25/02/2026
আমার ধারণা, মানব ইতিহাসে কোনো পুরুষ কোনো নারীকে ততটা ভালোবাসেনি, যতটা নবিজি ﷺ আমাদের মা খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ রা.-কে ভালোবেসেছিলেন। তবুও খাদিজা রা. যখন তাঁর রবের সান্নিধ্যে চলে গেলেন, তখন নবিজি সা. নিজের ক্ষত বুকে চেপে রাখলেন এবং নিজেকে দ্বিতীয়বার ভালোবাসা ও ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ দিলেন।
খাদিজা রা.-এর বিচ্ছেদের প্রভাব তাঁর ওপর এতটাই প্রকট ছিল—চেনাজনেরা তা উপলব্ধি করতে পারত।
ইবনু সা’দ তার ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন—খাদিজা রা.-এর ইনতিকালের পর খাওলা বিনতু হাকিম নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি দেখছি খাদিজার মৃত্যু আপনাকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে।’
নবিজি সা. বললেন: ‘হ্যাঁ, সে ছিল আমার সন্তানের মা এবং আমার ঘরের কর্তা।’
তিনি বললেন: ‘তাহলে কি আমি আপনার জন্য বিবাহের প্রস্তাব আনব?’
তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, তোমরা নারীরা এ ব্যাপারে অধিক উপযুক্ত।’
অতঃপর তিনি আয়েশা রা.-এর জন্য বিবাহের প্রস্তাব আনলেন। এরপর নবীজি সা. একে একে উম্মাহাতুল মু’মিনীনদের বিবাহ করলেন। তাঁর দিনগুলো ভালোবাসা ও মমতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তুমি যদি সিরাতের গ্রন্থসমূহে নবিপত্নিদের সঙ্গে তাঁর মায়াময় আচরণের বিবরণগুলো পড়ো, মনে হবে যেন তাঁর হৃদয় কখনোই বিচ্ছেদের বেদনায় ধ্বস্ত হয় নি। ভাবতে শুরু করবে, তিনি যেন খাদিজাকে ভুলে গেছেন। অথচ, বাস্তবতা হলো—খাদিজার স্মৃতি চিরকাল তাঁর হৃদয়ে অম্লান ছিল। আমৃত্যু কেউ তার স্থান দখল করতে পারেনি। নবিজীবনে তিনি ছিলেন এক অনন্যা নারী—অম্লান, অবিস্মরণীয়।
তিনি আয়েশার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, একই পাত্রে যেখানে আয়েশা পান করতেন সেখান থেকেই পান করতেন, তাঁর মুখের স্থানে নিজের মুখ রাখতেন; নিজ হাতে লোকমা তুলে তাঁকে খাওয়াতেন, তাঁর ব্যবহৃত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন এবং একই পাত্রে তাঁর সঙ্গে গোসল করতেন।
তিনি নিজের হাতে সাফিয়ার অশ্রু মুছিয়ে দিতেন, তার উটের পিঠে আরোহনের জন্য নিজের হাঁটু মুড়ে এগিয়ে দিতেন; ইতিকাফের সময় তিনি তাঁকে দেখতে এলে নিজে উঠে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতেন।
তিনি হাফসার প্রতি কোমল ছিলেন। সাওদা বিনতু জামআর প্রতি সহানুভূতিশীল, যায়নাব বিনতু জাহাশের অনুভূতির প্রতি যত্নবান ছিলেন। যায়নাব বিনতু খুযাইমাকে সম্মান দিতেন। উম্মু সালামার প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। উম্মু হাবিবাকে উত্তম সঙ্গ দিতেন। মাইমুনার প্রতি সদাচারী এবং জুয়াইরিয়ার প্রতি দয়াদ্র ছিলেন। [মহান আল্লাহ সকল মুমিনদের মাতাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।]
তবুও খাদিজা রা. সবসময় তাঁর হৃদয়ে বিদ্যমান ছিলেন। মাটি তাঁকে নিজের ক্রোড়ে বরণ করেছিল; তবে তিনি তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর স্ত্রীদের উপস্থিতিতেও বারবার তাঁর কথা স্মরণ করতেন। আয়েশা রা. বলতেন: ‘নবী ﷺ-এর কোনো স্ত্রীর প্রতি আমি ততটা ঈর্ষান্বিত হইনি, যতটা খাদিজার প্রতি হয়েছি—যদিও আমি তাঁকে দেখিনি! নবিজি ﷺ প্রায়ই তাঁর কথা স্মরণ করতেন। কখনো একটি ছাগল জবাই করে টুকরো টুকরো করতেন, তারপর বলতেন: ‘এর কিছু অংশ খাদিজার বান্ধবীদের দাও।’
তখন আয়েশা রা. বলতেন: ‘মনে হয় দুনিয়ায় খাদিজা ছাড়া আর কোনো নারীই ছিল না! আপনি কত বেশি তাঁর কথা স্মরণ করেন! অথচ আল্লাহ তো আপনাকে তাঁর চেয়েও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন!’
তিনি বলতেন: ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে তাঁর চেয়ে উত্তম কাউকে দেননি। যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছিল, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছিল। যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, তখন সে আমাকে সত্যায়ন করেছিল। যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছিল, সে তার সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিল। আর আল্লাহ আমাকে তার থেকেই সন্তান দান করেছেন, অন্য নারীদের থেকে দেননি।’
তিনি খাদিজাকে ভালোবাসতেন—এবং যারা খাদিজাকে ভালোবাসত, তাদেরকেও ভালোবাসতেন। প্রায় ষাট বছর বয়সে একদল বৃদ্ধা নারীকে দেখে তিনি নিজের চাদর খুলে তাদের বসালেন, এবং আশপাশের লোকদের বিস্ময় দূর করে বললেন: ‘এরা খাদিজার সখি।’
একদা জুছামা আল-মুযানিয়া তাঁর কাছে এলে, তিনি তার প্রতি বিশেষ সম্মান ও স্নেহ দেখালেন। তার খোঁজখবর নিলেন। তিনি বললেন, ‘ভালো আছি, হে আল্লাহর রাসুল! আমার প্রাণ ও পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক!’
তিনি চলে গেলে আয়েশা রা. বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এই বৃদ্ধার প্রতি এত আগ্রহ দেখালেন কেন?’
তিনি বললেন: ‘সে খাদিজার সময়ে আমাদের কাছে আসত; আর পুরনো সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের অংশ।’
দেখো তাঁর ভাষা: ‘খাদিজার সময়’—মনে হয় যেন তিনি নিজের জীবনকে তাঁর মাধ্যমেই সময়ের মানদণ্ডে মাপছেন!
অতএব, তুমিও এমন হও। নিজের বেদনাকে লুকিয়ে রাখো। ক্ষতকে বুকে ধারণ করো। তবে নিজের জন্য দ্বিতীয় বিকল্প খুঁজে নাও। কারণ, এটি তোমার প্রাপ্য।
বেদনাকে পুষতে যেও না। দুঃখের কারাগারে বন্দী হয়ো না। যারা চলে গেছে—যদি তারা প্রিয়জন হয়, তবে তাদের হৃদয়ে ধারণ করো; এটাই বিশ্বস্ততা। আর যদি তারা প্রতারক হয়ে চলে যায়, তবে যে তোমার অতীতকে নষ্ট করেছে, তাকে তোমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে দিও না।
দুঃখের সুতো ছিন্ন করো। আবার হৃদয়কে উড়তে দাও। হয়তো তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো এখনো আসেনি।
আদহাম শারকাভী