19/08/2026
#সে_আমার_মল্লিকা
#পর্ব_৯
#মারিয়া_আক্তার_সাদিয়া
সূর্যের প্রখরতা বাড়ার সাথে সাথে শহরের কোলাহলও বাড়তে শুরু করেছে। অনিন্দিতা ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে এক গলি থেকে অন্য গলিতে। কাঁধের ব্যাগটার ওজনটা যেন আস্তে আস্তে কয়েক গুণ বেশি ভারী লাগতে শুরু করল। ব্যাগের ভারী ওজনটার চেয়েও যেন তার বুকের ভেতরের অনিশ্চয়তার ওজনটা অনেক বেশি ভারী লাগছে।
প্রতিটা টু-লেট ঝুলতে থাকা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। একা একটা মেয়ে, অত্যন্ত সাধারন বেশভূষা, কাঁধে শুধু একটা ব্যাগ, কোন আয় রোজগার নেই চাকরি নেই পড়াশোনা নেই কিচ্ছু নেই সেই মেয়েকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া টা অনেকের কাছেই যেন বিপদজনক মনে হচ্ছিল। বাড়িওয়ালারা সরাসরি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
কোন কোন বাসার ভাড়াই এমন আকাশছোঁয়া যে অনিন্দিতা চাইলেই সে ভাড়াতে থাকতে পারবে না।
দুপুরের দিকে রোদের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে অনিন্দিতা এক বিশাল বটগাছের ছায়ায় এসে বসলো। মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই, পকেটের জমানো টাকাগুলোও একটু একটু করে শেষের পথে। টাকা তো শেষ হয়ে যাবে ও তো আর এমনি এমনি বাড়বে না । হঠাৎ করেই চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো তার। ঘরের বাইরে একা একটা মেয়ের টিকে থাকাটা মোটেও সহজ কথা নয়। যা অনিন্দিতা এই দুই দিনেই আরো ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছে। এই উপলব্ধিতে কোন কাজ তো হবে না অনিন্দিতার। কারণ তার ঘরের ভেতরেও সম্মান নেই। সেখানেও মানুষের বাঁকা নজর, আড়ালে ফিসফিসানো কথা। যা বেঁচে থাকাকে যেন মৃত্যুসম করে তোলে। এর চেয়ে যদি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে নিজের কাছে নিজের জন্য একটুখানি সম্মান তৈরি করা যায় এতে দোষ কি? দেয়ালে তো পিঠ ঠেকেই গেছে। এবার না হয় সামনের লড়াই করে এগিয়ে যাই। ফলে দুটো সমাধান পাওয়া যাবে এক হয়তো আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে উঠবো, দুই মৃত্যু আমাকে বরণ করে নিবে।
চোখের কোণ গড়িয়ে একফোঁটা জল গালে এসে পড়তেই জলদি তা মুছে ফেলল সে। দুর্বল হলে চলবে না, তাকে লড়তে হবে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন মনে মনে এই বাক্যটি জপে কষ্ট চেপে আবার উঠে দাঁড়ালো সে।
,
,
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী-মোহরা সীমান্তের একটি উঁচু টিলার ঠিক ওপর ঘেঁষে তৈরি এক আভিজাত্যপূর্ণ ও পরিপাটি দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটিই ফারজাদের বর্তমান আশ্রয়স্থল। বাড়িতে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অপরূপ প্রকৃতির সৌন্দর্য। বাড়িটার কিছুটা দূরে একধার থেকে বয়ে চলছে কর্ণফুলী নদীর ঢেউ। আরেকধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়।
ফারযাদের বারান্দা থেকে সামনে দৃশ্যমান সারি সারি পাহাড়গুলোকে মনে হয় প্রকাণ্ড কোনো শান্ত প্রহরীর দল, যারা যুগ যুগ ধরে একই জায়গায় গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের শরীর জুড়ে ঘন সবুজের বিস্তার। কোথাও গাঢ় সবুজ শ্যাওলার আস্তরণ, কোথাও বা উঁচু অচেনা সব বৃক্ষের মাথার রাজকীয় দোলা। পটিয়া-বোয়ালখালীর দিক থেকে নেমে আসা ছোট-বড় টিলাগুলো একটির পেছনে আরেকটি এমনভাবে সাজানো, যেন সবুজ তরঙ্গের ঢেউ এসে থমকে গেছে দিগন্তের কোলে। পাহাড়ের খাজে খাজে যেন ছড়িয়ে থাকে ধোয়াটে কুয়াশার হালকা চাদর। পড়ন্ত বিকেলে যখন পাহাড়ি ঢালের মাঝ দিয়ে সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে, তখন মেঘ আর রোদের খেলা জমে ওঠে। পাহাড়ের চুড়ায় তখন কাঁচা সোনার আলো লেগে জ্বলজ্বল করে, আর নিচু উপত্যকাগুলো ডুবে যেতে থাকে আবছা বেগুনি আর কালচে ছায়ায়। পাহাড়ি ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দু-একটা ছোট ছোট ঘরের চালের ওপর সেই আলো পড়ে মনে হয় যেন পাহাড়ের বুকে মুক্তো ছিটানো রয়েছে।
সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য তৈরি করে বারান্দার ডান দিকটা। সেখান দিয়ে বয়ে যাওয়া কর্ণফুলী নদী যেন পাহাড়ের পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়ে। বারান্দায় দাঁড়ালে পাহাড়ের বুক চিরে আসা হিমশীতল বাতাস সরাসরি ছুঁয়ে যায় মুখ-চোখ। পাহাড়ি মেহগনি আর পাইন গাছের পাতা ছুয়ে আসা সেই বাতাসে ভেসে আসে এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। যে গন্ধে কোনো শহরের ভেজাল নেই, আছে কেবল এক নির্জন, শান্ত আর প্রশান্তিদায়ক মায়াবী ছোঁয়া।
সকালে সূর্য যখন নদীর বুকে কাঁচা সোনা রোদ ছড়িয়ে দেয়, তখন ফারযাদের বারান্দা থেকে সেই দৃশ্য দেখতে চমৎকার লাগে। আবার সন্ধ্যায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যখন অন্ধকার নেমে আসে, তখন নদীর ধারের ছোট ছোট ঘরের বাতিগুলো যেন জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে।
এই অপরূপ সুন্দর প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্যই হয়তো সুলতানা এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন বাসস্থানের জন্য।
বাড়িটা ফারজাদের নিজের না হলেও এখানেই যেন ফরযাদের প্রাণ। অবশ্য এবাড়ির মানুষ সব সময়ই বলে তুই এবাড়ির একজন।এবাড়ির ছেলে তুই। সারা জীবন এখানেই কাটিয়ে দিবি কোন সমস্যা নেই। খবরদার নিজেকে কক্ষনো বাইরের কেউ ভাববি না। তাহলে কিন্তু ভাববো তোকে এত আদর ভালোবাসা দিয়েও আপন করতে পারিনি। আমাদের ভালোবাসা ব্যর্থ।
ফারযাদ জানে তারা যতই আবেগ নিয়ে কথাগুলো বলুক না কেন দিন শেষে সে এবাড়ির ছেলে নয়। কথাটা অবশ্য ফারজাদ নিজেও ভুলতে বসেছে। অত্যন্ত গোপনে হৃদয়ের এক গভীরে কথাখানা তালাবদ্ধ করে রেখেছে সে। সেই তালা কখনো ভাঙ্গার প্রয়োজন পড়বে কিনা সে জানে না, জানতে চায়ও না।
ফারযাদ শেষ বিকেলের নদী আর পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বারান্দার দোলনায় হেলান দিয়ে বসেছে। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি। কিন্তু আজ পাহাড় নদীর এই রহস্যময় প্রকৃতির সাথেও ফারযাদের কল্পনায় ভাসছে সেই ভোরের কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া রহস্যময়ী অনিন্দিতার কাছে। যার চোখে কখনো দুঃখ কখনো জেদ কখনো অহংকারী এক আত্মমর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টি তো কখনো বিরক্তি । ঠিক যেন এই সামনে অবস্থিত পাহাড় নদীর রহস্যের মতো।
ওই দূর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে একসময় গভীর ভাবনায় ডুবে গেল ফারযাদ।
আচ্ছা! মেয়েটা এখন কি করছে? সে কি তার মত এমন কোন অপূর্ব প্রকৃতিতে ডুবে আছে? তার মতো ভাবছে কি সকালে দেখা হওয়া সেই ছেলেটিকে? নিজের ভাবনার ওপর নিজেই হাসলো ফারযদ। সে ভাবছে বলে কি তাকেও ভবতে হবে! হয়তো মনেই নেই।
ফারযাদ গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে ফিসফিস করে উঠল,
এই পাহাড়ের শান্ত সৌন্দর্য যতটাই মায়াবী, তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর আর ঝোড়ো আপনার চোখ দুটো!
