17/06/2026
আপনাদের সঙ্গে এক মহৎ ছেলের পরিচয় করিয়ে দেই আসুন। ১২ বছর বয়সী এই ছেলে ইতিমধ্যে তার মা বাবাকে গর্বিত করেছে। আজই দেখা মিলল এই সোনার টুকরা ছেলের, সংসদের সামনে এক বাসে। হাতে তার পানির বোতল। বিক্রি করে সে।
কী নাম বাবা?
মুয়াজ্জিন। আমার এই নাম খুব ভালো লাগে ভাইয়া।
এই প্রথম শুনলাম কেউ তার নিজের নামে সন্তুষ্ট।
মুয়াজ্জিনের বাড়ি নাসিরনগর, ব্রাম্মণবাড়িয়ায়। ক্লাস থ্রিতে সম্ভবত উঠেছিল। স্কুল তলিয়েছে পানিতে। তারপর সে ঢাকায় চলে এসেছে। বাবা মার কাছেই থাকে। মুয়াজ্জিনের পেশা পানি বিক্রি নয়। সে মূলত পড়াশোনার অবসরে পানি বেচার মুনাফা তুলে দেয় বাবা মার হাতে।
তা মুয়াজ্জিন টাকা তুমি রাখো না কেন? বলল, আমি টাকা রাখিতো। প্রতিদিন দশটাকা করে জমাই। বাকিগুলান আব্বা মায়ের কাছে দেই। টাকা জমিয়ে কী হবে।
বলল, সাইকেল কিনবো। সাইকেলে করে স্কুলে যাব। আব্বা মায়ের টাকা খরচ হইতো না আর তাইলে। বাহ ভালো বুদ্ধি। মুয়াজ্জিন অংকে একটু কাঁচা। বিবেকে বিশাল। বলল, প্রতিদিন দশ টাকা জমাইলে ছয়মাসে কত টাকা হয় ভাইয়া?
আমি উত্তর দিলাম না। এই উত্তরে তার সাইকেল হবে না।
আচ্ছা মুয়াজ্জিন, বড় হয়ে কী করার ইচ্ছে তোমার? বলল, এখন যেমন কাজ করতেছি বড় হয়ে আরো কাজ করতে চাই। তাইলে অনেক টাকা হবে। আমার সখ আব্বা আম্মারে হজে পাঠানোর।
আরে বাহ এই ছেলের স্বপ্ন কী বিশাল! সে হয়তো বুঝে না হজ কার জন্য। তবুও সে সুন্দর পবিত্র এই স্বপ্ন দেখেছে। বাদাম বিক্রেতা বাবা, গৃহিণী মাকে এই সুসন্তান হজে পাঠাবে।
মুয়াজ্জিন, পড়াশোনা করতে হবে না বাবা?
বলল, হ্যাঁ আমার আব্বুও পড়তে বলে। এইজন্যতো সারাদিন পান বেচি না। পড়াশোনা শেষ করে তারপর বের হই। মুয়াজ্জিন তার বাবা মাকে বোকা বলতে শিখেছে নিজেকে বুদ্ধিমান ভেবে। আসলেই তো বুদ্ধিমান। বলে, আচ্ছা দেখেন আমি যদি কিছু ইনকাম করে তাদের হাতে দেই এতে তাদের ভালো হইলো না কন ভাইয়া?
হু, মুয়াজ্জিন তুমি ঠিক বলেছ।
মুয়াজ্জিন তার বন্ধুদের গল্প শোনালো। তার বন্ধুরা এই শহরে নেই। সব গ্রামে। তার চোখ চকচক করে উঠলো বন্ধুদের কথা বলতে গিয়ে। স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লো।
মুয়াজ্জিন এই পানি বেচার কাজ বাদ দিলে হয় না? না না ভাইয়া বাদ দেব কিজন্য। এইটাতো আমার কর্ম। মন দিয়ে করা লাগবো। নইলে লাভ করবো কেন।
মুয়াজ্জিন সবসময় কি লাভ হয়? এত টাকা কী করবে?
বলল, লাভ করলে মানুষকেও দেয়া যায়। একদিন কী হইছে জানেন? এইরকম ঘটনা আমার ছয়বার হইছে ছয়রকম। একদিন দেখি এম্বুল্যান্সে রোগী উঠাইতাছে। রোগীর মনে হয় পিপাসা লাগছিল। আমার কাছে আছিল ছয় বোতল পানি। আমি কী করছি জানেন? সব বোতল তাদের এম্বুল্যান্সে দিয়া দিছি। সারা রাস্তা যেন পানি না লাগে। টাকা নেইনি। টাকা দিব ক্যামনে। তাদের হাতে পানি দিয়েই দৌড় মারছি যেন টাকা দিতে না পারে। উপকার করে ক্যান টাকা নেব?
মুয়াজ্জিন কী বলছ এসব জানো তুমি? এই কাজ কেন করলা? তুমি টাকা নিতে। বলল, ওরাতো টাকা দিতে পারতোই। কিন্তু বিপদের সময় ধনী গরিব দেইখা লাভ আছে আমার? উপকার করতে পারছি কিনা কন?
হ্যাঁ পেরেছ। কিন্তু তারা কি এটা মনে রাখবে?
কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না মুয়াজ্জিন। তবে যা বলল, তা শুনে আমার পেছনের যাত্রীও বলে উঠলো, মুয়াজ্জিন তুই আসলে মা বাবার গর্ব। কী বলেছিল আসলে মুয়াজ্জিন?
সে বলেছিল- ভাইয়া আমি তাগো উপকার করছি। বিনিময়ে আমার উপকার করা লাগবো না তাগোর। কিন্তু তারাও একসময় আরেকজনের এমন কইরা উপকার করবো। বিপদে পাশে দাঁড়াইবো।
আমি স্পিসলেস হয়ে গেলাম পিচ্চি এই ছেলের কথায়।
কথা বাড়াতে পারছিনা। গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। মুয়াজ্জিন আসলে বলতে চাইছে, উপকারটা একটা চেইনের মতো। তবে এই চেইন সীমাহীন। বড় হতেই থাকে। আমার মুয়াজ্জিনের মতো জীবন যাপন করতে ইচ্ছে করছে বেশ।
১২ জুন, সংসদ ভবন এলাকা।
আলী ইমরান