19/04/2020
-কী ব্যাপার?ওজন এত বেড়ে গেছে কেন তোমার?
-কমিয়ে ফেলবো।
-ওড়না নিও,বাজে দেখা যায় সামনের দিকে।
শেষের কথাটা কাল্পনিক। তবে যে বলেছে তার চোখের চাহনিতেই শেষের লাইনটার কথ্য রূপ আমার মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছে।
এবার ধীরে ধীরে আমি যন্ত্রণাদায়ক কিছু স্মৃতিচারণ করা শুরু করলাম।নতুন কিছু না।গত এক যুগ ধরে করে আসছি আমি বিভিন্ন ঘটনার রেশ ধরে।
তখন আমি ছোট খাটো 'গোলগাল' সবে আটে পা দেয়া 'মেয়ে'।শিশু বলতে পারছি না,কোনোভাবেই না।ছোট থেকেই আমি খাবারপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলায় শখের বশে খেতাম,এখন খাই ডিপ্রেশনে।ছোটবেলায় এটাকে 'রুচি' বলা হত,এখন এটা ইটিং ডিজওর্ডার।যাই হোক,'নাদুস নুদুস' হওয়ার সাথে যে যৌনতার বিশেষ একধরনের সূত্র আছে,সেটা আমি জানতে পেরেছি আমার পনের বছর বয়সে।অনেক পেচালাম কথা,ঘটনায় আসি।
আট বছর বয়সে আমি বেশ গোলগাল ছিলাম।ঐ গোলগাল আমি সালোয়ার কামিজ পরে বড় ওড়না পেঁচিয়ে আরো গোল হয়ে যেতাম নিজের ধর্ম শিক্ষার জন্য।আমসেপারা শেষ করে কোরআন শরীফের ছিলো ছয় পাড়া পর্যন্ত পরলেও খতম দিতে পারিনি।এখনো আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় কোরআন খতম করোনি?ওমুক তমুক তো তিনবার খতম দিয়েছে।আমি হাসি।ভদ্রতার হাসি,যে আমি অনেকই ব্যর্থ একজন।কিন্তু কেন দিতে পারি নি জানেন?একজন ধর্ম শিক্ষকের হাত সামনে কোরআন শরীফ থাকা অবস্থায় আমার তথাকথিক 'গোলগাল' শরীরে আনাচে কানাচে বিচরণ করত।আমি জানতাম না বিষয়টা কতখানি গুরুতর,কিন্তু দিনদিন বিষয়টা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো।ছোট্ট সেই আমি ঘটনার বর্ণনা দিতে পারিনি বাবা মায়ের কাছে,তবে বলেছিলাম,আমি আর পড়বো না,খুব শান্তভাবে,যেন কিছুই হয়নি।আমার বাবা মা আমার কথার গুরুত্ব দিয়ে পড়া থামিয়ে দিলেন।
গোলগাল আমি বারো তে পা দিবো একমাস পর।বই মেলায় গিয়েছি বাবার হাত ধরে।তখনো নারী হিসেবে শরীর পূর্ণতা পায়নি,মানসিকতাও না।ফুলহাতা ঢোলা শার্ট পরে আমি মনের আনন্দে কবিতার বই খুঁজছিলাম।এক অযাচিত স্পর্শ আমার বুকে এসে লাগলো।আমি চমকালাম।ডিস্ট্র্যাক্ট হলাম,এমনভাবেই হলাম যে আর বই কিনতে পারলাম না।বই মেলা থেকে বের হয়ে ফুটপাতে হাঁটা শুরু করলাম বাবার হাত ধরে,প্রচুর ভীড়। হটাৎ কে যেন আমার সমতল বুকে খুব গাড় যৌনতা খুঁজে পেয়ে থাবা দিলো,বেশ জোড়ে।এবার চমকালাম না।থেমে গেলাম,চোখে পানি আসলো।লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলাম, ইন করা নীল শার্ট পরা এক শিক্ষিত ভদ্রলোক।বাসা পর্যন্ত আমি একটা কথাও বললাম না বাবার সাথে।বাবা হয়ত বিষয়টা বুঝলেন।আমাকে মার কাছে পাঠালেন।আমি ডুকরে কেঁদে বললাম 'মা আমাকে সালোয়ার কামিজ বানিয়ে দাও প্লিজ!'
