ফেলে দিয়