30/06/2020
বস্তা পরিধান করার ইতিহাস। ১
আমার ছোটবেলায় আমার বাবা ছিল আমাদের প্রধান বন্ধু ।আবার শিক্ষক ও বলতে পারেন।
উনার ছোট বেলার গল্পই ছিল আমাদের জন্য দুষ্টামি করার প্রধান পাথেও ।সত্যি কথা বলতে আমার বাবার ছোটবেলার জীবনটাই ছিল আমাদের কাছে প্রাথমিক অধ্যয়নের মূল বিষয়।
আমার বাবার ছোট বেলার খেলার সাথীরা ছিলেন নূরু,নয়ন,প্রমীলা ইত্যাদি।
তাদের সাথে খেলা করা,ইস্কুল জিবনে দুষ্টামি এবং পরবর্তীতে বন্ধুত্ব, প্রেম সব কিছুই আমরা জীবনের প্রতি স্তরে ধাপে ধাপে শিখতে পেরে ছিলাম বাবার কাছ থেকে।
আমার বাবা তৎকালীন সময়ে দুটা হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। একটির নাম ছিল ফুলবানে অঙ্গারে ওপর মুভিটির নাম আমি ভুলে গিয়েছি।
আমার জেঠির ক্লাসমেট ছিল সুচিত্রা সেন, পরবর্তীতে ওনার হাত ধরে চলচ্চিত্রে যাওয়া। বেশিদিন টিকতে পারেনি আমার দাদির করা নিষেধ ছিল তাই।
কিন্তু আমার বাবা কে দেখে কেউ বিন্দু মাত্র বুঝে উঠতে পারবে না বাবা যে অনেক বেশি ধর্ম ভীরু ছিলেন।
আমার বাবা ছিল আমাদের কাছে অনেক বেশী আনন্দদায়ক এবং প্রিয় বন্ধু। আমরা দুটি ভাই, এক বছরের ছোট বড়।আমি বড়। আমার বাবা বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতার দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, এদের মাঝে কোন এক জায়গায়, এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।
আমার দাদার পূর্বপুরুষদের বাড়ি রাজশাহী, কিন্তু আমার দাদা চাকরির সুবাদে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমার বাবারা চার ভাই ছিলেন। কিন্তু উনার খেলার সহপাঠী ছিলেন উনার ইমিডিয়েট ছোট কাফি কাকা। তাই উনার যাবতীয় গল্প খেলাধুলা সবকিছুই সেই ছোট কাকাকে নিয়ে ছিল। তাছাড়া এদিকে আমরা ও দুইভাই ছিলাম। তাই বাবার যে কোন গল্প আমাদের কাছে খুব আনন্দদায়ক মনে হতো। কারণ বাবা ও চাচার খেলাধুলার বিষয়গুলো আমরা আমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে মিলিয়ে সবকিছু অনুধাবন করার চেষ্টা করতাম।
যেমন বাবার গল্পের মধ্যে অনেকগুলো চরিত্র ছিল। সেই চরিত্রগুলো একেক ঋতুতে একেক রকম।
অবশ্য দুইটা চরিত্র ছিল তাদের নাম জগা এবং মগা।
তারা পার্মানেন্ট, সব ঋতুতেই ওদের অবস্থান ছিল।
পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিলাম জগা, মগা চরিত্রটি আসলে আমাদের দুই ভাইকে নিয়েই তৈরি করা।
কিন্তু এছাড়া ছিল জিমনারী, তুথিলু মিথিলু, হুদা, পবন, ফেউ ,হুতুম পেঁচা ইত্যাদি।
আমাদের বাবা কিছু মজার মজার খেলনা বানানো শিখেছিলেন আমাদের।
যার কারণে আমরা বরাবরই বাবার অনেক ভক্ত ছিলাম।
বাবা জুটমিল থেকে ফিরলেই পিছু পিছু ঘুরে বেড়াতাম কখন নতুন কিছু শেখা যায় সেই আশায়।
বাবার গল্প বলার চরিত্রগুলো ছিল আমাদের জীবনের পাথেয় বলতে পারেন, বড় বড় এক একটি দর্শন।
বাবার জুট মিল প্রায় বন্ধ থাকার কারণে আমাদের অনেক চাহিদায়ই পূরণ করতে পারতেন না। কিন্তু মজার বিষয় হল আমরা এ নিয়ে খুব বেশি আক্ষেপ করতাম না।
কারণ জগা মগাদের ওই চাহিদাগুলো পূরণ হতো না।