আচমকা পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে চোখ মেলে তাকালো ফারযাদ। নেহালকে দেখে মুচকি এক হাসি উপহার দিয়ে আবারো মনোনিবেশ করল প্রকৃতিতে।
নেহাল ভ্রু কুঁচকে সবটাই পর্যবেক্ষণ করলো। সে এখানে এসে দাঁড়িয়েছিল প্রায় মিনিট দশেক আগে । এর আগে ফারজাদের কফি এভাবে ঠান্ডা হতে সে দেখেনি।
চোখ ভরা কৌতুহল নিয়ে বলল,
তোর কি হয়েছে বলতো? সকালে এলি একদম হাসি খুশি মুডে। ফ্রেশ ট্রেশ হয়ে সারাদিন হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ালি, এখন চোখ বন্ধ করে পাহাড় দেখছিস, কফি ঠান্ডা করে ফেলছিস। ঝেড়ে কাশতো ভাই!
তো তুই কি চাচ্ছিস, আমি সারাদিন মুড খারাপ করে থাকি।
না, আমি বা আমরা কেউই সেটা চাই না, তবে প্রত্যেকবার সেটাই হয়। ঢাকা থেকে ফিরলে সচরাচর তোকে এভাবে দেখা যায় না।
সব সময় তো আর আমার অধরা মল্লিকার সঙ্গে দেখা হয়নি।
নেহাল যেন একটা ঝটকা খেলো। এই, হ্যাঁ তুই তো সকালে বলছিলি অধরা মল্লিকা না কি জানো। ফারযাদ, তোর কান্ডকারখানা কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুই ঢাকা থেকে এত তড়িঘড়ি করে এলি, আবার বাসে জার্নি করলি, আর এখন বলছিস কোনো এক মল্লিকার কথা! মেয়েটা কে শুনি? এক মিনিট এক মিনিট, লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট!
ফারযাদ হালকা হেসে কফিতে একটা চুমুক দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে নিল। কোল্ড কফি খেতে তো দারুন লাগে অথচ এই গরম কফি ঠান্ডা হয়ে কেন ভালো লাগবে না আশ্চর্য। ঠান্ডা আর কোল্ড একি তো কথা!
নেহাল দুহাত বুকে বেঁধে বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো ভাইয়ের দিকে। বলল,
এমনটা কি আসলেই হয় ভাই? না মানে প্রথম দেখায় প্রেম ভালোবাসা হয়ে যাওয়াটা কেমন একটা আজগুবি কথা না?
আমি কখন বললাম যে আমার প্রেম ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে?
