16/01/2022
একটা সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সন্তান দ্বারা বৃদ্ধ পিতা-মাতার অবহেলা, অবজ্ঞার ঘটনা পড়লে বেশ খারাপ লাগতো, বাংলাদেশের বাইরের পৃথিবী দেখার পর ধিরে ধিরে বুঝতে পারলাম কেন এ জাতীয় ঘটনা আমাদের উপ-মহাদেশেই বেশী ঘটে।
আমাদের পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের কাছে আকাশ চুম্বি প্রত্যাশা করেন, বিনিময়ে আদরের সন্তানদের সকল দাবী তারা যথাযথ ভাবে পূরন করেন প্রয়োজনে নিজ সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও।
দুধে-ভাতে সন্তানকে লালন-পালন করতে করতে তারা এমন একটা কমফোর্ট জোন তৈরী করে দেন যে সন্তানরা পুরোপুরিভাবেই তাদের পিতামাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরে, তা সে ১৭ বছর বয়সী সন্তানই হোক বা ৩৭ বছর বয়সী। এ সন্তানদের কখনোই কোন কষ্ট বা আর্থিক সমস্যা বুঝতে দেয়া হয় না, আর তারা এই ধারনা নিয়েই বেড়ে উঠে যে আব্বু-আম্মুর তো আছেই! কিন্তু আব্বু-আম্মু যে তাদের বড় করতে গিয়ে নিজের সহায় সম্বলও উজার করে দিয়েছেন সেটা কখনোই তাদের জানা হয় না।
আর পরবর্তীতে এ সন্তান যখন স্বাবলম্বী হয় তখন সে তার নিজ জীবনে ধ্যান দেয়, নিজ জীবনের উন্নতি, তার নিজ পরিবার গড়ে তোলে, আর ওই বাবা-মা’র সাথে দূরত্বটাও তৈরী হয়ে যায়। আমাদের বাবা-মা’রা আবার বেশ লাজুক হন, তারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ ফুটে কিছু বলেন না, পাছে সন্তানটি কষ্ট যেন না পায় অথবা ভুল যেন না বোঝে।
এ পর্যন্ত পড়ে আপনার নিশ্চই বলতে ইচ্ছে করছে, আরে এটাই তো আমাদের “কালচার” এভাবেই তো হয়ে এসেছে যুগের পর যুগ, আপনি কোথাকার কোন ছার, এসব কি লিখছেন?
পৃথিবী যতটা দেখেছি, তাতে এটা অন্তত আমি বুঝতে পেরেছি যে এটা একটা অতি জঘন্য আয়োজন, আর কিছুতেই এটা কোন সভ্য সমাজের কালচার হতে পারেনা!
কেন?
আমাদের উচ্চবিত্ত- মধ্যবিত্ত- নিম্নবিত্ত পরিবারের কৈশোর পেরুনো বাচ্চারা তাদের পরিবারের সর্বোচ্চ সুযোগ গুলো পেয়েই বড় হয়, তাদের পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকলেও কখনোই সন্তানদের ছোটখোটো পেইড কাজ করতে উৎসাহিত করে না, সেটা আপনার আয় যাই হোক না কেন!
১৮ পার হবার পরেও সন্তানের শিক্ষার সকল খরচ ওই বাবা-মাকেই বহন করতে হয়, এবং সেক্ষেত্রেও সন্তানের পছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তাদের ভর্তি করতে হয়, তা যত খরচই লাগুক না কেন, প্রয়োজনে ব্যাংক লোন-ধারদেনা করে হলেও বেশীরভাগ পরিবারই তাই করেন। এখানে দোষেরও কিছু নেই, সন্তান সেরা শিক্ষাটি পাবে সেটা সব বাবা-মা’ই চান।
কিন্তু অর্থের যে বিষয়টি জড়িত তা নিয়ে কি কখনো খোলাখুলিভাবে সন্তানের সাথে আলাপ করেন? তাকে কি কখনো বলা হয় এই অর্থ একটা নির্দিষ্ট সময়ে পর তাকে ফেরত দিতে হবে? কলেজ পর্যন্ত আপনি অবশ্যই সন্তানের শিক্ষার ও জীবনযাপনের সকল খরচ বহন করতে পারেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের দ্রুত স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ করা উচিত প্রত্যেক অভিভাবকের।
আপনি যত ধনীই হোন না কেন, বা যত বিশাল চাকুরী বা গন্যমান্য ব্যক্তিই হোন না কেন, সন্তানদের এটা বোঝান যে কোন কাজই ছোট না, সে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে তাতেই তো আপনাদের খুশী হওয়ার কথা, অসৎ কিছু তো আর করছেনা।
সন্তানের সাথে আপনার আর্থিক সম্পর্ক ও পিতামাতার সম্পর্ক দুটোই ভিন্ন ব্যাপার, তাদের বিয়ের খরচ, বিলাসিতার খরচ এসব মেটানো আপনার তো দ্বায়িত্ব না। অবশ্যই কিছুটা সাহায্য হয়তো করতে পারেন, কিন্তু সন্তানের বিয়েতে নিজ জীবনের সঞ্চয়ে কেন হাত দেবেন? সেটা তো আপনার শেষ জীবনের অবলম্বন।
আবার দেখুন স্বাবলম্বী, প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি মানুষের নিজস্ব একটি স্পেইস আছে, আপনার সন্তানদেরও তা আছে, সেই স্পেইসে কখনোই অভিভাবকদের অনুপ্রবেশ করা উচিত নয়। আপনার সন্তান আপনারই একটি অংশ, কিন্তু সম্পত্তি নয়।
সন্মানের করিডোরটা দ্বৈতমুখী, সন্তানরা যখন অনুভব করবে তাদের নিজস্ব মতামতকে পিতা-মাতা সন্মান করছেন তখন তাদের কাছে আপনার অবস্থান আরো উর্ধে হবে।
Collected