অসমাপ্ত গল্পটা

অসমাপ্ত গল্পটা নিজের ভালো অন্য কেউ দেখবে না
নিজেকেই দেখতে হবে
(গল্প পরতে ভালোবাসি)
আলহামদুলিল্লাহ
(1)

 #পুর্নহীন_পূর্ণতা  #লেখিকা_তানিয়া_চৌধুরী  #পর্ব ৪ ফজরের আযানের সুমধুর সুরে ঘুম ভাঙে সারার। কাল রাতে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি...
20/02/2026

#পুর্নহীন_পূর্ণতা
#লেখিকা_তানিয়া_চৌধুরী
#পর্ব ৪

ফজরের আযানের সুমধুর সুরে ঘুম ভাঙে সারার। কাল রাতে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করার পর শরীর আর দিচ্ছিল না, তাই সোজা রুমে এসে শুয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরটা তেমন একটা ভালো লাগছে না ওর। রাতেও না খেয়ে ঘুমিয়েছে। রাফসানের ওই বিষাক্ত কথাগুলো শোনার পর খিদে জিনিসটাই সে ভুলে গিয়েছিল। অপমানে আর কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল ওর, তাই না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সারা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এলো। এরপর জায়নামাজ বিছিয়ে মন দিয়ে নামাজ আদায় করে নিল। এইটা সারার একটা বড় গুণ যে সে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে সারা পরম শান্তিতে কোরআন তেলওয়াত শেষ করল। মনে হলো বুক থেকে অনেক বড় একটা পাথর নেমে গেছে।

তেলওয়াত শেষে সে জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। সকালের আলো এখনো পুরোপুরি ফুটেনি, চারদিকে আবছা আবছা অন্ধকার লেগে আছে। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আর হালকা ঠান্ডা হাওয়া সারার চোখেমুখে লাগতেই মনটা একদম ফ্রেশ হয়ে গেল। রাতের সেই বিভীষিকা আর অপমানের স্মৃতি যেন এই মিষ্টি বাতাসে কিছুটা ধুয়ে গেল। সারা চোখ বুজে এক দীর্ঘশ্বাস নিল।

অনেকক্ষণ পর যখন সকালটা পুরোপুরি হলো, সারা রুম থেকে বের হয়ে নিচে নেমে এলো। নিচে আসতেই দেখল রায়ান চৌধুরী সোফায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। আজ শুক্রবার, তাই রায়ান চৌধুরীর আজ কোনো তাড়া নেই। কলেজ বা অফিস না থাকায় বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছেন তিনি। সারা ধীরে ধীরে পায়ে রায়ান চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়াল এবং মৃদু স্বরে বলল।

"আসসালামু আলাইকুম আব্বু। শুভ সকাল।"

রায়ান চৌধুরী সারার কণ্ঠ শুনে খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকালেন। সস্নেহে হাসলেন তিনি।

"ওয়ালাইকুম আসসালাম। শুভ সকাল মা। কখন উঠেছিস?"

"অনেকক্ষণ আগে আব্বু।"

রায়ান চৌধুরী সারার মুখের দিকে একটু ভালো করে তাকালেন। অভিজ্ঞ চোখ দুটো সারার ফোলা ফোলা চোখের পাতা আর ম্লান চেহারা দেখে কুঁচকে গেল। তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন।

"তোর চোখ এমন ফোলা কেন মা? কেঁদেছিস? নাকি রাফসান আবার কিছু বলেছে তোকে?"

সারা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গালের সেই চড়ের দাগ আর রাতের অপমানগুলো ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল, কিন্তু সে চায় না তার জন্য বাবা-ছেলের মধ্যে অশান্তি হোক। সে চট করে সামলে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল।

"না না আব্বু, ভাইয়া কিছু বলেনি। আসলে কাল রাতে একদমই ঘুম হয়নি, তাই চোখটা এমন ফোলা লাগছে হয়তো।"

রায়ান চৌধুরী ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি জানেন রাফসান কতটা একগুঁয়ে আর কর্কশ। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "রাফসানটা দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে মা। ওর পক্ষ থেকে আমি তোর কাছে মাফ চাইছি। তুই চিন্তা করিস না, আজ ওর সাথে আমি কথা বলব।"

সারা জোর করে ঠোঁটে একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, "আব্বু তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো। ভাইয়া কিছুই বলেনি আমাকে।"

ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির ধাপে ধাপে রাফসানের ভারি পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। সে বেশ ধীরগতিতে আয়েশ করে নিচে নামছিল। সারা আর তার বাবার মাঝখানে কী কথা হচ্ছিল সেটা সে শুনতে পায়নি ঠিকই, কিন্তু দুজনকে ওভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে ওর মাথার রগ দপদপ করে উঠল। রাফসানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে মনে মনে ভাবল, "নিশ্চয়ই এই জংলি মেয়েটা কাল রাতের নাটক সাজিয়ে এখন আব্বুর কাছে নালিশ করছে। সুযোগ পেয়েই আমাকে ফাঁসানোর ফন্দি আঁটছে।"

রাফসান নিচে নামতেই রায়ান চৌধুরীর তীক্ষ্ণ নজর ছেলের ওপর পড়ল। তিনি হাতের খবরের কাগজটা শব্দ করে পাশে রাখলেন। তাঁর শান্ত চোখে এখন একরাশ গাম্ভীর্য। তিনি বেশ কড়া গলায় ডাকলেন।

"রাফসান।"

রাফসান পকেটে হাত গুঁজে ভাবলেশহীন মুখে এগিয়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল। গলার স্বরে এক চিলতে নির্লিপ্ততা মিশিয়ে বলল।

"জ্বি আব্বু, ডাকলে কেন।"

রায়ান চৌধুরী একবার সারার ম্লান মুখের দিকে তাকালেন, তারপর সারার দিকে ফিরে স্নেহের স্বরে বললেন।

"যা তো মা, আমার জন্য এক কাপ কড়া করে চা বানিয়ে নিয়ে আয়। আজ এই সাতসকালে কাজের লোকের হাতের পানসে চা খেতে একদম মন চাইছে না। তুই নিজ হাতে বানিয়ে নিয়ে আয়, তোর হাতের চা খেলেই মনটা চাঙ্গা হবে।"

সারা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে এক মুহূর্তও সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছিল না। রাফসানের আগুনের মতো দৃষ্টি এড়িয়ে সে দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সারা আড়ালে যেতেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল। রায়ান চৌধুরী এবার সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর দৃষ্টি এবার সরাসরি রাফসানের চোখের ওপর স্থির। তিনি নিচু কিন্তু অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন।

"রাফসান, তোর সাথে আমার কিছু সিরিয়াস কথা আছে। বস এখানে।"

