05/02/2024
"ফিনল্যান্ডের পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর)/পাসপোর্ট এবং স্পাউস (Spouse) বেনিফিট / সোশ্যাল বেনিফিট /Kela বেনিফিট / ফিনিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স ইত্যাদি সম্পর্কে বাংলাদেশে অবস্থানরত ফিনল্যান্ডে অভিবাসন প্রত্যাশিদের কিছু বিভ্রম। "
ফিনল্যান্ডের পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর) সম্পর্কে বলি। বাংলাদেশে অবস্থানরত ফিনল্যান্ডে অভিবাসন প্রত্যাশিদের প্রায় সকলেরই এই বিষয়ে ধারণা এমন যে, " ফিনল্যান্ডে যাবার ৪ বছর পরেই পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর) পাওয়া যাবে এবং ফিনল্যান্ডের ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট (migri) তে এমন তথ্যই দেয়া আছে তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট, এখানে তা নিয়ে আবার প্রশ্ন কেন? এই বিষয়টি অনেকেই নিজ থেকে জেনে-বুঝে নেয় আবার অনেকেই বিভিন্ন এজেন্সি/ব্লগারদের মাধ্যমে জেনে-শুনে প্রভাবিত হয়ে ইতিমধ্যে ফিনল্যান্ডে এসেছে বা আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এখানে সমস্যা হচ্ছে আমারা আমাদের বর্তমান অবস্থান কি বা কোথায়? সেটা বিবেচনা না করেই সামগ্রিকভাবে সবকিছুর বিচার বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে চলে আসি এবং সেটাতেই অটল থাকি। এর বিপরীতে কোন কিছু জানতে বা বুঝতে চেষ্টাতো করি না এবং উক্ত বিষয়ে যদি কোনো তথ্যের প্রয়োজন হয় তাহলে ততটুকুই নেই যতটুকু আমাদের নির্ধারিত সিদ্ধান্তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
প্রথমেই আপনাকে বিবেচনা করতে হবে যে, আপনি কি হিসেবে ফিনল্যান্ডের অভিবাসন প্রত্যাশি হতে চাচ্ছেন- স্টুডেন্ট হিসেবে, ওয়ার্ক পার্মিট নিয়ে নাকি স্পাউস ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে?
* স্টুডেন্ট হিসেবেই যেহেতু বেশিরভাগ লোকজন ফিনল্যান্ডের অভিবাসন প্রত্যাশি হয়ে থাকে সেহেতু আপনি স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার ৪ বছর পরে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর) পাবেন না। কেন পাবেন না?
এখানে বিষয়টি হচ্ছে, আপনি যখন স্টুডেন্ট হিসেবে রেসিডেন্স পার্মিট পাবেন তখন প্রথমে আপনাকে ২ অথবা ৪ বছরে রেসিডেন্স পার্মিট দেয়া হবে এবং সেটা A পার্মিট তবে তাতে স্টুডেন্ট হিসেবে ৩০ ঘন্টা (পার্টটাইম) কাজের বাধ্যবাধকতা থাকবে। সুতরাং, আপনি এই রেসিডেন্স পার্মিট নিয়ে কোন কোম্পানিতে ফুলটাইম কাজের কন্ট্রাক্ট পাবেন না। ২/৪ বছর পরে আপনি যখন গ্রাজুয়েশন শেষ করে নতুনভাবে যখন রেসিডেন্স পার্মিটের জন্য আবেদন করবেন তখন আপনার যেহেতু কোন ফুল টাইম কাজের কন্ট্রাক্ট থাকবে না, সেহেতু আপনাকে তখন ৩০ ঘন্টা (পার্টটাইম) কাজের কন্ট্রাক্ট দিয়ে আবেদন করতে হবে। তখন আপনাকে ৪ বছরের ফুলটাইম কাজের রেসিডেন্স পার্মিট (A Continues) নিতে হবে। আর আপনারা সেই রেসিডেন্স পার্মিটের মেয়াদ শেষ হবার ২/৩ মাস আগে আপনি পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর) এর আবেদন করতে পারবেন। এর আগে নয় এবং আগে যদি করেও থাকেন তাহলে আপনার সেই রেসিডেন্সি পার্মিটের মেয়াদ শেষের আগে আপনার আবেদন প্রসেসিং করা হবে না। এইটা migri ওয়েবসাইটে স্পষ্ট বলা আছে।
