16/06/2026
আকাবিরে সিলেট -(৬) জীবন ও সংগ্রাম -
লিখেছেন: মুহতারাম মাওলানা মুখলিসুর রাহমান রাজাগঞ্জী হাফি.
----------------------------------
জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদরাসার ১ ম শায়খুল হাদীস ইলমে হাদীসের আলোকজ্জ্বল ধ্রুবতারা হযরত মাওলানা ইসহাক বিরদলী (জালালাবাদী) রাহ.- সংক্ষিপ্ত পরিচয়- (জন্ম- ১৯৪১- মৃত্যু- ২০১৩ ঈ.)
* ভূমিকা - বিশ্বজগতের বিভিন্ন দেশে যুগ- যুগান্তরে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক-বাহক নাইবে নবী হক্কানী উলামায়ে কেরামের আবির্ভাব হয়| এটাই এ ধরাপৃষ্ঠের চিরায়ত নিয়ম| আল্লাহ তা’আলা তাঁদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম, কুরআন-সুন্নাহর সহিহ খেদমত নিয়ে থাকেন| কুরআন-সুন্নাহর অসীম জ্ঞানসুধা পান করে এসব আলেম দ্বীনে ইসলামের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খেদমতের অবদান রেখে যেভাবে আল্লাহর দরবারে মকবুল বান্দা হিসাবে বিবেচিত হন| তদ্রূপ মানুষের মধ্যেও তারা হয়ে যান কীর্তিমান অমর| তাদের প্রশংসিত কীর্তি-অবদান যুগ-যুগ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথচলার পাথেয়, হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসাবে পরিগণিত হয়| সেসব মনীষী ও হক্কানী আলেমদের মধ্যে অন্যতম ইলমে হাদীসের এক সমুজ্জল নক্ষত্র ছিলেন হযরত মাওলানা ইসহাক রাহ.|
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন যে ক'জন হাদীসের পন্ডিত জ্যোতির্ময় নক্ষত্রকে নিজের বক্ষে ধারণ করে দেশব্যাপী সুনাম- সুখ্যাতি অর্জন করেছে - এবং বাংলাদেশের যেসব আলেমদের মূল্যবান রচনা- গ্রন্থনা দেশের সীমান্তের গন্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও সমাদৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
হযরত মাওলানা ইসহাক বিরদলী জালালাবাদী রাহ. ছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম। ছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য শায়খুলহাদীস। হাদীস বিজ্ঞানে পারদর্শী। বিভিন্ন মাদরাসায় মিশকাত ও বুখারির ব্যতিক্রমধর্মী দারস প্রদান ছিলো তাঁর কর্ম ঔজ্জ্বল্যতার অনুপম বৈশিষ্ট্য। ইলমে হাদীসের উপর অসামান্য পান্ডিত্য, দারস ও তাদরিসের প্রক্রিয়াগত বাচনভঙ্গির অধিকারী ও উর্দু ভাষার দারসী কয়েকটি মূল্যবান শরাহগ্রন্থের মুসান্নিফও ছিলেন তিনি।
* জন্ম ও পড়াশোনা - সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের বিরদল আনসারপুরে ১৯৪১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ছিলেন সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারের খান্দানী মনীষী। প্রাথমিক পড়াশোনা স্থানীয় সাবাহি মক্তবে- ছিলেন প্রচুর মেধাবী। তখন তিনি ৩ দিনে বাগদাদী কায়দা ও ২ দিনে আমপারা সমাপ্ত করে ফেলেন। তাঁর মক্তবের উস্তাদ মাওলানা রফিক আহমদ বলেন - আমি সুদীর্ঘ ৪০ বছরের মধ্যে এরকম প্রখর মেধার অধিকারী কোনো ছাত্রকে পাইনি। অতঃপর স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার পর তালবাড়ি নিছারিয়া ফয়যে আম তালবাড়ি (কোনাগ্রাম) মাদরাসায় ভর্তি হয়ে জামায়াতে হিদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। কাফিয়া পড়েন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার প্রাচীন মাদরাসা উমরগঞ্জ। অতঃপর ঢাকার আশরাফুল উলুম বড়কাটরা মাদরাসায় জামায়াতে হেদায়া (উচ্চ মাধ্যমিক) সম্পন্ন করেন।
* উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান গমন - পরিশেষে স্বীয় আসাতাযায়ে কেরাম, আত্মীয়স্বজন ও সহপাঠীদের পরামর্শক্রমে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করার উদ্দেশ্যে