রাফসান মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করল। সে নিশ্চিত যে এখন সারার হয়ে ওকালতি শুরু হবে। সে অবজ্ঞার সাথে বাবার সামনের সোফাটায় গা এলিয়ে বসল, যেন সে কিছুই জানে না।রায়ান চৌধুরী এবার আরও আষ্টেপৃষ্ঠে গাম্ভীর্য জড়িয়ে নিলেন। ড্রয়িংরুমের পিনপতন নিস্তব্ধতায় তাঁর কণ্ঠস্বরটা যেন কোনো এক কঠিন দণ্ডাদেশের মতো শোনাল। তিনি ছেলের চোখের মণির দিকে সরাসরি তাকিয়ে পাথরচাপা গলায় বললেন।

"আমি তোর সাথে সারার বিয়ে দিতে চাই।"

কথাটা শোনামাত্র রাফসানের মনে হলো মাথার ওপর বিশাল কোনো বাজ পড়ল। ওর কানের ভেতর দিয়ে যেন গরম সিসা বয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য ওর চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। বিস্ময় আর চরম ঘৃণায় রাফসান সোফা থেকে ঝড়ের বেগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।

"হোয়াট। আব্বু, তুমি কি সেন্স হারিয়ে ফেলেছ। কী বলছো এসব তুমি। ওই কালকূট জংলি মেয়েটাকে আমি বিয়ে করব। ইটস এ জোক রাইট।"

ওর কন্ঠের তীক্ষ্ণতায় সারা ড্রয়িংরুম থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু রায়ান চৌধুরী একদম অবিচল। তিনি অত্যন্ত শান্ত, নিচু কিন্তু হাড়কাঁপানো গম্ভীর গলায় হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন।

"কুল ডাউন রাফসান। গলার স্বর নামা। শান্ত হয়ে বোস। আমার সিদ্ধান্ত সচরাচর কেউ বদলাতে পারে না সেটা তুই জানিস। আর আমার কথা শুধু এইটুকুই না, আরও অনেক কিছু শোনার বাকি আছে তোর। আগে বোস।"

রাফসান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। ওর চওড়া বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।রায়ান চৌধুরী এবার সোফায় হেলান দিয়ে বসে নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর চোখেমুখে এখন একজন কঠোর ব্যবসায়ীর ছায়া। তিনি রাফসানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শীতল গলায় বললেন।

"প্রথম কথা হচ্ছে, আমি তোর বাবা। আমার সিদ্ধান্ত বা কথা রাখা তোর নৈতিক দায়িত্ব। এখন শোন আসল কথা। তুই হয়তো ভাবছিস তুই আমার একমাত্র ছেলে বলে আমি তোর ওপর খুব দরদ দেখাবো। ভুল ভাবছিস রাফসান। ছেলের মঙ্গলের জন্য আমি কতটা কঠোর হতে পারি, সেটা তোর কল্পনার বাইরে। আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড মাই পয়েন্ট।"

রাফসান রাগে ফুঁসছে কিন্তু বাবার গলার স্বর শুনে কিছুটা দমে গেল। রায়ান চৌধুরী আবার বলতে শুরু করলেন।

"আই ডোন্ট লাইক টু ওয়েস্ট মাই টাইম উইথ ইউজলেস টক। আমি খুব সংক্ষেপে বলছি। আমার যত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে, তার সবটাই আমি আজই সারার নামে লিখে দেয়ার ব্যবস্থা করব। লজিকটা খুব সিম্পল। তুই যদি সারাকে বিয়ে করিস, তবে সারার যখন আঠারো বছর পূর্ণ হবে, তখন তার স্বামী হিসেবে তুই ওই বিশাল সম্পত্তির বৈধ অংশীদার বা অধিকারী হবি। ইন দ্যাট কেস, ইউ উইল গেট এভরিথিং।"

রাফসানের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। রায়ান চৌধুরী এক বাঁকা হাসি দিয়ে শেষ মোক্ষম চালটা চাললেন।"এখন চয়েস তোর। অপশনটা খুব সোজাসাপ্টা। তুই কি সারাকে বিয়ে করে এই সাম্রাজ্য আগলে রাখবি, নাকি এক কাপড়ে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি। ভাবিস না আমি তোকে জোর করব। ইট ইজ কমপ্লিটলি আপ টু ইউ। তোর ইচ্ছে হলে রাজি হস, না হলে নেই।"

রাফসান অবাক হওয়ার চরম সীমায় পৌঁছে গেল। তার নিজের জন্মদাতা পিতা আজ সামান্য এক রাস্তার মেয়ের জন্য নিজের ছেলেকে ত্যাজ্য করার হুমকি দিচ্ছে। সব সম্পত্তি ওই মেয়েকে লিখে দেবে আর তাকে হতে হবে ঘরছাড়া। রাফসানের রগ চটা স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে রাগে হিংশ্র পশুর মতো সোফার কুশন খামচে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

"আব্বু। তুমি কি সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছ। ওই অজাত-কুজাত একটা মেয়ের জন্য তুমি নিজের ছেলের ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিচ্ছো। জাস্ট একটা রাস্তার মেয়ের জন্য তুমি আমার সাথে এমন করছ।"

ছেলের মুখে আবারো ‘রাস্তার মেয়ে’ শব্দটা শুনে রায়ান চৌধুরী এবার বাঘের মতো গর্জে উঠলেন। তিনি সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি রাফসানের চোখে চোখ রেখে ধমকের স্বরে বললেন।

"শাট আপ রাফসান। অনেক হয়েছে। তোকে কতবার বলব সারা কোনো রাস্তার মেয়ে নয়, সারা আমার মেয়ে। ও এই বাড়ির সম্মান। এরপর যদি দ্বিতীয়বার ওকে রাস্তার মেয়ে বলে ডাকিস, তবে আমি ভুলে যাব তুই আমার নিজের রক্ত। তখন তোকেও রাস্তার ছেলে বলতে আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করব না।"

রাফসান রাগে আবারও কিছু বলতে গেলে রায়ান চৌধুরী তর্জনী উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো শীতল আর ধারালো। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন।

"ব্যাস রাফসান। আমি তোর কোনো কৈফিয়ত বা সাফাই শুনতে চাই না। কথা একটাই। তোর সামনে রাস্তা এখন দুইটা। হয় সারাকে বিয়ে করে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হবি, না হয় আজীবনের জন্য আমার ত্যাজ্য পুত্র হয়ে এই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবি।"

রাফসান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তাঁর মনে হলো বুকের ভেতর এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ছে। সে পাগলের মতো সোফা থেকে দাঁড়িয়ে পাশে থাকা দামী ফুলদানিটা দুহাতে তুলে সজোরে মেঝেতে আছাড় মারল। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রাফসান গলার রগ ফুলিয়ে উন্মাদ চিৎকার করে উঠল।

"আমার সব কেড়ে নিল ওই রাস্তার মেয়েটা। আমার নাম, আমার প্রতিপত্তি, আর আজ আমার বাবার ভালোবাসা থেকেও আমাকে বঞ্চিত করছে ও। আই উইল কিল হার।"