সেক্ষেত্রে, "স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার পরে ৪ বা ২ বছর (ব্যাচেলর প্রোগ্রাম ৪ বছরের এবং মাস্টার্স প্রোগ্রাম ২ বছরের) থাকার পরে পরবর্তী আরও নুন্যতম ৪ বছর ওয়ার্ক পার্মিট (A Continues) ক্যাটাগরিতে থাকতে হবে। তার পরই মিলবে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি.আর)।
এইখানে আগের আইন, নতুন/পুরান/সংশোধিত/প্রস্তাবিত যে আইনের কথাই আপনি বলুন না কেন, ঘুরেফিরে স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার পরে নুন্যতম ৬/৮ বছর পরে আপনি পি.আর পাবেন তার আগে নয়। কাগজে কলমে আইন থাকলেও প্রায়োগিক ভাবে একজন স্টুডেন্ট হিসেবে ৩০ ঘন্টা কাজের বাধ্যবাধকতার কারনে আপনার ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য হচ্ছে না।
(উক্ত বিষয়ের রেফারেন্স এবং স্ক্রিনশট দেয়া আছে)
* আপনি যদি কোন কোম্পানির ওয়ার্ক পার্মিট নিয়ে ফিনল্যান্ডে আসেন তাহলে আপনার যেহেতু আসার পরেই ফুলটাইম কাজ থাকবে। সেক্ষেত্রে আপনি ৪ বছর পরেই পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটের (পি,আর) জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যেই পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিট (পি,আর) পেয়ে যাবেন।
সেক্ষেত্রে প্রথমে ১ বছরের রেসিডেন্স পার্মিট দেয়া হয় এবং তারপর ৪ বছরের দেয়া হয়। ৪ বছরের রেসিডেন্স পার্মিটের মেয়াদ শেষের ১/৩ মাস আগে বা পরে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটের (পি.আর) ডিসিশন দেয়া হয়। যদিও ফিনল্যান্ডে সরাসরি ওয়ার্কপার্মিট নিয়ে আসা লোকের সংখ্যা তুলনামূলক খুবই সামান্য এবং এক্ষেত্রেও অনেক জটিলতা এবং হয়রানির শিকার হতে হয় বেশিরভাগকে। (এই বিষয়ে যদি আপনাদের জানার আগ্রহ থাকে তাহলে পরবর্তীতে লেখার চেষ্টা করব।)
* আপনি যদি স্পাউস ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে আসেন তাহলে আপনি ফুলটাইম যেকোনো কাজ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আপনি যদি ফিনল্যান্ডে আসার পরে কোন ফুলটাইম কাজের কন্ট্রাক্ট পান, তাহলে ৬ মাস সেই কোম্পানিতে কাজের পরে উক্ত কন্ট্রাক্ট পার্মানেন্ট কন্ট্রাক্ট হিসেবে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে আপনি চাইলে আপনার রেসিডেন্স পার্মিট স্পউস ডিপেন্ডেন্ট থেকে ওয়ার্ক পার্মিটে পরিবর্তন করতে পারবেন। আর ওয়ার্ক পার্মিটের বিষয়ে উপরে যা বলেছি সেভাবেই আপনার পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটের (পি.আর) ডিসিশন প্রক্রিয়া হবে কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার হয়তো সবমিলিয়ে ৬ মাস বা সর্বোচ্চ ১ বছর সময় বেশি লাগতে পারে।
