15/09/2024
বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ব্যাংক রান এবং সাধারণ মানুষের ভাবনা:-
ব্যাংক হচ্ছে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আতঙ্কিত না হয়ে ব্যাংক থেকে শুধুমাত্র আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলুন। তাহলে বাঁচবে ব্যাংক, বাঁচবে দেশের অর্থনীতি!
প্রারম্ভিক কথা:
আদিকাল থেকে ব্যাংক ব্যবসা চলে আসছে আমানতকারীদের আস্থা এবং বিশ্বাসের উপর। প্রতিটি ব্যাংকের মুখ্য কাজ হলো আমানতকারীদের কাছ থেকে লাভে আমানত বা ধার সংগ্রহ করা এবং সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আমানত সংগ্রহের লাভ থেকে একটু বেশি লাভে ঋণ দেওয়া। গ্রাহকের অর্থ ঋণ নেওয়া এবং এ অর্থ ধার দেওয়া ব্যাংকের মুখ্য কাজ হওয়ায় ব্যাংককে "পরের ধনে পোদ্দারি" বা ধার করা অর্থের ধারক বলা হয়। তবে ব্যাংক আমানত থেকে দৈনন্দিন নগদ প্রবাহ ঠিক রেখে ঋণ প্রদান করে থাকে। আমানত এবং ঋণ প্রদানের একটি নির্ধারিত অনুপাত থাকে। এই অনুপাত দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে কনভেনশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮৭:৩ এবং শরিয়া ভিত্তিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৯২:৮ । অর্থাৎ কনভেনশনাল ব্যাংকগুলো জমাকৃত ১০০ টাকার মধ্যে ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারে এবং গ্রাহকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য নগদ ১৩ টাকা (CRR & SLR) হিসেবে হাতে রাখে। আবার শরিয়া ভিত্তিক ব্যাংকগুলো ১০০ টাকার মধ্যে ৯২ টাকা ঋণ প্রদান করতে পারে আর গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর জন্য ৮ টাকা (CRR & SLR) হাতে রাখে।
ধরা যাক, একটি ব্যাংকে গ্রাহকের আমানত জমা আছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ওই ব্যাংক ঋণ প্রদান করতে পারে ৪৩,৫০০ কোটি টাকা আর দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য হাতে জমা রাখে ৬,৫০০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো সাধারণত ঋণ দেয় স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী (উদাহরণস্বরূপ: ১ বছর, ৩ বছর, ৫ বছর, ১০ বছর, ২০ বছর ইত্যাদি)। আবার বিভিন্ন গ্রাহকের নিকট থেকে এভাবেই স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী আমানত সংগ্রহ করে (উদাহরণস্বরূপ: ১ মাস, ৩ মাস, ৬ মাস, ১ বছর, ৫ বছর, ৭ বছর, ১০ বছর ইত্যাদি)। অর্থাৎ ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন এবং আমানত জমা রাখেন। আমানত এবং ঋণ এই দুই ক্ষেত্রেই মেয়াদ অনুযায়ী লভ্যাংশ নির্ধারিত হয়ে থাকে।
মূল আলোচনায়:
গ্রাহক যদি তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেন, সে ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন লেনদেনে কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনার জন্য নির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী ১০০ টাকার মধ্যে কনভেনশনাল এবং শরিয়া ব্যাংকের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৩ টাকা অথবা ৮ টাকা নগদ সংরক্ষণ করে। তাছাড়া, প্রতিদিন লেনদেনের অংশ হিসেবে কছু গ্রাহক ব্যাংকে টাকা জমা করেন, আবার কিছু গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা উত্তোলন করেন। তবে বেশিরভাগ দিনে টাকা উত্তোলনের চেয়ে জমার পরিমাণ বেশি হয়, যার ফলে প্রতিদিন লেনদেনের পর কিছু টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। যারফলে ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হয় না।
কিন্তু বিভিন্ন কারনে গ্রাহক যখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তখন ব্যাংকে প্রতিদিন টাকা জমার দেয়ার পরিমান কমে যায় আবার প্রয়োজন ছাড়া গ্রাহক তাঁর জমাকৃত পুরো টাকা বা মেয়াদ পূর্তির আগেই তাঁর আমানত তুলে নিতে চান। ঠিক তখনই বড় ধরণের সমস্যা তৈরি হয়। কেননা ব্যাংকের হাতে গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রদানের জন্য নগদ শতকরা মাত্র ১৩ টাকা বা ৮ টাকা থাকে। গ্রাহকের আমানতের অবশিষ্ট টাকা ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ দেওয়া থাকে। গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে তার পুরো টাকা একসাথে তুলতে চাইলেও ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণ মেয়াদ পূর্তির পূর্বে ফেরত নেওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। কেননা, ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় গড়ে তুলেছেন দোকানপাট, মিল-কলকারখানা সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে।
ব্যাংকিং সেক্টর একটা অস্থিরতা তৈরি হয় যখন একজন গ্রাহক যদি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে দেখে ব্যাংক তার পাওনা টাকা দিতে চাচ্ছে না বা দিতে পারছে না অথবা কম দিতে চাচ্ছে বা একদিন পরে দিবে এমন আশ্বাস দিচ্ছে তখন গ্রাহক ভেবে নেয় ব্যাংকের হাতে হয়তো টাকা নাই। আর সে গ্রাহকই বাহিরে গিয়ে অন্যান্য গ্রাহকদের এই তথ্যটি ছড়িয়ে দেয়। যার ফলে অর্থনীতিতে ব্যাংক রান শুরু হয়। এর ফলে মানুষ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তাদের হিসাব থেকে টাকা তুলে বাসায় নিয়ে জমা করে এবং ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে যায়। তাই প্রয়োজন ছাড়া সকল গ্রাহকের পুরো টাকা একসাথে শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর কোনো দেশের ব্যাংকের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
আর ব্যাংকিং সেক্টর তারল্য সংকটে পড়লে ব্যাংক তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যাহত হয়, নতুন ঋণ দিতে পারেনা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
মনে রাখবেন ব্যাংক হচ্ছে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আতঙ্কিত না হয়ে শুধুমাত্র আপনার প্রয়োজনের টাকাটাই তুলুন, তাহলে বাঁচবে ব্যাংক, বাঁচবে দেশের অর্থনীতি।