পশ্চিম পাকিস্তান গমন করত করাচীর প্রসিদ্ধ জামেয়া ইসলামিয়া বান্নুরী টাউন মাদরাসায় জালালাইন জামাআতে ভর্তি মোট ৫ বছর পড়াশোনা করত দাওরায়ে হাদীস ও উলুমুল হাদীসের বিশেষ কোর্স কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন। তিনি তথায় যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রাহ. মুফতি ওলি হাসান টুনকি রাহ. আল্লামা আব্দুর রশিদ নুমানী রাহ. আল্লামা ইদ্রিস মিরাঠি রাহ. ফযলুল হক পেশাওয়ারী রাহ. প্রমুখ দেশবিখ্যাত মুহাদ্দিস উলামায়ে কেরামের কাছে পড়াশোনা করেন। তিনি তদীয় মেধাগুণে আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রাহ.'র ঘনিষ্ঠ শাগিরদ হিসাবে আবির্ভূত হোন। ফলে তিনি দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করার পর ঢাকার আশরাফুল উলুম বড়কাটরা মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করার দুমাসের মাথায় বান্নুরী রাহ. তাঁকে উলুমুল হাদীসের বিশেষ কৌর্স পড়ার জন্য পুনরায় তাঁর মাদরাসায় ডেকে পাঠান। তথায় আরো ২ বছরে উলুমুল হাদীস সম্পন্ন করে হাদীসের বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র জীবনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করা ছিলো তাঁর পড়াশোনার বৈশিষ্ট্য। তিনি উস্তাদদের যবানী তাকরির সম্পূর্ণ হুবহু মুখস্থ করে নিতেন।
* কর্ম জীবন - বান্নুরী টাউন মাদরাসায় পড়াশোনা সমাপ্ত করার পর উস্তাদ ইউসুফ বান্নুরী রাহ. সেখানেই শিক্ষক নিযুক্ত করতে চাইলে ঢাকার আশরাফুল উলুম বড়কাটরা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বারবার যোগাযোগ ও পীড়াপীড়িতে তিনি বড়কাটরায় চলে আসেন এবং সেখানে দীর্ঘ ১০ বছর অবস্থান করে ইলমে হাদীসের গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির অধ্যাপনা করেন।
অতঃপর সিলেটের জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস নিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে দারসে হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত থাকাবস্থায় তাঁর ঈর্ষান্বিত দারস ও তাদরিসের সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
দরগাহ মাদরাসায় তাঁর কাছে পড়ার জন্য ছাত্ররা উদগ্রীব হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে ১৯৮১ সালে রাজাগঞ্জ মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস চালু করা হলে তিনি তথায় চলে যান।
তিনি ছিলেন জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদরাসার ১ম শায়খুল হাদীস। ১৯৮১ সালে সেখানে দাওরায়ে হাদীস চালু হলে তিনিই প্রথম শায়খুল মনোনীত হোন। তাঁর শিক্ষকতার আমলে ১৯৮১-১৯৮৩ ঈ. ৩ বছর রাজাগঞ্জ মাদরাসা দেশব্যাপী বিশাল পরিচিতি লাভ করে।
অতঃপর জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার, জামেয়া হোসাইনিয়া ঢাকদক্ষিণ ও সর্বশেষ ২০০৯-২০১৫ ঈ. ৭ বছরকাল জামেয়া মাহমুদিয়া সোবহানীঘাট মাদ্রাসার শায়খুলহাদীস মনোনীত হয়ে আজীবন দারসে হাদীসের খেদমতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন।
* দরসে হাদীসের চিত্তাকর্ষক আকর্ষণ ও বৈশিষ্ট্য- দারসে তিনি যে চিত্তাকর্ষক তাকরির প্রদান করতেন - তা কেবলমাত্র আমাদের মতো যারা তাঁর দারসে পাঠগ্রহণে সৌভাগ্যবান হয়েছি - কেবল তাদের পক্ষেই এই মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারা সম্ভব।
কর্মজীবনের শুরুতেই ঢাকার বড়কাটরা মাদরাসায় যখন মিশকাত ও তিরমিযী শরীফ কিতাবদ্বয়ের দরস দিতে আরম্ভ করেন| তখন থেকেই তার আকর্ষণীয় দরস প্রদানের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে| সহজ উর্দু ভাষায় প্রদত্ত তার দরসের ভাষা ছিল খুবই মার্জিত| মুখ থেকে নিঃসরিত বাক্যসমূহ অত্যন্ত গোছালো ও সুবিন্যস্ত থাকতো| হাদীস সমূহের উর্দু অনুবাদ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, ইখতেলাফী মাসআলায় ইমাম সাহেবদের মাযহাব বর্ণনা ও মাযহাবের দলিল উপস্থাপন এবং ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ.’র পক্ষে অন্যদের দলিলের জবাব প্রদান ও যুক্তি খন্ডনের বর্ণনা দারুণ আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতেন| মনে হতো মিশকাত- তিরমিযী ও বুখারী শরীফের হাদীস সংক্রান্ত যাবতীয় মাসআলাসমূহ দলিল প্রমাণসহ আগা-গোড়া তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল| মুখস্থ কিংবা জানার অভাবে অন্যদের মত কোন বাক্য-বিশ্লেষণে বা মাযহাব বর্ণনা ইত্যাদিতে বাক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতোনা কখনো| ভিন্ন মাযহাবের ইমামদের মধ্যে আল্লামা নববী, ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. প্রমুখের মতামতকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে উচ্চারণ করতেন| হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানীফা, আল্লামা কাশ্মিরী ও আল্লামা বানুরী রাহ. প্রমুখদের মতামতকে খুবই গুরুত্বের সাথে পেশ করতেন| এমনকি কোনো কোনো হাদীসের ব্যাখ্যায় নিজের মতামতকেও নম্র ভাষায় তোলে ধরতেন|
