10/11/2025
একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, ১১ মাসের বাচ্চাকে হ্যাল্পিং হ্যান্ডের কাছে রেখে মা বাইরে গেছে। পরে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে বাচ্চা টা কে মেয়েটা মারছে। ঠাশ করে বাচ্চা টার নাকে মুখে একটা থা*প্পড় দিয়েছে মেয়েটা।
শুধু এইটুকুই ফুটেযে এসেছে আর বাকি সময় তারা অন্য রুমে ছিল। শুধু বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ আসছিল জোরে থেকে জোরে।
আহারে বাচ্চাটা। কিছুই বুঝে না, যে আঘাত করছে তাকে থামানোর ক্ষমতা নেই। শুধু চিৎকার করছে, আর যে তাকে টর্চার করছে তার মনে একটুকু সিম্প্যাথি ও নেই।
বড় শিশু হলেও তার এটলিস্ট অভিযোগ করার সুযোগ থাকে যে "মা ও আমাকে মেরেছে,। কিন্তু এই বাচ্চা টার সেটা করার ও সুযোগ নেই।। মা যদি রাগ করে বাচ্চার গায়ে হাত ও তোলে কিন্তু পরক্ষনে মায়ের মনে মমতা ও কাজ করে। সন্তান কে জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু এক্ষেত্রে না আছে এই পরিচারিকার মনে মায়া আর না শিশুটির অভিযোগ করার ক্ষমতা। ঠিক যখন মা বাড়ি আসবে তখন হয়তো নিষ্পাপ শিশু এই মেয়েটির কোলে থেকেই হাসবে।
আমার কলিগ যেদিন প্রথম দিন তার হ্যাল্পিং হ্যান্ডের কাছে ১১ মাসের বেবিকে রেখে অফিসে আসল। আমি তাকে বললাম কয়েকদিন অন্তত অই আপাকে সহ বাবুকে নিয়ে আসতে পারতে। আজকে প্রথম দিন ই উনাকে কাজে রাখলে, আর বাবুকে রেখে চলে আসলে? আমার কলিগ বলল, এখানে আসলে বাবুর কষ্ট হয়।কারণ আমার স্কুলে বাচ্চাকে রাখার কোন পরিবেশ নেই।
পরে উনাকে বললাম, সিসি ক্যামেরা লাগাবে না? উনি বলল, "না, আল্লাহ দেখবে, মানুষ কে বিশ্বাস করি"
এট লিস্ট কথা বলার আগে পর্যন্ত বাবুকে বাইরের মানুষের কাছে রাখব না বলে আমার বোন আমার সাথে এসে থেকেছে বাবুর দেখাশোনার জন্য।
কথা বলা শিখলেও রেখে যাব কি না সন্দেহ আছে।
আমি ৬ মাস ম্যাটার্নিটি লিভের পরে উইদাউট পেতে আরো কয়েক মাস ছুটি নিয়ে বাবুর ১০ মাস বয়সে জয়েন করেছি।
বাচ্চাকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে আমি চাকরিও ছেড়ে দিতে চেয়েছি। ইভেন জয়েন করেও বেশিরভাগ ই ডিপ্রেশনে থাকি কেন বাচ্চাকে ছেড়ে থাকি। যদিও আমি বেবিকে ছেড়ে ৪ ঘন্টা থাকি। এবং সেটাও টানা ৪ ঘন্টা নয়। প্রথম ২ ঘন্টা, মাঝখানে আবার বাবুর সাথে থাকি ২ ঘন্টা দ্যান আবার ২ ঘন্টা।
স্কুল থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব ২০ মিনিট। তবুও আমি স্কুল থেকে পায়ে হেটে ২ মিনিট দূরত্বে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি।যাতে টিফিন পিরিয়ডে বাসায় আসতে পারি।
আজকের সিসি ফুটেজ দেখে সবাই বলেছে বাচ্চার মায়ের চাকরি করতে হবে কেন?
আমাকে বুঝান বাচ্চার মায়ের চাকরি করতে হবে না কেন?
আপনারা সবার পরিস্থিতি জানেন?
অনেকে অভাবে করে, অনেকে পরিবার থেকে বাধ্য হয়ে করে, অনেক মেয়ের সারাজীবনের স্বপ্ন তার ক্যারিয়ার। সারাজীবন কষ্ট করে তার এই ক্যারিয়ার গড়ে।
এই মা কত কষ্ট করে বাইরে জব করে, আবার ঘরে ফিরে সন্তান
সংসার সব ম্যানেজ করে। জানেন ১০ মিনিট টাইম পাওয়া যায়না নিজের জন্য। আপনারা আবার মাকেই ব্লেম করেন।
আপনাদের আওয়াজ তোলা দরকার ছিল, প্রতিটা অফিসে ডে কেয়ার সেন্টার নেই কেন?
