31/01/2026
বাউনিয়া আব্দুল জলিল স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। যেতে হবে বানরেরটেক। সেটা কোথায় আমি জানি না। জানে সেকান্দার। সে আমাকে বলেছে এখানে আসতে। খুব জরুরীভাবে আসতে বলেছে। আমি তখন ছিলাম উত্তরায়। সে ফোন দিয়ে বললো, ইমার্জেন্সি আসতে। এক মেয়ের সাথে দেখা করতে এসে নাকি কট খেয়ে গেছে৷ তাকে মেয়ের ফ্যামিলি আটকে রেখেছে। আমি বললাম, পুলিশে কল দে। না হয় আমি পুলিশ নিয়ে আসি। সে বললো, পুলিশ লাগবে না। এই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। মেয়ের গার্ডিয়ান কাজী আনতে গেছে। এখনই বিয়ে হবে। আমার পক্ষ থেকে গার্ডিয়ান লাগবে। এখন তুই আমার গার্ডিয়ান। সাক্ষি হইবি। তাড়াতাড়ি আয় বন্ধু। সাথে আরেকটা সাক্ষী নিয়ে আসিস"। আমি কই সাক্ষী পাব? লাইন কেটে দিল। আর কল দেয় নি। আমি অনেকক্ষণ ভেবে দেখলাম যাওয়া উচিত। বিপদেই পড়েছে। না গেলে খারাপ দেখায়।।।
বাউনিয়া আব্দুল মজিদ স্কুলের সামনে এসে তাকে কল দিচ্ছি। ধরে না। মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করে একটা রিক্সা নিয়ে এলাম বানরেরটেক। আসার পথে রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে বিয়ের সাক্ষী হবে কি না। সে প্রথমে রাজী হয় নি৷ ' কট'কেইস শুনে রাজী হয়েছে। তবে তাকে ২ হাজার টাকা দেয়া লাগবে। আমি বললাম, সমস্যা নাই! চলেন। টাকা দিলে বাঘের দুধ পাওয়া যায়। আর তুই তো ব্যাডা বিয়ের সাক্ষী।
বানরের টেক এসে কল দিলাম সেকান্দারকে। অনেকবার কল দেয়ার পর কল ধরে সে জানালো, বানরেরটেক নয়। এটা টাইগেরটেক বা বাইগার মাইগার টেক কিছু একটা। এসব জায়গার নাম আমি জীবনেও শুনি নি। ঢাকা শহরে এত জায়গা থাকে এমন জায়গায় কেন তোর কট খেতে হলো?! মেজাজ খুব খারাপ হতে লাগলো।
অবশেষে অনেক খুঁজে ফিরে সেকান্দরকে পেলাম৷ একটা তিনতলা নিন্মবিত্তের ধাচের নোংরা বিল্ডিং। দুই তলার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রইং রুমে সেকান্দার বসে আছে। ঘরে আরও ৪/৫ জন পুরুষ লোক। কাজীও চলে এসেছে। সেকান্দর হাসি মুখে দ্রুত কবুল বলে ফেললো। রিক্সাওয়ালা দুই তিনবার কলম যাতা টাতা দিয়ে সাইন করলো। সে ক্লাস ফৌর পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। নিজের নাম লিখত পারে। নাম আসলাম মিয়া। লিখছে আসলাম টিয়া। লিখে আবার কাটাকুটি করে দিয়ে ছ্যারাব্যারা। আমি বললাম হইসে, এতেই চলবে। টিয়া আর লাগবে না। একটা ময়লা টুপি কে যেন সেকান্দরকে জোগাড় করে দিয়েছে। সে কবুল বলে সামনের শোকেসের উপরে রাখা একটা ফুলের টবের দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে রইল।
একজন ৫০/৫২ বছরে লোক আমাকে ডেকে বললো, ভাই একটু এদিকে আসেন। পাশের রুমে নিয়ে গেল আমাকে। সেখানে আবার বারান্দা আছে। বারান্দায় গেলাম। লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি উনার কি হোন? আমি বললাম, বন্ধু। কেমন বন্ধু কাছের নাকি দুরের? আমি বললাম দুরের। " ও আচ্ছা। শুনেন আমি পাত্রীর খালু। ইটের ব্যাবসা করি। আমি বললাম, আচ্ছা। আপনার বন্ধু লোক ভালো না। আকাম করতে এসে ধরা খেয়েছে। গাড়ী টারি আছে দেখলাম। চেহারা ছবিও ভালো। তাই ধরে বিয়ে দিয়ে দিলাম। উনি খুব জোড়ে একটা টান দিলেন সিগারেটে। ধোয়ায় এক