ফলশ্রুতিতে ঢাকার বড়কাটরা মাদরাসায় তার কাছে পড়ার জন্য প্রতি বছর দাওরার ছাত্রদের ভিড় জমতে শুরু করে| তার দরসের আকর্ষণের কথা জানতে পেরে ১৩৯৩ হি./১৯৭২ঈ. সিলেট জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম আরিফ বিল্লাহ আকবর আলী রাহ. তাঁকে নিয়ে আসেন- সিলেটের দরগাহ মাদরাসায়| তিনি দরগা মাদরাসায় ক্রমান্বয়ে মিশকাত, তিরমিযী ও সহীহ বুখারীর দরস দিতে লাগলেন| ১৪০১ হি./১৯৮১ঈ. পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দরসে হাদীসের খেদমত অব্যাহত রাখেন| ফলে বৃহত্তর সিলটে তাঁর দরসে হাদীসের সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল| ছাত্রদের মুখে ঢাকার হুজুর খেতাবে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন| এরপর থেকে তিনি রাজাগঞ্জ, কাজিরবাজার, সোবহানীঘাটসহ যে সকল প্রতিষ্ঠানে শায়খুল হাদীস হিসাবে হাদীসের দরস প্রদান করেছেন। সকল প্রতিষ্ঠানেই তাঁর দরসে হাদীসের কীর্তি ও সুনাম ছিল নজিরবিহীন| মোটকথা- তিনি ছাত্রদের মাঝে হাদীসের দরস প্রদানে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার কারণে তার সম-সাময়িক মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদীসদের মধ্যে এমন এক অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন; যেনো তাঁর উপমা তিনি নিজেই| বৃহত্তর সিলেটসহ সমগ্র বাংলাদেশে এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য|
* অমর রচনা- গ্রন্থনা:
দরসে হাদীসে তার আকর্ষণ ও বৈশিষ্ট্য যেভাবে ছিল অনন্য| তদ্রূপ হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশেষণের কিতাব রচনায়ও তাঁর অবদান অতুল্য অনস্বীকার্য|
* ১. দরসে মিশকাত (উর্দু) - درس مشكوة
দরগাহ মাদরাসায় মিশকাত শরীফের পাঠদানের সময় থেকে ছাত্ররা তাঁর বয়ানকৃত তাকরিরকে কাগজে- কলমে নোট করা আরম্ভ করলো| এই নোট করা কপি বছরের পর বছর ফটোষ্ট্যাট করে একে অন্যের কাছে পৌছে দিতে লাগলো| এমনকি তাঁর দরসী বয়ানের কৃত শতশত পৃষ্ঠার এ নোট মিশকাতের ছাত্রদের জন্য অতি উপকারী হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করায় দরগাহ মাদরাসার ছাত্রদের কাছ থেকে অন্যান্য মাদরাসার ছাত্ররা ফটোকপি করে নিয়ে যেতো| দরসে মিশকাতের ফটোকপির ধারাবাহিকতা চলতে থাকলো প্রায় দুই যুগেরও বেশীকাল পর্যন্ত| অবশেষে তিনি যখন কাজিরবাজার মাদরাসার শাইখুলহাদীস মনোনীত হন| তখন এ দারসী তাকরীরকে ছাপিয়ে প্রকাশ করার জন্য এগিয়ে আসলেন বন্দরবাজার জামে মসজিদ মার্কেটের মুহাম্মদিয়া কুতুবখানার স্বত্তাধিকারী হাফিয মুহাম্মদ আলী|
মাওলানা ইসহাক রাহ. দরগাহ মাদরাসাতে পড়ুয়া তদীয় শাগরিদে রশীদ হাফিয মাওলানা গৌছ উদ্দীন; যিনি তখনকার সময়ে কাজিরবাজার মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তাকে ফটোকপি করা নোট বুককে বিন্যাস করার দায়িত্ব দেন এবং তিনি নিজে এতে সংযোজন পরিমার্জনের কাজ সম্পন্ন করেন| এভাবে দরসে মিশকাত নামে কিতাবটি আত্মপ্রকাশ করলো|
* দরসে মিশকাতের অন্যতম কয়েকটি বৈশিষ্ট্য: (ক.) সহজ উর্দু ও মার্জিত ভাষায় রচিত কিতাবটির মধ্যে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা-বিশেষণ এতটা বিস্তারিত নয় যে, পাঠক দীর্ঘতার কারণে ক্লান্তিবোধ করবে| আবার এতটা সংক্ষিপ্ত নয় যে, মকসুদ হাসিলে বাঁধা সৃষ্টি করবে| (খ.) মাযহাব, দলিল, দলিলের জবাব এবং হাদীসের توجيهات মর্মার্থ বর্ণনার ক্ষেত্রে দীর্ঘতাকে বাদ দিয়ে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মতামতগুলোকে উল্লেখ করা হয়েছে| ফলে মিশকাতগ্রন্থের শিক্ষক-ছাত্র সকলের জন্য আবশ্যক এক নিয়ামক উপাদান হিসাবে কিতাবখানি বিবেচিত হয়| (গ.) এমনকি সিহাহসিত্তার ছাত্রদের পরীক্ষার জন্য সুন্দর ও বিন্যস্ত উত্তরপত্র তৈরীর ক্ষেত্রে কিতাবখানি একটি অমূল্য পাথেয় হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে| (ঘ.) বাংলাদেশের মিশকাত-দাওরার বিদ্যাপীঠ সমূহ ছাড়াও