একবার আমার বাবার আমাদের সাইকেল কিনে দেওয়ার কথা ছিল। বাবা বলেছিলেন ঈদে এবার বোনাস পেলে আমাদের দুই ভাইকে একটি সাইকেল কিনে দিবেন। কিন্তু বাবার জুট মিল বন্ধ থাকায় সাইকেলটি উনি আমাদের আর কিনে দিতে পারেননি।বাবা যখন পাটকল থেকে ফিরে আসলেন খালি হাতে, ব্যাপারটি যখন বুঝতে পারলাম এবারও সাইকেলটি পাবনা, তখন আমাদের দুই ভাইয়ের মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরল। কারণ কত জল্পনা কল্পনা ছিল সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু রাতের খাবারের পর যখন বাবা জানালেন আমাদের কে, জগা এবং মগাও এবার ঈদে সাইকেল কিনতে পারছে না এবং তারা শুধু চকমকে লাল টুপি পড়ে ঈদ কাটাবেন তখন আমাদের মনেও সেই সাইকেলের কষ্টটা আর থাকলো না।পরের দিন আমাদের জন্যও বাবা দুইটি টুপি নিয়ে আসলেন সোনালি রঙের জরির কাপড় দিয়ে তৈরি করা। একটি লাল রঙের অপরটি নীল রঙের।
আমি লাল রঙের টুপি আর আমার ছোটভাই নীল রঙের টুপি নিয়ে আমরা মহাআনন্দে সেবারের ঈদ কাটিয়ে দিলাম। সাইকেলের কথা আমাদেরকে বিন্দুমাত্র কষ্ট দিতে পারল না।
বাবা আর কাফি কাকা ছোটবেলায় ফড়িং নিয়ে খেলতেন আমরাও খেলতাম। উনারা স্কুল পালিয়ে নদীর ধারে খেলাধুলা করতেন, আমরাও তাই করতাম। গাছ থেকে ফল চুরি করা, পাখি পালা, খরগোশ পালা, কুকুর বিড়াল পোষা, আমরাও তাই করতে চাইতাম। কখনো তার গল্প থেকে জানতে পেরেছিলাম উনারা মসজিদের খেদমত করতেন, মুরুব্বীদের সাথে ভালো আচরণ করতেন। আমরাও তাই করা শুরু করলাম। আমার মনেআছে শৈশবে একবার বাবা বলেছিলেন ১০১ টি সালাম দিলে নাকি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা যাবে। তাই সারাদিন ঘুরে মুরুব্বী খুঁজে ১০১ টি সালাম দিয়েছিলাম। আমার বাবা গান শিখেছিলেন,অভিনয় করতেন, ছবি আঁকতেন পরবর্তীতে আমরাও তাই শিখেছিলাম। আমরা জেনেছিলাম আমার বাবা খুব বইপড়তেন পরবর্তীতে আমরাও বই পড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠলাম। বাবার প্রেমিকার নাম ছিল প্রমিলা দেবী, পরবর্তীতে আমরাও বাবার কাছ থেকে শিখে ছিলাম প্রেমের মহত্ব কোথায়।
২০০৭,২০০৮ সালের কথা ,আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি পাটের পোশাকের প্রদর্শনী ও ফ্যাশন শো করে ফেলেছিলাম।
আমার এক শিল্পী বড় ভাই ছিলেন, ছবি আঁকতেন, উনাকে বড় মাপের দার্শনিক ও বলতে পারেন। উনার নাম ছিল আরিফ রব্বানী। উনাকে আমি গুরু বলে ডাকি।উনি প্রায়ই আমাকে বলতেন তুমি যে পাটের পোশাক নিয়ে কাজ করছ, তোমাকে কোনো এক সময়ে ছালার বস্তা পড়ে ঘুরে বেড়াতে হবে।
তুমি নিজেও পড়বা মানুষকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করবা।
বিষয়টা আমার কাছে খুব অবাক লাগলো এবং হাস্যকর মনে হয়েছিল।
আমি অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনো ভাবে ব্যাপার টা মেনেনিতে পারছিলাম না।
আমি মনে মনে প্রায়ই হাসতাম আর আরিফ ভাইকে উম্মাদ বলতাম।
একবার খুব ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমি কখনো ভাবতেও পারিনি আমার জীবনে এরকম একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যাবে।
