15/02/2026
মানুষের জীবনের থেকেও দামি লবঙ্গের গল্প
আজ থেকে ৪০০ বছর আগের কথা। তখন সমুদ্রপথে, বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ায়, পর্তুগালের দাপট একচেটিয়া ছিল। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও শ্রীলংকা থেকে অনেক মসলা ইউরোপে যেত, তাই সমুদ্রপথের গুরুত্ব অনেক বেশি।
পর্তুগালের একজন নাবিক মসলার দেশে যাওয়ার জন্য রাজা থেকে সাহায্য চাইলেন, কিন্তু রাজা পাত্তা দিলেন না। কারণ ইতিমধ্যে আফ্রিকার পথ ধরে পর্তুগিজরা সেখানে যাতায়াত করছিল।
ম্যাজিলান এরপর স্পেনের রাজার কাছে গেলেন। স্পেনের রাজা ও কিছু ধনী ব্যক্তি তাকে ৫টি জাহাজ, ২৭০ জন নাবিক ও প্রয়োজনীয় অর্থ দিলেন এই আশায় যে, ম্যাজিলান মসলা নিয়ে আসবে এবং তা বিক্রি করে তাদের খরচ উঠে আসবে।
ঝুঁকি অবশ্যই ছিল, কারণ জাহাজ ডুবে যেতে পারত, যুদ্ধ চলাকালীন সবাই মারা যেতে পারত ইত্যাদি। তবে এসব ঝুঁকি না নিলে নতুন দেশ আবিষ্কার হতো না, নতুন সম্পদও আসতো না।
১৫১৯ সালে স্পেন থেকে ম্যাজিলানের যাত্রা শুরু হলো। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার উপকূল অতিক্রম করে তারা ফিলিপাইন পৌঁছায়। সেখানে তিনি এক যুদ্ধে নিহত হন। এরপর তার লোকজন ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছে জাহাজ ভর্তি করে মসলা সংগ্রহ করল, মানে অনেক লবঙ্গ নিল।
এরপর তারা আফ্রিকার পথ ধরে ঘুরে স্পেনে পৌঁছালো। যুদ্ধ, নানা রোগ ও নিজেদের মধ্যে সংঘাতের কারণে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৮ জন নাবিক ফিরে এল স্পেনে, একটি জাহাজে করে, ১৫২২ সালে—মানে ৩ বছর পরে। ২৭০ জনের মধ্যে মাত্র ১৮ জন বেঁচে ছিল।
যাই হোক, স্পেনের রাজা এবং যেসব বড় ব্যক্তি এই অভিযানে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের ক্ষতি হয়নি। কারণ ঐ জাহাজে ছিল ২৬ টন (২৬,০০০ কেজি) লবঙ্গ। তা বিক্রি করে সব খরচ উঠে এসেছিল এবং লাভও হয়। ফিরে আসে নি, ম্যাজিলান সহ ২৫২ জন নাবিকের জীবন।
এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—ম্যাজিলানের সেই সঙ্গীরা বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমবার পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখেছে।
লবঙ্গ তখন ইউরোপে সবচেয়ে দামি মসলা। এক কেজি লবঙ্গের দাম একজন শ্রমিকের এক মাসের মজুরির সমান ছিল। তাছাড়া সব সময় সহজে কেনা যেত না, এবং এর চাষ সীমিত কিছু অঞ্চলে হতো। ইউরোপে লবঙ্গ রান্নার কাজে, ঔষধ তৈরিতে এবং সুগন্ধির জন্য ব্যবহৃত হতো, এবং এর চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া।
ম্যাজিলানের অনেক সঙ্গী তাকে পছন্দ করতো না। যারা শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিল, তারা কয়েকজন তার কৃতিত্ব কমানোর চেষ্টা করেছিল। তবে একজন নাবিক যাত্রার পূর্ণ বিবরণ লিখে গিয়েছিলেন, এবং এজন্য আমরা এই কাহিনী জানি।
ম্যাজিলানের মৃত্যুর পরে পর্তুগালের রাজা ও অন্যদের কাছে তিনি বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হলেন যেহেতু স্পেনের হয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়। আর স্পেনের রাজা এবং লোকজন তার ক্রেডিট পারলে ভ্যানিশ করে স্পেনিশদের ক্রেডিট দিতে অস্থির হল।
যাই হোক, ম্যাজিলান ইতিহাসে অমর হয়ে গেছেন। ৪০০ বছর পরেই তাকেই দুনিয়াতে সবাই চেনে বাকিদের না। তবে ম্যাজিলানের পরিবার সম্ভবত কোন টাকা বা ক্ষতিপূরণ পায় নি।
এরপর লবঙ্গ দিয়ে রান্না করলে বা কোন কিছু খেতে গেলে ম্যাজিলানের কথা মনে হবে আশা করি।
সংগ্রহিত