বহির্বিশ্বে ইউরোপ, আমেরিকা, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে বিদ্যমান উর্দু ভাষা প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে কিতাবখানি প্রচুর গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে| (ঙ.) হাদীস শাস্ত্রের অধ্যয়নে যারা আরবী ও উর্দু ভাষার প্রচুর কিতাবাদী অধ্যয়ন করে থাকেন; তারাও ছাত্রদের সামনে নিজেদের তাকরীর পেশ করার ক্ষেত্রে এ কিতাবখানির সহজলভ্য বিন্যাস থেকে ফায়দা হাসিল করে থাকেন| (চ.) এযাবত পর্যন্ত বাংলাভাষীদের জানার ও বুঝার জন্য কিতাবটি বাংলাতে অনুবাদ হয়ে ছাপিয়ে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইংরেজি ভাষীদের জন্য ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ ও ছাপার প্রস্তুতি লন্ডনে শুরু হয়ে গেছে| (ছ.) প্রতি বছর বাংলাদেশে হাজার হাজার কপি ছাপা হচ্ছে| পাকিস্তান ও ইন্ডিয়ায় পৃথকভাবে কিতাবটি ছাপিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে|
* ২. দরসে বুখারী (উর্দূ)- درس بخارى
সহীহ বুখারীর উর্দু ভাষায় লিখিত শরাহগ্রন্থগুলোর মধ্যে দরসে বুখারী হল একটি অন্যতম সংক্ষিপ্ত শরাহগ্রন্থ| বিস্তারিতভাবে লিখিত শরাহসমূহ অধ্যয়ন করার পর মৌলিক ও জরুরী বিষয়গুলো পুনরায় কণ্ঠস্থ বা যন্ত্রস্থ করতে হয়| সে মৌলিক বিষয়াদীর এক নযরে বা সংক্ষেপে জ্ঞান লাভ করতে হলে বুখারীর উস্তাদ-ছাত্রদের জন্য মাওলানা ইসহাক রাহ.’র দরসে বুখারী হল একটি অন্যতম পাথেয়|
তিনি যখন করাচি বানুরী টাউন মাদরাসায় ১৩৮২ হি.- ১৩৮৫ হি. পর্যন্ত ২ বছর হাদীস শাস্ত্রের বিশেষ কোর্স অধ্যয়ন করছিলেন। তখন তিনি হাদীস শাস্ত্রের বিপুল কিতাব ও শরাহগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন| আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী ও আল্লামা ইদ্রিস কান্দালবী মিরাঠী রাহ.’র বিশেষ তত্ত্বাবধানে হাদীসসমূহের গ্রহণযোগ্য توجيهات (ব্যাখ্যা) ও نكات (সূক্ষ্মবিষয়াদি) লিপিবদ্ধ করতে থাকেন| এক পর্যায়ে উস্তাদদ্বয়কে তা প্রদর্শন করলে তারা এতে খুশী হন এবং তাকে আরো উৎসাহিত করেন| এভাবে ক্রমান্বয়ে একটি হাতে লেখা কপি তৈরী হয়ে যায়| পরবর্তিতে ১৪০১ হি. থেকে যখন জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ মাদরাসায় তাঁর উপর নিয়মিত দরসে বুখারীর দায়িত্ব অর্পিত হয়| তখন তিনি তদীয় দরসে ছাত্রদেরকে এ কপির অবলম্বনে তাকরির পেশ করতেন| হযরতের তাকরির ছাত্রদের নিকট অত্যন্ত উপকারী বিবেচ্য হওয়ায় ছাত্ররা একে ফটোকপি করতে শুরু করে| ক্রমান্বয়ে এটি আলেম সমাজে প্রসিদ্ধি লাভ করায় ইহাকে ছাপিয়ে প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বারংবার অনুরোধ আসতে থাকে| তখন তিনি এদিকে কর্ণপাত করলেন এবং ইহাকে কিতাবের আকৃতিতে তৈরী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন- সংযোজনের কাজ করতে থাকেন|
এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, “কিতাবুল ইলম পর্যন্ত প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত আমি নগণ্যের লিখিত ও বয়ানকৃত তাকরিরের ফটোকপি করতে শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়| অন্যদিকে বন্ধু-বান্ধব, উলামা, ছাত্র, সর্বমহল থেকে কিতাবটি ছাপানোর জন্য তাকিদ আসতে থাকে| তাই মনে- মনে ভাবলাম- আসলাফ-আকাবিরদের লিখিত সহিহ বুখারীর অসংখ্য শরাহসমূহের মধ্যে আমি নগণ্যের লেখা কি আর উপকারী হবে? তবে আল্লাহ চাইলে-তো একে কবুলিয়্যাতের মর্যাদায় নিয়ে আসতে পারেন”|
অবশেষে তিনি যখন শহরের কাজিরবাজার মাদরাসার শাইখুলহাদীস মনোনীত হন| কিতাবুল ইলম পর্যন্ত ৪৬৪ পৃষ্ঠাব্যাপী দরসে বুখারী ১ম খণ্ড প্রকাশিত হয়ে কিতাবাকারে সর্বপ্রথম আলোর মুখ দেখতে পায়| পরবর্তিতে ক্রমান্বয়ে ২য় খণ্ড ও ৩য় খণ্ড প্রকাশিত হয়|
হুজুরের ইন্তেকাল পরবর্তী একটি স্মরণ সভায় সিলেটের বিজ্ঞ মুহাদ্দিস দরগাহ মাদরাসার সাবেক মুহতামিম তাঁরই সুযোগ্য শাগিরদ হযরত মাওলানা আবুল কালাম যাকারিয়া রাহ.'কে বলতে শুনেছি| বলতে গেলে সমগ্র বাংলাদেশের বুখারীর উস্তাদ- তালাবা সকলেই ইসহাক রাহ.'র রূহানী ছাত্র| কারণ সকলের নিকট হুজুরের লিখিত দরসে বুখারীর কপি রয়েছে এবং সকলেই হুজুরের লিখিত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হচ্ছেন|