এক্ষেত্রে আপনাকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে যে, আপনি যার স্বামী/স্ত্রী হিসেবে স্পউস ডিপেন্ডেন্ট হয়ে আসবেন সেক্ষেত্রে সেই স্বামী/স্ত্রী যদি স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসে তাহলে কিন্তু তার ক্ষেত্রে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটের (পি.আর) ডিসিশন প্রক্রিয়া হবে উপরে উল্লেখিত স্টুডেন্ট হিসেবে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটের (পি.আর) ডিসিশন প্রক্রিয়া।
এবার আসি, স্পাউস (Spouse) বেনিফিট / সোশ্যাল বেনিফিট /Kela বেনিফিট / ফিনিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনায়।
এই বিষয়েও বিভিন্ন এজেন্সি বা কিছু ব্লগাররা এমনভাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে যে, কেউ ফিনল্যান্ডে আসার সাথে সাথেই Kela বেনিফিট/Unemployment Benefit পাবেন এবং কোন কিছু না করেই বসে বসে সরকারের কাছ থেকে টাকা পেয়ে সবচেয়ে সুখী দেশে আপনিও সুখীভাবে জীবন জাপান করতে পারবেন। বিষয়টি আপনাকে ফিনল্যান্ডে আসার ব্যাপারে প্রভাবিত করলেও বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
হ্যাঁ, ফিনল্যান্ডে Kela বেনিফিট/Unemployment Benefit দেয়া হয় তবে সেটা কিসের ভিত্তিতে, কাদেরকে এবং কোন শর্তে দেয়া হয়ে থাকে সেটা আগে বুঝতে হবে।
প্রথমত, আপনি যদি স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসেন সেক্ষেত্রে আপনি ২/৪ বছরের মধ্যে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ওয়ার্ক পার্মিট (A continues) এ না যাওয়ার পর্যন্ত আপনি স্টুডেন্ট বেনিফিট (যেই শহরে আসবেন সেখানে স্টুডেন্ট এপার্টমেন্টে থাকার সু্যোগ আর ট্রাভেল কার্ড/টিকেট ৪০% ছাড়) ছাড়া কোন প্রকার Kela বেনিফিট/Unemployment Benefit
পাবেন না। তবে এই সময়ের মধ্যে আপনি যদি কোন পার্টটাইম কাজ করেন তাহলে PAM বা কোন লেবার অরগানাইজেশান এর মেম্বারশিপ নিতে পারবেন এই চুক্তিতে যে, প্রতিমাসে আপনি ৫০-৮০ ইউরো তাদেরকে দিবেন এবং পরবর্তীতে আপনি যদি আপনার কোম্পানি থেকে কোন কারণে ছাটাই হোন কিংবা শারীরিক কোন অসুস্থতার কারনে কাজ করবার সামর্থ্য না থাকে তাহলে তারা আপনাকে আপনার প্রতি মাসের গড় আয়ের ৬০-৮০% এর মত দিবে।
সুতরাং স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার আগে এইসব বিষয় আপনার জন্য নয় এবং এটাই মাথা থেকে সম্পূর্ণভাবে ঝেড়ে ফেলতে হবে। বরং একবছর পারে আপনাকে টিউশন ফি দিতে হবে এবং আপনাকে ইউনিভার্সিটির নূন্যতম ক্রেডিট/কোর্স সম্পূর্ণ করতে হবে। এইগুলোও সময়মত না করতে পারলে আপনার পরবর্তী রেসিডেন্সি পার্মিট পাবার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রাভাব পারার সম্ভাবনা থাকবে।