আমার বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিক ওদিক অনেক খুঁজে ফিরছি তারপরেও বাবাকে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সকাল বিকাল রাত দিন আমি আমার ভাই মিলে খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না।
বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে কখনো কখনো মনে হচ্ছিল আমি নিজেকেও হারিয়ে ফেলছি। ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।
এরকম অভিজ্ঞতার কথা বাবা কোনদিন বলে যায়নি।
সেজন্য ব্যাপারটি আরো বেশি ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল।
কখনো শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের গণজোয়ারের মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, আবার কখনো আজিমপুরের গোরস্থানের ভিখারিদের মাঝে। কখনো সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল আবার কখনো কমলাপুর রেলস্টেশনে। কখনো গোলাপ শাহ মাজার, আবার কখনো মিরপুর মাজার শরীফ, কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
খুঁজতে খুঁজতে যখন আমি ক্লান্ত পায়ের জুতো ছিঁড়ে গিয়েছিল। পকেটে ১০ টাকা, হয় আমাকে আমার জুতো সেলাই করে বাবাকে খুঁজতে হবে, না হয় আমাকে দশ টাকা দিয়ে কিছু কিনে খেতে হবে।
আমার খুব ভালো মনে আছে আমি সেই ১০ টাকা দিয়ে পায়ের জুতো সেলাই করে ছিলাম।
একবার রাতে স্টেডিয়াম মার্কেটের বারান্দায় বেশ কিছু মানুষকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সেখানে আমার বাবাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। কনকনে শীতের রাতে কিছু মানুষ মুখ ঢেকে শুয়ে ছিল। বেশিরভাগ মানুষই ছালার বস্তা গায়ে দিয়ে শুয়েছিল।
আমিও বাবাকে খোঁজ করতে গিয়ে তাদের মুখের ছালা বস্তা সরিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে আমার মুখের দিকে থুথু ছুরে মারলো মানুষটি।
এভাবে প্রায় কখনো কোন পাগল আমার দিকে তেড়ে এসেছে, কখনো ঢিল ছুড়ে মেরেছে কখনো কখনো থুথু দিয়েছে আমার দিকে।
তবুও আমার বাবাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
হতাশ হয়ে কখনো রমনাপার্ক কখনো সরোয়ারদী উদ্যান ঘুরে বেরিয়েছি অনেকদিন। বাবার বয়সী দেখলেই চলন্ত বাস কে থামিয়ে নেমে যেতাম, পিছু নিতাম কিন্তু সামনে গিয়ে দেখতাম অন্য কেউ।
কেউ কেউ বলেছে এরকম মানুষ দুয়েক ঘণ্টা আগে দেখেছিলেন, আবার অনেকেই বলেছেন দু'একদিন আগে দেখেছিলেন। যেখানে দেখা গিয়েছে, ওরা বলেছে, সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়েছিলাম। তবুও খুঁজে পাইনি শেষ পর্যন্ত।
মনে মনে শুধুএকটা কথাই ভাবতাম, বাবা যদি এরকম কোন গল্প আমাদের আগেই বানিয়ে বানিয়ে বলতেন তাহলে হয়তো একটা সুরাহা পেতাম।
একবার শবে বরাতের রাতে আজিমপুরে কনকনে শীতের মাঝে বাবাকে খুঁজতে গিয়েছি হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম এদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই সর্বস্বান্ত হয়ে ছালার বস্তা দিয়ে নিজেকে কনকনে শীত থেকে মুক্ত করছে। বেশিরভাগ মানুষই আমার বাবার বয়সী।
খুব আরাম করে তারা ছালার বস্তা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে রাস্তার উপর। বরং ছালার বস্তা টি তাদের কাছে আশীর্বাদ এর মত।