* ৩. হুসনুল মানযার ফি মুসতালিহে আহলিল আছারحسن المنظرفى مصطلح اهل الاثر উসূলে হাদীস শাস্ত্রের উপর উর্দু ভাষায় লিখিত তাঁর এ ছোট কিতাবটিও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিরল| দরসে নেযামিতে পঠিত আল্লামা হাফিয ইবনে হাযার আসকালানী রাহ. কর্তৃক লিখিত আরবী ভাষার প্রসিদ্ধ কিতাব نخبة الفكر নুখবাতুল ফিকর এবং এই শাস্ত্রের অন্যান্য কিতাব শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন ও দীর্ঘায়িত হওয়ায় উসূলে হাদীসের বিষয়াদীকে সহজলভ্য করার মহান ব্রত নিয়ে তিনি এ কিতাবখানি রচনা করেন|
সম্ভবত: উর্দু ভাষায় রচিত উসূলে হাদীস শাস্ত্রে এটি হল প্রথম একটি ছোট কিতাব| এ কিতাবটি প্রকাশিত হওয়ার পর নুখবাহ পাঠক উস্তাদ-তালাবাদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়| কারণ নুখবাতুল ফিকর এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদী এ কিতাবটিতে এমনভাবে সাজানো হয়েছে; যাতে এটি উসূলে হাদীসের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ও বোধগম্য হয়ে যায়| মোটকথা, উসূলে হাদীস শাস্ত্রের বিষয়াদীকে এতটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যেন ময়দা, চিনি, দারচিনি, এলাচী মিশ্রিত তৈরী সুস্বাদু হালওয়ার মত| মুখে দিলেই গিলে যায়| এ কিতাবটি পড়লে তেমনি উসূলে হাদীস শাস্ত্র সহজে অনায়াসে বোধগম্য হয়ে যায়|
* বাংলা ভাষায় অনুবাদ:
মাওলানা ইসহাক রাহ. কর্তৃক রচিত ও প্রকাশিত উল্লিখিত তিনটি কিতাব (দরসে মিশকাত, দরসে বুখারী ও হুসনুল মানযার) প্রতিটি আহলে ইলম হযরাতের নিকট কল্পনাতীতভাবে সমাদৃত হয়েছে| এটি হযরতের হুসনে নিয়াত ও খুলুসিয়্যাতের দলীল| এমনকি প্রত্যেকটি কিতাব পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে ছাপিয়ে বাজারজাত হয়েছে| উর্দু ও বাংলা উভয় ভাষায় প্রতি বছর হাজার- হাজার কপি উলামা-তালাবা হযরাতের নিকট পৌছে যাচ্ছে| নগণ্য মুখলিসুর রহমান রাজাগঞ্জী মাওলানা ইসহাক রাহ.’র নগণ্য শাগরিদ হওয়ার সুবাদে হুজুরের অনুমতিক্রমে দরসে মিশকাত ১ম খণ্ডের বাংলা অনুবাদ করার সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়েছি; যা সিলেটের মাহমুদিয়া লাইব্রেরী কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে বর্তমানে বাজারজাত রয়েছে|
হযরতের এ খেদমতকে মহান আল্লাহ হাদীসে উল্লিখিত মানুষের মৃত্যুর পর তিন সদকায়ে জারিয়ার একটি اوعلم ينتفع بعلمه এর মিসদাক ও প্রতিপাদনরূপে যেন কবুল করেছেন| অর্থাৎ এমন ইলম জ্ঞান যা থেকে পরবর্তী প্রজন্ম উপকৃত হতে থাকে-এটিও আলেমের জন্য সদকায়ে জারিয়া|
* অন্যান্য গুণাবলী - সাদা পোশাক পরিধানে অভ্যস্ত, নিরিবিলি পরিবেশ ও নির্ধারিত রুটিনে চলা পছন্দ করতেন তিনি। নিয়মিত তাহাজ্জুদ, তাকবীরে উলা, দৈনিক কুরআন তেলাওয়াত এবং বাদ আছরের যিকর কখনো বাদ পড়তো না। সহজ- সরল, নম্র- ভদ্র, ধৈর্যশীল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ছাত্রদের সাথে সর্বদা রিফকাত ও মহব্বতের আচরণ করতেন। ১৯৮৮ সালে তিনি পবিত্র হজ্ব পালন করেন।
* একটি চমৎকার ঘটনা -
একজন তরুণ আলেম; বয়স মাত্র ২১।
দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করে বাড়িতে ফেরার পর ট্রেনে করে যাচ্ছেন জীবনের প্রথম কর্মস্থল জামেয়া আশরাফুল উলূম বড়কাটারা ঢাকায়। বয়স কম, চেহারাও ছাত্রদের মতোই। পাশে বসা একজন ব্যক্তি তাঁকে ছাত্র ভেবে ছাত্রসূলভ আচরণ করেন। পরদিন যখন উভয়েই মাদ্রাসায় পৌঁছান- তখন দেখা যায় ;যিনি দেখতে হুজুরের মতো ছিলেন। তিনি ছাত্রের আসনে আর যিনি কম বয়সী ও ছাত্রের মতো দেখতে তিনি উস্তাদের আসনে! তখনই প্রকাশ পায়; তিনি ছিলেন সেই তরুণ প্রতিভাবান মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা ইসহাক রাহ.।
* শিষ্য-শাগরিদানের নুরানী কাফেলা -
