14/05/2026
তোমরা ঘনাদা-র নাম শুনেছ? প্রেমেন্দ্র মিত্র সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের অতি জনপ্রিয় একটি চরিত্র হল ঘনাদা। ঘনাদা-র পুরো নাম ঘনশ্যাম দাস। ১৯৪৫ সালে এই চরিত্রটির আবির্ভাব ঘটে। ‘মশা’ নামক ছোটগল্পে প্রথম ঘনাদাকে দেখা যায়। গল্পটি ‘দেব সাহিত্য কুটীর’-এর পূজাবার্ষিকী ‘আলপনা’-য় প্রকাশিত হয়েছিল।
‘মশা’ গল্পে ঘনাদার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে—‘‘ঘনাদার রোগা লম্বা শুকনো হাড়বার-করা এমন একরকম চেহারা, যা দেখে বয়স আন্দাজ করা একেবারে অসম্ভব। পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চান্ন যে কোনও বয়সই তাঁর হতে পারে। ঘনাদাকে জিজ্ঞেস করলে অবশ্য একটু হাসেন, বলেন, দুনিয়াময় টহলদারি করে বেড়াতে বেড়াতে বয়সের হিসেব রাখবার কি আর সময় পেয়েছি। তবে— বলে ঘনাদা যে গল্পটা শুরু করেন, সেটা কখনও সিপাই মিউটিনির, কখনও বা রুশ-জাপানের প্রথম যুদ্ধের সময়কার। সুতরাং ঘনাদার বয়স আন্দাজ করা আমরা ছেড়ে দিয়েছি। শুধু এইটুকুই মেনে নিয়েছি যে গত দুশো বছর ধরে পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেখানে তিনি যাননি, হেন ঘটনা ঘটেনি যার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই।’’
কলকাতার বনমালি নস্কর লেনের এক মেসবাড়িতে থাকেন ঘনাদা। সেই মেসের তরুণ বাসিন্দাদের তিনি শোনান রোমাঞ্চকর, বৈজ্ঞানিক ও বিস্ময়ভরা নানা গল্প। আর প্রায় প্রতিটি গল্পের নায়ক থাকতেন তিনি নিজেই। অসাধারণ পাণ্ডিত্য, তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি ও দুর্দান্ত উদ্ভাবনী শক্তির জন্য ঘনাদা দ্রুতই পাঠকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
ঘনাদাকে নিয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র মূলত ছোটগল্পই বেশি লিখেছেন। তবে উল্লেখযোগ্য কিছু উপন্যাসও রয়েছে— ‘তেল দেবেন ঘনাদা’, ‘মঙ্গলগ্রহে ঘনাদা’, ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’, এবং ‘মান্ধাতার টোপ ও ঘনাদা’। ঘনাদাকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেন নাটক ‘পৃথিবী যদি বাড়ত’। এছাড়া ‘ঘনার বচন’ নামে কিছু ছড়াও রচনা করেছেন তিনি।
১৯৮৩ সালের ২৮ মে প্রকাশিত ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকায় কার্তিক মজুমদারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রেমেন্দ্র মিত্র ঘনাদা সম্পর্কে বলেন— ‘‘আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, আবার আর্টসেরও ছাত্র ছিলাম। বিজ্ঞান বলো, ইতিহাস-ভূগোল-রূপকথা বলো, সবকিছুতেই আমার দারুণ আকর্ষণ। ঘনাদাকে নিয়ে মশা নামে একটি গল্প লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম তাঁকে নিয়ে আর লিখব না। কিন্তু পাঠকদের কাছ থেকে এত চিঠি আসতে লাগল যে বনমালি নস্কর লেনের মেসবাড়ির ঘনাদা আর আমি কেউ পালাতে পারলাম না।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প লেখার সময় একজন হিরোর দরকার পড়ল। বিদেশী সায়েন্স-ফিকশনের হিরোকে দেখা যায়, যেমন সে বিদ্যাদিগগজ তেমনই তার গায়ের জোর। আমি হিরো করলাম একজন সাধারণ অন্নভুক বাঙালিকে। সে কলকাতার মেসের ভাত খেয়ে এমন শক্তিমান যে তার মুখের জোরের ধারেকাছে কেউ দাঁড়াতে পারা না। পাঠকের কাছে ঘনাদা তাই এত ভালোবাসা পেয়েছে।’’
তোমাদের জন্য এখানে একটি ‘ঘনার বচন’ দেওয়া হলো—
‘‘দুনিয়াটা হত যদি উলটো,
পুবে নয়, পশ্চিমে
পাক খেয়ে পৃথিবী
ঘোরার আইনটাই ভুলত!
হায়! হায়! কী হত যে তা হলে?
ভেবে ভেবে পাকিয়ো না চুল।
যে দিকেই ভোর হোক,
সেইটেই পুব দিক
এইটুকু জেনো নির্ভুল!
তাই বলি, পৃথিবীটা
যে দিকেই পাক খাক
নিজের মাথাটা
রাখো ঠাণ্ডা,
পাত্তা না পায় যেন
হাহাকার মন্তর
পড়াবার ঘুঘু
সব পাণ্ডা!’’