আর কোনো কথা বললাম না।এরপর মধ্যরাতে,অন্ধকার ঘরে মার ঘুম ভাঙিয়ে কেঁদে কেঁদে খুলে বললাম সব।মা আমাকে বুকে নিয়ে শান্ত করলো।পরেরদিন দেখলাম রান্নাঘরে মা নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে আছে,চোখে তার পানি।
এই দুইটা ঘটনা আমাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে,যেটা আমি বর্ণনা করতে পারবো না।তবে বিষয়টা এখানেও থেমে থাকেনি।
এসএসসি শেষে কোচিং এ ভর্তি হলাম।তথাকথিত এক ফেসবুক ছেলে ফ্রেন্ড আমাকে বিরাট বড় বয়ান দিলো।বয়ানের সারমর্ম,তোমার সতর মেনে চলা উচিৎ।উল্লেখ্য, আমি তখনও ঢোলাঢালা শার্ট পড়তাম।চ্যাটের এক পর্যায়ে সেই 'শুভাকাঙখী' তার কাছের বন্ধুর মন্তব্য আমাকে জানালো,মন্তব্যটা হলো সেই বন্ধু নাকি আমার জামার ভেতরে বক্ষবন্ধনীর অস্তিত্ব পায়নি,তো সে ধরে নিয়েছে আমি ওরনা ছাড়া বক্ষবন্ধনী ছাড়া ঢ্যাং ঢ্যাং করে কোচিং এ আসি। কথাটা ভীষণভাবে আমাকে আঘাত করেছিলো।মানে একটা ছেলে যে কিনা সবেমাত্র এসএসসির গন্ডি পেরিয়েছে,সে আমার শরীর খুটিয়ে বের করছে জামার ভেতরে জামার কী খবর!আমি পরবর্তীতে আর সে কোচিং কন্টিনিউ করিনি,পারিনি।
আমি ২০১৬ সালে একটা সোশ্যাল সাইটে একাউন্ট খুলি যেখানে এনোনিমাস হয়ে প্রশ্ন করা যায়।সেই সাইটে আমি নিজের একটা প্রোফাইল পিকচার দিয়েছিলাম,ঢোলা জামা পরে।কিছু প্রশ্ন এসেছিলো,কী জানেন?
*No b***s?*
*You have no b***s *
*Are you a boy or something *
অর্থাৎ,আমি যদি নিজের অবয়ব না দেখিয়েও জামা পরি,আমাকে বুলিং এর শিকার হতে হবে।কতটা ছোট মনে হয়েছিলো নিজেকে আন্দাজ ও করতে পারবেন না।
এছাড়া ফেসবুক একাউন্টে অহরহ সেক্স চ্যাট করতে চাওয়া মানুষের ও অভাব নাই।মেসেজ রিকোয়েস্টে এসব মেসেজ ভরে থাকে।দুঃখজনক হলেও সত্যি,এরা বেশির ভাগই উচ্চ শিক্ষিত।
এসব বলার কারণ কী জানেন?কিছুই না হয়ত,নিজের মতামত প্রকাশ করা।এই পোস্ট পড়ার পর অনেকেই বলবে,আমি মেয়েদের উস্কিয়ে দিচ্ছি খোলামেলা জামা কাপড় পরার জন্য?এই পোস্টে আমি সুক্ষ্মভাবে মেসেজ দিয়েছি,পোষাকে কিছুই যায় আসে না,হেনস্তার শিকার হবাই,অতএব স্বাধীনভাবে চলো।
মোটেও না।
কক্ষনো না।
আমি এই পোস্টের মাধ্যমে একটাই মেসেজ দিতে চেয়েছি,কোনো মানুষের ভয় যেন কারো পর্দার কারণ না হয়।কোনো সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মেয়ে যেন না বলে 'আমাকে সালোয়ার কামিজ বানিয়ে দাও',কোনো মা যেন না বলে 'এলাকা ভালো না,বড় হয়েছিস,বোরকা পরবি'।
এই কথাগুলো যেন এভাবে আসে,'মা আমার সালোয়ার কামিজ ভালো লাগে,তাই বানাবো কয়েকটা'।
মা যেন মেয়ে কে বলে 'আল্লাহ বলেছে পর্দা করতে,তুই ধীরে ধীরে পর্দা করা শুরু কর'।
অথবা কেউ যদি পর্দায় নিজেকে রাখতে পছন্দ করে,শুধুমাত্র সেই কারণেই পর্দা করে।
মানুষের ভয়ে পর্দা করলে সেই পর্দা নিয়ে আপনি কি জান্নাতে যেতে পারবেন?সৃষ্টিকর্তাকে অবমাননা করা হয় না এতে?