ডে কেয়ার সেন্টার না দেন, কেয়ার গিভার না দেন, আপনারা এটলিস্ট বাচ্চা টা কে রাখার মতো একটা রুম একটা জায়গা দেন। কেয়ার গিভার না হয় আমরা নিজেরাই ম্যানেজ করে নিব।
আমি যে স্কুলে জব করি, সেই স্কুলে আমি বাচ্চা কে নিয়ে যে কোল থেকে নামাব সেই স্পেস টুকু নেই।
দেশে যদি মেয়েদের কাজের সুযোগ আপনারা দেন, তাহলে তাদের সন্তান রাখার সুযোগ আপনারা কেন দিবেন না? তাদের সন্তান কোথায় থাকবে বলেন?
একজন মা ই তো অধৈর্য্য হয়ে যায় অনেক সময় বাচ্চার ট্যান্টার্ম সহ্য করতে গিয়ে৷ সেখানে বাইরের মানুষ তো মেজাজ হারা হতেই পারেন।
আপনারা কেন ম্যাটার্নিটি লিভ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আওয়াজ তুলেন না? অন্যান্য রাষ্ট্রে তো ৩ বছর পর্যন্ত ও ম্যাটার্নিটি লিভ দেয়। আর আমাদের মাত্র ৬ মাস। এটলিস্ট ব্রেস্টফিডিং পিরিয়ড টা বা অন্তন ১ বছর ম্যাটার্নিটি লিভ কি দেয়া যায় না?
একটা ব্রেস্ট ফিডিং মা কত টুকু কষ্ট করে এই টাইম ম্যানেজমেন্ট করে জানেন? কিভাবে সারাদিন বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড না করিয়ে থাকে? মায়ের নিজের ই কতটা শারিরিক কষ্ট হয় জানেন? বেশিরভাগ মায়েদের দীর্ঘক্ষণ ব্রেস্টফিডিং না করানোর কারণে শারিরিক অসুবিধার জন্য ডাক্তারের প্রয়োজন হয় এইসময়।
৬ মাসের শিশু, ব্রেস্ট ফিডিং, বাচ্চার নতুন সলিড,পোস্ট পার্টাম অবস্থা, ডেলিভারীর দখল, নির্ঘুম রাত সবসময় বাচ্চার টেনশন, দীর্ঘ সময় সন্তান কে ছেড়ে থাকা, কি পরিমাণ আজাবের ভিতর যায় একজন জব হোল্ডার মা কল্পনাও করতে পারবেননা। জাস্ট হেল মনে হয়।
তবুও বাধ্য হয়ে চাকরি করতে হয় অনেকের? সব শারিরীক, মানসিক স্ট্রেস সামলায়, ঘর সংসার সামলায় তারপর আবার সন্তানের ফিনানশিয়াল দায়িত্ব টা ও মা নিয়ে নেয়। যারা স্বেচ্ছায় চাকরি করে তাদের তাও মানসিক রিলিফ থাকে আর যারা বাধ্য হয়ে করে তারা চিন্তা করেন কত কষ্টে করে।
কিন্তু এই মায়েদের আপনারা সহানুভূতি না দেখিয়ে উলটা ব্লেম করেন।
আপনারা কি আপনাদের কর্মস্থলে কখনো যোগ্য নারী কর্মী দেখেন নি? যে তার দায়িত্ব সিনসিয়ারলি পালন করে?যোগ্য মহিলা শিক্ষক, মহিলা ডাক্তার, মহিলা ইঞ্জিয়ার, মহিলা লেখক, মহিলা কর্পোরেট, মহিলা স্পোর্টম্যান দেখেন নি?মহিলা এভারেস্ট বিজয়ী দেখেন নি? পুরুষ কলিগ কে ছাড়িয়ে কোন পুরষ্কার প্রাপ্ত মহিলা পেশাজীবী কে দেখেন নি?
তাহলে তারা যদি যোগ্য হয় এবং তাদের ইচ্ছে থাকে কেন তারা কাজ করবে না? তারা যদি কাজ গুলো না করত তাহলে এই কৃতিত্ব গুলো বা তাদের দ্বারা আমরা যে বেনিফিট পেয়েছি সেগুলো থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম না? সন্তান জন্ম দান নারীর দূর্বলতা নয়। নারী যে আরো ক্ষমতাশালী তার প্রমাণ। তাহলে সে মা বলে আপনারা তাদের থেকে সব অধিকার ছিনিয়ে নিবেন কেন?
তাই সমস্যা সমাধানের জন্য আলতু ফালতু কারণ না দেখিয়ে,মায়েদের দোষ না দিয়ে সমস্যার গোড়া সমাধান করেন। চাকরি যেহেতু করতেই হবে মায়েদের প্রতিটি অফিসে ডে কেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক করার দাবী তুলুন, ম্যাটার্নিটি লিভ বাড়ানোর দাবী তুলুন।
নয়তো প্রত্যেক টা শিশুর ফিনানশিয়ালি নিরাপত্তা দেয়ার নিশ্চয়তা সরকার কে দিতে বলুন। প্রতিটা মেয়ের সম্মান, নিরাপত্তা সব কিছু সরকারকে দিতে বলুন।
মায়েদের দিকে আঙুল তোলা সহজ বলেই আঙুল তাদের দিকে তাক করে দিবেন না।
Smile with Noor