09/07/2026
পড়াশোনার সুবাদে আমি সৌদি আরবের রিয়াদে কিছু সময় কাটিয়েছি। সেখানে আমার পরিচয় হয় আমিনার সাথে। আমিনা একজন সম্ভ্রান্ত আরব পরিবারের নারী। আরবের নারীদের সম্পর্কে আমাদের অনেকের মনেই ভুল ধারণা থাকে যে তারা খুব রক্ষণশীল বা পিছিয়ে পড়া। কিন্তু আমিনার সংস্পর্শে এসে আমার সেই ধারণা আমূল বদলে যায়।
আমিনার বাড়িতে প্রথমবার যখন আমি আমন্ত্রিত হয়ে গেলাম, তখন তাদের ‘মজলিস’-এ বসার পর আমি অবাক হয়েছিলাম। তাদের আতিথেয়তা যেন এক শিল্প। আমিনা নিজেই কফি (গাহওয়া) আর দামী খেজুর নিয়ে এসে আপ্যায়ন করছিল। তার চালচলনে এক অদ্ভুত আভিজাত্য ছিল, কিন্তু তাতে কোনো অহংকার ছিল না।
সেদিন এক চমৎকার বিকেলের কথা। আমি আমিনার বাসাতেই ছিলাম। হঠাৎ একটা ফোনকল আসলো। ফোনের ওপাশ থেকে খুব ভারী কণ্ঠে কিছু একটা ভেসে আসলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম তাদের একটি বড় শিপমেন্ট লোহিত সাগরে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ডুবে গেছে। কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এমন খবর শুনলে যে কেউ কান্নাকাটি শুরু করবে বা অস্থির হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমিনার প্রতিক্রিয়া ছিল একদম ভিন্ন। সে কেবল একবার শান্ত স্বরে বলল—
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন। আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা তাঁরই। তিনি নিয়েছেন, এটাও তাঁর ইচ্ছা।”
তার মুখে ভয়ের কোনো রেখা নেই, নেই কোনো হাহাকার। সে সোজা অযু করে এসে জায়নামাজে দাঁড়াল। যখন সে নামাজ শেষ করে ফিরল, তার মুখে এক জান্নাতী প্রশান্তি। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “ চলো চা খাই। রিজিকের মালিক আল্লাহ, তিনি এক দরজা বন্ধ করলে হাজার দরজা খুলে দেন। আসমান - জমিনের সমস্ত রাজত্বই তো তার, তিনি আল-মালিক”
আমি আমিনার এই অটল বিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
আরবের নারীদের মধ্যে এই الرضا بالقضاء বা আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার গুণটি অত্যন্ত প্রবল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা ছোট বিপদেও অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলি, কিন্তু আমিনা আমাকে শেখাল প্রতিকূল অবস্থায় কীভাবে মাথা উঁচু করে থাকতে হয়।
কিছুদিন পর আমিনার এক আত্মীয়ের মৃত্যু হলো। আমি ভেবেছিলাম আরবের নারীরাও হয়তো বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম এক নীরব গম্ভীর পরিবেশ। তারা একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দিচ্ছে এবং কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করছে। তাদের বিলাপ নেই, কিন্তু চোখের কোণে পানি আছে। তাদের এই ধৈর্য আমাকে শেখাল যে, ঈমানের গভীরতা কেবল পোশাকে নয়, বরং বিপদে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মাঝেও।
আমিনা তার সন্তানদেরও ঠিক একইভাবে গড়ে তুলছে। তার সাত বছরের ছেলে ফয়সাল যখন পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়, তখন তার মা তাকে কোলে তুলে বলে না— ‘আহা রে, ব্যথা পেলে?’ বরং সে বলে— “ইয়া ফয়সাল, ইস্তাইন বিল্লাহ (আল্লাহর সাহায্য চাও), তুমি তো একজন মুমিন।”
আরব নারীদের আরেকটি বড় গুণ হলো তাদের হায়া বা লজ্জা। আমিনা যখন বাইরে বের হতো, তার আবায়া আর নেকাবের আড়ালে সে নিজেকে এমনভাবে আবৃত করত যে তার ব্যক্তিত্ব আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেত।
সে বলত,
“আমার এই হিজাব আমার বন্দিত্ব নয়, বরং এটি আমার স্বাধীনতার প্রতীক। এটি আমাকে অন্যদের কুনজর থেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং আমাকে কেবল আল্লাহর দাসী হিসেবে পরিচিত করে। আমার হিজাব আমার আইডেন্টিটি”
রিয়াদ ছাড়ার দিন আমিনা আমাকে একটি জায়নামাজ উপহার দিয়েছিল। সে বলেছিল, “মানুষ যেখানেই থাকুক, সে যদি তার রবের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখে, তবে পুরো পৃথিবী তার আপন হয়ে যায়।”
আজও যখন আমি কোনো ছোটখাটো সমস্যায় বিচলিত হই, তখন আমিনার সেই শান্ত মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
যদিও পাশ্চাত্য কালচার এখন আরবের জমিনে হুহু করে প্রবেশ করছে।
তারপরেও এখনো আরবের রুক্ষ মরুর বুকে জন্মানো এই কতিপয় নারীদের হদয়ে যে পরিমাণ কোমলতা এবং আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস থাকে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
তারা শিখিয়েছে, আসল আভিজাত্য দামী পোশাকে নয়, বরং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস আর ধৈর্যের মাঝে।
মরুর বুকে অমলিন বিশ্বাস: এক অবিশ্বাস্য তাওয়াক্কুলের গল্প🤍
Mastura Mukta