21/11/2024
তাঁতশিল্পের একটি পণ্য, অর্থাৎ তাঁতের সুতি শাড়িকেই বেশিরভাগ মানুষ তাঁতের কাপড় বলে জানলেও এ শিল্পের রয়েছে বহু ভিন্নতা, বহু বাহারি পণ্যের পসরা। এসব বস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দেবদাস, জরিপাড়, ইক্কাত, মণিপুরি, কটকি, কুমকুম, নীলাম্বরী, সানন্দা, গ্রামীণ চেকসহ আরো অনেক ধরনের কাপড়। এমনকি শুধু কাপড়ই নয়, তাঁতে বোনা হয় কম্বল, কার্পেট। নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তাঁতে বোনা পাপোশও রয়েছে। সবটাই নির্ভর করে তাঁতীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উপর। তাঁতে কাপড় বা অন্য পণ্য বোনার বিষয়টি বেশ জটিল। একটু ভুল হলেই পুরোটা গোলমাল। তাঁতে সাধারণত লম্বা করে টানটান করে রাখা সুতার মধ্য দিয়ে আড়াআড়ি বা আনুভূমিক সুতা প্রবেশ করিয়ে কাপড় তৈরি করতে হয়। লম্বালম্বি সুতোগুলোকে বলা হয় ‘টানা’, আর এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো আড়াআড়ি সুতোগুলোর নাম ‘পোড়েন’।
একেকটি তাঁতের শাড়ির দাম সাধারণত চারশো থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে ফ্যাশন হাউজগুলো যখন তাঁতীদের কাছ থেকে অনেকটা কম দামে শাড়ি নিয়ে আসেন, ঝলমলে শো-রুমে অন্যান্য হরেক পণ্যের মতো দাম বেড়ে যায় তাঁতের শাড়িরও। এছাড়া ঢালাওভাবে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য অনেকসময় তাঁতের সেই আদি রূপটি কিছুটা হলেও হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু এই বদলটাও সময়েরই প্রয়োজন বলে তাঁতী, বিক্রেতা ও ক্রেতা– সব পক্ষই মেনে নেয়।
একসময় যেমন শুধু হাতে চালানো তাঁতই ছিল এ শিল্পের কারিগরি। পরবর্তীতে তাতে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম তাঁতের ব্যবহার। হস্তচালিত এবং পাওয়ারলুম– এই দুই ধরনের সমন্বয়ে তাঁতশিল্প আরো বেশি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছেএবং আধুনিক পোশাক চাহিদার সাথেও তাল মেলাতে পেরেছে। অন্য যেকোনো শিল্পের মতোই তাঁতশিল্প যত সামনে এগিয়েছে, তত এতে সময়ের সাথে সাথে এসেছে পরিবর্তন। যোগ হয়েছে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। যেমন আগেরকার তাঁতীরা শাড়ির পাড়ে ব্যবহার করতেন মাধবীলতা, তেরবী, মরবী, লতাপাতা, পদ্মপাড়, কুঞ্জলতা ইত্যাদি নকশা। এখন সেগুলো প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এখন তাঁতের পাড়েও যোগ হয় অধুনা সব উপাদান, রঙ ও নকশার সংযোজন। তবে এখনো বহাল আছে তাঁতের শাড়িতে ফুল, লতাপাতা, পাখি ইত্যাদি সব প্রাকৃতিক উপাদান। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই তাঁতীরা এ নকশা বুনে আসছেন বছরের পর বছর ধরে।
কিন্তু তাঁতের কদর অনেক বেশি বেড়েও তাঁতীদের সুদিন খুব একটা ফেরেনি। তারা অনেকেই তাঁত চালানোর পাশাপাশিও রিকশা-ভ্যান চালানোর মতো পেশায়ও যুক্ত হচ্ছেন। মূল্যমান হোক বা সম্মান, কোনোটাতেই তাঁতীদের পাল্লা ভারি হয় না। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপে অনেক তাঁতীর ঘরেই চুলা জ্বলেনি। অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এখন অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন, কমে যাচ্ছে তাঁত ও তাঁতীর সংখ্যা। যারা টিকে আছেন, তারা হস্তচালিত তাঁতের জায়গায় চেষ্টা করছেন পাওয়ারলুম তাঁত ক্রয়ের। এতে উৎপাদনের হার অন্তত বৃদ্ধি পায়। ‘টানা’ আর ‘পোড়েন’-এর মাঝে ভারসাম্য রাখতে রাখতে তাঁতীদের জীবন কেটে যায় নিজস্ব টানা-পোড়েনে, যার ভারসাম্য রক্ষা তাঁতের সুতা বোনার চেয়েও বহুগুণ কঠিন।