আরেকটা ব্যাপারে কথা উঠবে,অবশ্যই। অনেক নিচু মানসিকতার ছোটলোক উঠে এসে কমেন্ট করবে ধর্ম নিয়ে।আগেই বলে নেই,একজন কে দিয়ে পুরো ধর্ম হয় না।পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে,যারা সত্যিকার অর্থেই ধর্ম পালন করছে একনিষ্ঠ ভাবে। একজনের জন্য তাদের কে গালি দেয়া চরম বোকামি।কারণ এই একি ধর্মের এক মানুষ আমাকে নামাযে যাওয়ার সময় নিজের গায়ের শাল দিয়েছিলো শরীর ঢাকার জন্য,কারণ আমার জামায় পিরিয়ডের রক্ত লেগেছিলো।
সমস্যা মানুষের মধ্যে,ধর্মের মধ্যে না।
এখন আমার একটা প্রশ্ন,আমি যে হেনস্তা হলাম,এদের একজন ধর্ম বিশারদ,একজন শিক্ষিত এডাল্ট,আরেকজন ভালো ফ্যামিলি থেকে বিলং করা ছেলে।এবার বলেন,ঠিক কিসের মাধ্যমে আপনি সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট থামাবেন?ভালো পরিবেশে বড় করা?শিক্ষা?বিশদ ধর্মীয় জ্ঞান?আমার উত্তর কোনোটাই না।এর পুরোটাই নির্ভর করে মাইন্ড সেট আপের উপর।
অনেক মানুষ আছেন,যারা যৌনতাকে চরম নেতিবাচক একটা বিষয় হিসেবে গণ্য করে,সেটাকে ট্যাবু পর্যায়ে নিয়ে যায়।আইরোনিকালি তারাই বিকৃত যৌনাচারকে জাস্টিফাই করে 'স্বভাবের দোষ','একটু আধটু হয়ই','বয়সটা খারাপ','ছেলেরা একটু ছোক ছোক করেই,'মেয়েরা ন্যাংটা হয়ে ঘুরলে ছেলেরা কী করবে?', ইত্যাদি দ্বারা।
সবশেষে এটাই বলবো,একটা মেয়ে,তার ছোটখাটো বিশ বছরের জীবনে প্রায় সব শ্রেণির মানুষের কাছে একবার না একবার হেনস্তা হবেই। সেটা শিক্ষক,রাস্তার পথচারি অথবা সহপাঠী। তাই তাকে জ্ঞান দেয়ার আগে অভিজ্ঞতা শুনে নিবেন দয়া করে।অভিজ্ঞতা শোনার পর আর জ্ঞান দেয়ার ইচ্ছা নাও থাকতে পারে।আর যারা বলেন মেয়েদের পর্দা না করার জন্য হেনস্তার শিকার হতে হয়,তাদের কাছে প্রশ্ন,একটা ছোট বাচ্চা ঠিক কি ঢাকার জন্য পর্দা করবে?তার অস্তিত্ব?আর কেউ পর্দা না করলে সেটার বিচার করার জন্য সৃষ্টিকর্তা আছে,আপনাকে কে পারমিশন দিয়েছে পরনারীর গায়ে হাত দেয়ার?নাকি তখন তথাকথিত উচ্চ শিক্ষা হতে প্রাপ্ত এটিকেট,ম্যানারস,এথিকস অথবা ধর্মের জ্ঞান লিঙ্গর নিচে চাপা পরে যায়?
পুরুষ দিবস ও কিন্তু আছে,কিন্তু কখনো ঘটা করে পালন করতে দেখেছেন?দেখবেন না।কিন্তু নারী দিবস অনেক জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়?কী ভাবছেন?পৃথিবী বদলাচ্ছে?উহু,যতদিন পর্যন্ত নারী দিবস বড় করে পালন করা হবে,বুঝবেন ততদিন পর্যন্ত নারীরা নিগৃহীত শ্রেণির মানুষ,এদের স্বান্তনার প্রয়োজন।এটা নারীর জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রতীক না,এটা বুঝাচ্ছে নারীরা এখনো অত্যাচারিত,এখনো,এই একবিংশ শতাব্দীতে।
লেখা: Sabrina Oishi-কী ব্যাপার?ওজন এত বেড়ে গেছে কেন তোমার?
