21/05/2025
শাশুড়ি বনাম মা
বিভিন্ন গার্লস গ্রুপে একখানা পোস্ট দেখছি। শাশুড়ির মোবাইল নম্বর মা লিখে সেইভ করেছিলেন উনারা। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই শাশুড়ি নাকি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে মা আর শাশুড়ি এক না। তাই তারা আবার সেই নম্বর শাশুড়ি লিখে সেইভ করেছেন। সেইসব পোস্টে আবার অনেক মেয়েরা সেইম অবস্থা লিখে কমেন্ট করছেন।
ওয়েল বাচ্চারা, একটু বড় হও। মা মা-ই, শাশুড়ি শাশুড়িই। দুইজন মানুষ ভিন্ন, দুইটা পরিবার ভিন্ন, পরিবারের মানুষগুলো ভিন্ন। দুইজনের সম্মান এবং দুইজনের প্রতি আমাদের দায়িত্বও ভিন্ন। শাশুড়ি যদি মা হয়, তাহলে আপনার স্বামী আপনার ভাই হয়ে যাবে (নাউজুবিল্লাহ্)। মায়ের জায়গা যেমন কেউ নিতে পারেনা, শাশুড়ির জায়গাও কেউ নিতে পারবেনা। আমাদের মা যদি আমাদের একটা চোখ হয়, শাশুড়ি আরেকটা চোখ। দুইটা চোখের গুরুত্বই অপরিসীম এবং দুইটা চোখ দিয়েই যখন আপনি দেখবেন আপনার দৃষ্টি পরিপূর্ণ হবে। এক চোখে দেখলে কখনো সঠিক ভিউ পাবেন না। পার্সপেক্টিভ বুঝবেন না।
বিয়ের আগে আমরা মেয়েরা আমাদের পরিবার থেকে, শিক্ষাজীবন, বন্ধুবান্ধব, নিজেদের অর্জিত জ্ঞান থেকে যে শিক্ষা পাই সেই শিক্ষার আলোকেই কিন্তু আমরা বিয়ের পরের জীবন শুরু করি এবং সেই জীবনটাই আমাদের আসল জীবন। বিয়ের আগের জ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস হচ্ছে বিয়ের পরের সময়। কি শিখলেন, কি জানলেন, নিজের অন্তরকে কতটুকু আলোকিত করতে পারলেন, কতোটুকু ম্যাচিউর আপনি সেটারই বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটে বিয়ে পরবর্তী সংসার জীবনে এবং আপনার পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি আপনার সার্বিক সকল শিক্ষার প্রকাশও কিন্তু এখানেই ঘটে।
একটা উদাহরণ দেই,আমরা ইউটিউব দেখে কিংবা রান্নার বই দেখে অনেক রান্নাই সহজ মনে করি। কিন্তু বাস্তবে যখন সেই রেসিপি রান্না করতে যাই তখন বুঝি যে রান্নাটা আসলে কতোটা শৈল্পিক এবং অভিজ্ঞতার কাজ। এখানে রন্ধন জ্ঞানের পাশাপাশি মায়া, মমতা, ভালোবাসার মিলন যখন ঘটবে তখনই দারুণ স্বাদের একটা খাবার হবে যা দেখে চোখ যেমন জুড়াবে, খেয়ে জিভের এবং মনেরও তৃপ্তি দিবে। এখানে আবেগ অনেকটাই অচল। আপনি যদি আবেগে তেলের জায়গায় ঘি দেন এবং দুই চামচের জায়গায় ছয় চামচ দেন তাহলে তা আর খাওয়ার লায়েক থাকবে না। শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে যাবে। তাই আবেগ নয়, মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে কাজ করুন।
মায়ের সাথে কেবল মায়ের তুলনা করুন। মনে রাখবেন, মায়েরাও দোষ ত্রুটির উর্ধ্বে নন। মায়েদের সকল কার্যকলাপই সঠিক হয় না। কিন্তু খুব সহজেই সেই বিষয়গুলো আপনারা এড়িয়ে যান, এমনকি মায়ের দোষগুলো কেউ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও আপনারা মায়ের পক্ষ নিয়ে অন্যদের দিকে তীর্যক দৃষ্টি হানেন। একই বিষয়ে শাশুড়ির দোষগুলো কিন্তু আবার পরিচিত অপরিচিত সকলের কাছেই বলে বেড়ান, শাশুড়িকে ছোট করতে অসম্মানিত করতে পিছপা হননা যার প্রমাণ গার্লস গ্রুপের পোস্টগুলো। শাশুড়ির সামনে মা মা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, নিজের মায়ের জায়গায় বসানোর কথা বলেন কিন্তু এই শাশুড়ির আইসিইউতে থাকা অবস্থাতেই আবার আপনারা নিজেদের জন্মদিনের সেলিব্রেশন করেন, পিকনিকে যান, বান্ধবীদের আড্ডায় যান, গেটটুগেদার করেন, পার্লারে সময় কাটান যেটা নিজের গর্ভধারিণী মায়ের ক্ষেত্রে স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেন না(এসবের অধিকাংশই আমার নিজের চোখে দেখা)। তাহলে কিভাবে আপনারা বলেন যে মা আর শাশুড়ি এক?? কিভাবে বলেন দুইজনকে একই রকম ভাবেন, একই জায়গায় স্থান দেন আর দুইদিন পর শাশুড়ি আপনাদেরকে তাদের আসল রূপ দেখায়, শ্বশুরবাড়ির লোকজন আপনাদের আপন ভাবেনা?!
বাবা মায়ের স্থানে তাদের মতো রাখেন, তাদের প্রাপ্য সম্মান ভালবাসা তাদেরকে দেন। শ্বশুর শাশুড়ির স্থানকেও তাদের মতো রাখেন। তাদের প্রাপ্য সম্মান তাদেরকে দেন। প্রমাণ করে দেন যে ছেলের বৌ ক্ষেত্র বিশেষে মেয়ের চেয়েও অনেক বেশি হয় যখন ছেলের বৌটা তার পারিবারিক সুশিক্ষার পাশাপাশি তার নিজের অর্জিত জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ ঘটায়। আর যদি কেবল লোকদেখানো শিষ্টাচারই একমাত্র হাতিয়ার হয়, তখন মুখে মুখেই কেবল শাশুড়িকে মায়ের জায়গায় বসানো যায়। বাস্তবে মা তো বহুদূর, শাশুড়ির প্রাপ্য সম্মানটুকুও জনসম্মুখে অসম্মানের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে যায় আর শাশুড়িকে মায়ের জায়গায় বসানো সেই ছেলের বৌ মহাকাশচারীর মতো আকাশ থেকে পড়ে বলেন,
"আমিতো তাকে মা-ই ভেবেছিলাম"!!!
- নাজনীন সুলতানা রিমি