21/08/2022
আমার মেয়ে অনেকদিন থেকেই চিংড়ি মাছ খেতে চাচ্ছিলো৷ কোন এক অদ্ভুত কারণে বাজারে গেলে আমার সবকিছুই মনে থাকে, থাকেনা কেবল চিংড়ি মাছের কথা৷ আজকে তাই বাজারে যাওয়ার সময় গিন্নিকে বলে গেলাম ঠিক বিশ মিনিট পর ফোন দিয়ে তুমি আমাকে চিংড়ি মাছের কথা মনে করিয়ে দেবা৷ বাজারে ঢোকা মাত্রই গিন্নির ফোন এলো৷ আমি ফোন কেটে দিয়ে চিংড়ি মাছের খোঁজ লাগালাম৷ একটা মাত্র মাছওয়ালা পেলাম যে কিনা চিংড়ি বিক্রি করে৷ আশেপাশের বাকী সবাই ইলিশের পসরা সাজিয়ে বসেছে৷ মোট চার রকমের চিংড়ি দেখলাম৷ আমি মাছওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা ভালো হবে? সে আমাকে খানিকটা কালচে রঙয়ের মাঝারি সাইজের চিংড়ি দেখিয়ে বললো, এটা নেন মামা, ভালো হবে৷
- দাম কত?
- এক দাম এক হাজার টাকা মামা৷
আমার মনে হলো আমি বোধহয় শুনতে ভুল করেছি৷ কিংবা মাছওয়ালা হয়তো বুঝতে ভুল করেছে৷ আমি আবার বুঝিয়ে বললাম- "সব মাছ নেবোনাতো মামা, জাস্ট এক কেজি নেবো৷ এক কেজি কত সেটা বলো৷ "
"এক কেজির দাম-ই তো কইলাম মামা, এক হাজার টাকা!"
আমার মাথা ভোঁ করে উঠলো৷ বলে কি এই লোক, কড়ে আঙ্গুল সাইজের চিংড়ির কেজি নাকি এক হাজার টাকা! প্রশ্নই আসেনা এত দাম দিয়ে চিংড়ি কেনার৷ মেজাজ খারাপ করে গুড়া মাছ কিনতে গেলাম৷ গিন্নির গুড়া মাছ খুবই পছন্দ৷ এই মাছওয়ালা আমাকে চেনে৷ তার দোকানের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই সে তার হেল্পারকে হাঁক দিয়ে বললো, ওই মামারে এক কেজি মাইপা দেতো!
মাছ মাপা হয়ে গেলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কত দেব?
- সাড়ে পাঁচশ কইরা বেচি মামা, আফনে পাঁচশ দেন!
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম৷ গুড়া মাছের কেজি পাঁচশ টাকা! মাছওয়ালা যখন মেপেই ফেলেছে তখন না নেওয়াটাও কেমন দেখায়৷ আমি মিনমিন করে বললাম, আধা কেজি দে৷ গুড়া মাছ দেখলেই তোর মামী খ্যাক করে উঠবে৷ এই মাছ কাটাকুটি নাকি ঝামেলার কাজ৷ মেয়েমানুষ ভালো জিনিস চেনেনা বুঝলি!
মুরগির দোকানে গিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সাদাটা আজ কত করে রে?
আমি এখানে নিয়মিত ক্রেতা৷ দোকানীও আমার এলাকার৷ সে কানেকানে বললো, নুমানি ভাই আপনার লাইগা একশ আশি কইরা ধরুম৷
"আর সবার জন্যে?"
সে একগাল হাসি দিয়া বললো, একশ নব্বই!
কেজিতে দশ টাকা ছাড় পাচ্ছি এই আনন্দে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম৷ মুরগি রেডি করতে দিয়ে কাঁচাবাজারে ঢুকলাম৷ এখানেও আগুন৷ এক হাত সাইজের একটা লাউ চাইলো একশ ত্রিশ টাকা! স্রেফ ডাকাতি৷ টুকটাক বাজার সেরে যখন বাইক স্টার্ট দিতে যাবো মনে পড়লো মেয়ে স্কুল থেকে এসে জিজ্ঞেস করবে, আব্বু চিংড়ি এনেছো?
প্রত্যেক বাবার কাছে তার মেয়েরা রাজকন্যা৷ আমি বাইক থেকে নেমে আবার চিংড়ি মাছের কাছে গেলাম৷ বিরাট সাহস দেখিয়ে আমার রাজকন্যার জন্যে চোখ বন্ধ করে পাঁচশ টাকা দিয়ে হাফ কেজি চিংড়ি কিনে ফেললাম৷
বাইকে উঠে হিসাব করার চেষ্টা করলাম, পকেটে আর কত আছে? দুই লিটার পেট্রোল নিতে পারবোতো?
মাথা নত হয়ে আসে৷ বুক ছিড়ে বের হয়ে আসে দীর্ঘনিঃশ্বাস৷ ইচ্ছে করে আশেপাশে সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলি- "কিভাবে বেঁচে আছি, তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ!"
কী লাভ? চিৎকার গিলে ফেললাম৷ চিৎকার গিলে ফেলে বেঁচে থাকার নাম সহনশীলতা৷ আমরা খুবই সহনশীল জাতি, চিৎকার করে সরকারকে বিব্রত করার কোন মানে হয় না৷
--কামরুল আহসান নোমানী