মাওলানা ইসহাক জালালাবাদী রাহ. ঢাকাসহ সিলেটের বড় বড় মাদরাসাসমূহে আজীবন হাদীসের দরসী খেদমত করেছেন| ফলে তাঁর হাজার- হাজার এমন শিষ্য-শাগরিদ রয়েছেন; যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শাইখুল হাদীস, মুহাদ্দিস, মুফতি, মুফাসসির হিসাবে কর্মরত আছেন| তাঁর এক নুরানী ঝলক দেখতে পেল কানাইঘাটবাসী অনুষ্ঠিত হযরতের বৃহত্তম জানাযায়| হাজার- হাজার মানুষের মধ্যে যেখানে পাগড়ি, সাদা কাপড় ও টুপিওয়ালাদের এক বিশাল উপস্থিতি হয়েছিল| এদের মধ্যে সিংহভাগই হযরতের শাগরিদান ছিলেন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন| আমাদের জানা মতে হযরতের প্রসিদ্ধ কয়েকজন শাগিরদের নাম ও কর্মস্থল বর্ণনা করা হলো| এর বাইরেও প্রসিদ্ধ ছাত্র আরো থাকতে পারেন| কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় কিংবা আমাদের জানার অভাবে অথবা লেখার সময় স্মরণ না হওয়াতে উল্লেখ করা গেলো না|
* হাফিয মাওলানা মাহমুদ হোসাইন সিলেটি, ফাযিল- জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ| সাবেক শাইখুল হাদীস- জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর, জামেয়া মাদানিয়া বিশ্বনাথ ও জামেয়া আব্বাসিয়া কৌড়িয়া| বর্তমান শাইখুল হাদীস- জামেয়া ইসলামিয়া বার্মিংহাম ইউ.কে. ও কাসিমুল উলুম দরগাহ।
(বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, বিচক্ষণ কর্মবীর, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, আযাদ দ্বীনী এদারার পরবর্তী সিলেবাস পরিকল্পনার স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার, আত্মখ্যাতিবিমুখ এক মহান ব্যক্তিত্ব, ইলমে ওয়াহীর জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী বাংলাকাশের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হাফিয মাওলানা মাহমুদ হোসাইন-কে নিয়ে ছিল মাওলানা ইসহাক রাহ.’র বিশাল গর্ব| একাধিকবার মাওলানা ইসহাক রাহ.’র মুখে তদীয় মায়ায়ে নায শাগরিদ হাফিয মাহমুদ হোসাইন সাহেবের প্রশংসাসূলভ বাক্য শুনতে পেয়েছি| তিনিও সারাজীবন দরগাহ মাদরাসায় পড়াশোনা করা সত্ত্বেও হযরতের কাছে বুখারী- তিরমিযি পড়ার মনোবাঞ্চা নিয়ে দাওরার বছর দরগাহ থেকে রাজাগঞ্জ মাদরাসায় গমন করেন।) * হাফিয মাওলানা গৌছ উদ্দীন রাহ. সাবেক মুহাদ্দিস কাজিরবাজার মাদরাসা ও ভার্থখলা মাদরাসা| (যিনি মাওলানা ইসহাক রাহ.'র খাস শাগরিদ ও দরসে মিশকাত কিতাবের কপি রাইটারও ছিলেন|) * মাওলানা মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া, মুহতামিম ও মুফতি, জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ| * মাওলানা শামসুল ইসলাম (দিরাইর হুজুর), সাবেক শাইখুল হাদীস, জামেয়া ইসলামিয়া গাফুরিয়া ইশ্বরগঞ্জ| * মাওলানা সাইফুল আলম (হযরতের জামাতা) বর্তমান মুহাদ্দিস, জামেয়া মাহমুদিয়া সোবহানীঘাট| * মাওলানা মুজিবুর রহমান (পাতন) শাইখুল হাদীস, জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর| * মাওলানা সালেহ আহমদ জকিগঞ্জী , মুহাদ্দিস, জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ| * মাওলানা আব্দুল মুমিন ওরফে পাকিস্তানী, সাবেক মুহতামিম, নয়াসড়ক মাদরাসা| * মাওলানা আব্দুল মতীন নবীগঞ্জী, সাবেক মুহতামিম, পীরের বাজার মাদরাসা, সিলেট| * মাওলানা মমতাজুদ্দীন, মুহতামিম জামেয়া ইসলামিয়া রাজাগঞ্জ| * মাওলানা তাজুল ইসলাম পারকুলী, মুহাদ্দিস, নারাইনগঞ্জ, ঢাকা| * মাওলানা হাফিয আব্দুল ওয়াদূদ, শাইখুল হাদীস জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম শাহবাগ| * মাওলানা ইউসুফ কুমিল্লাই| * মাওলানা যুবায়ের আহমদ মোমেনশাহী| * মাওলানা মাহমূদুর রাহমান কোনাগ্রামী, মুহাদ্দিস জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর| * মাওলানা আব্দুস সালাম গোরখসী, সাবেক মুহাদ্দিস রাণাপিং মাদরাসা| * মাওলানা হাবীবে রব্বানী চৌধুরী, সাবেক শাইখুল হাদীস, কুলিয়ারচর মাদরাসা, মৌলভীবাজার| * মাওলানা মুশাহিদ আলী, সাবেক শাইখুল হাদীস ছিরামপুর মাদরাসা| * মাওলানা আব্দুর রহমান হাবীব, লন্ডন প্রবাসী| * মাওলানা ক্বারী আব্দুল মতীন, মুহতামিম জামেয়া ফারুকিয়া সিলেট| * মাওলানা মুফতি শামীম আহমদ, লন্ডন প্রবাসী| * মাওলানা নজরুল ইসলাম: শাইখুল হাদীস দয়ামীর মাদরাসা| * মরহুম মাওলানা আব্দুল হান্নান, সাবেক মুহতামিম, জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ| * মরহুম মাওলানা আব্দুল মতীন সুনামগঞ্জী, সাবেক শাইখুল হাদীস কৌড়িয়া মাদরাসা| * মাওলানা আব্দুল মালিক আটগামী, শাইখুল হাদীস, জামেয়া রাহমানিয়া বালিকা