21/07/2026
যুগে যুগে জুলাই কেনো ফিরে আসে????
ব্যানার হাতে হাসি মুখের এই ছবিটা আজকের নয়, প্রায় আট থেকে দশ বছর আগের। আমরা তখন শিক্ষার্থী , তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, রক্তগরম আবেগ, আর অসংখ্য স্বপ্ন নিয়ে ভাবতাম, এই যে শহীদের রক্তে ভেজা স্বাধীন মাটিতে জন্মেছি, এই মাটির প্রতি আমাদের অনেক দায়। সেই দায় থেকেই এই দেশকে ভালোবেসেছি, এই দেশের মানুষকে ভালোবেসেছি, স্বপ্ন দেখেছি পরিবর্তনের।
কিন্তু বুঝ হবার পরেই দেখলাম একি এদেশে স্বাধীনতার চেতনার আলাপ দিয়েই গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দিতে চায় সকলের পায়। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম সব বদলে দেব। এ দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাবে, প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য নাগরিক অধিকার বুঝে পাবে, আইনের কাছে সবাই সমান হবে, এই রাষ্ট্র হবে মানুষের।
সেই আশাতেই বারবার আমরা ফুল হাতে, ব্যানার হাতে, ন্যায্য দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু হাসিমুখে ঘর থেকে বের হলেও হাসিমুখে ফিরতে পারিনি। সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ, আতঙ্ক আর সহিংসতার স্মৃতি আমাদের প্রজন্মের অনেকের কাছেই বাস্তব অভিজ্ঞতা। পিশাচিনীর পুলিশ বাহিনী আর পালিত হেলমেট পরিহিত জঙ্গি বাহিনীর যেই হিংস্রতার মুখোমুখি আমরা হতাম তারপর চোখে জল নিয়ে ঘরে ফিরতাম। অথচ ওই মানুষগুলোকে আমরা চিনতাম। আমরা একই ক্যাম্পাসে চলাফেরা করছি, একই এলাকায় আমরা বসবাস করছি। কিন্তু অবিকল আমাদের মতো দেখতে হলেও ওরা যে মানুষ নামের হায়েনা ছিল, সেটা আমরা সতেরো বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছি। কারা কি করেছে সেটা নিজ চোখে দেখেছি যুগ ধরে তাই কোনো ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের কল্পকাহিনি আমাদের শুনাতে আসবেন না।
নারী অধিকার,নারীর নিরাপত্তা, নারী স্বাধীনতার বহু বুলি আওড়ানো আমরা দেখেছি ঠিকই। কিন্তু না, কোনো একটা দিন নিশ্চিন্তে বাইরে বেরোতে পারিনি। সতেরো বছরে বহু ধর্ষণ, অসংখ্য যৌন হয়রানি, নারীর নির্যাতন রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। সেগুলো আমরা ভুলে যাইনি, সেগুলো আমরা নিজের চোখে দেখেছি। যা কিনা এখনো চলমান।
রাস্তাঘাটে, বাজারে কিংবা এলাকার ফুটপাতে, সবজিওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, চাওয়ালা, রিক্শাওয়ালা, দিনমজুরদের বসে কাঁদতে দেখেছি, তাদের সারাদিনের রোজগারের টাকা পিশাচিনীর কুকুরেরা এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। কিংবা বিল না দিয়েই বছরের পর বছর ধরে সদলবলে সদাই নিয়ে উজাড় করেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ছোট্ট দোকানখানা। সেই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া লোকেদের আর্তনাদ আমরা দেখেছি। অসহায় ভেজা চোখে ভয়ার্ত কন্ঠে সৃষ্টিকর্তার কাছে দেয়া তাদের অভিশাপ আমরা শুনেছি। এসব এখনো চলমান এবং মনে রাখবেন মানুষ সব মনে রাখে।
শুধুমাত্র বিরোধী মত পোষণ করার কারণে মানুষকে গুম, খুন, সেই মানুষগুলোর পরিবারের ওপর জঘন্য অত্যাচারের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমরা হয়েছি। না, এগুলো শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার গল্প নয়, এগুলো আমাদের আশেপাশেই হয়েছে, আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। এসব নিয়ে দুলাইন লিখার অপরাধে এহেন কোনো নোংরা ভাষা নেই যে ভাষায় আমাদের আক্রমণ করা হয়নি। আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুলাইন লিখলেই সেই একই কায়দায় করা হয় জঘন্য আক্রমণ। এক্ষেত্রে নারী হলেতো কথাই নেই, দুলাইন নোংরা শব্দে নারীদের আক্রমণ করার আনন্দই আলাদা।
তারপর বয়স বাড়লো, আমরা অনেকেই শত অভিমান নিয়ে দেশ ছাড়লাম, ধীরে ধীরে সব মেনে নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে কেবল নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম কারন চাটুকারেরাই এদেশে পুরস্কৃত হয়, আর চাটুকারিতাতো আমাদের দ্বারা সম্ভব না তাই আমরা হয়ে গেলাম কামলা। কারন আমরা চাটুকারিতার দাসত্ব বরণ করে দূর্বলের প্রভু হয়ে কেড়ে খাওয়ার চেয়ে খেটে খাওয়া দিনমজুরের জীবন যাপনকেও অধিক উত্তম মনে করি।