বলেই রাফসান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে হ হ করে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ঝড়ের বেগে বাড়ির সদর দরজার দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই পেছন থেকে রায়ান চৌধুরীর মেঘগম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

"শুনে রাখ রাফসান। সময় মাত্র আজকের দিনটাই। আজকের সূর্য ডোবার আগে যদি তুই ফিরে এসে আমার কথা না মানিস, তবে ভেবে নিস তোর বাবা আজই মারা গেছে।"

বাবার মুখ থেকে এমন চরম কথা শুনে রাফসানের পা জোড়া যেন মাটিতে গেঁথে গেল। ওর লাল হয়ে থাকা দুচোখ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে সম্পত্তির কথা ভেবে কাঁদছে না। আজ সামান্য একটা 'কুড়িয়ে পাওয়া' মেয়ের জন্য তার নিজের বাবা তাকে মরার কথা বলছ এই অপমান আর আঘাত ওর সহ্য সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। রাফসান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। সে রাগে আর অভিমানে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশের পথে চলে গেল।

রাফসান ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই রায়ান চৌধুরীর দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি সোফায় ধপ করে বসে পড়ে কপালে হাত দিলেন। বাইরে থেকে তাঁকে কঠোর মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তিনি দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছেন। তিনি সব জেনে-বুঝেই এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রায়ান চৌধুরী খুব ভালো করেই জানেন, সারার মতো শান্ত, ধৈর্যশীল আর গুণবতী মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অন্যদিকে, রাফসান দিন দিন প্রচণ্ড জেদি আর অহংকারী হয়ে উঠছে। তার এই আকাশচুম্বী অহংকার আর আভিজাত্যের দম্ভ যদি কেউ ভাঙতে পারে, তবে সে একমাত্র সারাই। রাফসানের এই বুনো স্বভাবকে বাগে আনতে হলে সারার মতো স্নিগ্ধ শাসন প্রয়োজন। রায়ান চৌধুরীর মনে অগাধ বিশ্বাস যে, আজ রাফসান তাঁকে ভুল বুঝলেও একদিন এই সারাই হবে রাফসানের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তাই নিজের কলিজার টুকরো ছেলেকে ঘরছাড়া করার হুমকি দিয়ে হলেও তিনি এই কঠিন জুয়াটা খেলেছেন।

কি হবে এখন রাফসান কি সারাকে বিয়ে করবে আর বিয়ে করলে সারার লাইফটা কি হবে জানতে হলে পর্ববতীর অপেক্ষায় থাকুন আর পেইজটা ফলো দিয়ে রাখুন।

চলবে...!

 #আমার_তুমি #পর্ব_২ #জান্নাত_সুলতানাআজ সকাল থেকে সওদাগর বাড়িতে রান্না বান্না বেশ আয়োজন করা হচ্ছে। বাড়ি বড় মেয়ে কে চেয়ারম...
19/02/2026

#আমার_তুমি
#পর্ব_২
#জান্নাত_সুলতানা

আজ সকাল থেকে সওদাগর বাড়িতে রান্না বান্না বেশ আয়োজন করা হচ্ছে।
বাড়ি বড় মেয়ে কে চেয়ারম্যান এর নাতির জন্য দেখতে আসবে।
কিন্তু কোন নাতি এটা প্রিয়তা বুঝতে পারছে না।
আজ দু টি দিন হয় স্কুলও যেতে পারে না।
বাড়ি ঘর ঝাড়ু মুছা করা থেকে শুরু করে সব আসবাবপত্র পরিস্কার করা।
রান্না বান্না সব করার জন্য কাজের লোক আছে।
কিন্তু মিতা সওদাগর কিছুতেই এই দুই দিন ধরে প্রিয়তা কে বাড়ির থেকে বেরুতে দেয় না।
এটা সে টা কাজ করিয়ে যাচ্ছে।
এর মধ্যে প্রিয়তা বেশ চিন্তা আছে। পাত্র কে হতে পারে?
মির্জা পরিবারে বড় ছেলে মির্জা রাহাত মাহমুদ আর ছোট ছেলে মির্জা সাদনান শাহরিয়া। আচ্ছা আর যাই হোক বাড়ির বড় ছেলে কে রেখে নিশ্চয়ই ছোট ছেলের বিয়ে দেবে না।
এ-সব ভাবতে ভাবতে প্রিয়তা রেডি হয়ে নেয়।
সুন্দর একটা ফ্রক পড়ে গলায় জর্জেট এর একটা ওড়না পেচিয়ে চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে আসে রুম থেকে।
করিডর দিয়ে যাওয়ার সময় নিচে নজর পড়তেই দেখা মিলে দুই জন মধ্যবয়সী লোক আর এক জন মুরব্বি আর কলো সুট পড়া এক জন ব্যক্তি আর তিন জন মহিলাও আছে।
আর সারা আর ওর ছোট চাচার এক মাত্র মেয়ে মাইশা কে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপর আসছে।
মাইশা ওদের দুই বছরের বড় এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।
সারা আর মাইশা উপর এসে দু জনেই প্রিয়তার সাথে কুশল বিনিময় করে আয়নার রুমের দিকে চলে যায়। মাইশা সাথে আছে বলে আর সারা কে জিজ্ঞেস করা হলো না পাত্র কে।অবশ্য প্রিয়তা ভাবে যদি সাদনান মির্জা পাত্র হতো তবে অবশ্যই সারা তাকে জানাতো আর জানাতে না পারলে এতো টা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতো না।
কারণ সারা জানে প্রিয়তা সাদনান কে কি পরিমাণ ভালোবাসে। যদিও সাদনান তা ছোট মানুষ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু হয়তো এক দিন সত্যি তা উপলব্ধি করতে পারবে।
প্রিয়তারা আয়নার রুমে এসে দেখলো
আয়না শুধু শাড়ী পড়ে বসে আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা টুলে।
প্রিয়তা আয়না কে এভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে

-"আপু তুমি রেডি হও নি কেন?
সবাই চলে এসছে।"

বলতে বলতে ড্রেসিং টেবিলের উপর হতে ইয়ার রিং জোড়া হাতে নিয়ে তা পড়িয়ে দেয় আয়না কে।
সারা মাইশা দু জনেই চুপ চাপ বিছানায় বসে দেখে যাচ্ছে। ছোট প্রিয়তা কিভাবে তার বড় বোন কে রেডি করে দিচ্ছে।
প্রিয়তা হঠাৎ করে প্রশ্ন করে আয়না কে

-"মন খারাপ?"

আয়না অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালো ছোট বোনের দিকে।
টুপ করে গড়িয়ে পড়ে বাম চোখ হতে এক ফোঁটা জল

-"ভাইয়া আসবে না?"

চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করে আয়না।

-"বলেছে তো চলে আসবে।
হয়তো এসে পড়েছে।
প্লিজ লক্ষী আপু কাঁদে না।
আর কাঁদলে চোখের কাজল লেপ্টে তোমাকে ভূত দেখা যাবে।
পরে দেখা যাবে পাত্র মানে দুলাভাই তোমাকে দেখতে এসে না দেখেই পালিয়ে যাবে।"

কথা টা বলতে বলতে হেসে দেয় প্রিয়তা।
পাশ থেকে মাইশা সারাও হাসে।
ঠিক তক্ষুনি কেউ দরজা থেকে বলে উঠে

-"মাশাআল্লাহ।
আমার দুই টা প্রিন্সেস।"

কথা টা বলতে বলতে আয়ান ঘরে ভেতর প্রবেশ করেই বোনদের কপালে আদর করে দিলো।
আয়না জড়িয়ে ধরে আয়ান কে আয়ান ছোট বোনের দিকে নিজের ডান হাত টা বাড়িয়ে দিতেই প্রিয়তাও ঝাপটে জড়িত ধরে বড় ভাই-বোন কে।
কে বলবে এরা দুই মায়ের গর্বে জন্ম?
এদিকে সারা আর মাইশা মুচকি হাসে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো এখানে একজন রমণীর গালে লাল আভা দেখা দিয়েছে।
আয়ান হুট করে নজর পড়ে বিছানায় দুই রমণীর উপর। আয়ান বোনের নিয়ে এতো টাই বিভোর যে এতক্ষণ তাদের নজরেই আসে নি।
কিন্তু এখানে যে তার প্রেয়সীও থাকতে পারে জানা ছিল না।
যাক এক কাজে দুই কাজ হলো।
আয়ান বোনদের ছেড়ে দিয়ে সারা মাইশার সাথে হালকা কথা বলে রুম ত্যাগ করে।
আয়নাও সবার সাথে কথা বলে এখন।এতোক্ষণ মন টা বেচারির বড্ড খারাপ ছিল।
বড় ভাইয়ের আগমনে তা উবে গেলো।
প্রিয়তা আয়নার শাড়ীর কুঁচি গুলো ঠিক করে উঠে দাঁড়াতেই শিউলি এসে বলে গেলো প্রিয়তা কে রান্না ঘরে ডাকছে।
প্রিয়তার মন টা বড্ড খারাপ হলো।
তবে মুখে হাসি রেখে সারা আর মাইশা কে আয়নার রুমে রেখে নিচে যাওয়ার অগ্রসর হয়।
নিচে যেয়ে প্রিয়তা লিভিং রুমে থাকা সব কয়টা মানুষ কে সালাম দিলো।
শফিক সওদাগর পরিচয় করিয়ে দিলো।
বাড়ি ছোট মেয়ে কে।
এক জন মিতা সওদাগরের বয়সী মহিলা ওকে কাছে ডেকে নিয়ে আদর করে দেয়।
প্রিয়তা গিয়েছে অনেক বার মির্জা বাড়ি এটা সাদনানের মা সালেহা বেগম।
কথা বলে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে সালেহা প্রিয়তা কে।
প্রিয়তা সবার সাথে কথা বলে রান্না ঘরে চলে যায়।
প্রিয়তা রান্না ঘরে প্রবেশ করতেই মিতা সওদাগর অনেক গুলো ফল একটা ঝুরিতে প্রিয়তার হাতে দিয়ে বলল

-"এগুলো কেটে নিয়ে বসার ঘরে দিয়ে আসবি।"

হুকুমের স্বরে বলেই তিনি রান্না ঘর থেকে চলে গেলো। প্রিয়তা বটি নিয়ে সে গুলো কাটতে বসে গেলো।
শিউলি থালা বাসন সব গুছিয়ে রাখছে।
একটু আগেই হয়তো খাবার পর্ব শেষ হয়েছে বুঝতে পারলো প্রিয়তা।
খাবার কথা মাথায় আসতেই পেটের ভেতর ক্ষুধা অনুভব করে।
ইস সকালে শুধু লুকিয়ে দুই টা বিস্কিট খেয়েছে।
মনে হতেই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ে গেলো।
শিউলি বুঝতে পারে।
এগিয়ে এসে কাঁধে রেখে বলে উঠে

-"তোমার বান্ধবী আছে না ছোট আপা?
সারা না কি জানি।অয় কিন্তু খায় নায়।
বলছে তোমার সাথে খাবে বলে সুন্দরী আপা ডারে লইয়া উপর চলে গেছে।"

প্রিয়তা হতভম্ব। অবাক হয়ে তাকালো শিউলির দিকে।
বিস্ময় চাহনি দিয়ে প্রশ্ন করে শিউলি কে

-"কি বলছো এসব চার টা বাজে এখন।"

-"তো আর কইতাছি কি।"

প্রিয়তা আর কিছু বলে না। শিউলিও নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।
আর প্রিয়তা তাড়াহুড়ো সহিতে ফল গুলো কেটে সুন্দর করে সাজিয়ে ট্রেতে করে লিভিং রুমের উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসে রান্না ঘর হতে।
এরমধ্যে সাদনানের দাদা দাদি তাগাদা দেয়।
মেয়ে কে নিয়ে আসার জন্য।
প্রিয়তা উপর চলে যায় আয়না কে আনতে পেছন পেছন আয়ানও আসে।
তার পর সারা আর মাইশা দু জনেই আগে নিচে চলে আসে।
আর আয়ানের অসহায় চোখে তাকায় প্রেয়সীর দিকে।
সে তো এসছিল এই মেয়ের সাথে একটু কথা বলার জন্য।
সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে তার প্রেয়সী তাকে।
অবশ্য রাখবে নাই বা কেন।সে তো করেছেও এমন অপরাধ। কিন্তু সে তো ইচ্ছে করে এমন টা করে নি।এক বার মনে হয় সব দোষ নিজের
তো একবার মনে হয় এই মেয়ে কষ্ট করে একটু মানিয়ে নিলেই তো হয়।
এ-সব ভাবতে ভাবতে আয়ান আয়না কে ধরে নিয়ে নিচে চলে আসে।
রাহাতের দাদি আম্বিয়া মির্জা তিনি তার পাশে বসিয়ে মুচকি হেসে এটা সে টা জিজ্ঞেস করে আয়না কে।
সবাই কথাবার্তা বলে আয়নার সাথে।
কিন্তু প্রিয়তা ভাবছে।
অন্য কথা সাদনান ভাই কেন আসে নি?
ওনি কোথায়?
প্রিয়তা ভাবনার মাঝেই রাহান সহ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে সাদনান।
সাদনান কে দেখেই প্রিয়তার বুকের ভিতর ধক করে উঠে। সাদা সার্ট চুল গুলো এলোমেলো। মুখে ক্লান্তির ছাপ।এই লোক টা এতো সুন্দর কেন? প্রিয়তার ভাবনার মাঝেই
সালেহা বেগম গিয়ে ছেলের গালে হাত রেখে আহ্লাদী কণ্ঠে বলে উঠে