*আপনি যদি স্পউস ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে আসেন, সেক্ষেত্রে আপনি যদি কোন প্রকার ফুলটাইম/পার্টটাইম কাজের ব্যাবস্থা না করতে পারেন তাহলে আপনি Kela বেনিফিট/Unemployment Benefit পাবেন তবে এক্ষেত্রে আপনাকে দেড়/দুই বছরের ফিনিস ল্যাংগুয়েজ কোর্স বা Integration programme এ যেতে হবে। এক্ষেত্রেও আপনাকে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সেগুলো হল -
১) ফিনিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স বা Integration programme এর জন্য আবেদন করার পরে আপনি যেহেতু স্টুডেন্টের স্পাউস ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে পর্যাপ্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা স্পনসর দেখিয়ে ফিনল্যান্ডে এসেছেন এইসব বিবেচনা করে অনেকেই এই কোর্স দেয়া হয় না, আবার অনেকেই দেয়া হয়। সুতরাং এই বিষয়টিও সবার ক্ষেত্রে কাজ করছে না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যদি স্বামী স্টুডেন্ট হিসেবে আসে এবং স্ত্রীকে স্পাউস ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে আনে তাহলে স্ত্রীর ক্ষেত্রে এই কোর্স পাওয়াটা মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়। কিন্তু এখানে বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যারা স্বামী-স্ত্রী একসাথে ফিনল্যান্ডের অভিবাসন প্রত্যাশি হতে চায় তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত এমন যে, স্ত্রী স্টুডেন্ট হিসেবে আর স্বামী তার ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যাবে এবং স্বামী যাবার পরে ১/২ টা ফুলটাইম কাজ করে সকল খরচ বহন করবে।
২) আপনি যদি ফিনিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স বা Integration programme পেয়েও থাকেন সেক্ষেত্রে ৫/৬/৭ মাস পরে আপনার ক্লাস শুরু হবে। তারপর সপ্তাহে ৫ দিন ৫/৬ ঘন্টা ক্লাসের বিপরীতে আপনাকে মাসে ৭০০/৮৫০ ইউরো দেয়া হবে। তাছাড়াও, আপনি বেনিফিট নিলে অন্যকোথাও কাজ করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনার স্বামী/ স্ত্রী যদি স্টুডেন্ট হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ না করে তাহলে, বেনিফিটের ৭০০/৮৫০ ইউরো দিয়ে দুইজনে কিভাবে চলবেন? স্টুডেন্ট এপার্টমেন্টে
থাকলেও ৫০০+ ইউরো বাসাভাড়া তারপর বাকি ৩৫০ ইউরো দিয়ে কিভাবে চলবেন? এছাড়া পরবর্তী বছরের টিউশন ফি কিভাবে ম্যানেজ করবেন? আর পরবর্তী দুই জনের রেসিডেন্স পার্মিটের আবেদন কিসের ভিত্তিতে করবেন? এইসব আগে বিবেচনা করবেন।
এই পর্যন্ত পড়ে, আপনার মনে হয়তো নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসবে তাহলে স্পাউস (Spouse) বেনিফিট / সোশ্যাল বেনিফিট /Kela বেনিফিট / ফিনিস ল্যাংগুয়েজ কোর্স এইগুলোও কাদের জন্য?