তাহলে,
আমার হৃদয় থমকে দিয়েছে, আমার কল্পনার রাজ্য দখল করেছে, আর আমার মনটাও সাথে নিয়ে গেছে।
হোয়াট! এ ভাই, তুই পাগল টাগল হয়ে গেলি নাকি? এতকিছু, আবার বলছিস প্রেম ভালোবাসা হয়নি, মানে কি ভাই? আমার অংকতো মিলছে না।
আচ্ছা ভাইয়া! প্রেম ভালোবাসা কি বলতো ? আমার চেয়ে তো তুই এই দুনিয়াটা বছর তিনেক বেশি দেখেছিস, জানিস কিছু এ ব্যাপারে? এ ব্যাপারে তো আমি কিছু জানিনা, কখনো জানতে চাইওনি। কতজন প্রেম ভালোবাসা নিয়ে এলো গেল কিন্তু অনুভূতিরা তো কখনো কিছুই জানান দেয়নি।
নেহাল হা করে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে।
সিনেমা নাটকে দেখেছি গল্পে শুনেছি, রাস্তাঘাটে ধাক্কা টাক্কা খেয়ে প্রেম হয়ে যায়, আচমকা কারো কণ্ঠস্বর শুনে মন গলে যায়, চোখ দেখে সর্বনাশ হয়। তোর কোনটা হয়েছে বল তো? ধাক্কা খেয়েছিস? নাকি ঝগড়া হয়েছে?
কোনটাই না,
তাহলে?
তোকে বলবো কেন?
ঠিক আছে, আমার যদি কোনদিন এরকম প্রেম টেম হয়ে যায় আমি কিন্তু তোকেও বলবো না।
তখন যদি মনে হয় তোর ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং তাহলে না হয় আমি তখন বলে তোরটা শুনে নেব, ব্যাপার না।
নেহাল এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, তুই কিন্তু আবার কোনো বিপদে পড়িস না ফারযাদ। এমনিতেই তোর লাইফটা কম জটিল নয়। আম্মু, নানু তোকে নিয়ে কতটা চিন্তিত জানিস তো? আমার ভাই তুই, ভাই বোনহীন একলা জীবনে আমি তোর মত একটা ভাই পেয়েছি। তুই আমার শক্তি, তোর কষ্ট আমাদের কারো সহ্য হবে না। প্রেম ভালোবাসায় কিন্তু বেদনার কথাই বেশি উল্লেখ থাকে। এই প্রেম ভালোবাসার জন্য যদি ভুল মানুষকে বেছে নিস তাহলে কিন্তু জীবনটাই বরবাদ হয়ে যাবে ভাই।
কাজী নজরুল ইসলামের একটা লেখা পড়েছিলাম,
"যারে হাত দিয়ে কাষ্ঠ জ্বালিয়েছো,
তাহারে কি আর প্রেম বলা যায়?
ভুল মানুষের প্রেমে পরা মানে
বিষের পেয়ালা নিজের হাতে তুলে নেওয়া।"
ফারযাদ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। বলল,
তুই তো দেখছি একদম আমার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছিস। আরে ভাই সেরকম কিছু হয়নি। জাস্ট দেখা হয়েছে কথা হয়েছে। আর এই যে আমার কল্পনায় ভেসে বেড়াচ্ছে এটুকুই। আর কথা যা বলার আমিই বলেছি। ওই মেয়ে তো আমাকে দেখে পারলে ভয়ে কোন আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। যদিও সে এখনো আড়ালে আছে। তবে একই শহরে তো। হয়তো কখনো দেখা হতেও পারে। আচ্ছা এখন ওসব কথা ছাড় ভাইয়া। চল একটু নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসি।
তোর মনটা নিয়ে গেছে মানে তোর কাছে তো আর কিছু নেই ভাই! আর তুই বলছিস তেমন কিছু না?
ওহ ভাইয়া, আগেই এত বেশি বেশি বলিস না তো। চল যাই,
চল,
,
,
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে পুরো শহর। অনিন্দিতার পা দুটো আর চলতে চাইছে না। খিদে আর ক্লান্তিতে মাথাটা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে যেন এখনই মাথাটা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যাবে সে। হাঁটতে হাঁটতে সে এসে পৌঁছালো এক নীরব আবাসিক এলাকায়। সেখানে একটা ছোট একতলা বাড়ির সামনে ঝুলছিল টু-লেট. একটি রুম ভাড়া দেওয়া হবে (শুধুমাত্র একজন মেয়ে )
বোর্ডের লেখাটা দেখে অনিন্দিতার নিভে যাওয়া চোখে যেন আশার আলো জ্বলে উঠলো। বুক ভরা ভয় আর আশা নিয়ে সে মূল গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লো।
দরজায় টোকা দিতেই বেরিয়ে এলেন মাঝবয়সী এক প্রবীণ নারী। মুখটা দয়ালু হলেও চাহনিতে কিছুটা গাম্ভীর্য। অনিন্দিতাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে তিনি শুধালেন,
কাকে চাও মেয়ে?
