12/06/2026
দ্বীনদার হয়েও কেন অনেক দম্পতি সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেন না?
বর্তমান সময়ে এমন অনেক দম্পতিকে দেখা যায়, যারা বাহ্যিকভাবে দ্বীনদার, নামাজ-রোজায় যত্নশীল, ইসলামি জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী এবং দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট অগ্রসর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাদের অনেকের সংসারেই শান্তি নেই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব, মনোমালিন্য, তিক্ততা কিংবা বিচ্ছেদের মতো ঘটনাও ঘটছে।
আসলে দ্বীনদার হওয়ার অর্থ কেবল কিছু ইবাদত পালন করা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে বাস্তবায়ন করা। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ দ্বীনের কিছু অংশকে গ্রহণ করলেও পারিবারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা অবহেলা করে। ফলে বাহ্যিক দ্বীনদারিতা থাকা সত্ত্বেও সংসারে সুখ-শান্তি অনুপস্থিত থাকে।
বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এমন কিছু সাধারণ কারণ চোখে পড়ে—
১. স্ত্রী দ্বীনদার, কিন্তু স্বামীর বৈধ আনুগত্যকে দ্বীনের অংশ মনে করেন না
ইসলাম স্বামীকে পরিবারের দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু অনেক সময় স্ত্রী ইবাদতে যত্নশীল হলেও স্বামীর বৈধ নির্দেশনা মেনে চলাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। ফলে নেতৃত্ব ও আনুগত্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
২. স্বামী দ্বীনদার, কিন্তু স্ত্রীর উপার্জনকে নিজের প্রত্যাশায় পরিণত করেন
ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। কিন্তু কিছু স্বামী সরাসরি না বললেও আচরণে এমন ধারণা দেন যে স্ত্রীকেও অর্থনৈতিকভাবে সংসার টানতে হবে। এতে স্ত্রীর ওপর অযাচিত মানসিক চাপ তৈরি হয়।
৩. স্বামী দ্বীনদার, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনে উদাসীন
স্ত্রীর অধিকার, সন্তানের লালন-পালন, সংসারের প্রয়োজন পূরণ এবং মানসিক সহায়তা—এসব পুরুষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কেবল উপদেশ দিয়ে বা কর্তৃত্ব দেখিয়ে দায়িত্বশীল স্বামী হওয়া যায় না।
৪. স্ত্রী দ্বীনদার, কিন্তু জবান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ
অনেক স্ত্রী সংসারের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন, কিন্তু কথাবার্তায় এমন আঘাত করেন যা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কখনো কখনো একটি কটু বাক্য বহু ভালো কাজকেও ম্লান করে দেয়।
৫. স্বামী স্ত্রীর হক ও পিতামাতার হকের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারেন না
পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব যেমন ফরজ, তেমনি স্ত্রীর হকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক পক্ষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্য পক্ষকে জুলুমের শিকার বানানো ইসলাম সমর্থন করে না।
৬. স্ত্রী স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ
স্বল্পে তুষ্ট থাকা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কিন্তু অনেক সময় স্বামীর অসংখ্য ভালো কাজ উপেক্ষা করে কেবল ত্রুটিগুলোকেই বড় করে দেখা হয়।
৭. স্বামী পরিবারের ক্ষেত্রে কৃপণ, অন্য ক্ষেত্রে অপচয়কারী
স্ত্রীকে সবসময় স্বল্পে তুষ্ট থাকার কথা বলা হলেও নিজের শখ, বন্ধু বা ব্যক্তিগত খরচের ক্ষেত্রে উদারতা দেখানো হয়। এ ধরনের দ্বৈত আচরণ সম্পর্কের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
৮. স্ত্রী সফট ফেমিনিজমের প্রভাবে প্রভাবিত
সংসার, মাতৃত্ব ও পারিবারিক দায়িত্বকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতাকেই একমাত্র সফলতা হিসেবে উপস্থাপন করা অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্কে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এতে স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়ে।
৯. স্বামী "সমান অধিকারের" কথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চান
কিছু স্বামী নারীর অধিকার নিয়ে তর্ক তুললেও নারীর জন্য শরিয়াহ যে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা দিয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে দিতে অনীহা দেখান। এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
১০. স্ত্রী কথায় কথায় তালাক দাবি করেন
রাগের মাথায় বা আবেগের বশে বারবার তালাকের কথা বলা দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। এতে সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
১১. একটি সংসার সামলাতে না পেরেই মাসনা নিয়ে অবাস্তব ফ্যান্টাসি
কিছু পুরুষ বাস্তবে নিজের বর্তমান দায়িত্বই সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না, অথচ বারবার বহুবিবাহের প্রসঙ্গ তুলে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করেন। ফলে প্রয়োজনহীন বিতর্ক ও মনোমালিন্য বাড়ে।
১২. উভয়ের মধ্যে অহংকার ও আত্মসমালোচনার অভাব
অনেক দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না। প্রত্যেকে নিজেকে সঠিক এবং অপর পক্ষকে ভুল মনে করে। অথচ সফল দাম্পত্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো বিনয়।
১৩. পরস্পরের প্রতি হুসনে যন (সু-ধারণা) না রাখা
প্রতিটি কথা, কাজ বা সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পর্ককে ধ্বংস করে। একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে যথাসম্ভব ভালো ধারণা পোষণ করার চেষ্টা করে।
১৪. পারিবারিক সমস্যার সমাধানে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা
রাগ, অভিমান, নীরব যুদ্ধ, তৃতীয় পক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ কিংবা সামাজিক মাধ্যমের পরামর্শকে প্রাধান্য দিয়ে অনেকেই কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত পদ্ধতি থেকে দূরে সরে যান। ফলে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আরও জটিল হয়ে ওঠে।
১৫. ইবাদতে যত্নশীল হলেও আখলাকে দুর্বলতা থাকা
অনেক সময় মানুষ নামাজ, রোজা বা ইসলামি জ্ঞান অর্জনে যত্নশীল হয়, কিন্তু ধৈর্য, ক্ষমা, কোমলতা, সহনশীলতা ও উত্তম চরিত্র গঠনে সমান গুরুত্ব দেয় না। অথচ সংসার টিকে থাকে মূলত সুন্দর আখলাকের ওপর।
দাম্পত্য জীবন শুধু অধিকার আদায়ের নাম নয়; বরং দায়িত্ব পালন, ত্যাগ, সহমর্মিতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ধারণ করার নাম। তাই বাহ্যিক দ্বীনদারিতার পাশাপাশি পারিবারিক জীবনে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন না হলে দ্বন্দ্ব ও অশান্তি সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।