আমি অনেক খুজেছি আমার বাবাকে...... একটা ছালার বস্তা দিয়ে যদি তাকে আবৃত করে দিতে পারতাম।
এভাবেই আমার বাবা একজন পাটকল শ্রমিকের দীর্ঘ ৪০ (চল্লিশ) বছর সততার সাথে চাকরি করার পরও যখন উনি উনার পাওনা টাকা আদায় করতে পারেনি, স্মৃতি শক্তি হারিয়ে উনি কোথায় যেন স্বয়ং নিজেই নিজকে হারিয়ে ফেলেন ।
ছালার বস্তা দিয়ে শীত নিবারনের জন্য উনাকে আর আবৃত করতে পারিনি।
বাবাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
মানুষ যখন সব হরিয়ে ফেলে তখন মানুষ বস্তার ভেতর আশ্রয় নেয়। বাবাকে খুঁজতে গিয়ে আমিও তাই শিখেছি।
বাবা, আমার বাবা হারিয়ে গিয়েও শিখিয়ে গেলেন।
পাটের বস্তা পরার পর
আমার আর হারানোর ভয় নেই।
এবার শুধুই অর্জন .........
বস্তা পরিধানের দীর্ঘ ছয় বছর......
কখনো আমাকে নিয়ে মানুষ উপহাস করেছেন,
আবার কখনো কখনো ধন্যবাদ জানিয়েছেন, এরকম একটি পোশাক পড়ে মানুষকে পথ দেখানোর জন্য।
কখনো ইয়ার্কি করেছেন। আবার কখনো প্রশংসা করেছেন। কোন কোন রিকশা আলা আমার কাছ থেকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে ভাড়া নিতে চাননি । কোন কোন চা বিক্রেতা মামা আমাকে বিনামূল্যে এক কাপ চা খাওয়ানোর জন্য অনেক আকুতি করেছেন।
কেউ কেউ ভেবেছেন ব্রাইড একটি ছেলে পাগল হয়ে যাচ্ছে। কোন কোন হুজুর আমাকে দেখে বলেছেন আমাকে দেখে নাকি তাদের কাছে আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ)কথা মনে পড়ছে। আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) নাকি উনার সকল ধন-সম্পদ সবকিছু গরীবদের মাঝে বিতরণ করে ছালার বস্তা পরে জীবন যাপন করতেন। একবার এক ইন্ডিয়ান মন্ত্রী আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন আমাকে দেখে নাকি উনার মহাত্মা গান্ধীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
একবার মাননীয় এমপি মহাদয় সাবের হোসেন স্যার নিজের সন্তানকে উদ্দেশ্যে বলেছিলেন আমি নাকি অনুকরণীয়।
বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় শেখ রেহানা আপা একবার আমার পাটের পোশাক পরিধান অবস্থায় আমার সাথে একটি ছবি তুলতে চেয়েছিলেন।
আবার কেউ কেউ বলছে আমি নাকি জুট রকস্টার। একবার এক ভিক্ষুক আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসে খুব লজ্জা পেয়ে চলে যায়, যাওয়ার সময় বলে এই ব্যাটা তো আমার চেয়েও গরীব, বস্তা পইরা ঘুরে।
একবার এক রাস্তার পাগল আমাকে দেখে অনেক হেসেছিলেন।
সেদিন আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি সফল হতে পেরেছি।
আমি পাগলামিতে পাগল কেও হার মানিয়ে দিয়েছি, আমার দেশের অর্থনৈতিক স্থায়ী উন্নতির জন্য।
আমি জানি আমার এ পোশাক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করে তুলবে।
তাই আপনাদের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
Please see to link
https://www.thedailystar.net/lifestyle/event/news/green-revolution-1878514
https://www.thedailystar.net/lifestyle/shop-special/revolution-the-making-jute-story-1286416?amp
Revolution in the making: A jute story