19/06/2026
চুড়ো হয়ে থাকা মুড়োর বড় বাটিটা মেয়ের পাশে নামিয়ে রেখে খাগড়াই কাঁসারের তৈরি খাসির মাংসের বাটিটা নামাতে যাচ্ছিলেন অন্নপূর্ণা| হঠাৎ ননদ রত্নার চিৎ কারে চমকে উঠলেন| কাঁসার বাটিতে লালচে তেল মশলাদার ঝোল চলকে মার্বেলের মেঝেতে পড়ে তেলে জলে হলুদ জলছবি এঁকে দিয়ে গেল|
নরম গলায় অন্নপূর্ণা বলে উঠলেন, কি হল ঠাকুরঝি অত চেঁ চাচ্ছ কেন?
গলা তুলেই বললেন রত্না, চেঁ চাচ্ছি কি আর সাধে? কোন আক্কেলে তুমি তোমার একমাত্র জামাইকে মাছের মুড়ো, ইলিশ মাছ, খাসির মাংস না দিয়ে মেয়ের পাতের গোড়ায় সব সাজিয়ে দিলে! দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা মাত্র জামাই তোমার বৌদি! আর তার পাতে কিনা পেটির ছোট দুটো মাছ, দেশি চিকেন, পমফ্রেট!
পিসির কথা শুনে মৈত্রেয়ীর মুখটা কালো হয়ে গেল| সে তো বরাবরই এগুলো খেতে ভালোবাসে| আর মা বরাবরই রসিয়ে কষিয়ে রান্না করে একমাত্র মেয়ের পছন্দের খাবার ওর মুখের গোড়ায় ধরে দেয়| তাতে তো পিসি কখনোই কোন আপত্তি করেনি! তবে আজ হল কি?
নতুন জামাই দেবজিতও পাশে বসে বেশ মজা নিয়ে গেরস্ত বাড়ির নাটক দেখছিল| শাশুড়ি যখন মেয়ের পাতের সামনে একে একে ইলিশ মাছ, মুড়ো, মাংসের বাটি নামিয়ে দিচ্ছিলেন তখন তার নিজেরই বেজায় রা গ হচ্ছিল| ও যদি আজকের দিনের স্পেশাল গেস্ট হয়ে চিকেন, পমফ্রেট আর মাছের পেটি খায়... তবে মৈত্রেয়ীরও ভালোমানুষের মতো তাই খাওয়া উচিত! শাশুড়ি মায়ের আবার আলাদা করে মেয়ের জন্য স্পেশাল রান্না করার কি দরকার? যেখানে জামাইয়ের নামেই জামাই ষষ্ঠীর যাবতীয় আয়োজন, সেখানে জামাই কি খেল না খেল সেদিকে কারোর কোনো নজরই নেই! এসে থেকে দেখছে সে, বাড়িতে জমিয়ে কন্যা পুজো চলছে| বেশ হয়েছে আজ| পিসিমণি ভালো করে ধু নে দিয়েছে|
নরম গলায় বললেন অন্নপূর্ণা, কি করব বলো ঠাকুরঝি, দেবজিত তো এসব খায় না, তাই করি নি| কিন্তু মৈত্রয়ী যে এগুলোই পছন্দ করে| ছোট থেকেই তো তুমি ওকে দেখছ রত্না| জানোই তো মেয়েটার পছন্দ অপছন্দ কেমন! আজকের দিনে মেয়েটাকে কি না খাইয়ে রাখব?
বিয়ের পর বরের পছন্দকেই নিজের পছন্দ করে নিতে হয়| কিছু ভুল বললাম কি? তুমি নিয়েছ, আমি নিয়েছি, আমাদের মৈত্রেয়ীই বা পারবে না কেন? জামাই পমফ্রেট খেলে ও-ও পমফ্রেট খাবে|
কেন খাবে? আমরা যা করেছি সেটাই যে ঠিক যেমনটা তো নয় ঠাকুরঝি| শান্ত অন্নপূর্ণার গলায় হঠাৎই অচেনা ব্যক্তিত্বের ঝলক| চমকে তাকাল দেবজিত| মৈত্রেয়ীর যদি ইলিশ ভালো লাগে সে ইলিশই খাবে| দেবজিত তো বিয়েটা করেছে, সে কি আমার মেয়ের জন্য নিজের পছন্দের পমফ্রেট ছেড়ে ইলিশ ধরেছে? নাকি ওদের বাড়িতে আমার মেয়ে ভালোবাসে বলে পমফ্রেট ছেড়ে ইলিশ, চিকেনের বদলে মাটন... কেনা শুরু হয়েছে?