মাদরাসা, খাদিমপাড়া| * মাওলানা মুফতি শফীকুর রহমান, মুফতি ও মুহাদ্দিস জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার| * মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিরাজী, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ| * মাওলানা রিয়াজুদ্দীন, মুহাদ্দিস ও লেখক| * মাওলানা শাব্বীর আহমদ, মুহাদ্দিস জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার| * মাওলানা মুশররফ হুসাইন, মুহাদ্দিস জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার| * মাওলানা মুসা বিন হাবীব, নাইবে মুহতামিম, জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার| * হাফিয মাওলানা হেলাল আহমদ, রাজনগর, মৌলভীবাজার| * হাফিয মাওলানা শামীম আহমদ, রাজনগর, মৌলভীবাজার| * মাওলানা জাহিদ উদ্দীন চৌধুরী, মুহতামিম, যিন্নুরাইন মাদরাসা সিলেট| * মাওলানা মুখলিসুর রহমান রাজাগঞ্জী, প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, জামেআ আয়েশা সিদ্দিকা রা. জাহানপুর দারুল হাদীস বালিকা মাদরাসা, সিলেট|
* ইন্তেকালের পূর্বে পাকিস্তান সফর - তরিকত ও তাসাউফের লাইনেও তাঁর মুর্শিদ ছিলেন উস্তাদ আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রাহ.।
জীবন সায়াহ্নে পদার্পণ করে তিনি মৃত্যুর আগের বছর পাকিস্তান সফর করে উস্তাদ ও মুর্শিদ আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী সহ সেখানকার করাচির সম্মানিত আসাতাযায়ে কেরামের মাকবারাহ যিয়ারত করেন।
* ইন্তেকাল ও সমাধি - সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালে কিছু দিন চিকিৎসারত থাকার পর ২০১৫ ঈ. ২৯ এপ্রিল রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ৭৪ বছর বয়সে অসংখ্য ছাত্র শিক্ষক ও ভক্তবৃন্দকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মাওলায়ে হাকিকির সান্নিধ্যে চলে যান। পরদিন বাদ যুহর জন্মভূমি রাজাগঞ্জের বিরদল মাঝরবন্দ মাঠে সিলেটের বিপুল সংখ্যক আলেম- উলামা, ছাত্র শিক্ষক ও সাধারণ জনতার উপস্থিতিতে তদীয় সাহেবযাদা মাওলানা বদর উদ্দিন চৌধুরীর ইমামতিতে নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের মসজিদের সন্নিকটে অবস্থিত কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
* রেখে যাওয়া উত্তরসূরী আমানত -
হযরত মাওলানা ইসহাক বিরদলী রাহ. ২ টি বিবাহ করেন। উভয় পত্নীর ঘরে সন্তানাদী রয়েছেন - তন্মধ্যে মাওলানা বদরুদ্দীন আহমদ চৌধুরী দেশ বিদেশে পড়াশোনা করত বর্তমানে সিলেটের বিভিন্ন মাদরাসায় হাদীসের অধ্যাপনা করে যাচ্ছেন। তাঁকেই হুজুরের ইলমি আমানত মনে করা হয়।
* স্মৃতির পাতায় সুরভিত দিনগুলো -
(১.) ১৯৮১ সালে আমার ওয়ালিদে মুহতারাম মাওলানা আফতাব উদ্দিন ফতেহগঞ্জী রাহ. আমাকে ভর্তি করে দিলেন দরগাহ মাদরাসায় কাফিয়ার জামায়াতে। দারুল একামা বোর্ডিংয়ে ঢাকার হুজুরের (দরগাহ মাদরাসায় তাকে ঢাকার হুজুর বলে ডাকা হতো।) তত্ত্বাবধানের ডিউটি কামরায় আমার থাকার সিট দেওয়া হয়। তখন থেকেই হুজুরের সঙ্গে আমার পরিচয়। দুর্ভাগ্যবশত কয়েক মাস পরই হুজুর চলে যান রাজাগঞ্জ মাদরাসায়।
(২.) ১৯৮৩ সাল - আমি কাজিরবাজার মাদ্রাসার ছাত্র। এবছর রমযান মাসের শুরুতে প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান রাহ.'র নির্দেশে আমি ও কোনাগ্রামের হাফিয ইব্রাহিম আলী রাহ. ঢাকার হুজুরের বাড়িতে গিয়ে তাঁর রাজাগঞ্জ মাদরাসা থেকে অব্যাহতি নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কাজিরবাজার মাদ্রাসায় গমনের দাওয়াত দিয়ে আসি। অতঃপর প্রিন্সিপাল রাহ. রমযানে হুজুরের বাড়িতে গিয়ে পরবর্তী বছর থেকে কাজিরবাজার মাদ্রাসায় খেদমতের জন্য নিয়োগ নিশ্চিত করেন।
(৩.) কাজিরবাজার মাদ্রাসায় হুজুরের কাছে
হেদায়া ৪র্থ খন্ড এবং মিশকাত শরীফ আউয়াল অধ্যয়ন করার দ্বারা হুজুরের শিষ্যত্ব লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। ফলে হুজুরের পাঠদান পদ্ধতির আকর্ষণে বিমোহিত আমিও আলহামদুলিল্লাহ আমার শিক্ষকতা জীবনে অধিকাংশই মিশকাত আউয়াল পাঠদান করা অব্যাহত রেখেছি।
