03/01/2026
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান ও প্রেসিডেন্ট মাদুরো আটক
কারাকাস, ভেনেজুয়েলা | শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয় মোড় এসেছে। আজ ভোররাতে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একযোগে বিশাল আকারের সামরিক অভিযান চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে ভেনেজুয়েলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অভিযানের বিস্তারিত
শনিবার স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বেশ কিছু এলাকায় সিরিজ বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই হামলা চলে এবং নিচু দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচলের আওয়াজ পাওয়া যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নিশ্চিত করেছেন যে, এটি একটি ‘ঝটিকা অভিযান’ ছিল এবং বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রী মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন। তাদের নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সেখানে তাদের বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক পাচারের অভিযোগে বিচার করা হবে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে "সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন" হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে মাদুরোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তার ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ (proof of life) দাবি করেছেন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী আবাসিক এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে এবং এর প্রতিবাদে সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে:
রাশিয়া ও কিউবা: এই দেশগুলো মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
কলম্বিয়া ও ব্রাজিল: প্রতিবেশী দেশগুলো এই হামলার ফলে শরণার্থী সংকট বাড়ার আশঙ্কা করছে এবং সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
যুক্তরাজ্য: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, এই অভিযানে যুক্তরাজ্যের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তিনি সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব
এই সামরিক উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল সমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ভয়ে সোনা ও তেলের বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
অভিযানের নেপথ্যে ও বর্তমান অবস্থা
অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ:
মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অভিযানের নাম দিয়েছে 'Operation Absolute Resolve'। এই অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী (Delta Force এবং 160th SOAR) সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
মাদুরোর অবস্থান:
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হেলিকপ্টারে করে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'USS Iwo Jima'-তে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে তাদের নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিচারের জন্য।
অভিযোগ:
মাদুরোর বিরুদ্ধে মূলত 'নার্কো-টেররিজম' (মাদক-সন্ত্রাস), দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি নিশ্চিত করেছেন যে নিউ ইয়র্কের আদালতে তাদের বিরুদ্ধে শুনানি হবে।
ভেনেজুয়েলার ভেতরে যা ঘটছে
ক্ষমতার শূন্যতা:
প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুপস্থিতিতে দেশটির সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে দায়িত্ব পালনের কথা। তবে তিনি মাদুরোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একে একটি "অবৈধ অপহরণ" হিসেবে অভিহিত করেছেন।
জনমনে আতঙ্ক:
কারাকাসসহ বড় শহরগুলোতে জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে সাধারণ মানুষ ঘরে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, বিশেষ করে সামরিক ঘাঁটিগুলোর আশেপাশে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
ব্রাজিলের অবস্থান:
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এই ঘটনাকে "অগ্রহণযোগ্য সীমা লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন এটি দক্ষিণ আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বিরোধী শিবিরের নীরবতা:
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্ক নীরবতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন এই অভিযানের পর দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
#ভেনেজুয়েলা