06/10/2025
রাত প্রায় তিনটা হবে, ইমারজেন্সী থেকে ফোনে জানানো হলো,খারাপ রুগী এসেছে। কিছুক্ষনের ভেতর প্রচন্ড শ্বাসকস্ট আর বুকে চাপ ব্যাথা নিয়ে রুগী সিসিউ তে বেড নাম্বার তিন এ ভর্তি হলো।
সাথে থাকা দুই ছেলে আর স্ত্রীর কাছ থেকে যাবতীয় তথ্যাদি জানার পর এবং প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা করে ডায়াগনোসিস হলো, ম্যাসিভ হার্ট এট্যাক সাথে হার্ট ফেইলিউর।
ভোরের দিকে রুগীর হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়, যাকে আমরা কার্ডিয়াক এরেস্ট বলি, এবং তার স্ত্রী ও ছেলেদের অনুমতি নিয়ে আমরা তাকে লাইফ সাপোর্ট এ দিয়ে দেই।
রুগীটি প্রায় চার দিন লাইফ সাপোর্ট এ ছিলো, এবং এই কয়দিন আমি ছেলে দুটোকে অল্প বিস্তর আসা যাওয়া করতে দেখলেও স্ত্রী টিকে কখনই এক বারের জন্য ও অনুপস্থিত হতে দেখিনি। তিনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতেন সিসিউ এর গেটের বাইরে, আর ভিজিটিং আওয়ার হলে সবার আগে এসে স্বামীর বেড এর কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো দেখতাম হাতে দোয়ার বই নিয়ে বিড় বিড় করে দোয়া পড়ছেন, কখনোবা হাতে তজবী।
চার দিন পর রূগীকে লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করে আনা গেলো। আর সেদিন ই ঘটলো ঘটনা টি।
রূগীর স্ত্রী এবার সিসিউ তে ভর্তি হলেন হার্ট ফেইলিওর নিয়ে। ছেলে দুটো আমাদের জানালো যে তার বাবার এর আগে কোনো কার্ডিয়াক সমস্যা ছিলো না, এবার ই প্রথম। তবে মায়ের কার্ডিয়াক সমস্যা আছে,আর এই কয়দিনের অনিয়মে তার আজ এই অবস্থা।
আমরা স্ত্রী রুগীটিকে পাঁচ নাম্বার বেডে দিলাম।
স্বামী এবং স্ত্রী, দুজনের মাঝখানে ছিলো চার নাম্বার বেড টি। তিন নাম্বার বেডে শুয়ে থাকা পুরুষ রুগীটি কিন্ত তখনো জানতেন না যে পাশের এক বেড পরেই তার প্রিয়তমা স্ত্রী আছেন। কারণ ছেলেদের বারণ ছিলো যেনো আমরা তাদের বাবা কে মায়ের অসুস্থতার কথা না জানাই।
এভাবে প্রায় দুই দিন, চিকিৎসা পাওয়া অবস্থাতেই স্ত্রী রুগীটির কিডনি এবং ব্রেইন এ ও সমস্যা দেখা দেয়, যার কারনে তার সিভিয়ার রেস্টলেসনেস শুরু হয়, এবংপ্রায় সারাদিন ই সে চিৎকার করত।এর তার নাম ধরে ডাকাডাকি করতে থাকত।
এদিকে বেড তিন থেকে পুরুষ রুগীটি তখন বার বার শুধু জানতে চাইত যে পাশের বেডে কে চিৎকার করছে! তার ছেলেরা সিস্টার এবং আমরা তখন তাকে এটা সেটা বলে কথা ভুলাবার চেস্টায় থাকতাম কারন তার নিজের অবস্থাও তখন ততটা ভালো ছিলো না।
এর দুই তিন দিন পর স্ত্রী রুগীটি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠে, এবং আমাদের কাছে তার স্বামীর কথা জানতে চায়। তার অনুরোধে চার নাম্বার বেডের পর্দা অল্প সরিয়ে তাকে তার স্বামীকে একটু দেখতে দেয়া হয়।
এই ঘটনার আমাদের কাছে অভিনব ছিলো এবং আমরা তাদের ছেলেদের কাছে জানতে পারি তাদের বাবা মায়ের অসম্ভব ভালোবাসার কথা।
এই দুই রুগী আমাদের কাছে চিহ্নিত হয়ে যায় লাভ বার্ড হিসেবে। স্ত্রী রুগীটি জানত যে তার স্বামী পাশে আছে, আর পুরুষ রুগীটি বার বার ছেলেদের কাছে জানতে চাইত তাদের মা আসছে না কেনো!!
মাঝখানে নাইট ডিউটি পরায় আমার দুইদিন অফ পরে যায়। পরের দিন সিসিউ তে এসে ফলো আপ দিতে দিতে আমি পাঁচ নাম্বার বেডের কাছে গিয়ে দেখলাম বেড ফাঁকা। আমি খুশি হলাম ভেবে, হয়ত পেশেন্ট ওয়ার্ডে শিফট হয়ে গেছে। হটাৎ আমার চোখ হ্যান্ডওভার খাতার বেড পাঁচের ঘরে আটকে যায়, সেখানে লিখা নামটি এক টানে কেটে পাশে বড় বড় অক্ষরে লিখা.....
EXPIRED at 3:30 AM.....
ধাক্কা খেলাম একটা, মন অসম্ভব খারাপ হয়ে হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে বেড তিনের কাছে গেলাম, দেখলাম বড় ছেলেটি বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর তাকে কবে বাসায় নিয়ে যাবে তা সান্ত্বনার সুরে বলছে। হতভাগ্য লোকটি তখনো জানে না যে করুন একটা মর্মস্পর্শী গল্প গাঁথা হয়ে গেছে তার আড়ালে।
কেও অপেক্ষা করে নেই আর সিসিউর বাইরে হাতে দোয়ার বই নিয়ে।
বাস্তবতা গল্প কে হারিয়ে দিতে পারে, এই অভিজ্ঞতা তার করুন প্রমান নিয়ে আমার মনে গেঁথে আছে আজো
কস্টের স্মৃতি হয়ে....।
ডা: মিম
collected..