13/05/2026
🔥মৃত্যু ধর্মকে ভুলে যাওয়া উচিত নহে। আমাকে মরতে হবে কথাটা যেন ভুলে না যাই। মরতে হবে কথাটা যারা ভুলে থাকে, তাদের মান অহংকার সদা উৎপন্ন হয়ে থাকে। আমি এখন মরবো না, আমি আরো বাঁচবো বলে মান অহংকার হতে থাকে। এভাবে মান অহংকার উৎপন্ন হলে ঐ ব্যক্তির তার শরীর কায়কে কেন্দ্র করে কায়িক দুশ্চরিত বা অপকর্ম সাধিত হওয়া বৈচিত্র নহে।
মুখকে কেন্দ্র করে বাচনিক অপকর্ম, মনকে কেন্দ্র করে মানসিক অপকর্ম সাধিত হতে পারে। তাই মৃত্যু বা মরণানুস্মৃতি অবশ্যই করা উচিত। এভাবে যাদের এই জ্ঞান নেই, তারা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে চলার সময় মুখে কর্কশ ভাষা প্রয়োগ করতে পারে। মনেও ক্ষতিকর চিন্তা উৎপন্ন হতে পারে। কায়িকভাবেও ভুল করতে পারে। এভাবে লোভ, দ্বেষ ও মোহ নিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে চলাফেরা করে থাকে। তা দেখে সংবেগ প্রাপ্ত হওয়া প্রয়োজন।
ধর্ম জ্ঞান যার আছে সে ধীরে সুস্থে কথা বলে, সে ধীর স্থির ব্যক্তিতে পরিণত হয়। তাকে আমি দেখতে পারি না; লোকটি বড় অসৎ। একদিন লোকটি মরে গেলে সবই নিশ্চুপ হয়ে যায়। ঐ কথা বলার আর প্রয়োজনও পড়ে না। এভাবে জীবিত থাকাকালে লোভ, দ্বেষ ও মোহ নিয়ে যাই করি না কেন, মৃত্যুর পর সবই স্তব্ধ হয়ে যায়।
ময়লা-আবর্জনা বা মৃতদেহ সমুদ্রে বিসর্জন দিলে ঢেউয়ে দুলতে থাকে, ভাসতে থাকে। যখন এক সময় সমুদ্রের গভীরে নিমজ্জিত হয়, তখন সবই অদৃশ্য হয়ে যায়। আমাদের বেলায়ও ঠিক তদ্রূপ নয় কি?
সেও মরবে, আমিও মরব। সকলে মরবে। এটি জগতের ধ্রুব সত্য। এই মৃত্যু ধর্মের চেয়ে শক্তিমান কোন ধর্ম নেই। মরবো, মরবো বলে ভাবতে থাকলে লোভ, দ্বেষ-চিত্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই ভগবান বুদ্ধ সর্বদা মরণানুস্মৃতিতে জাগ্রত থাকতে বলেছেন।
ভগবান বুদ্ধ আরো বলেছেন-
ফলান মিব পাক্কানং; নিচ্চং পতনতো ভয়ং
এবং জাতান মচ্চানং; নিচ্চং মরণহো ভয়ং ॥
অর্থাৎ- যে ফল পাকতে শুরু করে, তা বৃক্ষ থেকে বৃন্তচ্যুত হয়ে মাটিতে পতিত হবার আশংকা সর্বদা যেমন বিদ্যমান, ঠিক তেমনি মনুষ্য-দেব-ব্রহ্মা সকল সত্বই জন্মিলে মরতে হবে এই ভয়ে সদা ভীত থাকে।
বুদ্ধ বলেন-
সায় মেতে ন দিস্সন্তি; পাতো দিট্ঠা বহুজনা,
পাতো সেতে ন দিস্সন্তি; সায়ং দিট্ঠা বহুজনা ॥
অর্থাৎ- যে সকল ব্যক্তিকে সকালে দেখেছি; সন্ধ্যায় তাদের অনেককে আর দেখা যায় না; আবার সন্ধ্যায় যাদেরকে দেখেছি সকালে তাদের অনেককে দেখা যায় না।
আহা! মরণ ধর্ম এমনই ধর্ম। আমার পিতা; পিতার পিতা, পিতামহের পিতা এভাবে পূর্ব পুরুষগণও আমাদের ন্যায় সংসার করেছিলেন। মৃত্যুতে তাঁরা গত হয়ে অদৃশ্য হয়েছেন। আমরা তাঁদের আর স্মরণ করি না। ঠিক তদ্রূপ আমিও একদিন এভাবে মৃত্যুতে গত হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবো এবং আমাকেও সকলে একদিন ভুলে যাবেই এটি চিরন্তন সত্য ধর্ম।
তাই এই মরণানুস্মৃতি যাঁরা করেন তাঁরা অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম- এই ত্রিলক্ষণ জ্ঞান লাভ করে থাকেন। ত্রিলক্ষণ জ্ঞান যাঁরা লাভ করেন তাঁরা সমস্ত লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করতে সক্ষম হন। যাঁরা লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করতে সক্ষম হন, তাঁরা মুক্ত পুরুষ হতে সক্ষম হন। তাঁরা পরম শান্তি নির্বাণ দর্শন করেন।
তাই ভগবান বুদ্ধ বলেছেন-
সুপ্প বুদ্ধং পবুজ্ঝন্তি সদা গোতমসাবকা
য়েসং দিবাচ, রত্তোচ; নিচ্চং মরণানুস্সতি।
অর্থাৎ- যে সকল বুদ্ধ শ্রাবকগণ সর্বদা মরণানুস্মৃতি করবেন তাঁরা সর্বদা জাগ্রত ও অপ্রমাদ হয়ে থাকেন।
যাঁরা ভব সংসার পরিভ্রমণে জাগ্রত, তাঁরা শীঘ্রই গন্তব্যস্থলে পৌঁছেন, তাঁদের জন্য রাত্রি অল্পক্ষণ হয়। আর যারা জাগ্রত নহে ঘুমন্ত (প্রমাদ বহুল) তাদের রাত্রি দীর্ঘ হয় এবং সংসার পরিভ্রমণ তাদের শেষ হয় না।
~~গুরুভন্তের দেশনা কল্পতরু (২য় খন্ড) হতে সংগ্রহীত🙏🙏🙏🌺🌺🌺