08/06/2024
#জানাযার_নামাযের_নিয়মঃ
জানাযার ফযীলতের ব্যাপারে হাদীসে রাসূল :
১.রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের জানাযায় শরীক হয়ে নামায পড়ে এবং তাকে কবরও দেয় সে দু’কীরাত নেকী পায়। প্রত্যেক কীরাত উহুদ পাহাড় সমান নেকী । আর যে ব্যক্তি শুধু জানাযার নামায পড়ে এবং মাটি দেয় না সে এক কীরাত নেকী পাবে।(সহীহ আল বোখারী ও সহীহ মুসলিম)
২.রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন মুসলমানের জানাযায় এমন চল্লিশজন লোক যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেননি যদি শরীক হয়ে ঐ লাশের জন্য দোয়া করে তাহলে আল্লাহতা’য়ালা তাদের সুপারিশ নিশ্চয়ই কবুল করবেন। (সহীহ মুসলিম ও মিশকাত)
৩.উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-যখন কোনো মুসলমানের ইন্তেকাল হয় এবং একশ জনের কাছাকছি সংখ্যক মুসলমান তাঁর জানাযার নামায পড়ে ও তাঁর জন্য সুপারিশ করে তো এই সুপারিশ কবুল করা হয়’। (জামে আত-তিরমীযি)
জানাযার খাট বহন করার নিয়ম :
১.বয়স্ক নারী-পুরুষের লাশ খাটে করে বহন করতে হয়। খাটের চার কোণায় ৪ জনে বহন করবে। লোক অদল বদল করেও বহন করা চলে। লাশের মাথার দিকে সামনে রেখে চলতে হবে।
২.দুগ্ধপোষ্য বা তার চেয়ে কিছু বড় শিশুর লাশ দুই হাতে নিয়ে যেতে হবে। এ রকম লাশ একাই বহন করা যায়। পালাক্রমে অন্যেরাও ইহা বহন করতে পারে।
৩.জানাযা অর্থাৎ লাশ নিয়ে দ্রুত হাঁটা সুন্নাত। আবার লাশে ধাক্কা খায় বা দোলে এমন জোরে হাটাও ঠিক নয়।
৪.লাশের সঙ্গে যারা যাবে তাদের পেছনে থাকা ভালো। তবে সামনে হাঁটা নাজায়েয নয়; কিন্তু ডানে বা বামে হাঁটা উচিত নয়।
জানাযা নামাযের নিয়মঃ
১. প্রথম তাকবীরের পর ছানা পড়া ও সূরা ফাতিহা পড়া,
২. দ্বিতীয় তাকবীরের পর দরূদ পড়া,
৩. তৃতীয় তাকবীরের পর দোয়া পড়া,
৪. চতুর্থ তাকবীরের পর সালাম ফিরানো।
হাত উঠানো : জায়নামাজে শুধু প্রথম তাকবীরে হাত উঠাবে এ ছাড়া অন্য কোথাও হাত ওঠানোর নিয়ম নেই।
জানাযা নামাযের নিয়ম : জামায়াতের সামনে কাফন ঢাকা লাশ রাখতে হবে। তার পেছনে লাশের সিনা বরাবর ইমাম দাঁড়াবেন। তার পেছনে মুক্তাদীরা কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন। সবাই মনে মনে ধারনা করবেন : এই মৃত ব্যক্তির দোয়ার জন্য জানাযার নামায পড়ছি। এই হল নিয়ত।
আল্লাহর ওয়াস্তে আমি কেবলামুখী হয়ে চার তাকবীরের সাথে জানাযার নামায আদায় করছি। আল্লাহু আকবার।
নিয়ত করে ইমাম জোরে আল্লাহু আকবার বলে কানের লতি বরাবর দুই হাত তুলে নাভির উপরে বাম হাত রেখো ডান হাতের বুড়ো ও কনিষ্ঠা আংগুল দিয়ে বাম হাতের কব্জি বেঁধে বাকী ৩ আংগুল বাম হাতের উপরে বিছিয়ে অন্য নামাযের ছানার ন্যায় ছানা পড়বে। তবে এই ছানার ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা এর পরে ওয়া জাল্লা ছানাউকা অতিরিক্ত বলতে হবে।
মুক্তাদীগণ ইমামের অনুসরণ করে ঐভাবে তাকবীর দিয়ে ছানা পড়বে। পরে ইমাম জোরে আল্লাহু আকবার বলে বাঁধা হাত ছেড়ে না দিয়েই আস্তে আস্তে অন্য নামাযের দরূদের ন্যায় দরূদ পড়বে। মুক্তাদীরাও ঐরূপ করবে। দরূদ শেষ করে ইমাম পুনরায় জোরে তাকবীর উচ্চারণ করে ঐ হাত বাঁধা অবস্থাতেই বয়স্ক ব্যক্তির লাশ হলে চুপে চুপে এই দোয়া পড়বে।
اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِ نَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَاُنْثَنَا اَللّٰهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَاَحْيِهِ عَلٰى الْاِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلٰى الْاِيْمَانِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগ ফিরলি হায়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ও ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াহতাহু মিন্না ফাআহয়িহী আলাল ইসলামি ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফফাহ আলাল ইমান। বিরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহিমীন।
আর ঐ লাশ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলে উক্ত দোয়ার পরিবর্তে এই দোয়া পড়বে :
اَللّٰهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطًا وَّاجْعَلْهُ لَنَا اَجْرً ا وَّذُخْرًا وَّاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا وَّمُشَفِّعًا
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজ আলহু লানা ফারাতাও ওয়াজ আলহু লানা আজরাও ওয়া যুখরাও ওয়াজ আলহু লানা শাফিআও ওয়া মুশাফফিআ।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক লাশ মেয়ের হলে ‘হু’ (هُ) স্থানে ‘হা’ (هَا) বলতে হবে। এই দোয়ার পরে পুনরায় ইমাম জোরে তাকবীর বলে প্রথমে ডানে ও পরে বামে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি’ বলে সালাম ফিরাবে। মুক্তাদীরাও তার অনুকরণ করবে।
জানাযার নামায সংক্রান্ত কতিপয় জরুরী মাসায়েল :
১.ছানা, সূরা ফাতিহা, দরূদ ও দোয়ার পরে যে আরো তিনবার তাকবীর বলতে হয় তখন ইমাম ও মোক্তাদীর হাত বাঁধা থাকবে।
২.ইমাম তাকবীর ব্যতীত সবকিছুই চুপে চুপে বলবে, শুধু তাকবীর উচ্চস্বরে বলবে। মোক্তাদীরা তাকবীরসহ সবকিছুই আস্তে আস্তে বলবে।
৩.ডান দিকে সালাম ফিরানোর সাথে সাথে ডান হাত এবং বাম দিকে সালাম ফিরানোর সাথে সাথে বাম হাত নামিয়ে ফেলবে।
৪.জানাযার নামাযের পরে আর কোন দোয়া বা মোনাজাত এক সাথে করার বিধান নেই।
৫.জানাযার নামায ছুটে যাওয়ার আশংকা হলে (পানি নিকটে থাকা সত্ত্বেও) তায়্যাম্মুম করে জানাযায় শরীক হওয়া যায়।
৬.জুতা পায়ে রেখেও জানাযার নামায পড়া যায়। তবে শর্ত এই যে জুতার তলা এবং জুতার জমিন পাক থাকতে হবে। আর যদি জুতা খুলে জুতার উপরে পা রেখে দাঁড়ায় তাহলে পায়ের সাথে লাগা জুতার উপরের অংশ পাক থাকলেই চলবে। জুতার তলা বা জুতার নীচে কার জমিন নাপাক থাকলেও জানাযার নামায হয়ে যাবে।
৭.জানাযার নামাযের জন্য জামাত শর্ত নয়। একজনে পড়লেও ফরয আদায় হয়ে যাবে।
৮.জানাযার নামাজ ৩ (তিন) কাতার করা মোস্তাহাব। ইমাম ছাড়া ৫ (পাঁচ) জন থাকলে ১ম কাতারে ২ জন, ২য় কাতারে ২ জন এবং তৃতীয় কাতারে ১ জন এইরূপ দাঁড়াতে হবে। লোক বেশী হলে ৩ এর অধিক যে কোন বিজোড় সংখ্যক কাতার করে দাঁড়ানো ভালো।
৯.জন্ম মাত্রই যে শিশুর মৃত্যু হয়েছে তার নাম রাখতে হবে এবং নিয়মানুযায়ী গোছল, জানাযা, কাফন দাফন করবে। আর যে মৃত অবস্থায় জন্মেছে তার নামও রাখবে, গোছল দেবে, কিন্তু নিয়মানুযায়ী কাফন ও জানাযা পড়তে হবে না। শুধু এক খ- কাপড় দিয়ে লাশ ঢেকে দিয়ে কবরে মাটি চাপা দিয়ে রেখে দেবে।
দাফন সংক্রান্ত মাসায়েল :
১.লাশ কবরে নামানোর জন্য ৩/৪ জন কবরে নেমে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে খাট থেকে লাশ নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে উত্তর দিকে মাথা ও দক্ষিণ দিকে পা রেখে কবরে শোয়াবে। কিছু মাটি, বালু বা পাথরের টুকরার সাহায্যে মুখম-ল কেবলামুখী করে দিতে হবে। মহিলাদের লাশ যাদের সঙ্গে তাদের বিবাহ হারাম ছিল এমন আপন পুরুষেরা নামবেন। এমন কাউকে না পেলে দ্বীনদার মোত্তাকী লোকেরা নামবেন।
২.লাশ কবরে রাখার সময়ে এই দোয়া পড়বে : بِسْمِ اللهِ وَعَلٰى مِلَّةِ رَسُوْ ل ِاللهِ
উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি ও ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ।
৩.মহিলাদের কবরে নামানোর সময়ে পর্দা করবে।
৪.কবরে রাখার পর কাফনের বাঁধনগুলো খুলে ফেলবে। তারপর বাঁশ বা কাঁচা ইট কবরের উপর বিছিয়ে দিয়ে কবর ঢেকে দিবে। উপর থেকে যাতে এর মাটি ইত্যাদি মৃতের গায়ে না পড়ে সে জন্য মাটি দেয়ার আগে কলা পাতা বা এ ধরনের পাতলা কিছু বিছিয়ে দেয়া ভালো। কবর মাছের পিঠের মত করবে। চৌকোণা করে করবে না।
প্রথম মুষ্টি মাটি দেয়ার সময়ে বলবে :مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ
উচ্চারণ : মিনহা খালাকনাকুম
অর্থ : এই মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি।
দ্বিতীয় মুষ্টি মাটি দেয়ার সময়ে বলবে : وَفِيْهَا نُعِيْدُ كُمْ
উচ্চারণ : ওয়া ফিহা নু’ঈদুকুম।
অর্থ : পুনরায় তোমাদেরকে মাটিতেই ফিরিয়ে আনব।
এবং তৃতীয় মুষ্টি মাটি দেয়ার সময়ে বলবে : وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً اُخْرَئ
উচ্চারণ : ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা।
অর্থ : এবং আর একবার তোমাদেরকে মাটি থেকে বের করবে।
এরপর মাটি দেয়া শেষ করে, প্রয়োজন মত কবরের উপরিভাগ মজবুত করার জন্য পানি দিয়ে ও পিটিয়ে মাছের পিঠের আকার বিশিষ্ট করবে। পরিশেষে একবার পানি ছিটিয়ে দেয়া মোস্তাহাব। এই পানি দেয়া মাথার দিক থেকে শুরু করবে।
জানাযা ও কবর সংক্রান্ত আরো মাসায়েল :
১.জানাযার নামায মসজিদের ভেতর অথবা কবর সামনে রেখে পড়া মাকরূহ
২.জানাযার পরে লাশ বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় কালেমা ইত্যাদি আস্তে আস্তে পড়তে হবে। উচ্চস্বরে পড়া উচিত নয়।
৩. লোকের সংখ্যা বেশী হওয়ার আশায় জানাযার নামায বিলম্বিত করা মাকরূহ্
৪. জানাযার সামনে সাওয়ারির উপর আরোহন করা মাকরূহ।
৫. একত্রে কয়েকজনের জানাযা উপস্থিত হলে সকলের জানাযা এক সাথে পড়বে।
৬.ইমাম বা মুক্তাদী তাকবীর বলার (২য়, ৩য় ও ৪র্থ) সময়ে ভুলে হাত উঠায় তাহলে নামায হয়ে যাবে। ঐ নামায দ্বিতীয়বার পড়তে হবে না।
৭.কাফন-দাফনের পর পুনরায় কবর খনন করে লাশ উত্তোলন করা জায়েয নয়।
৮.মৃত স্থানে দাফন করা উত্তম। তবে এক দুই মাইলের মধ্যে দাফন করতে দোষ নেই। অধিক দূরে নেয়া উচিত নয়।
৯.জীবিত অবস্থায় নিজের কাফনের ব্যবস্থা করা জায়েয কিন্তু কবর তৈরী করা মাকরূহ।
১০.মৃত ব্যক্তিকে খারাপ ভাষায় স্মরণ করা বৈধ নয়। তার অসৎকর্মের প্রশংসাও করবে না এবং মন্দ কাজের প্রচারণাও করবে না।
১১.দাফনান্তে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মৃত ব্যক্তির ক্ষমার জন্য দোয়া করা সুন্নাত। হযরত নবী করীম (সা) বলেছেন- মৃত দেহ দাফন করার পর তার শিয়রে সূরা বাকারার প্রথম আয়াতসমূহ অত : পর ডানে দাঁড়িয়ে ঐ সূরার শেষ আয়াতসমূহ পাঠ করবে। দাফন সম্পন্ন হয়ে গেলে সকলে মিলে একত্রে দোয়া করবে।
১২.কবরস্থানে গিয়ে গল্প গুজব করা বা বাজে কথা বলা উচিত নয়। বরং নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে মনে মনে বলবে : আমি আজ একজনকে দাফন করলাম, একদিন লোকেরা আমাকে দাফন করবে।
১৩.অধিক উঁচু করে কবর তৈরী করা জায়েয নয়। উটের পীঠের ন্যায় বড় জোর একহাত উঁচু করা যেতে পারে। কবরকে পাকা করা এবং তার উপর মিনার স্থাপন করা জায়েয নয়।
১৪.কদাচার থেকে কবরকে হেফাজত করার জন্য বেড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এবং কার কবর তা বোঝার জন্য পাকা করে চিহ্নও স্থাপন করা যেতে পারে।
সমবেদনা জ্ঞাপন :
১.মৃত ব্যক্তির শোকার্ত আত্মীয়স্বজনকে সান্তনা দেয়া এবং ধৈর্য্য ধারণের উপদেশ দেয়া সুন্নাত। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং মৃত ব্যক্তির আত্মীয়গণের ঘরে ঘরে গিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করতেন এবং ছবরের উপদেশ দিতেন।
২. মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাবার পাঠানোও সমবেদনার অন্তর্ভুক্ত। তবে তিন বেলার অধিক পাঠানো উচিত নয়।
৩. দূরের কেউ না হলে তার জন্য তিন দিন পরে সমবেদনা জ্ঞাপন করতে যাওয়া মাকরূহ।
collected