গালে হাত দিয়ে বলল রত্না, কি সব বলছ বৌদি? তা আবার হয় নাকি?
কেন হবে না বলো দেখি? আমার মেয়েটা যদি অন্য সংসারে গিয়ে মানিয়ে নিতে পারে তবে তাদেরকেও আমার মেয়ের পছন্দ অপছন্দের খেয়াল রাখতে হবে| তাই তো হওয়া উচিত| কি জামাই, আমি কি কিছু ভুল বললাম? তারা যদি সে খেয়াল রাখতে অক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে আমার মেয়ের পছন্দের খাবারের ব্যবস্থাটুকু আমাকেই করতে হবে| যাতে মেয়ে ভুলে না যায় তারও কিছু পছন্দ অপছন্দ ছিল| নিজেদের বাড়িতে তাঁদের ছেলের পছন্দের খাবার দাবারের আয়োজন যদি করতে পারে তাঁরা তবে আমরা কেন জামাই আদরের পাশাপাশি আমাদের বাড়ির মেয়ের জন্য পছন্দের খাবার দাবারের আয়োজন করব না?
অন্নপূর্ণার ভাবনা চিন্তার গভীরতা দেখে বেশ অবাক হল রত্না| বিমূঢ় গলায় বলল সে, কথাটা নেহাৎ ফেলে দেওয়ার মত নয়| আসলে এমন করে তো কখনো ভেবে দেখি নি... সব সময় শুনে এসেছি, জেনে এসেছি মেয়ে হলে মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে হয়|
ভেবে দেখাটা দরকার ঠাকুরঝি| সময় বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছি আমরাও| মেয়েরা নিজেরাই যদি নিজেদের সম্মান না করতে পারি, মেয়ের বাড়ির লোকজন যদি নিজেদের সন্তানের পছন্দ অপছন্দের খেয়াল না রাখে তবে অন্য বাড়ির লোকজনের কি দায় পড়েছে মেয়েটার পছন্দের খেয়াল রাখার? সময় পেলে ভেবে দেখ একবার|
মৈত্রেয়ীর দিকে স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন রত্না| আদরমাখা গলায় বললেন খা, মা খা| তোর মা কথাগুলো আজ আমার চোখ খুলে দিয়েছে|
দেবজিতও ভাবছিল| সত্যি এভাবে তো কখনো সে ভেবে দেখেনি| ভালোবেসে পাশে থাকার অঙ্গীকার করে বিয়ে করার পর কতদিন সে মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে দেখেছে? ওর পছন্দ অপছন্দের খেয়াল রেখেছে? কি খেতে ভালোবাসে সে কথা জিজ্ঞেস করেছে?
এঁটো হাতেই মাকে জড়িয়ে ধরে মৈত্রেয়ী| ইয়্যু আর গ্ৰেট মা| আই লাভ ইয়্যু| ইয়্যু আর দ্য বেস্ট মম অফ দ্য ওয়ার্ল্ড|
ব্যালকনিতে রাখা আর্মচেয়ারে বসেছিলেন রূপঙ্কর| মুখের সামনে সকালের খবরের কাগজ খোলা| কাগজে মুখ লুকিয়ে মিটি মিটি হাসছিলেন, আজ রত্না বুঝল, কিন্তু তিনি? অনেকদিন আগেই বুঝেছিলেন| অন্নপূর্ণা যে তাঁর চোখদুটোও খুলে দিয়েছেন|
( সমাপ্ত )
গল্প: জামাইষষ্ঠী
লিখেছেন: Monkemoner dakbakso - Anindita
গল্প কালেক্টেড