অনিন্দিতা শুকনো গলায় অত্যন্ত বিনীতভাবে বলল, আঙ্কেল, ম- মানে আন্টি, বাইরে টু-লেট বোর্ডটা দেখলাম। রুমটা কি এখনো খালি আছে?
মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে অনিন্দিতার শুকনো করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বললেন, হুম, খালি তো আছে। কিন্তু তুমি একা? পড়াশোনা করো নাকি চাকরি? বাড়ি কোথায় তোমার?
একটার পর একটা প্রশ্নে অনিন্দিতা ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলো। আজ সারাটা দিন এমনই হয়েছে। আগে পিছে কেউ নেই বলে কেউ ওকে বাসা ভাড়া দিতে ভরসা পায় না। এখনো যদি সত্যি কথা বলে তাহলে হয়তো এখান থেকেও বিতাড়িত হবে। আবার মিথ্যা বলতেও তার বিবেক সায় দিচ্ছে না। নতুন জীবনের শুরুটা সে কিছুতেই মিথ্যার আশ্রয় নেবে না, তাতে যত কষ্টই হোক। অনিন্দিতা নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
আমি ঢাকায় পড়াশোনা করতাম আন্টি। খুব অসহায় হয়ে আমাকে এই চট্টগ্রামে আসতে হয়েছে। আমি খুব বিপদে পড়েছি আন্টি, আপনি যদি কোনরকম ছোট একটা রুম আমাকে ভাড়া দেন, আমি সারাজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।
মহিলা কিছুক্ষণ অনিন্দিতার চোখের দিকে চেয়ে রইলেন। মেয়েটার মুখটাই যেন ভীষণ ক্লান্তি দুঃখ মায়া সব একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবুও আজকাল এই শহরে প্রতারকের অভাব নেই। তাই নিজেকে শক্ত রেখেই গম্ভীর কণ্ঠে ফের বললেন,
সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু তোমার বাবা-মা? বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ নিশ্চয়ই?
আমার বাবা মা নেই আন্টি। ভাই বোন কাছের বলতে কেউ নেই। যারা আছেন তাদের কাছে আমার নিজেকে নিজে বোঝা মনে হয়। তাই আমি নিজেই নিজের জন্য। আন্টি! রুমটা আমাকে ভাড়া দিবেন? কথা দিচ্ছি আমি আমার ভাড়া যথা সময়ে পরিশোধ করব। যদি না পারি তখন না হয় বের করে দিয়েন।
তবু মহিলার সন্দেহ গেল না। চারদিক ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন। কেউ লুকিয়ে ঠুকিয়ে আছে কিনা। আসলেই কি এই মেয়ে একা? নাকি কোন চক্রের? তিনি একা এক মহিলা কলেজ পড়া এক মেয়ে আর স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া এক ছেলে নিয়ে থাকেন। স্বামী গত হয়েছেন বছর তিনেক হল। কঠিন বিপদের সময়ে আত্মীয়দের সকলের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখে একা একাই থাকেন তিনি। কথায় আছে, 'আপনের চেয়ে পর ভালো পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো'। তবু একা একটা বাড়িতেই ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকেন।মাঝে মাঝে ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে। তাই তিনি ভেবেছিলেন ছাদের উপরের চিলেকোঠার রুমটা কোন এক মেয়েকে ভাড়া দিবেন । তাই এই টু-লেটটা ঝুলিয়েছেন। বেশ কয়েকজন দেখেও গিয়েছে তবে এমন বাসা আজকালকার মেয়েদের খুব একটা পছন্দ নয়। তাদের সঙ্গে পরিবার ছিল পরিচয় ছিল। কিন্তু এই মেয়েটা সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবারহীন একটা মেয়ে। যা বলছে তা সত্য না মিথ্যা বোঝা দায়।
