15/05/2026
বৃষ্টির শব্দটা আজ অন্যরকম লাগছিল মেহরাবের কাছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ তুলে পানি গড়িয়ে পড়ছে, আর সে বসে আছে অন্ধকার ঘরে, হাতে আধখানা চায়ের কাপ। বাইরে শহরটা ব্যস্ত, অথচ তার ভেতরটা অদ্ভুত নিঃশব্দ।
মোবাইলের স্ক্রিনে একটা মেসেজ জ্বলে উঠল।
— “আজ দেখা হবে?”
মেসেজটা নীলার।
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই “দেখা হবে” কথাটার ভেতর কত অপরাধ, কত আকাঙ্ক্ষা, কত শূন্যতা লুকিয়ে আছে— সেটা শুধু ওরা দু’জনই জানে।
নীলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল বইমেলায়। দু’জনেই একই বই হাতে নিয়েছিল— জীবনানন্দের কবিতা। সেই হাসিটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তারপর কথার পর কথা জমে একসময় এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখান থেকে ফিরে আসা সহজ নয়।
নীলা বিবাহিত। তার স্বামী আরিফ একজন সফল ব্যবসায়ী। সংসারে অভাব নেই, কিন্তু সময় নেই। ভালোবাসার ভাষা নেই। আর মেহরাব? সে নিজেও বিবাহিত। স্ত্রী সায়মা তাকে ভীষণ বিশ্বাস করে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে দেরি হলে এখনও ফোন করে বলে,
— “খেয়েছ?”
এই একটি প্রশ্নই মাঝে মাঝে মেহরাবকে অপরাধবোধে ভাসিয়ে দেয়।
তবু মানুষ কেন ভুল পথে হাঁটে?
হয়তো ভালোবাসার জন্য নয়, বোঝা হওয়ার জন্য। কেউ একজন মন খুলে শুনুক— এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই।
সেদিন ক্যাফেতে নীলা বলেছিল,
— “আমরা কি খুব খারাপ মানুষ?”
মেহরাব উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সত্যি বলতে, ওরা কেউ কাউকে ঠকাতে চায়নি। শুধু নিজেদের নিঃসঙ্গতা থেকে একটু আশ্রয় খুঁজেছিল।
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “আমি কখনও ভাবিনি অন্য কারও সঙ্গে এত কথা বলতে ভালো লাগবে।”
— “আমিও না।”
দু’জনেই চুপ হয়ে গেল।
ক্যাফের ভেতর নরম আলো, ধোঁয়া ওঠা কফি, পিয়ানোর মৃদু সুর— সবকিছু যেন ওদের আরও কাছে টেনে আনছিল। অথচ দূরত্বটাই ছিল সবচেয়ে জরুরি।
কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো পূর্ণতা পেলেই ভেঙে যায়।
একদিন রাতে সায়মা ঘুমিয়ে পড়ার পর মেহরাব বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, সে আসলে দুটো জীবনের মাঝে আটকে গেছে। একদিকে দায়িত্ব, অন্যদিকে অনুভূতি। কিন্তু দায়িত্বকে অস্বীকার করলে অনুভূতির সৌন্দর্যও নষ্ট হয়ে যায়।
পরদিন সে নীলাকে শেষবারের মতো দেখা করতে বলল।
নীলা এসেছিল সাদা শাড়ি পরে। চোখে কষ্ট লুকোনো হাসি।
— “এটাই শেষ, তাই না?” সে জিজ্ঞেস করল।
মেহরাব ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
— “হয়তো কিছু ভালোবাসা কাছে থাকার জন্য না। দূরে থেকেই সুন্দর।”
নীলার চোখ ভিজে উঠল।
— “তোমাকে ভুলতে পারব না।”
— “আমিও না। কিন্তু মনে রাখাটাই সবসময় পাওয়া না।”
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে হালকা রোদ উঠছে।
ওরা দু’জন বিপরীত দিকে হাঁটতে শুরু করল। কেউ পিছনে তাকাল না। কারণ কিছু গল্পের সৌন্দর্য এখানেই— অসম্পূর্ণতায়।
আর ভালোবাসা?
সে কখনও কখনও মানুষকে এক করে না, বরং সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে দেয়।