-"কি দরকার ছিল এতো টা পথ জার্নি করে এখানে আসার?
কাল সকালেও আসা যেতো।"

সাদনান মাকে আশ্বাস দিয়ে ক্লান্ত ভরা কণ্ঠে জানায়

-"আমি ঠিক আছি।
তবে একটু ফ্রেশ হতে পারলে ভালো হতো।"

#চলবে

18/02/2026

Romadan Mubarak 🥰🌙🌙

রাত তখন এগারোটা। বিয়ের ধকল কাটিয়ে বাড়ির সবাই যখন কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই লিভিং রুমে বোমা ফাটালো তিথি।...
18/02/2026

রাত তখন এগারোটা। বিয়ের ধকল কাটিয়ে বাড়ির সবাই যখন কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই লিভিং রুমে বোমা ফাটালো তিথি।

সে সোফায় পা তুলে বসে আয়েশ করে বলছিল,
—“উফ, শরীরটা কেমন ম্যাচম্যাচ করছে! এই সময়ে যদি এক বাটি চকলেট চিপস আইসক্রিম পাওয়া যেত, তবে কলিজাটা একদম জুড়িয়ে যেত।”

প্রমা পাশে বসে ছিল, সে সুযোগ বুঝে তিথির সাথে সুর মেলালো।
—“ঠিক বলেছিস তিথি! আমারও খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই রাতে কে এনে দেবে?”

তিথি আড়চোখে পাশে বসা কাবিরের দিকে তাকাল। কাবির তখন ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। তিথি গলা বাড়িয়ে বলল,
—“কেন? বাড়িতে এত বড় একজন ‘ইতালিয়ান সিইও’ আছেন, আর আমরা আইসক্রিম পাব না? নাকি সিইও সাহেব শুধু ডলারে ডিল করেন, আইসক্রিমের ডিল বোঝেন না?”

সাদ্দাম, আহনাফ আর রোনা তখনো যায়নি,তারা ড্রয়িংরুমেই ছিলো।

সাদ্দাম ফোড়ন কেটে বলল,
—“দোস্ত কাবির,বোন আর বউয়ের আবদার! না করলে কিন্তু আজ রাতে তোর কপালে ঘুম নেই। তুই ইতালিতে গিয়ে কি রোমান্টিকতা সব ভুলে গেছিস?”

কাবির বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
—“এত রাতে আইসক্রিম পার্লার খোলা নেই। কাল সকালে আনিয়ে দেব।”

তিথি এবার তার তুরুপের তাস চালল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি থাকলে কি আর আমাকে কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো? আপনি তো যেমন নাচে সেরা, তেমন মনের দিক থেকেও অনেক বড়। আপনিই পারতেন এই দুঃখিনী বোনটার ইচ্ছে পূরণ করতে।”

আহনাফের নাম শুনতেই কাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। আহনাফ বেচারা কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
—“আরে আমি তো এখুনি গিয়ে নিয়ে আসতে পারি, কিন্তু কাবির যদি...”

কাবির ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—“কাউকে যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি। কার কার লাগবে নাম বলো।”

তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল।
—“শুধু আনলে হবে না মিস্টার কায়নাত! আমরা সবাই মিলে যাব। এই মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় আইসক্রিম খাওয়ার মজাই আলাদা। প্রমা, সাদ্দাম ভাইয়া, আহনাফ ভাইয়া, রোনা আপু—সবাই চলুন!”

গাড়িতে ওঠার সময় তিথি ইচ্ছা করেই আহনাফের পাশে বসতে চাইল।
—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি কিন্তু আমাকে ওই নাচের স্টেপগুলো আবার শেখাবেন। আপনার ওই যে কাঁধ ঝাঁকানোর মুভমেন্টটা... জাস্ট ওয়াও!”

ড্রাইভিং সিটে বসা কাবিরের হাত স্টিয়ারিংয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। সে আয়নায় তিথির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
—“তিথি, সিটে ঠিকমতো বসো। আর আহনাফ, তুই যদি নাচতে চাস তবে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় গিয়ে নাচ।”

পেছনের সিটে সাদ্দাম প্রমার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
—“দেখলে প্রমা? কাবিরের ইঞ্জিনে এখন আইসক্রিমের চেয়ে বেশি আগুন জ্বলছে!”

প্রমা ওড়নাটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে লাজুক হেসে বলল,
—“সাদ্দাম ভাইয়া, আপনি তো দেখছি দারুণ ফ্লার্ট করতে পারেন! আপনার কথাগুলো কিন্তু আইসক্রিমের চেয়েও মিষ্টি।”

সাদ্দাম এবার প্রমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম স্বরে বলল,
—“আমি তো বলেছি প্রমা, এখন থেকে আমাকে শুধু সাদ্দাম বলবে। আর তোমাকে আমি শুরু থেকেই তুমি ডাকার অধিকার আদায় করে নিয়েছি। তোমার জন্য আইসক্রিম কেন, আমি পুরো ফ্যাক্টরি তুলে আনতে পারি।”

পাশে বসা রোনা সবটা দেখছিল। সে কলেজ লাইফ থেকেই আহনাফকে পছন্দ করে, কিন্তু আহনাফ তিথির চঞ্চলতায় মুগ্ধ থাকে। রোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহনাফকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল।

—“কিরে আহনাফ, তুই কি সারাজীবন তিথির ফ্যান হয়েই থাকবি? পাশে যে একজন স্কুল টিচার বসে আছে, তার দিকে তো তোর নজর নেই।”

আহনাফ একটু ঘাবড়ে গিয়ে ফিসফিস করল,
—“আরে রোনা, তুই তো আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু। আর তিথি তো ছোট মানুষ, ও একটু প্রশংসা করল তাই...”

রোনা মনে মনে হাসল। সে জানে আহনাফ তাকে কেবল 'বন্ধু'ই ভাবে, অথচ রোনা আজও সেই কলেজের দিনগুলোর মতো তাকেই মনে মনে চেয়ে যাচ্ছে।

🍨

আইসক্রিম পার্লারে ঢুকে তিথি আহনাফের জন্য ফ্লেভার পছন্দ করতে করতে বলল,
—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি এই ডার্ক চকলেটটা ট্রাই করুন, আপনাকে খুব মানাবে।”

কাবির এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আহনাফ আর তিথির মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আহনাফ নিজেরটা পছন্দ করতে পারবে তিথি। তুমি তোমার কাজে মন দাও। আর আহনাফ, তুই বাবার কোম্পানি চালাস নাকি তিথির কথায় উঠবস করিস, সেটা ক্লিয়ার কর।”

সাদ্দাম হাসতে হাসতে প্রমার দিকে আইসক্রিমের চামচ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—“তুমি খেয়ে দেখো তো প্রমা। কাবির তো আজ রাতে নির্ঘাত স্ট্রোক করবে। রোনা, তুই শুধু দেখ, আমাদের বিজনেস টাইকুন আর ইতালিয়ান সিইও আজ আইসক্রিম নিয়ে কীভাবে মারামারি করে!”