(৪.) বাংলা দারসে মিশকাত - হুজুরের অনুমতিক্রমে তদীয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী "উর্দু দারসে মিশকাত" ১ম খন্ডের বাংলা অনুবাদ করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার; যা ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রতিবছর সিলেটের মাহমুদিয়া লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয়ে দেশের হাজার- হাজার শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের হাতে- হাতে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়েছে।
(৫.) সিলেটের সেরা ৩ শায়খুল হাদীস (তিন বেওয়াই) এক মাহফিলে- ২০০৯ সালে অসুস্থতার কারণে অপারেশন করতে হয় আমার। মাস খানেক ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলাম। সুস্থ হয়ে মাদরাসায় ফিরে শিক্ষকদের মুখে জানতে পারলাম - আমার ৩ উস্তাদ যথাক্রমে - শায়খুলহাদীস হযরত মাওলানা ইসহাক বিরদলী, শায়খুলহাদীস হযরত মাওলানা শিহাব উদ্দিন মুহাদ্দিসে রেঙ্গা, শায়খুলহাদীস হযরত মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী তিনোজন আমার সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে খাসভাবে মুনাজাত করেছেন। তাই আমি তাদের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আনুমানিক ২০১০ সালে আমাদের জামেয়া আয়েশা সিদ্দিকা রা. জাহানপুর (তখন ছিলো সৈয়দপুর) মাদরাসায় এক দোয়া মাহফিলে তিনো শায়খুল হাদীসকে একত্রিত করেছিলাম। সেদিন তাঁরা সকলেই বয়ান করেছিলেন এবং আমাদের মাদরাসার জন্য দোয়া করেছিলেন। একসঙ্গে আমার ৩ উস্তাদ সিলেটের তৎকালীন সেরা ৩ শায়খুল হাদীসকে এক মাহফিলে সমবেত করার দিনটি আমার কর্মজীবনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিলো। তাঁরা তিনোজন পরস্পরে ছিল বেওয়াই সম্পর্ক। আজ কেউই দুনিয়াতে নেই। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন আমিন।
(৬.) জামেয়া মাহমুদিয়া সোবহানীঘাট মাদ্রাসায় শায়খুলহাদীস থাকাকালীন সময়ে হুজুর ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত।
রাজনৈতিক কাজে সোবহানীঘাট গেলে হুজুরের সাক্ষাৎ ও দোয়া নিতে কার্পণ্য করতামনা। একদিন তাড়াহুড়া করে দু'তলায় উঠে হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে না পারায় হুজুর আমার উপর ক্ষোভ ঝাড়েন হাফিয মাওলানা আহমদ সগিরের কাছে। ঢাকার হুজুর তাকে বলেন - "দেখলাম মখলিস অবায় আইলো - আমারে দেখিয়া গেলো না। আমকুনীর কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় মিলে। আমারে দেখার সময় নাই"। এটা ছিলো আমার প্রতি হুজুরের মহব্বতের চমৎকার নিদর্শন। আমি পরবর্তীতে সোবহানীঘাট গেলে এজন্য হুজুরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।
(৭.) ইন্তেকালের পর স্বপ্ন -
মোটকথা হুজুর আমাকে খুব মহব্বত করতেন। আর তাই হুজুরের ইন্তেকালের পর স্বপ্ন যোগেও আমি হুজুরের সাক্ষাৎ পাই। হুজুরের ইন্তেকালের ১ মাসের মাথায় আমার একটি স্বপ্ন; দেখলাম একটি অত্যন্ত সুন্দর বাগানের ভিতরে হুজুর আমার হাতে ধরে আমাকে নিয়ে হাঁটছেন। নদী নালা, ফল ফুলে ভরা বাগান দেখিয়ে আমাকে বলছেন - "এই দেখো এগুলো জান্নাতের বাগান; আমরা এখানে থাকি"। হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পর দেখলাম - এক জায়গায় বড়- বড় ডেগ দ্বারা শিরণি তৈরি করা হচ্ছে। আমি ডেগের শিরণি খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে হুজুর আমাকে সামনের দিকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন - এগুলো তুমি খাওয়ার সময় হয়নি। সুবহানাল্লাহ। অতঃপর স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। এই খাবের তা'বির সম্পর্কে আমি কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমকে জানতে চাইলে সকলেই এক উত্তর দিয়েছেন - "হুজুর জান্নাতে আছেন"।
سقى الله ثراه وجعل الجنة مثواه.
(সূত্র - মৌলিক মাখয - তুহফাতুল আখয়ার, আল্লামা হাফিয মাহমুদ হোসাইন সিলেটি, পৃষ্ঠা, ০৮ । ২. মাওলানা মাহদী হাসান- ফেসবুক পোস্ট, ১১-৬-২৬.। ৩. মাওলানা সাইফুল আলম, শায়খুলহাদীস ভার্থখলা মাদ্রাসা, ইসহাক রাহ.'র জামাতা। ৪. ফিরে দেখা অতীত, মাওলানা মুখলিসুর রাহমান রাজাগঞ্জী, অপ্রকাশিত।)
--------------
মুখলিসুর রাহমান রাজাগঞ্জী , সিলেট।
১৬-০৬-২৬.
#কবিরবস্ত্রবিতান #রংমহলটাওয়ার #বন্দরবাজার াহ ুব্বা ায়জামা