-কমিয়ে ফেলবো।
-ওড়না নিও,বাজে দেখা যায় সামনের দিকে।
শেষের কথাটা কাল্পনিক। তবে যে বলেছে তার চোখের চাহনিতেই শেষের লাইনটার কথ্য রূপ আমার মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছে।
এবার ধীরে ধীরে আমি যন্ত্রণাদায়ক কিছু স্মৃতিচারণ করা শুরু করলাম।নতুন কিছু না।গত এক যুগ ধরে করে আসছি আমি বিভিন্ন ঘটনার রেশ ধরে।
তখন আমি ছোট খাটো 'গোলগাল' সবে আটে পা দেয়া 'মেয়ে'।শিশু বলতে পারছি না,কোনোভাবেই না।ছোট থেকেই আমি খাবারপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলায় শখের বশে খেতাম,এখন খাই ডিপ্রেশনে।ছোটবেলায় এটাকে 'রুচি' বলা হত,এখন এটা ইটিং ডিজওর্ডার।যাই হোক,'নাদুস নুদুস' হওয়ার সাথে যে যৌনতার বিশেষ একধরনের সূত্র আছে,সেটা আমি জানতে পেরেছি আমার পনের বছর বয়সে।অনেক পেচালাম কথা,ঘটনায় আসি।
আট বছর বয়সে আমি বেশ গোলগাল ছিলাম।ঐ গোলগাল আমি সালোয়ার কামিজ পরে বড় ওড়না পেঁচিয়ে আরো গোল হয়ে যেতাম নিজের ধর্ম শিক্ষার জন্য।আমসেপারা শেষ করে কোরআন শরীফের ছিলো ছয় পাড়া পর্যন্ত পরলেও খতম দিতে পারিনি।এখনো আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় কোরআন খতম করোনি?ওমুক তমুক তো তিনবার খতম দিয়েছে।আমি হাসি।ভদ্রতার হাসি,যে আমি অনেকই ব্যর্থ একজন।কিন্তু কেন দিতে পারি নি জানেন?একজন ধর্ম শিক্ষকের হাত সামনে কোরআন শরীফ থাকা অবস্থায় আমার তথাকথিক 'গোলগাল' শরীরে আনাচে কানাচে বিচরণ করত।আমি জানতাম না বিষয়টা কতখানি গুরুতর,কিন্তু দিনদিন বিষয়টা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো।ছোট্ট সেই আমি ঘটনার বর্ণনা দিতে পারিনি বাবা মায়ের কাছে,তবে বলেছিলাম,আমি আর পড়বো না,খুব শান্তভাবে,যেন কিছুই হয়নি।আমার বাবা মা আমার কথার গুরুত্ব দিয়ে পড়া থামিয়ে দিলেন।
গোলগাল আমি বারো তে পা দিবো একমাস পর।বই মেলায় গিয়েছি বাবার হাত ধরে।তখনো নারী হিসেবে শরীর পূর্ণতা পায়নি,মানসিকতাও না।ফুলহাতা ঢোলা শার্ট পরে আমি মনের আনন্দে কবিতার বই খুঁজছিলাম।এক অযাচিত স্পর্শ আমার বুকে এসে লাগলো।আমি চমকালাম।ডিস্ট্র্যাক্ট হলাম,এমনভাবেই হলাম যে আর বই কিনতে পারলাম না।বই মেলা থেকে বের হয়ে ফুটপাতে হাঁটা শুরু করলাম বাবার হাত ধরে,প্রচুর ভীড়। হটাৎ কে যেন আমার সমতল বুকে খুব গাড় যৌনতা খুঁজে পেয়ে থাবা দিলো,বেশ জোড়ে।এবার চমকালাম না।থেমে গেলাম,চোখে পানি আসলো।লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলাম, ইন করা নীল শার্ট পরা এক শিক্ষিত ভদ্রলোক।বাসা পর্যন্ত আমি একটা কথাও বললাম না বাবার সাথে।বাবা হয়ত বিষয়টা বুঝলেন।আমাকে মার কাছে পাঠালেন।আমি ডুকরে কেঁদে বললাম 'মা আমাকে সালোয়ার কামিজ বানিয়ে দাও প্লিজ!'