রোনা আহনাফের প্লেট থেকে এক চামচ আইসক্রিম জোর করে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলল।

আহনাফের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জিং গলায় বলল,
—“কিরে আহনাফ, কলেজের মতো আজও কি তুই শুধু তিথির কথাই শুনবি? আমার ডার্ক চকলেটটা কিন্তু তুই অর্ডার করবি, এটা আমার হুকুম।”

আহনাফ প্রথমবার একটু লাজুক হাসল। সে বুঝতে পারল রোনা আজ তাকে তিথির থেকে সরাতে চাইছে।

~

অন্যদিকে কাবিরের রাগী মুখ দেখে তিথি মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছে, কারণটা সে নিজেও জানে না।

আইসক্রিম পার্লার থেকে বেরিয়েই তিথি যখন রাস্তার ওপাশে বিশাল মাঠটা দেখল, রাতের নিস্তব্ধতায় মায়াবী এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আকাশজুড়ে বিশাল একটা চাঁদ,যার রুপোলি আলোয় ভিজে যাচ্ছে শহরের পিচঢালা রাস্তা আর মাঠের সবুজ ঘাস।
সবাই যখন সেই ফুটবল মাঠে গিয়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে এল। দূর থেকে দু-একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। মাঠের এক কোণায়, ঘাসের ওপর শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এক ভিখারি ছেলে, দিনের ক্লান্তি শেষে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এই নির্জন মাঠে।

তিথি তার লম্বা গাউনটা একটু উঁচিয়ে ধরে আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আহনাফ ভাইয়া, চলুন! আজ কাবির সাহেবকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি শুধু নাচে নয়, ড্রিবলিংয়েও সেরা!”

কাবির তখন রাগে নিজের জ্যাকেটের হাতা গোটাচ্ছে। সে আহনাফের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—“আহনাফ, তুই তিথির জন্য আজ মাঠে এসেছিস, কিন্তু ফেরার পথটা তোর জন্য খুব একটা সুখকর হবে না, মনে রাখিস!”

তারপর তিথির দিকে ফিরে শাসন করার সুরে বলল, —“তিথি, তুমি গাউন পরে ফুটবল খেলবে? পাগল হয়েছ নাকি? চলো বাসায় যাই।”

কিন্তু তিথি কার কথা শোনে! মাঠের এক কোণায় সাদ্দাম আর প্রমা। সাদ্দাম একটা পুরনো বল খুঁজে এনে প্রমার সামনে রাখল।

সাদ্দাম খুব নরম গলায় বলল,
—“প্রমা, এদিকে আসো। শুধু দেখলেই হবে না, একটু ট্রাই করো।”

প্রমা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
—“সাদ্দাম ভাইয়া, আমি তো ফুটবল কক্ষনো খেলিনি! যদি পড়ে যাই?”

সাদ্দাম মৃদু হেসে প্রমার একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সে প্রমার কোমরের দুপাশে হাত রেখে তাকে স্থির করল,তারপর নিচু হয়ে প্রমার ডান পা-টা বলের কাছে নিয়ে এল। সাদ্দামের হাতের স্পর্শ আর ঘাড়ের কাছে তার তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে প্রমা শিউরে উঠল। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে গেল।

সাদ্দাম প্রমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—“পড়ে যাবে না, আমি তো আছি। শুধু আমার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে একটা শট দাও।”

প্রমা সাদ্দামের এই ঘনিষ্ঠতায় এতটাই আড়ষ্ট হয়ে গেল যে সে বলের বদলে ঘাসে লাথি মারল। সাদ্দাম হেসে প্রমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু জোরে চেপে ধরল।

প্রমা নিচু স্বরে বলল,
—“সাদ্দাম ভাইয়া, সবাই তাকিয়ে আছে কিন্তু! ছেড়ে দিন না।”

সাদ্দাম চোখ টিপে বলল,
—“সবাই সবার মতো ব্যস্ত প্রমা। দেখো, রোনা কিন্তু ঠিকই আহনাফকে মার্ক করে ফেলেছে।”

সত্যিই, রোনা তখন আহনাফকে একরকম তাড়া করছে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য। রোনা হাসতে হাসতে বলল,
—“কিরে আহনাফ, বাবার কোম্পানির ফাইল নাড়াচাড়া করতে করতে কি তোর রিফ্লেক্স কমে গেছে? আমি কিন্তু এই গোলটা হতে দেব না!”

আহনাফ বল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তিথির দিকে তাকাল। তিথি তার গাউনটা এক হাতে ধরে হাততালি দিচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে,
—“আহনাফ ভাইয়া, গোল! আপনিই চ্যাম্পিয়ন!”

কাবির এবার আর সহ্য করতে পারল না। সে সজোরে দৌড়ে এসে আহনাফের সামনে একটা স্লাইড ট্যাকল করল। আহনাফ ছিটকে পড়ে যেতেই কাবির বলটা কেড়ে নিয়ে সজোরে এক শট মারল। বলটা গোলের জালে জড়িয়ে যেতেই কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কিন্তু তীব্র গলায় বলল,
—“গোলটা কিন্তু আমি দিলাম তিথি। এবার তুমি তোমার এই ‘চ্যাম্পিয়ন’কে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নাও।”

⛹️‍♀️⛹️‍♀️

হঠাৎ তিথি জেদ ধরে বসল, সেও একটা শট মারবে। তার পায়ে ছিল পাতলা ফিতার সুন্দর স্যান্ডেল। সে গাউনটা দুই হাতে একটু ওপরে তুলে ধরে, কোমর বাঁকিয়ে সজোরে একটা কিক মারল বলটার দিকে। কিন্তু কপাল খারাপ, বলের বদলে তার পায়ের স্যান্ডেলের ফিতা মটাৎ করে ছিঁড়ে গেল। ডান পায়ের স্যান্ডেল সজোরে ছিটকে উড়ে গেল রাতের আঁধার চিরে।

"উফফ!" - তিথি ব্যথায় এক পায়ে লাফাতে লাগল।

কিন্তু আসল মজা হলো তখনই। ছিটকে যাওয়া স্যান্ডেলটা সরাসরি গিয়ে পড়ল মাঠের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা সেই ভিখারি ছেলেটার মাথার ওপর! ছেলেটি ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার চোখে তখনো ঘুমের ঘোর। সে একবার ওপরের চাঁদটার দিকে তাকায়, একবার শূন্য মাঠের দিকে, আর একবার হাতে থাকা তিথির দামি স্যান্ডেলটার দিকে!