তোমার পরিচয় পত্রটা একটু দেখাও তো মেয়ে।
এবার যেন আনন্দিতা অথৈ সাগরে পড়ল। পরিচয় পত্র তো তার এখনো বানানো হয়নি। এযাবৎকাল জন্ম নিবন্ধন এর কাগজটা দিয়েই সমস্ত প্রক্রিয়া পার করে এসেছে। জীবনের বিভিন্ন চড়াই উত্তর পার হতে হতে পরিচয় পত্র তৈরি করা হয়নি। পরিচয়ই তো নেই। তবুও রহিমা চৌধুরী বার কয়েক বলেছিলেন। করবে করবে করেও করা হয়নি। মেডিকেলে আবেদন করার আগে আগে করার কথা ভেবেছিল।
অনিন্দিতা ব্যাগ হাতড়ে সেই জন্ম নিবন্ধন এর কাগজটাই এগিয়ে দিল। বলল,
আন্টির পরিচয় পত্র তো তৈরি করা হয়নি, এই কাগজটা আছে। এটা দেখুন দয়া করে।
মহিলা কাগজটা দেখে আবার ফিরিয়ে দিয়ে বলল, আমি এখনই কিছু ভাবতে পারছি না। তুমি চাইলে অন্য কোথাও দেখতে পারো।
অনিন্দিতা ভীষণ হতাশ হলো, ভেতর থেকে ভেঙে যেন গুড়িয়ে গেল। ঘরের সামনে সিমেন্টে বাধাই করা বৈঠকে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লো। বলল,
এক গ্লাস পানি দিন আন্টি, বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে।
পানির চাওয়াতে যেন মহিলা আরও ভড়কে গেল। এই মেয়ে তো পিছু ছাড়ছে না, তার সন্দেহ কি তবে ঠিক ? তবুও পানি যেহেতু চেয়েছে মেয়েটাকে দেখতেও ক্লান্ত লাগছে তাই তিনি ভেতর থেকে পানি এনে দিলেন।
পানি খেয়ে অনিন্দিতা নিঃশব্দে গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
মহিলা আর দেরি না করে ভেতর থেকে দরজার খিল এটে দিলেন।
অনিন্দিতা সেখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে ধির পায়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল। রাত একটা মেয়ের জন্য কতটা ভয়ংকর তা সে জানে, তবুও কোথায় যাবে সে? হাঁটতে হাঁটতে আবারো কিছুটা দূর গেল। জিড়িয়ে জিড়িয়ে ঘণ্টা দুই হাঁটল মেয়েটা। রাত গভীর হয়ে আসছে। হাত-পা অসার হয়ে আসছে। ইচ্ছে করছে এই পিচঢালা রাস্তায় শুয়ে পড়তে। আশপাশের দোকানদার একে একে দোকান বন্ধ করে যেতে লাগলো। একটা সময় অনিন্দিতা বন্ধ একটা দোকানের সামনে মাথা ঘুরে বসে পড়লো। এই খোলা আকাশের নিচেও শরীরে যেন অক্সিজেনের বড্ড অভাব পড়েছে। আপনা আপনি শরীরটা সেখানেই এলিয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো অপরিচিত বন্ধো দোকানের সামনের মেঝেটাতে। অনিন্দিতা চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল এমন করে ও আগে পাগলদের শুয়ে থাকতে দেখতো ।
চলবে,
অনেক বড় একটা পর্ব। আপনারা কিন্তু গল্প সম্বন্ধে কিছু একটা বলে যাবে হ্যাঁ।
গল্প দিতে দেরি করি এসব বলে লজ্জা দিবেন না। নিয়মিত দিতে পারলে আমারই লাভ হয়। পেইজের অবস্থা খুবই বাজে হয়ে যাচ্ছে নিয়মিত না দিতে পারার কারণে। তো আর কি গল্প নিয়ে কিছু একটা বলে যাবেন কিন্তু।
ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ।