10/10/2026
একটা বাচ্চার বয়স মাত্র পনেরো বছর। সে ক্লাস সেভেনে পড়ে। এই বয়সে একটা বাচ্চা দুনিয়ার কতটুকুই বোঝে? তার কাছে পৃথিবীটা অনেক রঙিন, অনেক রহস্যময়। তার অনেক কিছু দেখতে ইচ্ছে করে, নতুন নতুন জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে, অ্যাডভেঞ্চার করতে ইচ্ছে করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কত রকমের জীবন দেখে, কত রকমের অভিজ্ঞতা দেখে, কত রকমের ফ্যান্টাসির জগৎ দেখে। সেগুলো তাকে আকৃষ্ট করে। তারও সেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ইচ্ছে হতে পারে।
তাই তাজমিন নামের এই পনেরো বছরের কিশোরীকে নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। আমি শুধু তার বাবা-মার বক্তব্য জানতে চাই।
এই বয়সে তার মধ্যে কৌতূহল থাকবে, আবেগ থাকবে, হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার প্রবণতা থাকবে। সে সবকিছুর পরিণতি বুঝবে না, সব বিপদ আগেভাগে আঁচ করতে পারবে না, মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক মানুষকে চিনতে পারবে না। এই বয়সে তার বিচারবুদ্ধি ও ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা এখনো পরিণত হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু একজন অভিভাবকের দায়িত্বটা কি?
একটা কিশোরী মেয়ে তার বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলে অভিভাবকের কি সেই বান্ধবীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া উচিত নয় যে সে সত্যিই সেখানে যাচ্ছে কিনা? ক্লাস সেভেনে পড়া একটা মেয়ে একা একা অন্য জেলায় চলে যাচ্ছে, এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরছে, তার গতিবিধি সম্পর্কে অভিভাবকেরা জানতেন না? তারা খোঁজ নিয়েছিলেন? সন্তান কোথায় আছে, কার সঙ্গে আছে, কীভাবে যাচ্ছে, কখন ফিরবে, এসব জানার দায়িত্ব কি বাবা-মায়ের নয়?
সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া আর সন্তানকে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে দেওয়া এক বিষয় নয়। আধুনিক হওয়া মানে সন্তানকে কোনো প্রশ্ন না করা নয়। সন্তানকে বিশ্বাস করা মানে তার নিরাপত্তার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকা নয়। বরং সন্তানকে এমন একটা সম্পর্ক ও পরিবেশ দেওয়া, যেখানে সে বিপদে পড়লে নির্ভয়ে বাবা-মাকে জানাতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে।
একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেল, যেখানে শেষ পর্যন্ত তাকে বাবাকে মেসেজ দিয়ে বলতে হলো, বাবা, আমি আটকে আছি, আমাকে নিয়ে যাও।
কী ভয়াবহ অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে! একটা শিশু বিপদে পড়ে বাবাকে ডাকছে। অথচ সেই সাহায্যের বার্তাটি সময়মতো দেখাও হলো না। অথচ বিপদের সময় একটা শিশুর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হওয়ার কথা তার পরিবার।
এই মেয়েটির মৃত্যুর জন্য তার বাবা-মাকেও দায়ী মনে হয় আমার যদি সত্যিই তার বাবা-মা বেঁচে থাকে। কারণ সন্তানকে জন্ম দেওয়াই বাবা-মায়ের দায়িত্বের শেষ কথা নয়। সন্তানকে নিরাপদ রাখা, তার চলাফেরার খোঁজ রাখা, তার বয়স অনুযায়ী সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং তাকে বিপদ চিনতে শেখানোও সেই দায়িত্বের অংশ।
পনেরো বছরের একটা শিশুর কাছে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো দূরদর্শিতা আশা করা যায় না। কিন্তু তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্তবয়স্কের দায়িত্বশীলতা অবশ্যই আশা করা যায়।
শিশুরা ভুল করবে, আবেগে সিদ্ধান্ত নেবে, কখনো নিষেধ অমান্যও করবে। সেই কারণেই তো তাদের পাশে অভিভাবক থাকেন। তাদের প্রতিটি ইচ্ছায় বাধা দেওয়ার জন্য নয়, আবার প্রতিটি ইচ্ছাকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়ার জন্যও নয়, বরং কোন পথে যাওয়া নিরাপদ, কোন মানুষকে বিশ্বাস করা যায়, কোথায় থামতে হয় এবং বিপদে পড়লে কী করতে হয়, সেটা শেখানোর জন্য।
একটা শিশুর জীবন চলে যাওয়ার পর তার ভুল খুঁজে বের করে লাভ নেই। বরং আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কি আমাদের সন্তানদের বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতা দিচ্ছি, নাকি স্বাধীনতার নামে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বটাই ভুলে যাচ্ছি?
সন্তানকে বিশ্বাস করুন, ভালোবাসুন, স্বাধীনতা দিন। কিন্তু তার বয়স, বিচারবুদ্ধি ও নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতাগুলো ভুলে যাবেন না। কারণ একটা শিশুর কাছে পৃথিবী যতটা রঙিন, সেই পৃথিবী যে ততটাই বিপজ্জনক হতে পারে, সেটা বোঝানোর দায়িত্বও অভিভাবকের।