31/12/2025
পুরানো ক্যালেন্ডারটা দেয়াল থেকে নামানোর সময় আজ হাতটা একটু থমকে গেল। কেবল আজকের দিন, এরপর ২০২৫ সালটাও হয়ে যাবে কেবলই একটা ইতিহাস।
আপনি হয়তো আপনার ঘরের জানালার গ্রিলটা ধরে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার অপেক্ষায় পুরো শহর। আপনার কানে ভেসে আসবে দূর থেকে আসা কিছু হর্ষধ্বনি। কিন্তু আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন, এই কয়েক ঘণ্টার তথাকথিত ‘সেলিব্রেশন’ পুরো পৃথিবীর ওপর কতটা ভয়াবহ ক্ষত রেখে যায়?
আপনি হয়তো ভাববেন, কয়েকটা আতশবাজি বা ফানুস ওড়ালে এমন কী আর ক্ষতি হয়!
তাহলে শুনুন— প্রতি বছর এই একটি রাতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা কেবল ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেওয়া হয়। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের একটি শিশুর সারা বছরের শিক্ষার খরচ যেখানে মেটানো সম্ভব, সেখানে আমরা কয়েক মিনিটের আলোর ঝিলিক দেখে টাকাগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছি।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন তো— বিশ্বজুড়ে এই রাতে আতশবাজির কারণে বাতাসে বিষাক্ত পিএম২.৫ (PM2.5) ধূলিকণার পরিমাণ সাধারণ সময়ের চেয়ে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই এক রাতে ৬০ হাজার টনের বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। ভাবুন তো, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে আমরা যখন চিন্তিত, তখন আমাদের এই আনন্দই পরিবেশের শ্বাসরোধ করছে।
আপনি কি অনুভব করতে পারছেন সেই লাখ লাখ অবলা প্রাণীর আর্তনাদ? ইউরোপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, থার্টি ফার্স্ট নাইটের মাঝরাতে বিকট শব্দে প্রায় ১ লক্ষাধিক পাখি আতঙ্কিত হয়ে বাসা থেকে উড়াল দেয়। তাদের বড় একটা অংশ দালানে ধাক্কা খেয়ে বা হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। আপনার ঘরের পোষা বিড়াল বা রাস্তার কুকুরগুলো ভয়ে যেভাবে কুঁকড়ে থাকে, সেই যন্ত্রণার দায় কি আমরা এড়াতে পারি?
হয়তো আপনার পাশের ফ্ল্যাটের সেই হার্টের রোগীটি আজ ঘুমাতে পারবেন না। হয়তো কোনো নবজাতক শিশু বিকট শব্দে আঁতকে উঠে চিরজীবনের জন্য কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হবে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর এই রাতে প্রায় ৬-৭ হাজার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফানুস যখন ওড়ান, আপনি কি জানেন না যে সেই জ্বলন্ত বাঁশ বা আগুন কারো টিনের চালে কিংবা বস্তির কুঁড়েঘরে পড়ে নিমিষেই সব ছাই করে দিতে পারে?
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে 'মুহাসাবা' বা আত্মসমালোচনার কথা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন— তোমাদের থেকে হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব মিলিয়ে নাও। অথচ আমরা আজ বিজাতীয় অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়েছি। আপনি কি আজ রাতে জায়নামাজে বসে একবারও ভেবেছেন যে, গত ৩৬৫ দিনে আপনি আল্লাহর কয়টা হুকুম মেনেছেন? আপনার আয়ু থেকে তো একটি বছর চিরতরে হারিয়ে গেল, আপনি কি কবরের সেই দীর্ঘ যাত্রার জন্য একটুও পাথেয় জমা করতে পেরেছেন?
কুরআন মজিদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৭)। এই রাতে যে পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়, তা দিয়ে বিশ্বের কয়েক কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের আহার জুটতে পারত।
আসুন না, আজ রাতে আমরা একটু ভিন্নভাবে ভাবি।
উশৃঙ্খলতা নয়, বরং আত্মসমালোচনার চাদর গায়ে জড়িয়ে নিই।
আতশবাজির ধোঁয়ায় বাতাস বিষাক্ত না করে, তওবার চোখের জলে নিজের হৃদয়টাকে পবিত্র করি।
কারো কষ্টের কারণ না হয়ে, নতুন বছরে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর শপথ নিই।
মনে রাখবেন, উৎসব মানেই ধ্বংস নয়; প্রকৃত উৎসব হলো প্রশান্তি এবং অন্যের জন্য কল্যাণ বয়ে আনা। আপনার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত আজ হয়তো একটি প্রাণ বাঁচাতে পারে, কিংবা রক্ষা করতে পারে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে।
আপনি কি তবে আজ থেকে সেই পরিবর্তনের অংশ হবেন না?