24/06/2021
৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার পতন নির্দিষ্ট একটি দিনে হয়নি।
আবার উন্নত অর্থনীতি ও স্বর্ণোজ্জল রাষ্ট্র কাঠামোর বিশাল সালতানাতের কী এমন হলো যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত, বেকারত্ব সমস্যাগ্রস্ত, রোগগ্রস্ত ও বসবাসের অযোগ্য নগরীর কেন্দ্রস্থল এই উপমহাদেশ?
এ বিষয়কে সামনে রেখে আজ পলাশী দিবসে যা করা উচিৎ–
• পলাশী দিবসের গুরুত্ব আলোচনা করা।
• পলাশী দিবস, পলাশীর পরাজয় থেকেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবিদার 'পলাশী কেন হলো' তার ইতিহাস ও কারণ বিশ্লেষণ করা।
• মীর জাফরদের গালি দেওয়াকে সমাধান মনে না করে মীর জাফরদের যারা তৈরি করেছে, যারা সাজানো বাগানকে ধ্বংস করতে নিজেদের বিকিয়ে দেয়– তাদের চিনতে পারা, তাদের ধারা ও ভিত্তিকে বুঝতে পারা।
• মীর জাফরের সাথে দু'চারজন হিন্দুর নাম বলাকে সমাধান মনে না করা, বরং ‘উপমহাদেশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রজেক্ট’ বুঝতে পারা, তার পেছনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাবকে জাতির সামনে তুলে ধরে আমাদের রাজনৈতিক ভিশনকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করা।
• লর্ড ক্লাইভদের চিনতে পারা কোনো শিক্ষা নয়, সবচেয়ে বড় শিক্ষা ও পর্যালোচনা হলো তারা যা নিয়ে এসেছিলেন সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানতে পারা এবং তার ভয়াবহতা সম্পর্কে মানবতাকে সচেতন করে মুক্তি সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।
• জায়নবাদী লর্ড ক্লাইভদের রেখে যাওয়া চিন্তা-দর্শন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থা আজও প্রতিষ্ঠিত, যা আমাদের সবচেয়ে বড় পরাজিত ধারাবাহিকতা– এটি বুঝতে পারা।
• বৃটিশ জায়নবাদী শক্তি গোলামীর রাজনীতিসহ যে ইতিহাস ও ধর্মীয় বয়ান শিখিয়ে গেছে, সেটিকে খন্ডন করে ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে পারা; হারানো সভ্যতাকে সময়ের আলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে পারা; স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা, সে আলোকে দার্শনিক ভিত্তিসম্পন্ন আন্দোলন গড়ে তোলা।
এসব বিষয় নিয়ে যৌক্তিক পর্যালোচনা করে আমাদের সামনের পথ, রূপরেখা বিনির্মাণ আবশ্যক; এছাড়া মুক্তি অসম্ভব!
একটু চিন্তা করলেই দেখবো, ৭০০ বছর মুসলমানদের নেতৃত্বে সাজানো উপমহাদেশ বৃটিশ জায়নাবাদীদের কর্তৃক দখলের মাত্র ১৩ বছরের মাথায়ই শুরু হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ! এক বছরে শুধু বাংলা অঞ্চলেই এক কোটি লোক মারা যায়। ১৭৭২ সালে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেসটিংস তার চিঠিতে নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন, শুধু বাংলা প্রদেশেই এক তৃতীয়াংশ মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে মারা গিয়েছিলো।
কেন?
যেখানে যাকাত নেওয়ার মতো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিলো; যেখান থেকে ৮০ টি অঞ্চলে ফসল রপ্তানি করা হতো, যেখানে উৎপাদিত ৩০০ এর বেশি ফসল গোটা দুনিয়ার খাদ্য চাহিদা মেটাতো; খনিজ, বন্দর ও জাহাজ নির্মাণসহ হাজারো আয়ের উৎসস্থল যে জমিন, সে জমিনে কেন এভাবে অনাহারে মানুষ মারা যাবে?
কেন প্রত্যেক বছর দুর্ভিক্ষ হবে?
কেন দুইশত বছর ধরে চলতে থাকবে দুর্ভিক্ষ আর লুণ্ঠন?
কেনইবা ভেঙ্গে পড়লো আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্র?
সেই ভয়ংকর গণহত্যা পরিচালনাকারী, মহা জুলুমবাজ শক্তির আগ্রাসন, শোষণ আজও দুনিয়াব্যাপী বিদ্যমান; শুধু প্লট পরিবর্তন হয়েছে, মোড়ক পরিবর্তন হয়েছে। মুক্তিকামী মানুষ আজও আগ্রাসী রাজনীতি, সংস্কৃতি, গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ। পঙ্গু হয়ে আছে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
আজ এসব পর্যালোচনা ও ইতিহাসকে মুছে দিয়ে আমাদের ইতিহাস চর্চা শুধু এক কেন্দ্রিক! ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দালালি ও মুসলিম বিদ্বেষ, মারাঠাদের লুণ্ঠন, বৃটিশ জায়নবাদীদের ধ্বংসলীলা– সবই কথিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বয়ানে এবং এ যুগের মীর জাফরদের উপন্যাস, গল্প, গান আর সিনেমার স্রোতে হারিয়ে গেছে, যাচ্ছে!
আমরা ভুলে গেছি সত্যিকার নায়ক ও সুমহান ইসলামী সভ্যতার সেই স্বর্ণালী সময়ের কথা, প্রয়োজনীয়তার কথা।
তাই উপরোক্ত পর্যালোচনার পাশাপাশি বৃটিশ জায়নবাদী দর্শন ও সভ্যতা, তাদের উপমহাদেশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রজেক্ট, আমাদের পতনের কারণ, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব ভালোভাবে তুলে ধরাই সময়ের সবচেয়ে বড় কর্ম।
আর হারানো সভ্যতার অভিজ্ঞতা, ৩০০ বছরের পতনকালীন শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ-ই হোক আজকের শপথ।
#পলাশী_দিবস
#নতুন_দুনিয়া
কার্টেসি: হাসান আল ফিরদাউস