ধর্ষণের বিচার, পরিবেশ রক্ষা, কোটা সংস্কার কিংবা নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালেও পালিত হেলমেট বাহিনী কে লেলিয়ে দেয়া হতো। কারণ সুন্দরবন বাঁচাতে চাইলেও গদি নিয়ে ভয় ধরে যেত, ধর্ষণের বিচার চাইলেও গদিতে নাকি টান লেগে যেত, নিরাপদ সড়ক চাইলেও গদি নাকি নড়বড়ে হয়ে যেত। প্রতিবার সংঘাতই ছিলো তাদের একমাত্র ভাষা।
যদি জনগণের পূর্ণ সমর্থন নিয়েই একটি সরকার ক্ষমতায় থাকে, তবে শান্তিপূর্ণ নাগরিক দাবিকে এত বড় হুমকি হিসেবে কেন দেখা হতো? জনগণের ছোটখাটো দাবি দাওয়াতে কেন গদি নিয়ে এত টেনশনে পড়ে যেতো। কারণ তারা নিজেরাও জানতেন আমাদের জেনারেশনকে ভোটার হবার পর ভোট দেওয়ারই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এবং সবশেষে দেশের বুক চিরে পাশের দেশকে করিডোর দেওয়ার যে দুঃসাহস তারা দেখালেন সে নিয়ে আর কি বলবো। অন্যদিকে চুরি দুর্নীতির হিসেব লিখতে থাকলে ডায়রির পাতা ফুরিয়ে যাবে।
সতেরো বছরের জমে থাকা এত অসংখ্য অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের ফলাফলই হল চব্বিশের জুলাই। দেশের সাথে যোগাযোগ বিহীন সেই নির্ঘুম রাতগুলো আমাদের ভুলে যাওয়া সম্ভব না।
মানুষ সিস্টেমের পরিবর্তন চেয়েছে, দাসত্বের শিকল ভাঙতে চেয়েছে কিন্তু এখনো যদি সেই একইভাবে অন্যায়, অত্যা্চার, জুলুম আর অবিচার চলতেই থাকে তবে জালিমের মসনদ ভেঙে চুরমার করে দিতে জুলাইও ফিরবে একইভাবে।
এবং এই সবকিছুর মাঝে অনেক গুজব হয়তো ছড়িয়েছে, কিন্তু আপনারা কেনো আপনাদের অপশাসন এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে মানুষ গুজব পর্যন্ত বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে। সেই সুযোগে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছে, সবই মেনে নিলাম। কিন্তু কোন আইনে, কোন অধিকারে বারবার পালিত হেলমেট বাহিনীকে জনগণের উপর লেলিয়ে দেয়া হয়েছে?
আমি অন্তত বিশ্বাস করি সেদিন কেউ ঢাবি রিলেটেড গুজবে পথে নামেনাই। সেদিন শিক্ষার্থীরা পথে নেমে ছিল ছাত্রলীগের তান্ডবের কারণে। সেই ছাত্রলীগ যাদের অত্যাচারে প্রতিটা এলাকায় নিরীহ মানুষের চোখের পানি ঝরেছে, সেই ছাত্রলীগ যাদের নৃশংসতায় প্রাণ গেছে অসংখ্য নিরপরাধের, বিবেক বিসর্জন দেয়া সেই সন্ত্রাসী লীগ আজও হুংকার দিয়ে বেড়ায় সেই পুরনো হিংস্রতার ক্ষমতা ফিরে পেতে চায়।
আচ্ছা বলুন তো হিংস্রতা দিয়ে কি কখনো মানুষের মন জয় করা যায়? সতেরো বছর তো বহু করলেন, আর কতো??
এরপর সবচেয়ে বড় নোংরামিটা শুরু করলেন ৭১ আর চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে, এই নোংরা যুক্তি দিয়ে একজন স্বৈরাচারীকে ডিফেন্ড করতেও কি আপনাদের লজ্জাবোধ হয়না? না হয়না কারন বিবেক, মনুষ্যত্ব, হায়া এইসব মানুষের থাকে, অমানুষদের নয়।
জেনে রাখুন চব্বিশ একাত্তরের পরিপূরক নয় বরং একাত্তরের পরম্পরাই হলো চব্বিশ।
জুলাই আমাদের কি দিয়েছে? কিছুই না।
দেশের মানুষ তাদের কাঙ্খিত নাগরিক অধিকার বুঝে পায়নি, ধর্ষ/ন, হ/ত্যা, চুরি, ছিন/তাই কিছুই কমেনি, চারপাশে মানুষের অভিযোগ আর অভিযোগ। তবে কি জুলাইয়ের পক্ষে থাকা নিয়ে আমাদের রিগ্রেট হয়, না হয় না। আমরা জালিমের বিরুদ্ধে ছিলাম আজীবন থাকবো, সে যেই রূপে আর যেই নামেই ফিরে আসুক না কেনো আমরা মজলুমের পক্ষেই থাকবো। এবং জুলাই হওয়াটা অত্যাবশক ছিলো তাই হয়েছে। গন অভ্যুত্থান কোনো ডিজাইন মেনে ভবিষ্যৎ ভেবে হয়না (এটাই চিরন্তন সত্য)।
যারা এখনো একই কায়দায় জনগণের প্রভু হতে চায়, তারা জনগণের জন্য কাজ করুন নাহয় মনে রাখবেন ইতিহাস বারবার ফিরে ফিরে আসে, ইতিহাস থেকে শিখুন, মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার চায়, গোলামী নয়। পৃথিবীর যেখানেই স্বৈরাচার জন্মাবে, সেখানেই বারবার জুলাই নেমে আসবে। চেয়ে দেখুন পাশের দেশেও জুলাই নেমে এসেছে। ওই তরুনরা তাদের অধিকার বুঝে পাক, তরুনরা ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিশ্ব জুড়ে তারুণ্যের জয় হোক।