হতভম্ব ছেলেটা কিচ্ছু না বুঝে কিছুক্ষণ স্যান্ডেলটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর চারদিকে মানুষ দেখে ভয়ে আর ব্যথায় হঠাৎই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল!
সবাই এই কাণ্ড দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কাবিরের রাগ মুহূর্তের জন্য কর্পূরের মতো উবে গেল।

সে তিথির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, —“তিথি, তুমি গোল দেওয়ার বদলে মানুষের মাথা ফাটানো শুরু করলে? এটা কোন ধরনের পাওয়ার?”

তিথি লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। সে ডান পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটির পাশ থেকে স্যান্ডেলটা কুড়িয়ে নিল।
কাঁচুমাচু মুখে বলল,
—“আরে আমি তো... ভুল হয়ে গেছে!”

সাদ্দাম হাসতে হাসতে প্রমাকে বলল,
—“দেখলে প্রমা? তিথি গোল দেওয়ার বদলে ডাইরেক্ট অ্যাটাক করা শুরু করেছে! এই জন্যেই তো বলি, মেয়েদের ফুটবল খেলা রিস্কি!”

প্রমা হাসতে হাসতে বলল,
—“সাদ্দাম ভাইয়া, আপনিও না! তিথি তো ইচ্ছা করে করেনি!”

রোনা আহনাফকে টেনে তুলতে তুলতে বলল,
—“এবার বুঝেছিস আহনাফ? তিথি শুধু তোকে নয়, গোটা দুনিয়াকে অস্থির করে রাখবে! তুই বরং আমার সাথে চল, অন্তত তোর মাথাটা সেফ থাকবে।”

#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৭
#লেখনীতে_উম্মে_ফুল
#চলবে

 #কে_প্রথম_ভালোবেসেছি_?  #পর্ব_১৪ #যুমার_মাহরীন_আহমেদমেঘের রাজ্য সাজেককে  অবশেষে বিদায় জানিয়ে আজকে বাড়িতে ফিরলো জেবা এবং...
18/02/2026

#কে_প্রথম_ভালোবেসেছি_?
#পর্ব_১৪
#যুমার_মাহরীন_আহমেদ

মেঘের রাজ্য সাজেককে অবশেষে বিদায় জানিয়ে আজকে বাড়িতে ফিরলো জেবা এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা।এই তিনদিন তাদের কাছে স্বপ্নের মতো কেটেছে। মাঝখানে যদিও জেবার ইনসিডেন্ট ঘটেছিল। বিকালের দিকে সবাই ফিরেছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে সবাই এখন গল্প করছে। এনায়া তানিমাকে মেহেদী পড়িয়ে দিয়েছে। তখন সেখানে ইভান আসে।

তনিমাকে মেহেদী পড়তে দেখে সে বলল, তনিমা ফুফু, তুমি এই রাতে মেহেদী দিচ্ছো?

" হ্যাঁ ,আমার মেহেদী দিতে খুব ভালো লাগে। তাই আমি রাত-দিনের ধার ধারি না। তুমি মেহেদী দিতে পারো ইভান?"

" না, আমি অবশ্য দিই নি কাউকে।"

" আচ্ছা, তাহলে আমায় দিয়ে দাও। দেখি আমার ভাইপো কিরকম মেহেদী আমায় দিয়ে দেয়।"

" ওকে, আমি জাস্ট ট্রাই করতে পারি। "

" ঠিক আছে। এই নাও।" মেহেদী ইভানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল তানিমা।

ইভান মেহেদী নিয়ে এমনভাবে দিতে লাগল যেন সে ইনজেকশন দিচ্ছে।

সেটা দেখে তানিমা বলল, বাপ আমার, একটু আস্তে দে। মেহেদী তো না যেন ইনজেকশন দিচ্ছে। আমাদের ইভান ডাক্তারি স্টাইলে মেহেদী দিচ্ছে।

" আচ্ছা, তুমি হাত সরিও না। নাহলে মেহেদী নষ্ট হয়ে যাবে।"

" ওকে, ওকে। আমরা সবাই এখন তোমার মেহেদী দেওয়া দেখছি। "

ইভান খুব সুন্দর করে মেহেদী দিচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে না প্রথমবার দিচ্ছে। সে আসলেই একজন পারফেক্ট মানুষ। তার মতো তার সবকিছুই পারফেক্ট।

আপনমনে সে কথা ভেবে মুচকি হাসলো জেবা।

মেহেদী দেওয়া শেষে তানিমা বলল, এবার তাহলে কুইজ খেলা হোক।

" ফুফু, ইভান ভাইকে সেই কুইজগুলো জিজ্ঞেস করো। যেগুলো আমাদের করেছিলে।"

" ওকে সবার জন্য কুইজ। আকিব একটা ছেলে। সে পরপর তিনজন ডাক্তারের কাছে গেলো। তিনজন ডাক্তারই তাকে দেখে বললো আকিব তো আমাদের ভাই। কিন্তু আকিব বললো আমার কোনো ভাই নাই। ডাক্তারদের কথা সঠিক আবার আকিবের কথাও সঠিক। কিভাবে?"

মাহিম বলল, সৎভাই আকিব।

" আরে না। সৎ ভাইও না। নিজের ভাই।"

" ইউনিভার্সিটির বড় ভাই।" এনায়া বলল।

" আরে না।"

" মুসলিম মুসলিম ভাই। " মাহিম আবারও বললো।

" না, এসব কিছু না। " তানিমা বলল।

এবার ইভান বলল, মেবি ডাক্তাররা সবাই ফিমেল। আকিব ফিমেল ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। ভাই নেই। বোন থাকতে পারে।

" কারেক্ট। ডাক্তাররা মেয়ে। তাই আকিব তাদের ভাই। কিন্তু তারা আকিবের বোন।"

" ইশরে, অল্প এর জন্য।" মাহিম আফসোসের সুরে বলল।

" তুই তো বেটা ধারে কাছেও ছিলি না।" জেবা বলল।

" আচ্ছা আরেকটা কুইজ, একটা কাপের হ্যান্ডেল কোন সাইডে থাকে?"

" ডান সাইডে।" মাহিম বলল।

"না। আমি যদি বাম সাইডে রাখি?"
" তাহলে বাম সাইডে।"

" না। ডান সাইডে রাখলে? "

" আউটসাইডে।" ইভান বলে উঠলো।

" তোমার এমন বলার কারণ কি ইভান?" তানিমা বলল।

" দেখো,কাপ বাম সাইডে ধরলে হ্যান্ডেল বাম সাইডে হবে। ডান সাইডে ধরলে হ্যান্ডেল ডান সাইডে হবে।কিন্তু ইনসাইডে কাপের হ্যান্ডল থাকে না। হ্যান্ডেল আউটসাইডে থাকে।" ইভান বলল।

"বাহ, ইভান।তুমি তো জিনিয়াস। একদম কারেক্ট। সবাই ইভানের জন্য ক্লাপ দাও।"

সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। আর ইভান মুচকি হাসলো।

—-------

সুন্দর সময়গুলো একটু তাড়াতাড়িই যেন কেটে যায়। দেখতে দেখতে ইভানদের ইংল্যান্ড যাওয়ার দিন চলে এলো।কালকে সকালে তাদের ফ্লাইট। ইভানরা চলে যাবে।সবার তাতে মন খারাপ। এই একমাসে ইভানরা যেন তাদের সাথে একদম মিশে গেছে। জেবার সবচেয়ে বেশি মন খারাপ। কারণ ওর ভালোবাসার মানুষটা চলে যাবে। কতদিন ওকে দেখতে পারবে না। কিন্তু ও অপেক্ষা করবে ইভানের ডাক্তারি পড়াশোনার এবং নিজের পড়াশোনার শেষ হওয়ার। ভালোবাসা অপেক্ষা করাতে জানে। অপেক্ষা শুদ্ধ ভালোবাসার চিহ্ন।

জেবার মনটা একদম ভালো নেই। তাই সে ছাদে উঠেছে একটু হাটার জন্য। মনটা বড্ড ভারী লাগছে ওর কাছে। ছাদে উঠতে দেখলো ছাদের এক পাশে ইভান দাড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই জেবাকে বলল, একটু পাশে এসে দাড়াবে প্রিয়ভাষিণী?

কেঁপে উঠলো জেবা।লোকটার গলায় ভালোবাসা যেন উপচে পড়ছে।যা জেবার হৃদয়কে ছুয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

জেবা গুটিগুটি পায়ে একটু দূরত্ব বজায় রেখে ইভানের পাশে দাড়ালো।

"আজ এক মাস হলো নিজের দেশকে ছেড়ে অন্য দেশে রয়েছি। এ দেশে আসার সময় মনে হয়েছিল কেমনে একটা নতুন দেশে,নতুন পরিবেশে এক মাস নিজেকে এডজাস্ট করাবো?

কিন্তু এখন আমার এই দেশ ছেড়ে যেতে এত কষ্ট কেন হচ্ছে? কাল আমি নিজের দেশে, নিজের কম্ফোর্ট জোনে ফিরে যাচ্ছি। তবুও কেন আমি মন থেকে খুশি হতে পারছি না? কেন বারবার মনে হচ্ছে খুব প্রিয় কিছু ফেলে চলে যাচ্ছি। কেন বারবার মনে হচ্ছে বলতে পারো প্রিয়ভাষিণী?" আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো ইভান।

কন্ঠে তার বেদনার সুর,বিচ্ছেদের সুর।

ইভানের কথা শুনে কিছুক্ষণ নিরব থাকলো প্রিয়ভাষিণী। তারপর বলে উঠলো, তাহলে থেকে যান।

ইভান তখন একইভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো, রেখে দিবে?

অনেক কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না জেবা। কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে গেছে।হৃদয় চেঁচিয়ে বলছে, আপনি আমায় ছেড়ে যাবেন না ইভান ভাই। প্লিজ যাবেন না। খুব ভালোবাসি আপনাকে। এই বিচ্ছেদ আমি সইতে পারবো না। কিন্তু মুখ একদম নিরব।

তবুও জেবা আস্তে করে বলল, আপনি তো আর একেবারে চলে যাচ্ছেন না।এটা আপনারই বাড়ি।যখন খুশি আসতে পারেন।

—-------

ইভানদের গাড়ি চলে এসেছে। সবাই সবকিছু গাড়িতে নিয়ে তুলছে। ফারহান সাহেব ভাইকে জড়িয়ে ধরে ,বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। ইসমাত নাহারের চোখেও জল। তিনি প্রথমবার এখানে এসেছেন। অথচ এই কয়েকদিন তারা ওনাকে এত আপন করে নিয়েছে। যে তাদের ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। ইসরা প্রচুর কাঁদছে। সে তনিমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি আবার আসবো ফুফু। আমি কয়েকদিন পর পর আসবো।

ইহান গাড়িতে উঠে বসেছে।ইভান এক পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। মুখে কোনো রিয়েকশন নেই। চোখে সানগ্লাস। জেবা এক কোণে দাড়িয়ে সব দেখছে। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।

মাহিম তো ইভানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। ইভান তখন মাহিমকে ধরে বলল, তুমি শান্ত হও মাহিম। এভাবে কাঁদলে তোমার শরীর খারাপ করবে।তুমি প্লিজ শান্ত হও।

ফাওয়াদ সাহেব ইভানের কাধে হাত রেখে আবেগ জড়ানো কন্ঠে বললেন, এখন থেকে এসো কিন্তু বাবা। এখন তো সব চেনো। মাঝে মাঝে এসো।আমাদের খোজ-খবর নিও।এটা তো তোমার নিজের বাড়ি। সাথে আমরা সবাই।

ফাওয়াদ সাহেবের কথায় সহজে না কাঁদা ইভানেরও ভীষণ কান্না পেলো। সে কিছুতেই কান্না আটকাতে পারছে না। তাই সে ওয়াশরুমে যাবে বলে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ওয়াশরুমে দরজা বন্ধ করে ইভান কাঁদতে লাগলো।ভীষণ কান্না পাচ্ছে ফাওয়াদ সাহেবের কথায়। কিছুক্ষণ এভাবে কাটানোর পর পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলো । চোখে সানগ্লাসটা পড়ে নিল সে।যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেও কেঁদেছিল। গাড়িতে উঠার সময় একবার প্রিয়ভাষিণীর দিকে তাকালো সে।তারপর হালকা হেসে হাত নাড়িয়ে গুড বাই জানালো।প্রিয়ভাষিণীও তার দিকে হাত নাড়িয়ে গুড বাই জানালো।তখন এক ফোঁটা অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।

—-------

সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল। জেবা এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ইভানদের চলে যাওয়ার দুই বছর হয়ে গেছে। এই দুই বছর জেবা ইভানকে একা একাই ভালোবেসে গেছে। ইভানের অনুপস্থিতি তার স্মৃতি মনে করে পূরণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবসময় কি তা সম্ভব হয়? এমনও অনেক দিন গেছে সে ইভানের স্মৃতিতে কাতর হয়ে ইভানকে খুজেছে। কিন্তু পারে নি কিছু বলতে। তবুও জেবা অপেক্ষা করছে সেইদিনের। যেদিন ইভান ওকে নিজের কাছে নিয়ে যাবে হালাল উপায়ে। ইভান নিজে থেকে তাকে তার ভালোবাসার কথা বলবে এটা জেবা বিশ্বাস করে। কারণ সে ইভানের চোখে নিজের জন্য ভালোবাসা দেখতে পেয়েছে। যাওয়ার পর থেকে ইভানের সাথে তার যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলা চলে। ইন্সটা, হোয়াটসঅ্যাপ এসবে সে কম এক্টিভ থাকে। ইসরার সাথে মাঝেমাঝে কথা হয়। তবুও জেবা অপেক্ষা করছে।

চলবে........

Address

Cantonment Bottola
Savar
1344

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when অসমাপ্ত গল্পটা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share