চোখ প্রায় বন্ধ অবস্থায় থেকে বললেন, "মেয়ে আমাদের খুবই ভালো। বাবা নেই। মা একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকুরী করে সংসার চালায়। অভাব অনটনে বড় হচ্ছিল। লেখাপড়াতেও ভালো না। ইন্টার দুইবার দিয়েও পাশ করতে পারলো না। একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু এই ছেলেও খারাপ না। তাই বিয়ে করিয়ে দিলাম। ভুল কিছু করলাম? আমি বললাম, না খুবই ভালো করেছেন। মেয়ের আরও বোন টোন থাকলে সেগুলোরেও বিয়ে দিয়ে দেন তার সাথে। সে ধনী ছেলে। একসাথে ৮/১০ টা বউ পালতে পারবে। লোকটা হেসে উঠলো। আপনি মজার আছেন। চলেন মেয়ে তুলে দিয়ে হাতের কাজ শেষ করে ফেলি।।
রাত ৯ টা বাজে। সেকান্দার গাড়ী নিয়ে এসেছিল। আমি সেকান্দারের পাশে বসে আছি। সেকান্দার ড্রাইভ করছে৷ পেছনে একটা পুরাতন বেনারশী পরা বউ। ফিসফিস করে কান্নাকাটি করছে। সেকান্দারকে আমি বললাম, এত জায়গায় থাকতে তুই এখানে কেন ম*রতে তে এসেছিলি? সেকান্দার বললো, দোস্ত ফেসবুকে পরিচয়। জীবনে এর আগে কখনো দেখা সাক্ষাতও হয় নি। পাশেই একটা কাজে এসেছিলাম। সে বললো দেখা করে যেতে। যেতেই কট। তার খালু এসে হাজির।
তবে ভালোই হয়েছে ব্যাডা। মেয়ে সুন্দরই আছে। লেখাপড়ায় খারাপ। এত লেখাপড়া দিয়ে আমি করব কি? আমি কি স্কুল দিসি যে মাস্টর লাগব! আমি করব সংসার। আলু পিয়াজের হিসাব জানলেই হবে। সেকান্দর উত্তেজিত। প্রচুর বক বক করছে।
একটা সিগারেট ধরিয়ে তার পাশের জানালা খুলে দিল। তবে বন্ধু, আমাকে এমনি বললেও রাজী হয়ে যেতাম। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। কত টাকা পয়সা বেঁচে গেল। দুনিয়ায় লোকজন জানিয়ে বিয়ে করলে ১৫/২০ লাখ চলে যেত৷ এখন বলতে গেলে ফ্রিতে বিয়ে হয়ে গেল।
মেয়েটা কান্নাজড়ানোর কন্ঠে পেছন থেকে বলছে, শুনেন! আপনি ভুল বুঝিয়েন না। আমি কিন্তু আসলেই কিছু জানতাম না। আমি কিছু প্ল্যান করে করি নাই। আমি কোন চক্র টক্র কিছু না। আমার খালু যে বাসায় চলে আসবে আমি বুঝি নাই। আপনি আমাকে মাফ করে দিয়েন। সেকান্দার বললো, কোন সমস্যা নাই। তোমাকে আমাকে ভালো লাগসে। পছন্দ হইসে। যা হবার ঠিক ই হইসে। আমি সেকান্দারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নেশাপানি তার মস্তিষ্কটা নষ্ট করে দিচ্ছে৷ সে হয়তো বুঝতে পারছে না।
সেকান্দার বউ নিয়ে বাসায় চলে গেল। আমাকে নামিয়ে দিল পথে মিরপুর ১২ তে। একটা রিক্সা নিলাম। সেকান্দার এর মধ্যে আবার কল দিলো। দোস্ত তোরে ধন্যবাদ। জীবনে এই প্রথম তুই আমার একটা উপকার করলি। আগামীকাল আমার বাসায় তোর দাওয়াত। তোর নতুন ভাবি দাওয়াত দিয়েছে।
আমি লাইন কেটে দিলাম। মানুষের জীবন কত বিচিত্র। সুখী হওয়া খুব সহজ বিষয় এখানে। শুধু সুখী হবার মানসিকতা থাকলেই হয়। যা পায় তা নিয়েই খুশি থাকলেই চলে। সেকান্দার কোন কিছু নিয়ে এত ভাবে না। হয়তো সে জন্যই সে সুখী।
বাসার কাছে এসেছি এমন সময় বিয়ের সাক্ষী রিক্সাওয়ালা আমাকে কল দিয়েছে। তার নাম্বার আমি রেখে দিয়েছি। সেও আমারটা রেখেছে। কল দিয়ে জানালো, তাকে যে এক হাজার টাকার দুইটা নোট দিয়েছি তার মধ্যে একটা ছেড়া। টেপ লাগানো। চেঞ্জ করে দিতে হবে। আমি একটা গালি দিলাম। কেন দিলাম জানি না। ফোন কেটে নাম্বার ব্লক করে দিলাম।