আর কোনো কথা বললাম না।এরপর মধ্যরাতে,অন্ধকার ঘরে মার ঘুম ভাঙিয়ে কেঁদে কেঁদে খুলে বললাম সব।মা আমাকে বুকে নিয়ে শান্ত করলো।পরেরদিন দেখলাম রান্নাঘরে মা নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে আছে,চোখে তার পানি।
এই দুইটা ঘটনা আমাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে,যেটা আমি বর্ণনা করতে পারবো না।তবে বিষয়টা এখানেও থেমে থাকেনি।
এসএসসি শেষে কোচিং এ ভর্তি হলাম।তথাকথিত এক ফেসবুক ছেলে ফ্রেন্ড আমাকে বিরাট বড় বয়ান দিলো।বয়ানের সারমর্ম,তোমার সতর মেনে চলা উচিৎ।উল্লেখ্য, আমি তখনও ঢোলাঢালা শার্ট পড়তাম।চ্যাটের এক পর্যায়ে সেই 'শুভাকাঙখী' তার কাছের বন্ধুর মন্তব্য আমাকে জানালো,মন্তব্যটা হলো সেই বন্ধু নাকি আমার জামার ভেতরে বক্ষবন্ধনীর অস্তিত্ব পায়নি,তো সে ধরে নিয়েছে আমি ওরনা ছাড়া বক্ষবন্ধনী ছাড়া ঢ্যাং ঢ্যাং করে কোচিং এ আসি। কথাটা ভীষণভাবে আমাকে আঘাত করেছিলো।মানে একটা ছেলে যে কিনা সবেমাত্র এসএসসির গন্ডি পেরিয়েছে,সে আমার শরীর খুটিয়ে বের করছে জামার ভেতরে জামার কী খবর!আমি পরবর্তীতে আর সে কোচিং কন্টিনিউ করিনি,পারিনি।
আমি ২০১৬ সালে একটা সোশ্যাল সাইটে একাউন্ট খুলি যেখানে এনোনিমাস হয়ে প্রশ্ন করা যায়।সেই সাইটে আমি নিজের একটা প্রোফাইল পিকচার দিয়েছিলাম,ঢোলা জামা পরে।কিছু প্রশ্ন এসেছিলো,কী জানেন?
*No b***s?*
*You have no b***s *
*Are you a boy or something *
অর্থাৎ,আমি যদি নিজের অবয়ব না দেখিয়েও জামা পরি,আমাকে বুলিং এর শিকার হতে হবে।কতটা ছোট মনে হয়েছিলো নিজেকে আন্দাজ ও করতে পারবেন না।
এছাড়া ফেসবুক একাউন্টে অহরহ সেক্স চ্যাট করতে চাওয়া মানুষের ও অভাব নাই।মেসেজ রিকোয়েস্টে এসব মেসেজ ভরে থাকে।দুঃখজনক হলেও সত্যি,এরা বেশির ভাগই উচ্চ শিক্ষিত।
এসব বলার কারণ কী জানেন?কিছুই না হয়ত,নিজের মতামত প্রকাশ করা।এই পোস্ট পড়ার পর অনেকেই বলবে,আমি মেয়েদের উস্কিয়ে দিচ্ছি খোলামেলা জামা কাপড় পরার জন্য?এই পোস্টে আমি সুক্ষ্মভাবে মেসেজ দিয়েছি,পোষাকে কিছুই যায় আসে না,হেনস্তার শিকার হবাই,অতএব স্বাধীনভাবে চলো।
মোটেও না।
কক্ষনো না।
আমি এই পোস্টের মাধ্যমে একটাই মেসেজ দিতে চেয়েছি,কোনো মানুষের ভয় যেন কারো পর্দার কারণ না হয়।কোনো সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মেয়ে যেন না বলে 'আমাকে সালোয়ার কামিজ বানিয়ে দাও',কোনো মা যেন না বলে 'এলাকা ভালো না,বড় হয়েছিস,বোরকা পরবি'।
এই কথাগুলো যেন এভাবে আসে,'মা আমার সালোয়ার কামিজ ভালো লাগে,তাই বানাবো কয়েকটা'।
মা যেন মেয়ে কে বলে 'আল্লাহ বলেছে পর্দা করতে,তুই ধীরে ধীরে পর্দা করা শুরু কর'।
অথবা কেউ যদি পর্দায় নিজেকে রাখতে পছন্দ করে,শুধুমাত্র সেই কারণেই পর্দা করে।
মানুষের ভয়ে পর্দা করলে সেই পর্দা নিয়ে আপনি কি জান্নাতে যেতে পারবেন?সৃষ্টিকর্তাকে অবমাননা করা হয় না এতে?