হ্যাঁ, এইসব বেনিফিট মুলত যায় স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার পরে গ্রাজুয়েশন শেষ করে যখন ওয়ার্ক পার্মিট (A continues) এ আসবেন অথবা তার পরবর্তীতে পার্মানেন্ট রেসিডেন্স পার্মিটে যাবেন, তখন যদি আপনার কাজ বা পর্যাপ্ত ইনকাম না থাকে সে ক্ষেত্রেই আপনি এইসব Kela/Unemployment বেনিফিট নিতে পারবেন। এবং এই পর্যায়ের যে কেউ চাইলে ফিনিশ ল্যাংগুয়েজ কোর্স বা Integration প্রোগ্রামে যেতে পারবেন। এই পর্যায়ের কেউ যদি তার স্ত্রী/স্বামীকে spouse/family ties এই ক্যাটাগরিতে আবেদন করে ফিনল্যান্ডে নিয়ে আসে সেক্ষেত্রে তারাও ফিনল্যান্ডে আসার পরে এইসব বেনিফিটগুলো পাবে।
অনেকেই আবার উপরের এইসব কিছুর ধারণা উপেক্ষা করে ফিনল্যান্ডে আসার ৪ বছরের মধ্যে ফিনিস ভাষার CEFR level B1 শেষ করে YKI টেস্ট দিয়ে ফিনল্যান্ডের পাসপোর্ট নেয়া যাবে। বিভিন্ন এজেন্সি/ব্লগারদের মাধ্যমে এইসব তথ্যে প্রভাবিত হয়ে ফিনল্যান্ডের অভিবাসন প্রত্যাশি হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং অনেকেই ফিনল্যান্ডে এই প্রত্যাশা নিয়ে ইতিমধ্যে চলেও এসেছেন। অনেক এজেন্সিতো এইসব প্রচারণা করে বাংলাদেশেই ফিনিশ ভাষা শেখানোর কোচিং সেন্টার চালাচ্ছে।
আপনাদের উদ্দেশ্য বলছি, স্টুডেন্ট হিসেবে ফিনল্যান্ডে আসার পরে প্রথম ২/৪ (মাস্টার্স ২ বছর এবং ব্যাচেলর ৪বছর) বছরের মধ্যে কিভাবে আপনি আপনার পড়াশোনা শেষ করে স্টুডেন্ট থেকে ওয়ার্ক পার্মিটে যাবেন? এর পাশাপাশি আপনার থাকা-খাওয়ার খরচ এবং পরবর্তী বছরের টিউশন ফির যোগাড় করবার জন্য আর্থিক সামর্থ্য /পর্যাপ্ত কাজের ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা? এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য আগে প্রস্তুতি নেন। আর যদি এইসব নিয়ে আপনার কোন মাথাব্যথা না থাকে, সম্পূর্ণ সাপোর্ট দেশ থেকে পাওয়া যাবে তাহলেই আপনার সিদ্ধান্তই সঠিক। কিন্তু এর বিপরীতে এটাও আপনার বিবেচনায় নিতে হবে যে, স্টাডির ২/৪ বছরের সময়ের বাইরে আপনি সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ বছর সময় বেশি পাবেন আপনার স্টাডি শেষ করবার। তা না হলে আপনি পরবর্তীতে আপনার স্টুডেন্ট হিসেবে থাকা রেসিডেন্স পার্মিটের মেয়াদ এক্সটেনশনের আবেদনে নেতিবাচক প্রভাব পরবে। সেক্ষেত্রে আপনাকে হয় বাংলাদেশে ফেরত আসতে হবে নতুবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশ যেমন পর্তুগাল,ফ্রান্স, ইতালি,জার্মানি এইসব দেশে গিয়ে অবৈধ শরনার্থী হতে হবে এবং রিফিউজি তালিকায় নাম লিখাতে হবে।
এজেন্সি এবং ব্লগারদের উদ্দেশ্য কিছু বলি। আপনারা যারা এজেন্সি পরিচালনা করছেন, আপনারা টাকা ইনকামের জন্য যতোটা না উদগ্রীব তারচেয়েও বেশি উদগ্রীব বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে আসবার জন্যে। সুতরাং আপনারা সবাইকে ফিনল্যান্ডে যাবার পরবর্তী বিষয় সম্পর্কে সকল বাস্তবতার ইতিবাচক/নেতিবাচক উভয়ই দিক বিস্তারিত বুঝিয়ে বলুন। যেন তারা ফিনল্যান্ডে আসার পূর্বেই সেইভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে এবং ফিনল্যান্ডে আসার পরবর্তীতে তাদের যেন কোন প্রকার সমস্যা বা হতাশার সম্মুখীন না হয়। এতে আপনাদের কাস্টমার তুলনামূলক কিছুটা কম হলেও ভবিষ্যতে আপনাদের সুনাম সুখ্যাতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সকলের কাছে অনেক গুন বাড়বে।