আরেকটা ব্যাপারে কথা উঠবে,অবশ্যই। অনেক নিচু মানসিকতার ছোটলোক উঠে এসে কমেন্ট করবে ধর্ম নিয়ে।আগেই বলে নেই,একজন কে দিয়ে পুরো ধর্ম হয় না।পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে,যারা সত্যিকার অর্থেই ধর্ম পালন করছে একনিষ্ঠ ভাবে। একজনের জন্য তাদের কে গালি দেয়া চরম বোকামি।কারণ এই একি ধর্মের এক মানুষ আমাকে নামাযে যাওয়ার সময় নিজের গায়ের শাল দিয়েছিলো শরীর ঢাকার জন্য,কারণ আমার জামায় পিরিয়ডের রক্ত লেগেছিলো।
সমস্যা মানুষের মধ্যে,ধর্মের মধ্যে না।
এখন আমার একটা প্রশ্ন,আমি যে হেনস্তা হলাম,এদের একজন ধর্ম বিশারদ,একজন শিক্ষিত এডাল্ট,আরেকজন ভালো ফ্যামিলি থেকে বিলং করা ছেলে।এবার বলেন,ঠিক কিসের মাধ্যমে আপনি সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট থামাবেন?ভালো পরিবেশে বড় করা?শিক্ষা?বিশদ ধর্মীয় জ্ঞান?আমার উত্তর কোনোটাই না।এর পুরোটাই নির্ভর করে মাইন্ড সেট আপের উপর।
অনেক মানুষ আছেন,যারা যৌনতাকে চরম নেতিবাচক একটা বিষয় হিসেবে গণ্য করে,সেটাকে ট্যাবু পর্যায়ে নিয়ে যায়।আইরোনিকালি তারাই বিকৃত যৌনাচারকে জাস্টিফাই করে 'স্বভাবের দোষ','একটু আধটু হয়ই','বয়সটা খারাপ','ছেলেরা একটু ছোক ছোক করেই,'মেয়েরা ন্যাংটা হয়ে ঘুরলে ছেলেরা কী করবে?', ইত্যাদি দ্বারা।
সবশেষে এটাই বলবো,একটা মেয়ে,তার ছোটখাটো বিশ বছরের জীবনে প্রায় সব শ্রেণির মানুষের কাছে একবার না একবার হেনস্তা হবেই। সেটা শিক্ষক,রাস্তার পথচারি অথবা সহপাঠী। তাই তাকে জ্ঞান দেয়ার আগে অভিজ্ঞতা শুনে নিবেন দয়া করে।অভিজ্ঞতা শোনার পর আর জ্ঞান দেয়ার ইচ্ছা নাও থাকতে পারে।আর যারা বলেন মেয়েদের পর্দা না করার জন্য হেনস্তার শিকার হতে হয়,তাদের কাছে প্রশ্ন,একটা ছোট বাচ্চা ঠিক কি ঢাকার জন্য পর্দা করবে?তার অস্তিত্ব?আর কেউ পর্দা না করলে সেটার বিচার করার জন্য সৃষ্টিকর্তা আছে,আপনাকে কে পারমিশন দিয়েছে পরনারীর গায়ে হাত দেয়ার?নাকি তখন তথাকথিত উচ্চ শিক্ষা হতে প্রাপ্ত এটিকেট,ম্যানারস,এথিকস অথবা ধর্মের জ্ঞান লিঙ্গর নিচে চাপা পরে যায়?
পুরুষ দিবস ও কিন্তু আছে,কিন্তু কখনো ঘটা করে পালন করতে দেখেছেন?দেখবেন না।কিন্তু নারী দিবস অনেক জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়?কী ভাবছেন?পৃথিবী বদলাচ্ছে?উহু,যতদিন পর্যন্ত নারী দিবস বড় করে পালন করা হবে,বুঝবেন ততদিন পর্যন্ত নারীরা নিগৃহীত শ্রেণির মানুষ,এদের স্বান্তনার প্রয়োজন।এটা নারীর জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রতীক না,এটা বুঝাচ্ছে নারীরা এখনো অত্যাচারিত,এখনো,এই একবিংশ শতাব্দীতে।
লেখা: Sabrina Oishi