ব্লগার ভাই/বোনদের সৃজনশীল কাজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি। আপনারা লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ভিউ এইসবের জন্যে ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন স্থাপনা, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য কিংবা বরফের মধ্যে অথবা লোন নিয়ে কেনা বা অন্যের কিংবা রেন্টাল কোম্পানি থেকে ভাড়া নেয়া মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ওডি, টেসলা গাড়ি ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে অথবা তা ড্রাইভ করতে করতে কিভাবে কত সহজে ফিনল্যান্ড আসবেন এবং এইখানের লাইফ স্টাইল কেমন হবে এইসব ভিডিও না বানিয়ে-
বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের সামনে ফুড ডেলিভারি দেবার জন্য মানুষ কিভাবে বিশাল ভারি ব্যাগ কাধে নিয়ে অপেক্ষা করে? বিভিন্ন শপিংমল বা অফিসগুলোতে ৬/৭ ঘন্টা কিভাবে ক্লিনিং এর কাজ করে এবং এই সময়ের মধ্যে ২০/৩০ টা টয়লেট, ফ্লোর কিভাবে ঝকঝকে পরিষ্কার করে? কিভাবে ৬/৭/৮ ঘন্টা ফ্রিজিং রুমের ভিতরে প্রচন্ড শব্দের মাঝে দাড়িয়ে ফুড প্রসেসিং এর কাজ করে? কিভাবে পিজ্জার দোকানে গরম ওভেনের সামনে দাঁড়িয়ে একটানা ৮/১০ ঘন্টা কাজ করে? কিভাবে ম্যাকডোনাল্ড'স/ বারগার কিং এ ২/৩ মিনিটে একটা অর্ডার প্রস্তুত করতে হয়? ফাইভস্টার হোটেল কিংবা ক্রুজ শিপ গুলোতে ৭/৮ ঘন্টার মধ্যে ২০/২৫/৩০ টা রুম কেমনে পারফেক্টলি গুছানো হয়? কিভাবে শীতকালে মাইনাস ২০-৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে রাত ১ টা থেকে সকাল ৬/৭ টা পর্যন্ত ৩০০/৪০০ পত্রিকা বিভিন্ন এপার্টমেন্ট বা বাড়িতে সাইকেল চালিয়ে ডেলিভারি দিয়ে, তারপর সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ৩/৪ টা পর্যন্ত ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করে বাসায় এসে রান্নাবান্না করে, ইউনিভার্সিটির এসাইনমেন্ট বা হোমওয়ার্ক করে ৪/৫ ঘন্টা ঘুমিয়ে তারপর রাত ১২ টায় আবার কাজের জন্য বের হয়? যদি পারেন এইসব দেখিয়ে ভিডিও বানান এবং ফিনল্যান্ডে IELTS ৬.০/৭ প্লাস স্কোর নিয়ে এসে এইসব কাজ করে কিভাবে বাংলাদেশিরা তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ইত্যাদি পরিবেশ পরিস্থিতি বাংলাদেশ ও ফিনল্যান্ডে একসাথে ম্যাইন্টেন করে জীবন-যাপন করছে? হাতে গুনা খুব অল্পকয়জন আই.টি বা অফিসিয়াল কাজ করছে তাদের উদাহরণ এখানে না দেয়াই ভাল। তারা দুনিয়ায় যে দেশেই যাবে সব জায়গায়ই ভালো থাকবে সুতরাং উনাদের জন্য ফিনল্যান্ড যাহা বাংলাদেশও তাহা। এই পর্যায়ের আপনাকে আসতে গেলে নূন্যতম ৬/৭ বছর সময় লাগবে ফিনল্যান্ডে আসার পরে এবং সেটা পুরোটা নির্ভর করবে আপনার ধৈর্য, সহনশীলতা, নিবিড় পরিশ্রম, বাস্তবতাকে বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং অবশ্যই আপনার যোগ্যতার উপর।
সবশেষে এটাই বলবো, "ফিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশে এটা সত্য তবে সেটা ফিনিশদের জন্য, ইমিগ্র্যান্টসদের জন্য নয়।"